অমর মিত্র ‘র গল্প : ভাই বোন

বাড়িটা তাদের ঠাকুরদা করে গিয়েছিল। দোতলা। নিচে দুটি ঘর, উপরে দুটি। এক সময় দুই ছেলে দুই মেয়ে, ভাই, এক অবিবাহিতা বোন, ঠাকুরদা, ঠাকুমা নিয়ে বাবার সংসার বড় ছিল। এই বাড়ি তখন গমগম করত। কলকাতার কাছেই তাদের এই বাড়ি। বাসে দেড় ঘন্টা ধর্মতলা। ট্রেনে আধ ঘন্টা শিয়ালদা। তার অফিস আলিপুর ছিল সওয়া ঘন্টা। বোনের অফিস সোনারপুর ট্রেনে তিন ষ্টেশন। দিদির ইস্কুল ছিল ট্রেকারে করে ভিতরের দিকে ৪৫ মিনিট, দুই বোন এক ভাইদের দাদা পরিমল চলে গিয়েছিল দিল্লিতে। দিল্লি থেকে এক সময় বছরে, ন’মাসে ছ’মাসে ফিরত। বাবা মা চলে যাওয়ার পর দাদার মায়া একটু একটু করে চলে গেল, তবু বলত ফিরবে। হ্যাঁ, বড় বোন গরিমা বলে দাদা তো ফিরতই। বদলি নিয়ে কিংবা নতুন চাকরি নিয়ে চলে আসত। কিন্তু ফেরেনি। দাদা অনেক বয়সে, প্রায় পঞ্চাশে এসে বিয়ে করল এক গুজরাতি কন্যাকে। তিনিও চল্লিশ পেরোন, এইটি ছিল সেই কৃষ্ণা মেহতার দ্বিতীয় বিবাহ। মহিলা হাসেন না। তারা ভাই বোন দিল্লি গিয়েছিল সেই বিয়ের সময়। দিদি যায়নি। এত বয়সে কেউ বিয়ে করে, ছি! দিল্লিতে নতুন বউ কৃষ্ণা মেহতা, যে ছিল চল্লিশের উপর, তাদের, অমল এবং নীলিমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তারা বিয়ে করেনি কেন? 
হেসেছিল অমল, এমনি। 
কৃষ্ণা জিজ্ঞেস করেছিল, ছোট বোনকে বিয়ে দাওনি কেন ? 
দাদা বিমল বলেছিল, ও চায়নি বলে। 
–বাট শাদি জরুর হোনা চাহিয়ে। 
দাদার বউ, কৃষ্ণা মেহতা খুব চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অমল আর নীলিমা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদেরও বয়স হয়েছে। দাদা করেছে, ভালো, কিন্তু তারা করবে কী করে? খুব হেসেছিল তারা। বলেছিল তাদের পিসি বিয়ে করেনি। তাদের এক কাকা ছিল, বিয়ে করেনি। নীলিমা বলেছিল, তার যদি বিয়ে হয়ে যায়, দাদাকে দেখবে কে ? 
অমল বলেছিল, আমি থাকতে পারব। 
–একা থাকবি, বাপরে, তুই ঘুমের ঘোরে ভয় পেলে কে এসে ডেকে দেবে ? 
চুপ করে ছিল অমল। 
–তুই কিছুই তো পারিস না দাদা। 
অমল উত্তর দেয়নি। কথা তো অসত্য নয়। 
–আমার বিয়ে হয়ে গেলে তোর ভালো লাগবে দাদা ? 
–কাছে-পিঠে হলে ভালোই হবে। 
–ভালো হবে, ঘুম থেকে উঠলে তোকে চা করে দেবে কে ? 
–আমি করে নেব। অমল বলেছিল। 
–তোর জামায় বোতাম লাগিয়ে দেবে কে ? 
–তোর বই, রুমাল খুঁজে দেবে কে ? 
–ময়লা রুমাল কেচে দেবে কে ? 
–তোর চুল বড় হলে বলে বলে সেলুনে পাঠাবে কে ? 
–তোর অফিসের কলিগরা এলে কে চা-জলখাবার করে দেবে? 
–তোর জন্য জামা কাপড় কিনে আনবে কে ? 
–তোর… তোর…। 
বিয়ের কথা আর তোলেনি সে। যে লোকটি, তার কলিগ বিয়ে করতে চেয়েছিল নীলিমাকে, সে হতাশ হয়ে সাঁইথিয়া ফিরে গিয়েছিল। সে বলেছিল চেষ্টা করে নীলিমাকে সাঁইথিয়া বদলি করে নিয়ে যাবে। চাকরি ছাড়তে হবে না। নীলিমা বলেছিল, গরমের দেশ, গাছ-পালা নেই, যাবে না। অমল নিশ্চিন্ত হয়েছিল। বলেছিল, তবু বলেছিল, তুই যে গয়না গড়েছিলি, তার কী হবে ? 
হি হি করে হেসেছিল নীলিমা, গয়না কি এমনি পরা যায় না ? 
–তুই কি পরিস ? 
–ব্যাঙ্কের লকারে রয়েছে যে, এখন কেউ সোনার গয়না পরে ঘোরে না। 
–লকারে পচবে অমন সুন্দর সীতাহার, মকরমুখী বালা ? 
–পরে ভূত হয়ে ছাদে ঘুরব! নীলিমা আবার হেসেছিল মুখ টিপে টিপে, মরি আগে, তারপর পরব, ঝমঝম, ঝমঝম, মনিহারা মনে নেই, কণিকা মজুমদার। 
–মারব এক চড়, ফালতু কথা বলবিনে। অমল খুব রেগে গিয়েছিল। 
–আহা, আমি কি চিরকাল বেঁচে থাকব ? 
–না, চিরকাল মরে থাকবি, পাকা বুড়ির মতো কথা বলিসনে। 
–তাহলে কি গয়না পরে অফিস যাব ? নীলিমা বলেছিল। 
–কেন অনুষ্ঠানবাড়িতে পরতে পারিস তো। 
–সে তো পরি, এখন সবাই যেমন নকল সোনা পরে। 
দিদি গরিমা বসুও গয়না গড়েছিল জীবনের আরম্ভে। তাদের মায়ের সামান্য হার, চুড়ি ছিল। আগে সব আলমারিতে ছিল, পরে ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিয়েছে। তার আর দাদা পরিমলের বউয়ের জন্য মা এক গাছা করে চুড়ি রেখে গিয়েছিল। আশীর্বাদী। সবই লকারে ঘুমিয়ে থাকত। সেখানেই থেকে যেত যদি দাদা না বিয়ে করত আচমকা, পঞ্চাশে পৌঁছে। তখন নীলিমা, দুই বোনের একজন তার চাকরি থেকে গড়া হার-বালা নিয়ে দিল্লি গিয়েছিল সেই বিয়েতে পরার জন্য। নীলিমার গলায় সীতাহার, হাতে মকরমুখী বালা, আর সিল্কের শাড়ি। অমল বলেছিল, টুকু, তুই বেনারসি পরিস বিয়েতে। 
টুকু নীলিমার ডাক নাম, সে জিজ্ঞেস করেছিল, বেনারসি কইরে? 
–কিনে নিয়ে আয় মোহিনীমোহন থেকে। 
–ইস, বেনারসি বিয়ের কনে পরে, আমি পরতে যাব কেন ? বলেছিল নীলিমা, বিয়ে করে কী হয়, বেনারসি তো আলমারিতে থেকে থেকে ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যায়। 
–হুঁ, মায়েরটা তাই হয়েছিল। তখন নীলিমা বলেছিল আমি তোর জন্য ধুতি আর দারুণ কাজকরা পাঞ্জাবি নিয়ে আসব গড়িয়াহাট থেকে, তুই পরবি বিয়ের দিন। 
–আমি কি ধুতি পরি ? 
–পরবি, পায়জামা পাঞ্জাবির চেয়ে ধুতি পাঞ্জাবিতে তোকে সুন্দর দেখাবে, দাদার বিয়ে বলে কথা, কী জানি তোকেই হয়তো কারো পছন্দ হয়ে যাবে। 
গরিমা যায়নি বিয়েতে। খুব রেগে গিয়েছিল পঞ্চাশ বছরে বিয়ে করা কেন ? ছি! আর নীলিমা সত্যিই তার জন্য ধুতি পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছিল। কোরা ধুতি, সিল্কের পাঞ্জাবি। খুব পছন্দ হয়েছিল তার। দিল্লিতে সেই ধুতি পাঞ্জাবি তাকে পরতে হয়েছিল। ধুতি পরতেই জানত না অমল। নীলিমা পরিয়ে দিয়েছিল। গায়ে ডিও- সুগন্ধী ছড়িয়ে দিয়েছিল। দূরে দাঁড়িয়ে তার ছবি তুলেছিল ক্যামেরায়। নানা দিক থেকে। ওকে বলে ফোটো সেশন। তাইই হয়েছিল। যেন তারই বিয়ে হচ্ছে। পরিমলের বিবাহের সাজ হয়েছিল পেশাদার পার্লারে গিয়ে। গুজরাতি সাজ। মাথায় পাগড়ি, রঙিন চোগা-চাপকান। তা দেখে নীলিমা রাগ করেছিল। দাদা কেন ধুতি পাঞ্জাবি পরল না? এই জন্য বিয়ে করতে নেই। শ্বশুরবাড়ি দাদাকে ভেড়া করে রেখে দেবে। সেই ধুতি পাঞ্জাবি পরা ছবি ঘরের দেওয়ালে বাঁধান রয়েছে। নীলিমা বাঁধিয়ে এনেছিল। আর একটি ছবি আছে নীলিমা ও অমল। বিয়ের দিনই তোলা। তার গলায় সীতাহার, হাতে মকরমুখী বালা, কপালে টিকলি। টিকলি নকল। নকল সোনার টিকলি নিতে হয়েছিল অমলের জেদে। ছবি তোলার সময়ই পরা হয়েছিল। দিল্লি থেকে ফিরতে ফিরতে তার মনে হয়েছিল, নীলিমার বিয়ে দিলে ভালো হয়। কিন্তু কথাটা মনের ভিতরেই থেকে গিয়েছিল। বিয়ে হলে নীলিমা থাকবে অনেক দূরে। পর হয়ে যাবে। তারা ফিরে আসার পর বিয়ের কাহিনি শুনতে শুনতে তার মনের কথা ধরে নিয়ে গরিমা তার বোনকে বলেছিল, তোর যদি অনেক দূরে বিয়ে হয়ে যায়, দাদার মতো পর হয়ে যাবি, লোকের বাড়ি গিয়ে বাসন মাজবি। 
ফেরার পর বিয়ের কথা অনেক দিন ধরে তাদের আলাপে ছিল। তাদের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। দাদা টোপর পরেনি, পাগড়ি পরেছিল। দাদা ধুতি পরেনি, চোস্তা পায়জামা পরেছিল। এক বছর আগে দাদা বলেছিল রিটায়ারমেন্টের পর পাকাপাকি ভাবে ফিরবে, তখন চার ভাইবোন উপর-নিচ চারটি ঘর নিয়ে থাকবে। সেই সময় তিনটি ঘর নয়, দোতলার দুটি ঘর খোলা ছিল। দুই বোন এক ঘরে থাকত, আর এক ভাই এক ঘরে। একতলা বন্ধ। বাড়িটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়েছিল সেই ঠাকুরদার আমলেই। সেই প্রাচীর কোনো কোনো জায়গায় ভেঙে পড়েছে। বাড়ির পেছন দিকে বাগান আছে। সেই বাগানে আম, জামরুল, পেয়ারার গাছ আছে। চৈত্র মাস থেকে সেই শ্রাবণ পর্যন্ত বাগান কত দিত। তারা ভাই বোন চারজন বাগানে ঘুরে ঘুরেই বড় হয়েছে। অনেক দিন আর বাগানে যাওয়া হয় না। আগেরবার নীলিমা বলেছিল অনেক গাছেই আর ফল আসে না। ফলে হনুমানের উৎপাত কমে গেছে। গাছগুলোর বেশিরভাগ বুড়ো হয়েছে। 
দিদি গরিমা খুব রাগ করেছিল, দাদা বিয়ে করায়। বিয়ে করতে হলে আগেই করতে পারত। পরিমল আর আগের মতো থাকবে না। দিদির কথাই সত্য হয়েছে। বিয়ের পর দাদা একবার এসেছিল তার বউ নিয়ে। কৃষ্ণা মেহতা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখেছিল, বলেছিল, তারা ভাইরা ভালো না। কেন বোনের বিয়ে দেয়নি! 
বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল, কিন্তু কেউই করতে চায়নি। দুই বোনের ইচ্ছে যে ছিল না তা নয়, গয়না গড়েছিল সেই জন্যই তো। সামান্য বেতন থেকে সরিয়ে, কিস্তিতে। কিন্তু গয়না গড়লেই তো বিয়ে হয় না। তাদের বাবার চাকরি ছিল না। বেসরকারি কোম্পানি উঠে গিয়েছিল আচমকা। তখন একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়েছে আর ভরা সংসার নিয়ে লোকে বেকার হয়েছে। তখন খুব কষ্ট গেছে তাদের। কচি বয়সে সামান্য বেতনের চাকরিতে ঢুকে সংসারে টাকা দিতে হতো। তবু ভাইরা তো মনে মনে ভাবত খুব ধুমধাম করে বিয়ে দেবে। তাদের জমা টাকা বোনের বিয়ের জন্যই না হয় কিছু খরচ করবে। যৌতুক লাগলে দেবে। কিন্তু টাকা জমতে লাগল আর বোনেরা বুড়ি হয়ে যেতে লাগল। তাদের বিয়ের সাধ গেল। অনেক পরে সাঁইথিয়া চলে যেতে হবে শুনে নীলিমা বেঁকে বসেছিল যে, তা বলা হয়েছে আগেই। দিদি গরিমার বোধ হয় একটা প্রেম হয়েছিল কিছুদিন। লোকটা তখন পঞ্চাশ পার। বিবাহিত। এক কন্যার পিতা। দিদি বেশ কিছুদিন সেই লোকটার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিল। সে ছবি আঁকে। দিদি তাকে নিয়ে এসেছে এ বাড়িতে কয়েকবার। এক সন্ধ্যায় অমল এবং নীলিমা লোকটার সঙ্গে কথা বলেছিল। লোকটা শিল্পী। শিল্পীর মতোই কত গভীর করে ভাবে। একদিন লোকটা হুইস্কি এনেছিল। অমল আর সে পান করেছিল। তারা দুই বোন বিরিয়ানি রেঁধেছিল। পানের অনুপানের জন্য মৌরলা মাছ ভেজে দিয়েছিল। বোনলেস চিকেন ভেজে দিয়েছিল। তাদের একটু করে নিতে বলেছিল রুদ্রাংশু। তারা দুই বোন, দাদার দিকে তাকিয়েছিল। তাদের ইচ্ছে হয়েছিল। এক পেগ করে তারাও নিয়েছিল। রুদ্রাংশু তার ছবি আর রঙের কথা বলছিল গরিমাকে। তখন নীলিমা অমলের হাত ধরে টেনেছিল, চ দাদা, আমরা ব্যালকনিতে গিয়ে কথা বলি, দিদি আর রুদ্রাংশুদা থাকুক ঘরে, ওদের নিজস্ব কথা আছে তো। 
অমল বলেছিল, রুদ্রাংশু কী সুন্দর রঙের কথা বলছে। 
দিদি শুনুক, দিদিকেই বলছে তো। 
তারা অন্ধকার ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুজনে তাকিয়েছিল তারাভরা আকাশের দিকে। তারা ভাই বোন। অমল ও নীলিমা। তারা যা বলেছিল সব দূর আকাশের তারাদের। কেউ কাউকে নয়। কী বলেছিল তা জানে না। তবে নীলিমা অনেক পরে জিজ্ঞেস করেছিল, যদি রুদ্রাংশুদা দিদির ভার না নেয়। 
–ভালোবাসলে নিতে হয়। 
দিদির কাছেই শুনেছিল নীলিমা, লোকটা, রুদ্রাংশু পাল তাকে বলেছিল, সে বিবাহিত, তার পরিবার আছে, তাদের সে ছাড়তে পারবে না। 
দিদি বলেছিল, তার প্রেম আছে, আর কিছু সে চায় না। 
দিদি তার সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিল সমুদ্রতীরে। ফিরে এসেছিল ডগমগে হয়ে। কিন্তু সেই লোকটা নিজের পেইন্টিং এবং পরিবার নিয়েই ব্যস্ত থাকত বেশি। দিদি আসতে বলত। নিজে আসার সময় পেত না। দিদি ওর জন্য কতবার কলকাতা ছুটে গেছে। কিন্তু সে এসেছে কবার ? আসেইনি বলা যায়। মনে হয়, তার টান ছিল না। দিদির মুখ দেখলে কষ্ট হতো। সেই আশ্চর্য সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে তাদের। নীলিমা নিয়ে বেরিয়ে এলে খুব খুশি হয়েছিল দিদি। ব্যালকনিতে এসে নীলিমা অনেক পরে বলেছিল, দাদা, যদি দিদিকে নিয়ে আলাদা ঘর বাঁধে শিল্পী, তাহলে ? 
–শিল্পীরা অমন হয়, হতেই পারে। 
–দিদি এবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ? 
–যাবে। 
–শুধু আমরা থাকব। 
–থাকব। 
–দাদা তোর নেশা হয়ে গেছে। 
–ভালো লাগছে খুব। 
নীলিমা বলেছিল, আমারও ভালো লাগছে। 
–আনন্দ হচ্ছে। 
–আমারও আনন্দ হচ্ছে। নীলিমা বলেছিল, বড়দাকে ফোন করব দিল্লিতে ? 
–কেন ? 
নীলিমা বলেছিল, কেমন আছে জানতে। 
–ভালোই আছে, বড়দা তো আমাদের ত্যাগ করেছে। অমল বলেছিল, ফোন করতে হবে না। 
তখন চুপ করে গিয়েছিল নীলিমা। সে কতদিন আগের কথা। সেদিন দিদি আর সে, রুদ্রাংশু আর অমলকে যত্ন করে খাইয়েছিল। অমলের বিছানা সাজিয়ে দিয়েছিল নীলিমা। ঘুমো দাদা, তোর নেশা হয়ে গেছে খুব। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রুদ্রাংশুর বিছানা সাজিয়ে দিয়েছিল দিদি। তাদের, দুই বোনের থাকার কথা ছিল একতলার একটি ঘরে। ঘরটি অনেকদিন পরে খুলে ঝাড়পোছ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা, গরিমা, নীলিমা বহুরাত অবধি ব্যালকনিতেই বসে ছিল। অমল ও রুদ্রাংশু দুই ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গরিমা একবার উঠে রুদ্রাংশুর ঘরে গিয়ে দেখে এসেছিল, জল দেওয়া আছে কি না, রাতে গলা শুকিয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে তো। তখন নীলিমা গিয়ে দেখে এসেছিল দাদার পায়ের দিকের জানালা খোলা আছে কিনা। কার্তিক মাস। নতুন হিম পড়ছে। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে অমলের, কাশি আরম্ভ হলে গোটা শীতকাল চলবে। তখন বাসকপাতার রস, মধু, চ্যবনপ্রাস—সব দরকার হবে। কাশিতে দাদা খুব কষ্ট পাবে। 
দুই 
ধীরে ধীরে রুদ্রাংশুর কাছ থেকে সরে এসেছিল গরিমা। এক সাধুর আশ্রমে যেতে শুরু করেছিল। রুদ্রাংশু যোগাযোগ করতে চাইলেও, সে উত্তর দেয়নি। রুদ্রাংশু তাকে আশ্রয় দেয়নি, সে কেন রুদ্রাংশু্র জন্য বসে থাকবে ? তার মনে রুদ্রাংশুর ছবির রঙ লেগেছিল। রুদ্রাংশু যখন বলেছিল, সে বিবাহিত, সে কী করে গ্রহণ করবে গরিমাকে, গরিমা বলেছিল, তার মনে রঙ লেগেছে, ওইটুকু মাত্র, তার বেশি সে চায় না। রঙটুকু তার থাক। কিন্তু সেই কার্তিক, অগ্রহায়ণ গেল, ফাগুন চৈত্রে রঙ গাঢ় হলো, তারা সমুদ্রে গেল, সমুদ্র থেকে ফেরার পর বৈশাখের তীব্র রোদ আর ঝড়, বর্ষার প্রবল ধারায় সেই রঙ মুছে যেতে লাগল, ধুয়ে যেতে লাগল। পুজোর পর থেকেই দিদি ঠাকুরের আশ্রমে যেতে থাকে। ঠাকুর তাকে মোহাবিষ্ট করেছিল, যেমন করেছিল রুদ্রাংশু। তখন থেকে সে নিচের ঘরে একা শুতে থাকে। নিজের মতো করে গুছিয়ে নেয় নিচের ঘর। তখন সে অনেক রাত জাগত। মোবাইলে কথা বলত হয়তো। তারপর এক সময় সেই নেশাও কেটে যায়। আশ্রমে যাওয়া বন্ধ করে গরিমা। পরিমল বিয়ের পর থেকে দুই বোনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। অমলের সঙ্গেও। তারপর একদিন গরিমা বলল, কৃষ্ণা মেহতা দাদার জীবন শেষ করে দিয়েছে। 
–কে বলল ? নীলিমা জিজ্ঞেস করেছিল। 
–দাদা। 
–দাদার সঙ্গে তোর যোগাযোগ আছে ? নীলিমা অবাক। 
–আছে, সব সময়ই আছে, বিয়ের আগে থেকে, পরেও। 
–আমাদের ফোন বেজেই যায়, কেউ ধরে না। নীলিমা বলেছিল। কিন্তু সে তো একবারই হয়েছিল। তারপর নীলিমা আর ফোনই করেনি। কী দরকার। অমলও না। 
–দাদার একটা আলাদা ফোন আছে, বাইরে গিয়ে ফোন করে। গরিমা বলেছিল। 
নীলিমা জিজ্ঞেস করেছিল, দাদার কি আমাদের কথা মনে পড়ে না ? 
গরিমা বলল, জানি না, কিন্তু আমাকে ফোন করে, এমন কি রাত্তিরে বউ ঘুমলে ব্যালকনিতে গিয়ে কথা বলে। 
নীলিমা জিজ্ঞেস করল, এতই যদি টান ছেড়ে চলে আসুক। 
–উপায় নেই, কৃষ্ণা মেহতা চোখে চোখে রাখে, ব্যাঙ্কের পাশবই, চেক বই সব তার কাছে, দাদা হাত খরচ পায়, দাদা যদি পালিয়ে আসতে পারত! 
নীলিমা পরে অমলকে বলেছিল, এই সব কথা ঠিক না। 
–কী কথা ? 
–কৃষ্ণা মেহতা অত খারাপ না। 
সেও তো প্রায় দুবছর হয়ে গেল। এখন এই বাড়িতে দোতলায় তারা দুইজন। এক তলায় আর এক বোন। দোতলার ভাই বোন ছোটবেলার গল্প করে। হ্যাঁ, দাদা, কাকা বিয়ে করেনি কেন ? 
ব্যালকনির পাতলা অন্ধকারে এসে পড়ে তখন সেই পুরাকালের চাঁদের আলো। অমল বলেছিল, তাদের কাকা অবিনাশের বউ তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। 
কী সে গল্প ? 
তা জানে না অমল। তবে আবছা যা শুনেছিল মায়ের কাছ থেকে, বছর খানেকের চেনা, প্রেম আর বিয়ে, কিন্তু বিয়ের এক মাসের মাথায় বউ চলে যায়। কেন চলে যায় কাকা বলেনি। অপমানিত কাকা আর বিয়ের দিকে যায়নি। শোনা যায় সেই বউ সংসার পেতেছে উত্তরবঙ্গে। অবিনাশ চন্দ্র আর বিয়ে করেনি। দিদির বিয়েটা দিতে পারা যেত না কি ? সে তো নীলিমার বিয়েও হতে পারত। নীলিমা হেসে বলেছে, ভাগ্যিস হয়নি, আমার বিয়ে হলে তুই কী করতিস ? 
অমল বলেছিল, সে একটা কৃষ্ণা মেহতার হাতে গিয়ে পড়ত। কিন্তু নীলিমা বলে, কৃষ্ণা মেহতা সকলে হয় না। আবার কৃষ্ণা মেহতা তাদের দাদাকে খুব ভালোবাসে হয়তো। তারা যা ভাবে তেমন হয়তো নয়। বেশি ভালোবাসা হলে অমনই হয়। দিদি কি সব ঠিক বলে ? দিল্লি থেকে তারা এই মফস্বল শহরে আসবে কেন ? তখন গরিমা যদি উপরে আসে, বলে, উইচ, কৃষ্ণা মেহতা একটা ডাইনি, দাদা পরিমলকে একেবারে দখল করে নিয়েছে। না হলে অবসর নিয়ে পরিমল ঠিক ফিরে আসত এই বাড়িতে, তারা চার ভাইবোন এক সঙ্গে থাকতে পারত। 
দাদার বিয়ের পর-পরই দিদি একদিন নিয়ে আসে রুদ্রাংশুকে। দাদার বিয়ে দেখেই দিদির হয়তো সাধ হয়েছিল পুরুষের। না হলে রুদ্রাংশু পর্ব ঘটত না। দাদা ফিরে এলে দিদি রুদ্রাংশুকে নিয়ে আসার সাহস পেত না। আর দিদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে হতো না। 
নীলিমা বলেছিল, হ্যাঁ দাদা, তোর প্রেম ছিল ? 
–থাকলে তুই জানতিস তো। 
–বড় হওয়ার আগে কী হয়েছিল তা আমি জানব কী করে ? 
অমল বলেছিল, তারা এসেছিল এক বছরের জন্য, তারপর তারা চলেও গেল। 
–কী নাম দাদা, চিনতাম ? কৌতুহলী হয়েছিল টুকু–নীলিমা। 
–না, আমার কলেজে, একটা ইয়ার পড়ে আসানসোল কলেজে চলে গিয়েছিল। 
–সে কি খুব সুন্দর ছিল ? 
–ছিল। অমল বলেছিল। 
–বলিসনি কেনরে, আমরা খুঁজে নিয়ে আসতাম। নীলিমার গলায় বিমর্ষতা। 
হেসেছে অমল, বলেছে, সে তো আমাকে রিফিউজ করেছিল। 
নীলিমার চোখে দ্যুতি ফিরে এল। বলল,সে ঠিক কৃষ্ণা মেহতার মতো হতো। 
–না হতো না। গরিমা উপরে উঠতে উঠতে বলেছে। হয়তো সে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শুনছিল নীলিমা আর অমলের আলাপ। 
–কী করে বুঝলি ? নীলিমা ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেছে। তার মুখে বিরক্তির ছাপ। 
–কৃষ্ণা মেহতা সকলে হয় নাকি ? গরিমা বলল, দাদার খুব কষ্ট। 
–একবার ফোন করতে বলবি আমাদের। বলল অমল। 
প্রসঙ্গ এড়িয়ে গরিমা বলল, দাদার কোনো প্রেম ছিল না। 
–কে বলল ? 
–দাদাই বলেছে, কৃষ্ণা মেহতা ফাঁদে ফেলে দাদাকে বিয়ে করেছে। 
নীলিমা বলল, হতে পারে না। 
–তুই জানিস না। গরিমা রেগে গিয়েছিল। 
অমল বলল, ওদের ব্যাপার ওদের বুঝে নিতে দে। 
–কেন বুঝে নেবে, আমার দাদা না, আমি একদিন কৃষ্ণাকে ফোন করে বলব দাদাকে ছেড়ে দিতে। 
–কী যে বলিস দিদি! 
–ঠিকই বলি, দাদাকে বন্দী করে রেখেছে। গরিমা বলল, আবার বলল, উইচ! 
–দিদি অমন বলিস না, দাদা কষ্ট পাবে। 
–দাদা খুব কষ্টে আছে রে। 
নীলিমা চুপ করে যায়। দিদি এতদিন বলেনি, এখন বলছে। কৃষ্ণা মেহতাকে নিয়ে যখন দাদা এসেছিল বিয়ের পর, গরিমা দুদিন বাদেই চলে গিয়েছিল চুঁচড়োয় মাসির বাড়ি। এমনিতে যায় না, কেন যে গেল? ফিরেছিল যখন ওরা চলে গেছে। ফিরে বলেছিল, ঐ বউটা ভালো হয়নি। গরিমা এখন নিন্দে করছে কৃষ্ণার। সবদিনই তা করে। এই নিন্দার ভিতরে একদিন দুপুরে যখন শুয়ে আছে অমল, তার অবসর হয়ে গেছে, নীলিমা, টুকুর অবসর তিন মাস বাকি, ফোন এল। ফোন কৃষ্ণা মেহতার। তার কাছেই এল। কী হয়েছে ভাবি ? তাদের দাদা পরিমল চন্দ্রের প্রয়াণ হয়েছে। হি হ্যাজ এক্সপায়ারড। হার্ট অ্যাটাক। দুপুরে ঘুমের ঘোরে। 
সন্ধ্যা হয়ে এল। পরিমল চন্দ্রের মৃত্যু সংবাদ এসেছে। দুই বোনের কেউ জানে না। নিচে অমলের দিদি, গরিমা, খুকু ছিল। অমল স্তম্ভিত হয়ে ব্যালকনিতে বসে থাকল। দাদার কোনো সম্পর্ক ছিল না এবাড়ির সঙ্গে। তবু তো ছিল। জমি-বাড়িতে দাদার ভাগ আছে। দিদি খুকু বিশ্বাস করে, দাদা কৃষ্ণা মেহতার হাত থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসবে এ বাড়িতে। আসবেই। টুকু ফিরল সন্ধের পর। টুকুকে বলল অমল। টুকু জিজ্ঞেস করল, দিদি জানে ? 
–আমি তো বলিনি। 
–দিদিকে ডাকি। 
–কেন ? 
–খবরটা। অস্ফুট বলল টুকু। 
–দিদি কষ্ট পাবে খুব। 
–পরে জানবে যখন, আমাদের দুষবে। 
অমল চুপ করে থাকে। টুকু দাদার গায়ে হাত রাখল, বলল, তুই সকালে উঠে বেরস না কেন, সকলে মর্নিং ওয়াক করে। 
–ভালো লাগে না। 
–ভালো লাগে না বললে হবে। টুকু ঝাঁজিয়ে উঠল, তারপর খুব নরম গলায় বলল, দাদা, আর তিন মাস, তারপর আমি তোকে সারাদিন নজরে রাখতে পারব, প্রেসারের ওষুধ খেতে ভুলে যাস। 
অমল চুপ করে থাকে। 
টুকু বলে, রিটায়ারের পরে একবার পুরী যাব, দিদি কি যাবে ? 
অমল চুপ করে থাকে। 
টুকু বলল, আর তো তিন মাস মাত্র। 
অমল তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে, তারপর কী মনে হতে বলল, দাদার বিয়ের কথা মনে পড়ছে, খুব আনন্দ হয়েছিল। 
–আমারও। 
–আমরা দিল্লি গেলাম। 
টুকু হাসে, হ্যাঁ। 
–তুই কী সুন্দর সেজেছিলি, গয়না পরেছিলি। 
–হ্যাঁ। মাথা নামায় টুকু। 
–আবার পরবি একদিন। 
–পরবরে পরব। 
–পরে আয়। 
–এখন ? 
–হ্যাঁ, আগের মতো সেজে আয়। 
–আজ না, কাল। টুকু বলল, কাল ছুটি আছে তো, গুড ফ্রাইডে। 
পরদিন বিকেলে গরিমা উঠল উপরে। বলল, দেখ অমু, আমাদের দুই ভাই দুই বোন, দাদাকে ঐভাবে দখল করে নিল দিল্লির ডাইনিটা, তোরা গিয়েছিলি, বিয়েটা ভেস্তে দিয়ে আসতে পারিসনি ? 
অমল চুপ করে থাকে। টুকু জিজ্ঞেস করল, দাদা তোকে বলে সব ? 
–বলেই তো, কাল রাতে বলল, ভালো করে খেতেই দেয় না কৃষ্ণা মেহতা। 
–বলল ? 
–হ্যাঁ, বলল। 
সেদিন অনেক রাতে গয়না পরে টুকু দাঁড়ায় ব্যালকনির চাঁদের আলোয়। অমল বসে ছিল ইজি চেয়ারে। টুকু বলল, দাদা, আমি। 
তখন নিচের তলা থেকে আবছা কান্নার শব্দ উঠে আসছিল…… খেতে দেয় না, খেতে দেয় না…। তোকে মেরে ফেলে দেবে দাদা, তুই ফিরে আয়।

3 thoughts on “অমর মিত্র ‘র গল্প : ভাই বোন

  • November 9, 2020 at 5:52 pm
    Permalink

    অসাধারণ গল্প। অবিবাহিত ভাইবোনেরা নিজস্ব জগতে হারিয়ে গেছে। বাস্তব না কল্পনা দিয়ে তৈরি সে জগত কেউ জানে না। শুধু শেষের কান্না বলে দেয় এ জগত তারা বানিয়ে নিয়েছে মনের মধ্যে আর এই কল্পজগতে তারা আমৃত্যু স্বেচ্ছাবন্দী। মানবমনের এই গভীর রহস্যের মুখোমুখি হয়ে বড় অসহায় লাগে !

    Reply
  • November 11, 2020 at 3:30 am
    Permalink

    পড়লাম গল্পটি।খুব ভালো লাগলো।

    Reply
  • January 21, 2022 at 7:15 pm
    Permalink

    খুব ভাল

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *