ওরাসিও কিরোগা’এর গল্প ঃঃ আরো বেশি কিছু

Más allá আরো বেশি কিছু/ ওরাসিও কিরোগা (উরুগুয়ে)/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

মরীয়া হয়ে গেছিলাম- কন্ঠস্বর বলে উঠল- ওকে ভালবাসতাম বলে মাবাবা প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল। ওরা আমায় মারধোর করত। শেষের দিনগুলোতে তো দরজায় উঁকি মারতেও দিত না। আগে যখন ও সকাল থেকে রাস্তার এককোণায় দাঁড়িয়ে থাকত তখন এক ঝলকের জন্য হলেও ওকে দেখতে পেতাম। পরে এটুকুও আর পারতাম না!
আগের সপ্তাহেই মাকে বলেছিলাম-
কিন্তু তুমি আর বাবা ওর মধ্যে কী দেখেছ যে আমায় এমন করে কষ্ট দিচ্ছ? ওর সম্পর্কে কী বলতে চাও তোমরা? কেন বাধা দিচ্ছ? মনে হচ্ছে যেন আমায় দেখবার জন্য এ বাড়ির চৌকাঠ মাড়ানোর যোগ্যতাও নেই ওর। 
কোন কথার উত্তর না দিয়ে মা আমায় বের করে দিল ঘর থেকে। ঠিক সেই সময় বাবা ঘরে ঢুকছিল, আমায় হাত দিয়ে আটকে দিল। মাকে কী কী বলেছি সেসব কথা মার কাছ থেকে শুনে নিল। দু কাঁধ ধরে ছিটকে বের করে দিল আমায়। পেছন থেকে চিৎকার করতে লাগল-
তোর মা ভুল করেছে। ও যা বলতে চেয়েছে তা হল , আমরা দুজনে, তোর মা আর আমি, শুনতে পাচ্ছিস, তোকে ওই ছেলের সাথে দেখবার আগে আমাদের কাছে তোর মরা মুখ দেখাও ঢের ভাল। আর একটাও কথা নয় এ ব্যাপারে। 
বাঃ খুব ভাল- বাবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে ঘুরে বসতে বসতে বললাম। মুখটা ওর ফ্যাকাশে হয়ে আছে, টেবিলক্লথটার চেয়েও বেশি বিবর্ণ – ঠিক আছে ছেলেটার সম্পর্কে আমি আর কিছু বলব না তোমায় বাবা। 
তারপর আস্তে আস্তে সে আমার ঘরে ঢুকল। গভীর আশা নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল যাতে আমি হাঁটাচলা করি, যাতে আমি কী দেখছি তা যেন সে দেখতে পায়। আর ঠিক তখনই আমি মরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। 
মৃত্যু! রোজকার এই নরকের চেয়ে শান্তির মৃত্যু। একথা তো জানব যে দু পা দূরেই ও আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটু দেখবে বলে, আমার চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট পাচ্ছে আমারই জন্য! লুইসকে বিয়ে করার অনুমতি বাবা কক্ষনও দেবে না! কেন দেখা হল ওর সঙ্গে আমার? নিজেকে এখনও প্রশ্ন করেই চলি। গরীবী কী বস্তু? আমরাও তো ওর মতনই মানুষ ছিলাম!
ওহ্‌ বাবার সেই জেদ! আমি তো ভালই চিনি তা, ঠিক বাবা যেমন করে মাকে চিনত।
ওই ছেলের হাতে ওকে তুলে দেবার চেয়ে হাজার বার মরুক ও- বাবা বলছিল।
কিন্তু বাবা কী দেবে আমায় এর বদলে ? আমার সর্বস্ব কেড়ে নেবার পরেও লুইস আমায় ভালবাসে – একথা জানলে বাবা কী করবে? বাবা যদি আমায় একবারটি দরজায় মুখ বাড়িয়ে ওকে দেখতেও না দেয়, তাহলে তার বদলে কী দেবে বাবা? 
মৃত্যুই শ্রেয়। মরি যদি দুজনে একসাথেই মরব।
আমি জানি ও যথেষ্ট সক্ষম নিজেকে নিজেই মেরে ফেলতে। কিন্তু আমি, লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য নিজেকে একা একা শেষ করে ফেলতে পারব না। আর কখনো দেখা হবে না জানার পর এক মুহূর্তও ওর পাশে থাকাটা আমার কাছে ঢের ঢের বেশি কাম্য। 
একটা চিঠি লিখলাম ওকে। সবকিছু খুলে লিখলাম। এক সপ্তাহ পরে সেই এক হোটেলে একই জায়গায় দেখা করলাম। 
কী ঘটতে চলেছে ভেবে কতটা যে গর্ব হচ্ছিল আমার সেকথা বলে বোঝাতে পারব না, যদিও মরব বলে খুশি ছিলাম না। সেটা এক বড্ড ভয়ানক অনুভূতি, বড় বেশি উন্মত্ততা, দারুণ দ্রুত কাজ চুকিয়ে ফেলার ঝোঁক যা থেকে ফিরে আসা যায় না। ঠিক যেন অতীতের গভীর থেকে উঠে আসা আমার দাদু, তার দাদু, আমার শৈশব, আমার প্রথম কম্যুনিয়ন, স্বপ্নের থেকে উঠে আসা আকূতির মত। যেন আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই তাদের উদ্দেশ্য নেই। 
আমাদের আনন্দ হচ্ছিল না। আবার বলছি আমাদের মরতে খুশি লাগছিল না। জীবনকে ছেড়ে যাচ্ছিলাম আমরা কারণ আমাদের একে অন্যের মধ্যে বিলীন হতে বাধা এসে পড়েছিল। জীবন তো আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল তখনই। প্রথমে বিছানায় শুয়ে আমরা শেষবারের মত দুজনে দুজনকে পবিত্র আলিঙ্গন করলাম । পোশাক আর জুতো যেমন যেমন এল পরে নিলাম। বুঝেছিলাম ওর বুকের ভেতর বাহুর ভেতরে থাকা যেন আশীর্বাদ। ইস যদি ওর প্রেমিকা বা বউ হতাম। 
দুজনে একসঙ্গে বিষ খেলাম। ওর হাত থেকে বিষের গ্লাসটা নেওয়া আর মুখে ঢালার মাঝখানের সামান্য সময়ে ওরা এল। যেভাবে আমার দাদুদিদিমা মৃত্যুর কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে দিচ্ছিল সেই একই শক্তিতে আমার অনিবার্য নিয়তির সীমায় দাঁড়িয়ে আচমকা উঁকি মারল ওরা… দেরী হয়ে গেছে তখনই! রাস্তায় হঠাত দারুণ হই হট্টগোল। সেই একই শহর, থেমে গেল ওরা। বিশাল সেই শহরের যার যার নিজস্ব খুলি থেকে বের হয়ে হতভম্ব ওরা এসে দাঁড়াল আমার সামনে। আগমুহূর্ত পর্যন্ত সেই পরিবেশটা চেনাজানা লোকের চিৎকারে সরগরম হয়ে ছিল। 
খোলা চোখে দু সেকেন্ড নিশ্চল হয়ে রইলাম। তারপর তড়িঘড়ি ওকে আঁকড়ে ধরলাম, শেষ পর্যন্ত আমার অদ্ভূত একাকীত্ব থেকে মুক্তির দোড়গোড়ায়।
ওর ধরে থাকি। এক্ষুনি মরে যাবে ও। 
বিষটা তীব্র শক্তিশালী ছিল। প্রথমে লুইস কথা বলল, যাতে আমাদের দুজনের একসাথে কবরের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। 
ক্ষমা করো- মাথাটা এলিয়ে পড়ছিল লুইসের, সেই অবস্থাতেই বলল- তোমায় এত ভালবাসি যে আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।
আমাকেও মাফ করো তুমি- বললাম – একসাথে মরব আমরা। 
আর কথা বলতে পারছি না। বড্ড শব্দ… বাইরে থেকে কী ভয়ঙ্কর আওয়াজ কানে আসছে। ওরা কী আমাদের কষ্ট দেখতে আসছে? দরজায় এত জোরে জোরে কে ধাক্কা দিচ্ছে?
আমার পিছু পিছু চলে এসেছে ওরা খুঁজতে খুঁজতে … বিড়বিড় করে যাচ্ছিলাম আমি- কিন্তু আমি তো এখনও তোমারই
কথা শেষ হতেই খেয়াল করলাম এইসব কথাগুলো মনে মনে আওড়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই অজ্ঞান হয়ে যাই।
*** ***
জ্ঞান ফিরলে মাথা বনবন করছিল, কোথায় আছি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। খুব অবশ লাগছিল প্রায় হাত পা এলিয়ে গিয়েছিল। এতটাই যে চোখ খোলার মিষ্টি অনুভূতিটাকেও শান্তভাবে উপভোগ করলাম। দাঁড়িয়ে আছি আমি! হোটেলের সেই ঘরটাতে, দেওয়ালের গা ঘেঁষে বিছানার পাশে মার উদ্বিগ্ন মুখ।
আমাকে ওরা বাঁচিয়ে দিল। তারপর? চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম। দারোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে – লুইস, ওর ওপর চোখ পড়লে মৃদু হাসল। দুজনে দুজনের দিকে তীব্র চোখে চেয়ে রইলাম। বিছানার চারপাশ ভর্তি লোকজন, ওরই মধ্যে দুজনে দুজনের চোখে খুশি ছুঁতে পারলাম। 
ওকে দেখতে দেখতে ওর স্বচ্ছ চোখের ভাষা পড়তে পড়তে বুঝলাম আমিও ওরই মত… মারা গেছি। 
আমরা মরে গেছিলাম। যদি কেউ এসে আমায় বাঁচিয়ে দেয় এই ভয় পেতে পেতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মা যখন মরীয়া হয়ে আমার মৃতদেহটাকে ঝাঁকাচ্ছিল সেই ফাঁকে হোটেলের কর্মচারী লুইসের বাহু থেকে আমার শরীরটাকে সরিয়ে আলাদা করে দিচ্ছিল।
ঘটনাস্থল থেকে অনেকটা দূরে আমি আর লুইস হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছিলাম সবকিছু… আবেগহীন শীতল। তিন পা দূরেই আমরা আছি, আত্মহত্যার কারণে মৃত। চারপাশে আমাদের বাপ মা, হোটেলের কর্মচারীর দল, মালিক আর পুলিশ। এতে কী যায় আসে আমাদের?!
সোনামণি… কত সামান্য দাম দিয়ে আমরা এমন সুখ পেলাম! 
আর আমি, আমি কী পেলাম… আগে যেমন চাইতাম তোমায় এখনও ঠিক তেমন করেই চাইব, লুইস। আমরা আর কখনও আলাদা হব না গো। আরও কাছাকাছি থাকতে পারব তাই না?
ওহ্‌ ঈশ্বর… আমরা চেষ্টা করেছি।
রোজ রাতে আমায় দেখতে আসবে তো?
নিজেদের শপথ একে অপরের কাছে বলার ফাঁকে ফাঁকে ভাবছিলাম মা জোরে চেঁচিয়ে উঠবে। কিন্তু কানে এল প্রায় অসহায় একটা গোঙানি। সে গোঙানি মার শরীরের এক মিটারের দূরত্বে থাকা সত্ত্বেও পেরিয়ে ছুঁতে পারছে না আমায়। 
আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ঘটনাস্থলে চোখ ফেরালাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের শরীরগুলো ওরা বয়ে আনছিল, ততক্ষণে মরে যাবার পরেও অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আপনাদের জানিয়ে রাখি ততক্ষণে আমার বা লুইসের হাড়্গুলো শক্ত হতে শুরু করেছে, আঙ্গুলগুলোও। 
আমাদের মড়াগুলো… কখন হল এসব? সত্যি বলতে কী আমরা আমাদের জীবনের কিছুটা অংশ, কিছু কোমল মুহূর্ত কাটিয়ে গেছি… সেসবই কি সিঁড়ির তলায় পড়ে থাকা ওই দুটো মড়া শরীরের জন্য, যার চারপাশে এতজন লোক ঘিরে আছে? 
মরে গেছে ওরা! কী অসম্ভব ব্যাপার! জীবনের চেয়েও বেশি আমাদের মাঝখানে যা বাস করে সে হল অনন্ত প্রেম সে এখনও দারুণ ভাবে অপেক্ষা করছে। আগে দরজা দিয়ে ওকে দেখবার জন্য একটু মুখ বাড়াতেও পারতাম না আর এখন ওর সঙ্গে সবসময় কথা বলতে পারি। এবার থেকে প্রেমিক হিসাবে ও আমার বাড়িও যেতে পারবে।
কবে থেকে বাড়িতে আমায় দেখতে আসবে তুমি?- ওকে প্রশ্ন করলাম।
কাল থেকে- গা এলিয়ে বলল ও- আজকের দিনটা তো কাটুক।
কাল কেন?- অভিমান করে বললাম,- আজকের দিনটা কি সেই একই দিন নেই? আজ রাতেই এসো না লুইস! একলা ঘরে তোমার সঙ্গে কাটাব এমন আমার কতদিনের ইচ্ছে!
আমারও তো! বেশ রাত নটায় তাহলে?
ঠিক আছে, বাই সোনা…
দুজনে দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মনটা বড় হালকা, ঠিক যেন প্রথম বার প্রেমিকের সাথে দেখা করে বাড়ি ফিরলাম। রাতেই আবার দেখা হবে যে।
*** ***
ঠিক রাত নটায় দৌড়ে গেলাম রাস্তায়। নিজে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে এলাম আমার প্রেমিককে, বাড়িতে, দেখা করবার জন্য!
জানো ঘরটায় লোকে লোকারণ্য? – বললাম- তবে ওরা আমাদের দেখে সংকোচ করতেও পারবে না।
তা তো বটেই, দেখতেই তো পাবে না… তুমি আছো তো?
হ্যাঁ
ভীষণ খারাপ দেখতে হয়ে গেছ?
নাঃ ততটা নয়। এসো, এসে নিজেই দেখো আমায়!
আমরা দুজনে তখন ঘরে। আমার নীল হয়ে যাওয়া কপাল, খাড়া হয়ে থাকা নাক, নাকের ফুটো দুটো বড্ড কালো দেখাচ্ছে, আমার মুখ ঠিক ওই রকমই দেখাচ্ছে যা দেখবার জন্য লুইস ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তার এককোণে দাঁড়িয়ে থেকেছে। 
তোমায় ঠিক আগের মতন দেখাচ্ছে- ও বলল
সত্যি? – বললাম- মনটা ভরা লাগছে- দুজনে আর পারছিলাম না ঘুমিয়ে পড়লাম। 
কিছুক্ষণের জন্য সবকিছু ভুলে আছড়ে পড়া জনস্রোত দেখছিলাম। সেইসময় লুইসের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম
দেখো!- কী হবে গো?
লোকজনের গলার আওয়াজ ক্রমে বাড়তে লাগল। ওরা সবাই মিলে একটা নতুন কফিন ঘরে নিয়ে এল। নতুন নতুন সব লোকজন, অনেককে আগে কখনও দেখি নি। সবাই চলে আসছিল ওদের সঙ্গে। 
আমি! এটা আমি! – অবাক হয়ে লুইস বলল। – আমার বোনেরা এসেছে দেখছি!
লুইস দেখো! ওরা আমাদের দুজনের শরীর এক কফিনে রাখছে! যেরকমভাবে মরে গিয়েছিলাম একসাথে।
যেভাবে আমরা একসাথেই থাকব!- লুইস বলল। তারপর একদৃষ্টে বোনেদের যন্ত্রণাকাতর মুখের দিকে চেয়ে রইল।
বেচারী খুকীরা!- নরম গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল। 
নিজেকে ওর কাছে হিঁচড়ে নিয়ে গেলাম। এবার আমার পালার শ্রদ্ধার্ঘ্য পেতে দেখলাম। কাঁদো কাঁদো মুখে বাবামা আমাকে কফিন থেকে সরিয়ে, ভগবান জানে কীভাবে ওরা আমাদের একসাথে কফিনে শোয়াতে পারল! 
আমাদের কবর দিচ্ছে একসঙ্গে!… কী পাগলামো! এই দুজন ছেলেমেয়ে কোন হোটেলের বিছানায় একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু শরীরে মনে পবিত্র ওরা তো বেঁচেই আছে একসঙ্গে! ওই দুটো ঠান্ডা মৃতদেহ, নামহীন, জীবন যেখানে যন্ত্রণায় ভেঙে গেছে… কিছুই আমাদের জোড়া দিতে পারছিল না। এত সবকিছু সত্ত্বেও আমাদের ভেতরে তীব্র ভালবাসার স্রোত বইছিল … অন্যরূপে। 
ওই শরীর দুটোও- লুইস বলল- আমাদের মতই চিরটাকাল একসাথে থাকবে।
কিন্তু আমি তো তোমার সঙ্গে রয়েছি- বললাম- চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে।
বাকী সব কিছু বিস্মরণ হয়ে গেল।
**** **** 
তিনমাস ধরে গলাটা শোনা যেত। সম্পূর্ণ আনন্দে ডুবে ছিলাম। সপ্তাহে দুদিন আমার প্রেমিক দেখা করতে আসত। ঠিক রাত নটায় আসত, একদিন রাতেও এক সেকেন্ড দেরী হয় নি ওর কিংবা আমারও ওকে দরজায় গিয়ে স্বাগত জানাতে। সময়ানুবর্তীতা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম না আমি কিংবা আমার প্রেমিক। কখনও রাত দেড়টা দুটোয় গলার স্বর শোনা যেত। আমাকে জড়িয়ে রাখা কিংবা ওর দিকে আমার চেয়ে থাকা কোনটাই ভুল হত না। যখন যাবার সময় হত ওর হাতের তালুতে গাল রেখে চেয়ে চেয়ে উপভোগ করতাম সেইসব মুহূর্ত, সতৃষ্ণ। 
দিনের বেলায় ওর কথা ভেবে ভেবে, এঘর ওঘর করে, পরিবারের লোকেরা সংসারের যেসব কাজকম্মে লিপ্ত যেসবে বিন্দুমাত্রও আগ্রহও নেই, তবুও সেসব জায়গায় থেকে সময় কাটিয়ে দিতাম। এমনকী কখনও কখনও খাবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতাম মা তার ছোট মেয়ের পাশে ফাঁকা খাবার টেবিলে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। 
আমি বাঁচছিলাম, টিকে রয়ে যাচ্ছিলাম- আবার বলছি কথাটা, ভালবাসার দায়ে, ভালবাসার কারণে। ওকে ছাড়া, আমার প্রিয়তমকে ছাড়া, ওর স্মৃতি আঁকড়ে থেকে যাচ্ছিলাম। বাকী সব কিছু অন্য দুনিয়ার মনে হত। এমনকী আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটা আমার মা, তার দিকেও চেয়ে দেখি আমাদের ভেতর এক অলঙ্ঘ্যনীয় নরক রয়ে গেছে যা আমাদের যোজন দূরত্বে রেখে দিয়েছে।
বাগদত্ত জোড়ার মত রাতে বেরোতাম। এমন কোন রাস্তা ছিল না যে পথ দিয়ে না হেঁটেছি, এমন কোন বিকেল নেই যেখানে দুজনে নিজেদের সব না বলা কথা বলেছি একে অপরকে। রাতে চাঁদ উঠছে, চরাচর যখন স্নিগ্ধ শীতলতা নেমে আসত, হাঁটতে হাঁটতে আমরা শহরের বাইরে চলে যেতাম। সেখানে নিজেদের আরও মুক্ত আরও শুদ্ধ আরও ভালবাসায় ডুবে থাকা মনে হত। 
সেরকম এক রাতে দুজনের কবরখানার সামনে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে করল মাটির নিচে যেখানে শুয়ে আছি সে জায়গাটা কেমন সেটা দেখি। বিশাল এলাকার ভেতর ঢুকলাম, পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালাম সবচেয়ে বিষণ্ণ এক কবরের সামনে। এক টুকরো মার্বেল চকচক করছে। ওপরে দুজনের নাম লেখা আর আমাদের মৃত্যুর তারিখ, ব্যস।
আমাদের স্মৃতি রাখবার জন্য এর চেয়ে সংক্ষেপে কিছু লেখা আর সম্ভব নয়- লুইস বলল।-এরকমই হয়, ব্যস। এভাবেই কত কষ্ট যাতনা সামান্য লেখা থাকে, জীবনে এর চেয়েও ঢের বেশি ছিল।
আবার দুজনে চুপ করে রইলাম।
হয়ত সেই জায়গায় সেসময়ে কেউ যদি আমাদের দেখত মনে হত দুটো বোকা খড়ের আঁটির মত পুড়ে যাচ্ছে ধূধূ করে। কিন্তু আমি আর আমার প্রেমিক দুজনেই জানতাম বোকা কাকে বলে আর ওই দুই আত্মা মুক্তি না পেয়ে আত্মহত্যা করে আমাদের পায়ের তলায় শুয়ে আছে । অথচ বাস্তবে আমাদের ভুলে ভরা পবিত্র জীবন আপনি উঁচুতে রয়ে আমাদের ভেতরে বিলীন হয়ে আছে ঠিক যেন একই প্রেমের দুটি জ্বলন্ত শিখা।
সেখান থেকে সরে গেলাম, সৌভাগ্যবান, স্মৃতিশূন্য। হাঁটতে থাকলাম আমাদের মেঘহীন সুখের সাদা পথে। 
যাই হোক ওইসব লোকেরা এসেছিল। তবু পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সব অবাক চাহনি থেকে সরে এসে, সীমাহীন, ভাবনাহীন আমাদের এসব ভাবনার দিকে ফেরাতে পারল না আর। আমাদের ভালবাসা বাড়তে লাগল। কোন অলৌকিক উপায়ে তা বেড়েছিল একথা বলব না। বরং যে আবেগ আমাদের প্রেম পর্ব পুড়িয়ে দিয়েছিল সেটাই এই জীবনে ফিরে পেলাম। একসঙ্গে থাকাকালীন এক মধুর বিষণ্ণতায় মন ছেয়ে যেত। কাছে থাকলে মধুর আবার দূরে সরে গেলে বিষণ্ণ। বলতে ভুলে গেছি তখন আমার প্রেমিক প্রতি রাতে দেখা করতে আসত আমার সঙ্গে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই কথা বলতাম না আমরা। যেন কোন কথাই আমাদের আবেগকে পূর্ণ রূপ দিয়ে উঠতে পারবে না। বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির সবাই যখন ঘুমে অচেতন তখন ও ফিরে যেত। 
চুপচাপ আমরা বেরোতাম আর ফিরে আসতাম। কেননা ওর কথা না শুনেই বুঝতে পারতাম আমায় কী বলতে চাইছে ও। ও নিজেও বুঝতে পারত না যে তাকিয়েই ওর যেকোনো কথারই উত্তর দেব আমি। 
একদিন রাতে, আমাদের অস্বস্তির সীমা আকাশ ছুঁল। লুইস অন্যদিনের চেয়ে দেরীতে বাড়ি থেকে গেল। দুহাতের ভেতর ওকে জড়িয়ে, ঠান্ডা চোখে ওর দিকে চাইলাম। ওর চোখের ভাষা পড়লাম। আমাদের ভেতরে যা চলছে সে বিষয়ে একটা অসহ্য স্বচ্ছতা ওর চোখে। মড়ার মত ফ্যাকাশে হয়ে গেলাম। ওর হাত দুটো অবশ্য আমায় ছাড়েনি।
লুইস!- বিভ্রান্ত অসহায় আমি ডেকে উঠলাম। মনে হচ্ছিল অন্য কোন পরিস্থিতিতে আমার শরীর মরীয়া হয়ে ওর আশ্রয় চাইছে। ভয়ঙ্কর অবস্থাটা টের পেল ও। কারণ আমার হাত ছেড়ে দিল। এখন খেয়াল করে দেখি ওর চোখে পুরনো কোমল চাহনি আবার ফিরে এসেছে।
কাল সকালে আবার, ডার্লিং- হেসে বলল লুইস
হুম, কাল সকালে- বিড়বিড় করে উত্তর দিলাম। আরও কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল বড্ড।
কারণ সে মুহূর্তে টের পাচ্ছিলাম আর একটা কথাও বলে উঠতে পারব না আমি। 
পরদিন রাতে লুইস এল। একসাথে বেরোলাম। গল্প করলাম। এমন ভাবে কথা বলছিলাম যেন আগে কোনদিন বলি নি। পরের রাতগুলোতেও যেন এভাবেই বলব। সবকিছু ব্যর্থ হল। দুজনে দুজনের দিক আর তাকাতে পারছিলাম না। সংক্ষেপে বিদায় নিলাম। কেউ কারো হাত ধরি নি।একে অন্যের থেকে অনেক খানি দূরত্বে।
আহ্‌! এটাই ঠিক হত…
শেষদিন রাতে লুইস আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। উরুতে মাথা রাখল। 
সোনা- ফিসফিস করে ডাকল।
চুপ!- বললাম।
আমার সোনা- আবার শুরু করল ও।
লুইস! চুপ করো! – বললাম আমি- উঠতে চেষ্টা করে বললাম- আর একবারও যদি ও কথা বলো
ওর মাথা সরে গেল। চোখে চোখ আমাদের। – একথা বলতেও ভয়ংকর লাগছে!
কী? – লুইস বলল- যদি ওনামে ডাকি কী হবে?
সব জানো তুমি
বলো বলো
তুমি জানো! আমি মরে গেছি তো!
পরের পনের সেকেন্ড আমাদের দৃষ্টি তীব্রভাবে একে অন্যকে জড়িয়ে রইল। সেই সময়টুকুতে দৃষ্টি চলাচল করেছিল। যেন নিয়তির সুতোয় গাঁথা। অনন্ত প্রেমের কাহিনী- কর্তিত, পুনরায় চালু, ভগ্ন, পুনরায় বিভক্ত, পরাজিত আর শেষাবধি অসম্ভবের আকাঙ্খার হাতে পরাজিত।
আমি মরে গেছি- কান্নার ফিসফিসানি উঠে আসছিল আমার গলায়। চোখে চোখ রেখে ভেঙে পড়ছিলাম চোখের জলে। ও – ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। আবার আমার হাঁটুতে মুখ গুঁজল। অনেকক্ষণ পরে বলল-
একটা কাজ ছাড়া আমাদের তো আর কিছু করার নেই… বলল 
আমিও ওটাই ভাবছি- বললাম
তুমি কি বুঝতে পারছ আমার কথা? 
বুঝেছি- বললাম। ওর হাত ধরে তুললাম। পিছনে না তাকিয়ে দুজনে হাঁটা শুরু করলাম আমাদের সমাধিস্থলের দিকে।
আহ! ভালবাসার সঙ্গে খেলতে নেই! প্রেমিক প্রেমিকাদের নিয়ে খেলতে নেই! যে ঠোঁট দুটো চুম্বনে ডুবে থাকতে পারত আত্মহত্যায় সে দুটি পুড়তে থাকে। জীবনের সঙ্গে খেলতে নেই! তীব্র আবেগের সাথে খেলতে নেই! যখন সমাধির গভীর থেকে দুটো আত্মা আমাদের ছায়া আর মিথ্যার দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করতে থাকে। প্রেম! এক উচ্চারিত অনুচ্চারণীয় শব্দ। মৃত্যুর আনন্দ উপভোগ করতে চাইলে সেই বিষ পাত্র তুলে নাও হাতে। আদর্শের সারমর্ম। শান্তির অনুভূতি। শুধু স্মরণেই রয়ে যায় তা আর কান্নায়। যখন দুজোড়া ঠোঁটের নিচে চাপা পড়ে যায় তা, বাড়ানো দুটি হাতে রয়ে যায় বিশুদ্ধ প্রেম।
সেই চুমুই আমাদের কাছে মৃত্যুর সমান হল- কথা শেষ করল সেই কন্ঠ। – আমরা সেকথা জানি। যখন কেউ ভালবাসার জন্য একবার মরে, তাকে তো নতুন করে মরতেই হবে। একটু আগেই আমার আত্মায় লুইসকে ফিরে পেয়ে চুমু পাবার যোগ্য হয়ে উঠি। পরের মুহূর্তেই ও আমায় চুমু খাবে। ঘটনার অস্থায়ী মেঘের মত যে চুমু আমাদের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে থাকবে। সমস্ত অস্তিত্বময় বস্তুকে পরাস্ত করবে তা। চিরকাল আমাদের নশ্বর দেহের প্রতি অনুগত রইবে। 
পরে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে তাকে অস্বীকার করি আমি। কিন্তু যদি কোনদিন আমাদের প্রেম আমাদের বিষে নীল হয়ে যাওয়া শরীরের চেয়ে উঁচুতে স্থান পায় তাহলে তিন মাস ধরে আমি কাব্যিক অলীকতায় ডুবে থাকব। হয়ত ওরাও থাকবে- ভালবাসার সেই আদিম ও জরুরী বিষয়গুলো যারা আমাদের জঘন্য বাধাগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছে। 
সমাধিফলকের ওপর দাঁড়িয়ে লুইস আর আমি পরস্পরের দিকে অনেকক্ষণ ধরে খোলা চোখে চেয়ে রইলাম। ওর দু হাত আমার কোমর আঁকড়ে নিল। ওর মুখ খুঁজে নিল আমার মুখ আর আমি … ওর মধ্যে নিজেকে এমন করে সঁপে দিলাম যাতে দুজনে নিলীন হয়ে যাই… 
****** ****** 

অনুবাদক
জয়া চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *