মিখাইল শিশকিনের গল্প : নবোকভের কালির ছিটে

ভাষান্তর : মৌসুমী কাদের

মিখাইল শিশকিন রুশ সমকালীন কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন  লেখক।  তিনি মস্কোতে ১৯৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং মস্কো স্টেট পেডাগজিক্যাল ইনস্টিটিউটে ইংরেজি এবং জার্মান বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। স্নাতকের পর তিনি নানা পেশায় কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে লেখক হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন এবং দ্বোভাষী ও অভিবাসন সেবা বিষয়ে কাজ করেন।  শিশকিন খোলাখুলিভাবে বর্তমান রুশ সরকারের বিরোধিতা ও সমালোচনা করে বলেন যে এটি একটি দুর্নীতিগ্রস্ত,অপরাধমূলক শাসন, যেখানে রাষ্ট্র একটি ‘পিরামিড চোর’। শিশকিনের ভাষা সহজ, চমৎকার, নিখুঁত ও সংক্ষিপ্ত। পুনরুত্থান এবং ভালোবাসার মত সার্বজনীন বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। ‘নবোকভস ইঙ্কব্লট’,‘নব্য রুশ’ দের নিয়ে লেখা বিদ্রুপাত্মক একটি কাহিনী যা পাঠকদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়। 


মিখাইল শিশকিনের গল্প : 
নবোকভের কালির ছিটে

জুরিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমন-টার্মিনালে ‘কোভালেভ’ লেখা একটা সাইনবোর্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। খুব আনন্দ হচ্ছিল আমার। 
আমাদের ছেলের বয়স তখন এক বছরও পেরোয়নি এবং আমার স্ত্রী ওকে নিয়ে বাড়িতেই থাকতো। ঠিক এই দিনগুলোতেই আমি একটা স্থায়ী কাজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জীবন খুব কঠিন হয়ে উঠেছিল। সবকিছুতেই আমাদের টিপে টিপে খরচ করতে হোত। আমি আমার পরিবারের জন্য যথেষ্ট উপার্জন করতে পারছিলাম না বলে মনটা ছোট হয়ে থাকতো। আর তার উপর দুটো জন্মদিন সামনে এগিয়ে আসছিল–প্রথমটি আমার ছেলের এবং দ্বিতীয়টি আমার স্ত্রীর। উপহার কেনার জন্য জরুরী ভাবে আমার টাকার প্রয়োজন ছিল। প্রিয়জনদের জন্য আমি অবাক করা চমৎকার কিছু কিনে দিতে চেয়েছিলাম। অথবা ওদের চমকে দিতে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। সামান্য কিছু একটা করে হলেও ওদের সুখী করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ি ভাড়া দেবার মতই যথেষ্ট টাকা ছিল না তখন।

ঠিক সেসময়ই ভাগ্য ফিরেছিল। দোভাষী সংস্থা থেকে একটা আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। ওরা আমাকে ড্রাইভ করে বিমানবন্দর থেকে একজন খদ্দেরকে তুলে নিয়ে প্রথমে হোটেলে এবং তারপর ব্যাংকে– তার কাজ শেষে মনত্রোতে পৌছে দিতে বললো। 

আর সেকাজের সূত্র ধরেই আমি এভাবে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর জীবন উপভোগ করছিলাম। এ কাজে ভালো বেতনের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম; আর সেই সঙ্গে এই প্রমোদ ভ্রমণটি আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাবে বলে মনে হয়েছিল, আর সেটা হলো—-‘নবোকভ’।

মনেত্রো প্যালেসে নবোকভ যে ঘরটিতে থাকতেন ঠিক সেই ঘরটিই আমার খদ্দের ভাড়া করেছিল। এই দরিদ্র দোভাষীর এমন একটি সুন্দর জায়গা দেখবার সুযোগ হলো যেটা নাকি রুশভাষী যে কোন পাঠকেরই স্বপ্ন ছিল।

আমি আমার সাইনবোর্ডটি হাতে বিলম্বে আসা ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম এবং মনে মনে আকাশকুসুম ভাবছিলাম; কিভাবে আমি নবোকভের লেখায় জায়গাটায় গিয়ে বসব, তারপর ড্রয়ারটি খুলে ফেলব এবং অবশেষে সেই কালির দাগভরা ইংকব্লটটি দেখতে পাবো।

নবোকভের কালির দাগভরা ইঙ্কব্লট! এই ব্যাপারটি নিয়ে আমি বেশ পড়াশুনা করেছি। এখন সেটা আমি আমার আঙুলগুলো দিয়ে ছুঁতে পারবো! আহা, কি আনন্দ! 

কোভালেভকে দেখা মাত্রই আমি চিনতে পারলাম। সে অবশ্য আমাকে চিনল না। দুনিয়ার সব কোভালেভদের মধ্যে এটাযে সেই ‘কোভালেভ’ হবে এমনটা আমি চিন্তাও করিনি। 
আমার প্রথম পাগলামো চিন্তাটা ছিল এরকম যে, সাইনবোর্ডটা দিয়ে তার হাতে আঘাত করে তারপর ঘুরে চলে যাবো। কিন্তু তার স্ত্রী ও কন্যাও সঙ্গে ছিল। মেয়েটির বয়স পাঁচ বছর হবে। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো এবং একটা খেলনা পেঙ্গুইন বাড়িয়ে দিল। এটা সে তাঁর বাড়িতে জমানো খেলনাগুলো থেকে প্লেনে চড়ে বয়ে নিয়ে এসেছে। আমি পেঙ্গুইনটা দিয়ে কি করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম যে আমি কেবল নামমাত্র একজন ‘পরিচিত’ ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নই। পেঙ্গুইনটির নাম ছিল পিঙ্গা। 
চলে যাওয়ার বদলে আমি কোভালভের সঙ্গে করমর্দন করলাম এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানানসই কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম,
‘জুরিখে স্বাগতম! ফ্লাইটটি ভাল ছিলতো? ইত্যাদি ইত্যাদি…’ 
আমরা ড্রাইভ করে বো-আ-ল্যাক হোটেলে গেলাম। এখানেই তাদের থাকা ঠিক হয়েছিল। 
ট্যাক্সিতে,কোভালেভ একসঙ্গে দুটি সেল ফোনে জরুরী কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিল এবং বিরতির সময় আমাকেও আলোচনায় যুক্ত করল। 
প্রত্যেকটি বিষয়ের উপরই তার জোড়াল ও স্পষ্ট মতামত ছিল।

যেমন; ‘সুইস এয়ার সত্যিই নিজেদের ডুবিয়েছে! ফ্লাইট দেরী ছিল আর তার সঙ্গে ওদের সেবাও ছিল ভয়ঙ্কর!’ 
অথবা ‘ঐ আল্পস পর্বতমালাতো কিছুইনা। আমাদের আলটাই পাহাড়গুলো তোমার দেখা উচিত’। 
বা, সুইস এর প্রকৃতি একারণেই এত সুন্দর যে গত দু’শ বছরে কেউ ওদের পাছায় লাথি মারেনি!!’ 
একজন নিম্নপদস্থ দোভাষী বলে আমি কোন তর্কতে যাইনি। কারণ তারা ঘণ্টার হিসেবে আমাকে টাকা দিচ্ছে। কোভালভের কথা আমার যতদূর মনে পড়ে, সে একসময় দেখতে একটা লিকলিকে সাদা বালক ছিল। তার গায়ের পোষাকে ‘রাশান কমিউনিস্ট ইউথ অরগানাইজেশন – লেনিনবাদী ইয়াং কমিউনিস্ট লীগ’ কমসোমাল-এর পিন লাগিয়ে রাখতো। প্রতিদিন ইন্সটিটিউট ছেড়ে চলে যাবার সময় সেটা খুলে রাখতো ও। আজকাল আর কেউ এই পিনের তোয়াক্কা করে না।

কিন্তু আজ সে এখানে দামী স্যুট পরা সম্ভ্রান্ত এক ‘নব্য রুশ’ হয়ে এসেছে। 
আমরা দুজনেই মস্কো রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলাম। আমি ছিলাম জার্মান বিভাগে আর কোভালেভ ছিল আমার চেয়ে দু গ্রেড উপরে, ইংরেজী বিভাগে। সে কমসোমল এর কর্মকর্তা হিসেবে ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে আর স্কুল এসেম্বলিগুলোতে বক্তৃতা দিত। সে পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলোকে খুব গদ্গদ চিত্তে আর মোলায়েম স্বরে ঘোষণা করত। এসব কাজে কলেজ কর্তৃপক্ষের পছন্দের ব্যক্তি ছিল সে। । আর আমরা ঠিক একারণেই তাকে খুব ঘৃণা করতাম। ইন্সটিটিউটে পড়াশুনা শেষ করে কোভালেভ কমসোমলের জেলা শহর শাখার প্রতিনিধি হিসেবে থেকে গিয়েছিল। তার মতন একজন মানুষের পক্ষে অনেকদূর যাওয়াই সম্ভব–সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তখনই। । আমি তাকে অশ্রদ্ধা করতাম। 
জীবন এখন সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে; কোভালেভ শেষ পর্যন্ত শীর্ষে পৌঁছে গেছে আর আমি পৌঁছেছি একেবার নীচে। দোভাষী হিসেবে আমাকে ডাকার কথা হয়ত কোভালেভ চিন্তাই করেনি। হোটেলে চেক-ইনের সময় সে অনর্গল ইংরেজীতে কথা বলছিল। আর মিটিংয়ের জন্য যখন সে ব্যাংকে ঢুকছিল, তখন তার স্ত্রী আর কন্যাকে জুরিখ ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিল। আমার সাবেক এই সহপাঠি খুব দ্রুতই স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে সে একজন ভৃত্যের জন্য টাকা দিচ্ছে,দোভাষীর জন্য নয়। তাঁর উচ্চাভিলাষ তাঁকে এই ধরনের সেবা পাবার যোগ্য করেছে– এটা তার বিশ্বাস তার হাবেভাবে ফুটে উঠেছে। 
কোভালেভের স্ত্রীর নাম আলিনা। তার মত উঁচু মর্যাদার লোকের পক্ষেই নিশ্চিতভাবে এমন একজন স্ত্রী পাওয়া সম্ভব। আলিনা তরুণী,সুন্দরী ও স্বর্ণকেশী। তার মতন উচ্চবিত্ত নারীর পক্ষেই এমনভাবে ধীরে-সুস্থে জুরিখ ভ্রমণ করে দেখা যথাযথ ছিল। সে বানহফস্ট্রাসের বুটিক দোকানগুলো থেকে শুধুমাত্র দামী জিনিষগুলোই কিনছিল। ইয়ানশকা, বাচ্চা মেয়েটি, মায়ের কেনাকাটায় বিরক্ত হচ্ছিল, তাই আমি তাকে পেঙ্গুইনের গল্প বলে আনন্দে রাখার চেষ্টা করছিলাম। 
‘তুমি কি জানো?’, মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো,‘পেঙ্গুইনরা তাদের সন্তানদের খুব ভালোবাসে। সেজন্য তারা বছরের অর্ধেক সময় শুধুই ডিমে তা দেয় যাতে সেগুলো ঠাণ্ডা হয়ে না যায়। এ সময় তারা কিছুই খায় না। 
‘হ্যাঁ, আমার মনে হয় এরকম কিছুই টেলিভিশনে দেখেছিলাম’, আমি উত্তর দিলাম। ‘আমার মনে হয় আসলে বাবা পেঙ্গুইনটিই ডিমে তা দেয়’। 
‘সত্যিই?’ ইয়ানশকা খুব আশ্চর্য্য হলো। আমার মনে হলো এটা শুনে নিজের বাবার প্রতি তার গর্বও বেড়ে গেল। ‘আমার বাবা আমি যা চাই তাই কিনে দেয়! সে কথা দিয়েছে আমাকে ছোট্ট ঘোড়ায় চড়াবে!’ 
আলিনাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে আগেই জুরিখে ছিল। চারপাশ ঘুরে দেখার বদলে আমাকেই সে শেষ পর্যন্ত পথ দেখিয়ে দোকানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি বিষন্ন মনে জিনিষপত্র টেনে নিয়ে তাকে অনুসরণ করছিলাম। তারপর আমরা ‘স্প্রিংলি’ ক্যাফেতে বসলাম। তখন আলিনা বললো যে, সে একজন প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং রিদমিক জিমন্যাস্টিকস খেলতো। আমি তার ফিগার দেখেই সেটা বুঝেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল সে কারো সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমাকে সে জানালো– তার স্বপ্ন ছিল একজন ‘ট্রেইনার’ হবার। কিন্তু তার স্বামী চেয়েছিল যেন সে তার সন্তানের সঙ্গেই বাড়িতে থাকে। তারপর সে বলা শুরু করলো, বাবা হিসেবে কোভালেভ কতটা ভালো এবং ইয়ানশকাকে সে কতটা ভালোবাসে। মেয়েটা যেন একেবারে তার জানের টুকরা। আমি আলিনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম এবং সত্যিই সে তার স্বামীকে ভালোবাসে কিনা–সেটা বোঝার চেষ্টা করলাম। নাকি সে কেবল সুবিধা পাবার জন্য বিয়ে করেছিল কোভালেভকে?  মেয়েটাকে দেখে কিন্ত ঠিক ‘সোনালীকেশী বোকা মেয়ে’ বলে মনে হলো না। মনে হলো, সত্যিই সে কোভালেভকে ভালোবাসে। 
তারপর সে হঠাৎ বলে উঠলো; ‘সত্যি বলতে কি, আমি শপিং করতে একদমই পছন্দ করি না। আমার কিছু পরিচিতজনের জন্য কিছু উপহার কিনতে হবে। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি- যেনো কারো কথা আবার ভুলে না যাই’। 
বিদায়ের সময় আনন্দের ভঙিমায় আলিনা আমাকে একটা জোকস শোনাল– ‘দুজন নতুন রুশ ইমিগ্রেন্ট জুরিখের বানহফস্ট্রাসে দেখা করল। একজন আরেকজনকে একটি গলার টাই দেখিয়ে বললো, ‘দেখ, আমি এটা মাত্র দুহাজার ফ্রাঙ্ক দিয়ে ঐ স্ট্যান্ড থেকে কিনেছি! অন্যজন বললো; ‘তুমি একটা বোকা! আমি ঠিক একই টাই দেখেছি আরেকটি স্ট্যান্ডে, মাত্র তিন হাজার ফ্রাঙ্ক! আলিনা খুশীর চোটে হাসিতে ফেটে পড়লো। পিঙ্গা তার ডানা আর জুতো নাড়িয়ে বিদায় জানাল এবং আমরা সকাল পর্যন্ত বিদায় নিলাম। পরের দিন তাদের সঙ্গে আমার মনত্রোতে যাবার কথা। 
সে রাতে আমাদের ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরেই ঘুমাচ্ছিল না, শুধু কাঁদছিল, আর ওর জ্বরও এসেছিল। আমার স্ত্রী তাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাচ্ছিল। এই গানটি তার মা তাকে ছোটবেলায় শোনাতো; 
আয় ঘুম আয় আয়… 
বাবা মাঠে মেষ চরায় 
মা স্বপ্ন ডাল দোলায় 
দুই চোখে তাই খোয়াব নামায় 
আয় ঘুম আয় আয়… 

আমিও ঘুমাতে পারছিলাম না। ঘুমপাড়ানি গান শুনে শুনে আর ছেলের মুখে একটু আলো দেখার অপেক্ষা নিয়ে জেগে রইলাম। এই পৃথিবীতে এ দুজন মানুষই আমার জীবনে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একারণেই সত্যিই আমার একটি চাকরীর প্রয়োজন।  ওদের জন্যই জরুরীভাবে আমার  কিছু টাকার দরকার। আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলেও একদিন বলতে পারবে: 
‘আমার বাবা আমি যা চাই তাই কিনে দেয়! 
কিন্তু আমার কোন টাকা নেই, এবং এখন পর্যন্ত একটা ভাল চাকরীও আমি জোগাড় করতে পারিনি, এসব ছুটো কাজ দিয়ে চলছি। আরেকটা ভয় ছিল হয়তো আমার স্ত্রী গোপনে তার বাবা-মায়ের কাছে টাকা চাইছে। তাতে আমি মনে মনে ভীষণ লজ্জিত ছিলাম। আমি একজন বেকার– একটা ধনী দেশে  দরিদ্র একজন বিদেশী মাত্র। 
শেষপর্যন্ত ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ল। আমার স্ত্রী আমাকে ধাক্কা দিয়ে শুয়ে পড়ল,কিন্তু আমার আর ঘুম এলো না। 
আমাকে সে জিজ্ঞেস করল,‘বলোতো, তোমার কি হয়েছে? ‘আমি বুঝতে পারছি কিছু একটা তোমাকে ভোগাচ্ছে। ও আমার ভালোবাসা, বলো কি হয়েছে? আমরাতো একসঙ্গেই আছি; কি আর এমন খারাপ কিছু হতে পারে?’ 
আমি তাকে তখন কোভালেভ এর কথা বললাম, কীভাবে, অনেকদিন আগে, সে সরকারী একজন দালাল ছিল এবং কেমন করে আমি তাকে ঘৃণা করতাম। 
যদি ভাগ্যক্রমে অন্য কোথাও আমাদের দেখা হতো, তাহলে কোনভাবেই আমি ওর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতাম না। কিন্তু এখন সে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে এখানে এসেছে, কোত্থেকে এত টাকা পেয়েছে কে জানে! আর এখন আমিই কিনা ওর চাকর’। 
‘তুমি মোটেই ওর চাকর নও। সৎ ভাবে কাজ করে উপার্জন করছ,এটাই। যে কোন পেশাই মর্যাদার সঙ্গে করা যায়’। 
‘তুমি জানো’? আমি বললাম, ‘টাকার গন্ধ সব জায়গাতেই আছে, কিন্ত বিভিন্ন দেশে তা বিভিন্ন রকম। সুইজারল্যান্ডে, টাকার গন্ধটাকে ‘দুর্গন্ধনাশক সুগন্ধি’ দিয়ে মুখোশ পরিয়ে রাখা হয়, কিন্তু রাশিয়াতে টাকা উৎকট গন্ধ ছড়ায়। নগদ.অল্প টাকা থেকে দারিদ্রের মত গন্ধ বের হয়। আর বড় অংকের টাকা ময়লা, চুরি, ঘুষ গ্রহণ, প্রতারণা, এবং রক্তের মত দুর্গন্ধ ছড়ায়। মোটা টাকা কোনভাবেই ওখানে সৎ হতে পারে না। তোমার কি মনে হয়? কোভালেভ কোথা থেকে এত টাকা পেল? রাশিয়াতে সৎভাবে পরিশ্রম করে দশ জনমেও এত টাকা উপার্জন করা সম্ভব না। আর সে কিনা ব্যাগ ভর্তি নোংরা টাকা নিয়ে এসে এদেশে ব্যাংক একাউন্ট খুলছে। এবং আমিও তার একটা অংশ পাচ্ছি। আমি আমার ‘সৎ শ্রম’ দিয়ে তারই দালালী করে নোংরা টাকা উপার্জন করছি, এই হচ্ছে আমার অবস্থা! অথচ এই কাজটি আমার সম্মানের সঙ্গে করা উচিত ছিল!’। 
আমার স্ত্রী বলল,‘মাই লাভ, এমন করে ভেবোনা! প্রয়োজনে চাকরীটা ছেড়ে দাও। টাকা নরকে যাক! এখন ঘুমাতে চেষ্টা করো, অনেক রাত হয়েছে।’ 
পরের দিন খদ্দেরদের নিয়ে আমি মনত্রোর দিকে রওনা দিলাম। 
পথে কোভালেভ সারা বিশ্ব সম্পর্কে তার মতামত বলতে থাকলেনঃ 
‘তারা ভয় পেয়ে মহাসড়কগুলোতে রাডার বসিয়েছে। আর তুমি এত বেশী ভয়ে থাকো যে সত্যিকার জীবনটাতেই বাস করোনা এখানে’। 
অথবা,‘সুইসদের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন কিসের? আল্পস পাহাড়ের উপর দিয়ে যতবার খুশী ওড়ার জন্য কতো বিলিয়ন টাকা লাগে একজনের? তোমাদের  অনেক টাকা আছে এখানে। এই টাকা দিয়ে তোমরা কি করবে–সেটা তোমরা জানোই না।’’ 
অথবা,‘নবোকভ ছিলেন একজন প্রতিভাভর। আজকালকার সব আধুনিক লেখকরাই ফালতু’। 
নবোকভের জন্য আমার সেই পুরনো পরিচিত আবেগের সঙ্গে কোভালেভের কমসোমল অতীত অথবা বর্তমান বিশাল ব্যবসায়ী পরিচিতি ব্যাপারটি মেলানো যায় না। কিন্তু এ নিয়ে কোভালেভকে কিছু জিজ্ঞেস করি না। ‘কোন্‌ কোন্ লোক নবোকভকে শ্রদ্ধা করে?’ এ ধরনের প্রশ্ন করাটা হবে এ সময়ের জন্য বোকামী। 
কিন্তু আমাদের তরুণ বয়সে নবোকভ কেনো নিষিদ্ধ ছিলেন–সে ব্যাপারটা এখনও আমার কাছে বিস্ময় লাগে। তার লেখাগুলো হাতে অথবা টাইপরাইটারে বারবার কপি করতে হতো। তারপর আমরা একে অপরকে গোপনে সেই লেখাগুলো পাচার করতাম। নিজেদের তখন অত্যাচারিতের দল মনে হতো এবং তার বইগুলোই ছিল আমাদের মূল্যবাদ সম্পদ। হয়ত আমরা নিজেদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্যদল মনে হতো তখন। কারণে আসলে যুদ্ধ একটা চলছিলোই সোভিয়েত প্রশাসনের সঙ্গে। তারা আমাদের আত্মা ও মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি রেখেছিল। নবোকভ ছিলেন একজন লেখকের চাইতেও অনেক বেশী। তিনিই ছিলেন আমাদের অস্ত্র। তার বই পড়া ছিল একঘেয়ে সময় পার করার চেয়েও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ,  এবং ওটা ছিল একটা যুদ্ধ—-নিজেদের রক্ষা করার যুদ্ধ। আমরা ক্রীতদাস থাকতে চাইনি কেবল– সেই জীবন থেকে মাথাটাও বাঁচাতে চেয়েছিলাম। ওটা ছিল স্বাধীনতারই একটি অংশ। সে সময়ে নবোকভ ছিল আমাদের জীবনের প্রতীক। আমাদের এবং তাদের মধ্যে একটা বিভাজক রেখা টেনে দিয়েছিলেন নবোকভ। কোভালেভ স্পষ্টতই তাদের একজন ছিল। আর এখন সে আমাকে মনেত্রোতে নিয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই ভীষণ অদ্ভুত… 
ছোট্ট মেয়েটি গাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং আমাদের বেশ কয়েকবার গাড়ী থামাতে হলো। কোভালেভ পেছনের সিটে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলো এবং নানা গল্প বলে ওর মনটাকে অন্যদিকে ভুলিয়ে রাখতে চাইলো। কোভালেভের সব গল্পেরই প্রধান চরিত্র ইয়ানশকা। সে দস্যু অথবা ড্রাগনের হাতে বন্দী হয়ে আছে। সেখান থেকে মুক্তি পাবার জন্য লড়াই করছে। রূপকথার এসব গল্পে ইয়ানশকা সবসময় জিতে যাচ্ছে। মেয়েটা একটুও না হেসে মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনছিলো। 
ফেব্রুয়ারী মাস। মস্কোতে তখনও তুষারঝড় হচ্ছিল, আর মনত্রোতে বসন্ত শুরু হয়ে গিয়েছিল। সূর্য আকাশ থেকে যেন একটু নিচুতে নেমে এসেছে, আর আয়নার মত স্বচ্ছ হ্রদের উপর দিয়ে সিগাল পাখিগুলো ঢেউ খেলে হালকাভাবে উড়ে যাচ্ছে। 
বিখ্যাত ফেরীঘাটটি এখনও মুসলিমদের বোরখার মতন কালো রঙ ধারণ করেনি –বরং পশমী গায়ে দেয়া এবং সানগ্লাস পরা বয়স্ক ভদ্রমহিলাদের ভীড়ে সরগরম হয়ে আছে । ওরা তখন দৈনন্দিন হাঁটার কাজটি সারছিল। কোভালেভ তার কোটের চেনটা খুলে ফেললো, আর তীর্যক দৃষ্টি ফেলে আবছায়ার ভেতরে নীল আল্পসের দিকে হেঁটে চললো। 
“হ্যাঁ,এভাবেই আমি কল্পনা করেছিলাম সবকিছু হবে!” 
আমাকে অবিরাম প্রতিটা কোণা থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে ছবি তুলতে হচ্ছিল। 
নবোকভ যে ঘরটিতে থাকতেন সেই একই ঘরটি কোভেলভ থাকার জন্য ভাড়া করেছিল। রুমটি তাকে দেওয়া হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে তার মনে একটু সন্দেহ ছিল। ব্যাপারটি নিশ্চিত হতে কাউন্টারের পেছনের মেয়েটিকে সে জিজ্ঞেস করল। 
মেয়েটির ইতিবাচক জবাব দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করলো না। একজন শ্মশ্রুধারী বেলবয় ওদের ব্যাগেজগুলো রুমে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে আবার কোভেলভ একই প্রশ্ন করল। তার সঙ্গে কোনরকম প্রতারণা করা হয়নি বলে বেলবয়টি আশ্বস্ত করল। বেলবয়  সার্বিয়া ছেড়ে এদেশে এসেছে। সম্প্রতি আমেরিকানরা বেলগ্রেডে বোমা হামলা করছিল এবং যুগোস্লাভিয়া রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, একইভাবে সার্বিয়াও আক্রান্ত হয়েছে। রুশরা এর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বেলবয় তার টিপসটি প্রত্যাখ্যান করল–কিন্তু তাৎক্ষনিকভাবে টিপসের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। এমনকি কোভালেভ এবং বেলবয় দুজন দুজনকে জড়িয়েও ধরলো। 
কোভালেভ নবোকভের ঘরটি দেখে খুবই হতাশ হলো। ভেরা’র মৃত্যুর পর সবকিছুই আবার নতুন করে তৈরি করা হয়েছে, এবং লেখক যে ঘরটিতে থাকতেন তাকে দুটি কক্ষে ভাগ করা হয়েছে–আমি তাকে ব্যাখ্যা করে বোঝালাম। কিন্তু নিচু বাঁকা সিলিং, চিকন জানালা আর ক্ষুদ্র ব্যালকনি দেখে কোভালেভ বিস্মিত হলো। 
“ এখানে থাকা তাঁর পক্ষে কীভাবে সম্ভব?” 
নবোকভের পুরনো ছবিগুলো ঘরের দেয়ালে টানানো ছিল, এবং কোভালেভ প্রতিটি ছবি পুনরায় নতুন করে তৈরি করতে চেয়েছিল। সে হোটেলের রুম সার্ভিসকে একটি দাবা সেট আনার অনুরোধ জানাল। আর আলিনার সঙ্গে ব্যালকনির টেবিলে গিয়ে বসলো। ঠিক এখানে যেভাবে নবোকভ বসতেন ভেরার সঙ্গে। সে আমাকে তাদের দুজনের এই ‘নবোকভ ও ভেরা’ জুটির মতন অনেকগুলো ছবি তুলতে বাধ্য করল। 
অবশ্যই কোভালেভ নবোকভের টেবিলের পেছনে শুধু তার নিজের একটি ছবি তুলতে চেয়েছিল।

নবোকভ এখন মৃত–এটা ভেবে জীবনে প্রথমবারের মতো আমি অত্যন্ত আনন্দ বোধ করলাম।  

কোভালেভ এবং তার স্ত্রী যখন ব্যলকনিতে গেল, তখন আমি নবোকভের সেই বহুমূল্যবান ড্রয়ারটি খুললাম। এখানে নবোকভের কলমের কালির ছিটের দাগ লেগে আছে। এই কালির দাগ সম্পর্কে আমি একবার পড়েছিলাম এবং অনেক বছর ধরে ওটা স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখছিলাম। সেটি ঠিক সেখানেই ছিল যেখানে থাকবার কথা ছিল। আমি আঙ্গুল দিয়ে হালকাভাবে সেটিকে স্পর্শ করলাম। জানিনা, কী আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ইয়ানশকা সেটি করা থেকে আমাকে বিরত করলো। সে দৌড়ে এলো এবং ড্রয়ারের ভেতরে গভীর দৃষ্টি দিল। 
“ওটা কি? আমাকে দেখাও!” 
“এইযে, দেখো!” আমি বললাম। ইঙ্কব্লট! 
সে অবাক হলো এবং স্পষ্টতই হতাশা প্রকাশ করলো। 
“একটা ইঙ্কব্লট…… নাবোকভের কালির ছিটে, আঁকিবুকি ” 
কোভালেভ বললো, ঘরটা বেশী ছোট। এবং ওরা শেষপর্যন্ত অন্য ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিল যেটা ছিল অনেক বড়। তারা আমাকে দুই দিনের জন্য ট্রেন স্টেশনের পাশে একটা হোটেলে থাকতে দিল। 
ইয়ানশকাকে একটা বাচ্চাঘোড়া উপহার দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল কোভালেভ। তাই একটা ঘোড়া খুঁজে বের করাই ছিল মনেত্রোতে আমার প্রথম কাজ। যখন আমি আর ইয়ানশকা ঘোড়া চড়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম তখন কোভালেভ ও তার স্ত্রী পেছনে হোটেল রুমে থেকে গেল। ছোট্ট বিষন্ন ঘোড়াটির গায়ে ছিল ভয়াবহ গন্ধ। 
ইয়ানশকা্ কিছু কারণে আমাকে পছন্দ করেছিল এবং কোনভাবেই সে আমাকে বিদায় দিতে চাইছিলনা। তাই কোভালেভ রাতের খাবারের জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানালো। খাবার টেবিলে কোভালেভ কখনও জেনেভার হ্রদের সৌন্দর্য, কখনোবা সুইসদের পরিচ্ছন্নতা–শৃংখলাবোধ নিয়ে খুব আনন্দের সঙ্গে কথা বলছিল। হোটেলের ‘স্টীম বাথ’ ঠিকমত গরম ছিল না বলে কিছুটা অভিযোগ করছিল। তার আশঙ্কা ছিল যে প্রধান ফটকের প্রবেশপথের নিরাপত্তা ছিল শিথিল–রাস্তা থেকে বয়স্ক তৎপর কোন লোক চাইলেই প্রবেশপথ দিয়ে হোটেলে ঢুকে পড়তে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো–এখানে প্রতি পদক্ষেপে রুশদের সঙ্গে ধাক্কা খেতে হয়। যে কোন কারণেই হোক না কেনো স্বদেশবাসীর এই আধিক্য তাকে সবচেয়ে বেশী বিরক্ত করেছিল। 
আলিনা তার স্বামীর দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে ছিল। এটা দেখে আমি অভিভূত হলাম। ভনিতা করে এভাবে কেউ তাকাতে পারেনা। 
হিটলারের স্ত্রী ইভা ব্রাউনের মতো এটাও একটা ধাঁধা। অপরাধী, শয়তান এবং অত্যাচারী লোকদের কীভাবে অকপটে নারীরা ভালবাসে? কেউ কখনো কি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবে? 
হয়তো এটা একটা পশু প্রবৃত্তি? পশুপালক হিসেবে পুরুষ তার জায়গা থেকে সন্তানদের বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করে। সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও ভুল ব্যাক্তিরাই নেতা হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতার অধিকারী হয়, তাই তাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার জন্য একটা ভাল সুযোগ তৈরী হয়। নারীরা নেতাদের– গোত্রপ্রধানদের সন্তান ধারণ করতে চায়। কারণ এই ক্ষমতাধর পুরুষরাই তাদের ও সন্তানদের সুরক্ষা দেয়। হয়তো এক্ষেত্রেও তাই। 
অথবা সবকিছুই হয়ত খুব সহজ: একজন নারী একজন অপরাধীর সঙ্গে প্রেমে পড়ে না, কিন্তু একজন দৃঢ় জীবনীশক্তিসম্পন্ন এবং শক্তিমত্তায় প্রবল পুরুষের প্রেমে পড়ে। সেই জীবনী শক্তির সঙ্গে প্রেমে পড়ে সে। 
সুস্বাদু খাবার খেতে খেতে কোভালেভ ফট করে বলে ফেলল, “তুমি কীভাবে এখানে থাকো? এটা খুবই ক্লান্তিকর! তুমি কি আদৌ এখানে বাস করছো? নাকি শুধু পচে মরছো! ” 
আমি তার টাকায় খাচ্ছিলাম বলে তার সবকথার সঙ্গে একমত হতে হচ্ছিল। 
আনন্দের সঙ্গে খাবার চাখতে চাখতে সে বললো, এই পশ্চিম দেশের মানুষজন খুবই কৃপণ। পরের দিনের জন্য সবকিছু তুলে রাখে। কিন্তু রাশিয়ার মানুষগুলো লোভীর মতো জীবন কাটায়। কারণ তারা মনে করে, তুমি জীবন থেকে এখুনি যদি কিছু গ্রহণ না করো তবে আগামীকাল হয়তো কিছুই বাকি থাকবে না! 
সে সবকিছুই লোভীর মতো করছিল–খাচ্ছিল লোভীর মতো,হাসছিল লোভীর মতো। হ্রদ থেকে উড়ে আসা বাতাসও নাক দিয়ে শুষে নিচ্ছিল লোভী মানুষের মতো। এমনকি সে ছবিও তুললো লোভীভাবে। তাঁর জন্য কিছুই যথেষ্ট ছিল না। 
কিন্তু কোভালেভ সবচেয়ে বেশী পছন্দ করল তাঁর মেয়ের সঙ্গে ছবি তুলতে। দেখে মনে হলো সে আন্তরিকভাবেই তার মেয়েকে ভালোবাসে। সে তাঁর মেয়েকে ডাকল “বানি’ বলে। এটা আমার কাছে বিস্বাদের মতন ঠেকলো। কারণ আমরাও আমাদের ছেলেকে “বানি’ বলেই ডাকি। 
সে রাতে  কিছুটা ক্লান্ত বলে ট্রেন স্টেশনের হোটেলের বিছানায় গড়িয়ে পড়লাম আমি। নিজের প্রতি ঘৃণার কারণে আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। আমি কি সত্যিই এই লোকটির প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলাম? নবোকভের হোটেলে সেই-ই থাকলো, আমি থাকতে পারলাম না কেনো? আমি নাবোকভকে ভালোবাসি। নবোকভ আমাদের দেশে দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিলেন। আমিই সেই ব্যক্তি যে তাঁর বইগুলোর মধ্যে দিয়ে বেঁচে ছিল। যে কোন কারণেই হোক না কেনো আমার মনে হতো,আহা, আমি যদি সেই পবিত্র কালির ছিটেগুলো স্পর্শ করতে পারতাম, তাহলে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর কিছু উপলব্ধি করতে পারতাম।

এখন আমি ওটা স্পর্শ করেছি -কিন্তু আমি কী বুঝতে পারলাম? কীইবা উদ্ঘাটন করতে পারলাম? 

আমি শুয়ে থাকি। রাতের অনিয়মিত ট্রেন চলে যাবার শব্দ শুনি মাঝে মাঝে এবং একই দু:খজনক চিন্তা মাথার মধ্যে হামাগুড়ি দিতে থাকে– কেনো কোভালেভ তার স্ত্রী ও কন্যার চাহিদা পূরণের যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে, আর আমাকে সেই ধনী পরিবারের ভৃত্য হয়ে থাকতে হয়? আমার ছেলে এবং স্ত্রী’র উপহার কিনতে কিছু টাকা পাওয়ার জন্য এই অসম্ভব আত্মতৃপ্ত লোকটির কাছে কেনো কাজ করতে হচ্ছে? কে সে? কিভাবে সে এই টাকা পেয়েছে? ইন্সটিটিউটে থাকাকালে সে কি আমার চেয়ে ভা্লো ছাত্র ছিল? সোভিয়েত যুগের শেষ দিকে দু ধরনের বাজে কাজের একটিকে বেছে নিতে হতো সবাইকে। ছোট বাজে কাজটি হলো–সব দেখেশুনে চুপ মেরে থাকা। আর বড়ো বাজে কাজটি হলো– বক্তৃতাবাজি করা। এ দুটোর মধ্যে বড় বাজে কাজটিই কোভালেভ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিল। যে কোন দেশে সব সময়েই বাঁচার জন্য অতি সামান্য হলেও কিছু অনৈতিক কাজ করা লাগে। তবে এটা বন্ধ করাও সম্ভব চেষ্টা করলে। যদি কারো জীবনে বড়ো কিছু হওয়ার দূনির্বার মোহ থাকে তবে তার পক্ষে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। 
আমি নিশ্চিত যে সোভিয়েতের নতুন জমানায়ও সে বড় বাজে কাজটি বেছে নিয়েছে। অপমান আর অসম্মানজনক পথটিই বেছে নিয়েছে আরো ধনী হওয়ার জন্য। আমি হঠাৎ কল্পনা করলাম — আগামীকাল সকালে আমি তার মুখের উপর এসব কথা ছুড়ে দেবো। তারপর কাজ ছেড়ে চলে যাবো। এসব ভাবনার পরই সে রাতে কেবল আমি ঘুমাতে পেরেছিলাম। 
কিন্তু পরেরদিন আমি আবার তাদের গাড়ি চালিয়ে ‘চিলন’ ক্যাসলে নিয়ে গেলাম। বেশ বন্ধুত্বপূর্ণভাবেই আমি কথা বলছিলাম এবং তাদের প্রতি মনযোগীও ছিলাম। ‘রাশান সুইজারল্যান্ড’ এর জন্য আমি তথ্য সংগ্রহ করছিলাম। এগুলো দিয়ে খুব সম্ভব একটা সুন্দর গাইডবুক লিখব।উচ্ছ্বসিত হয়ে আমি চিলনে রুশদের ভীড় সম্পর্কে তাদেরকে জানালাম। নিজেকে আমার অসহ্য লাগছিলো,কিন্তু আমি জানি কেন আমি এটা করছিলাম। 
রুশরা একটি বিশেষ ধরনের কথোপকথনের সঙ্গে পরিচিত– একে বলে ‘ট্রেন টক’। এক থেকে তিন দিনের একটানা ট্রেন যাত্রায় অপরিচিত লোকেরা একটি বগিতে একসঙ্গে থাকে। তারপর তারা চিরতরে দূরে চলে যায়। হঠাৎ দেখা হওয়া একজন ভ্রমণ সঙ্গীর কাছে তুমি হয়ত মনের গোপন কথাগুলো সহজে বলে ফেলবে। এ কথাগুলো হয়ত দৈনন্দিন বন্ধুদেরকে বলা হয়না। সেই সন্ধ্যাটি ছিল আমাদের একসঙ্গে কাটানোর শেষ সন্ধ্যা, তখন আমাদের মধ্যে ‘ট্রেন টক’ এর মত কিছু কথা হয়েছিল। 
আলিনা তার মেয়েকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেল, আমি আর কোভালেভ হোটেল বার’এ বসলাম। সে সবচেয়ে দামী কগনেকের একটি বোতল অর্ডার দিল। কোভালেভের আড্ডার সহযোগী হিসেবে আমার থাকার কথা নয়। মিগরস সুপার মার্কেটের একজন ক্যাশিয়ারের গড় মাসিক বেতনের সমান মূল্যের বোতলটি অর্ডার দিল আমার সামনে। এ ধরনের বড়োলোকী চাল দেখানোর জন্যই সম্ভবত সে আমাকে তখন তার সঙ্গে রেখেছিল। 
আমরা একসঙ্গে পান করলাম। কগনেকটি আসলেই অসামান্য ছিল। 
মনে পড়ে, রাশান সাহিত্যের দুই দিকপাল নবোকভ ও সলেঝিনিৎসিন মনত্রো প্যালেস হোটেলে দেখা করতে চেয়েও সফল হননি। সেই মজার গল্পটি তাকে বলেছিলাম । তাঁরা একে অপরকে চিঠি লেখেন এবং দেখা করতে সম্মত হন: নাবোকভ তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখেছেন-৬ অক্টোবর, ১১.০০ সলেঝিনিৎসিন এবং তার স্ত্রী। কিন্তু অন্যদিকে সলেঝিনিৎসিন তারিখটি ঠিক করলেন। নবোকভের কাছ থেকে একটি চিঠির অপেক্ষাও করলেন। না পেয়ে তিনি তার স্ত্রী নাটালিয়া সহ মনত্রোতে এলেন। হোটেল বরাবর হাঁটাও শুরু করলেন। তখন তাদের মনে হলো নাবোকভ হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অথবা যে কোন কারনেই হোক তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন না। এজন্য তারা গাড়ি নিলেন। এদিকে নাবোকভ দুপুরের খাবার অর্ডার দেয়া ছাড়াই অতিথিদের জন্য রেস্টুরেন্টে পুরো একঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন এবং কেনো তারা আসছেন না– এই ব্যাপারটি তিনি বুঝতে পারছিলেন না। এই ঘটনার পর তারা আর কোনদিন পরষ্পরের সঙ্গে দেখা করেন নি। 
কোভালেভ তার দুই কাঁধ ঝাঁকাল শুধু। আমার মনে হয় গল্পটি তার কাছে খুব মজার লাগেনি। 
তারপর আমরা আরো কিছুক্ষণ পান করলাম, এবং হঠাৎ তিনি কুটিলভাবে হাসলেন। 
‘তোমার মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আমার খুব পরিচিত লেগেছিল, কিন্তু আমি ঠিক মনে করতে পারছি না ঠিক কোথায় তোমাকে দেখেছিলাম। আমরা কি একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলাম আগে?’ 
আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, না, আমাদের কখনও আগে দেখা হয়নি। 
আলিনা ফোন করে জানালো যে সে ইয়ানশকার সঙ্গে থাকবে। 
কিভাবে শেষ পর্যন্ত আমি সুইজারল্যান্ডে এসে পৌছুলাম এবং আমার সুইস স্ত্রী সম্পর্কেও জানতে চাই্লো কোভালেভ। 
তুমি কি এসব ফুল এবং চকলেটের মধ্যে একঘেয়েমি বোধ করো না? 
সে আমার চাইতে বেশী পান করেছিল এবং খুব দ্রুত মাতাল হতে শুরু করেছিল। কোন সূত্র ছাড়াই সে হঠাৎ বলতে শুরু করল– তার প্রথম স্ত্রী খুব দুশ্চরিত্রা ছিল এবং তাদের ডিভোর্সের পর সে অনেক সুখী হয়েছিল। 
সে বললো,আমি কোর্টের বাইরে এসে অনুভব করলাম– আমি উড়ছি! আমি শপথ করে বললাম, আর কখনো বিয়ে করবো না। পাঁচ বছর আমি এই প্রতিজ্ঞা ধরে রেখেছিলাম এবং তারপর যখন আলিনা এলো, আমি পাগলের মতন তাকে ভালোবেসে ফেলি। এরকম একজন নারীকে কে না ভালোবাসবে? তুমি কি তার শরীর দেখেছ? আমাকে বলো, দেখেছো? 
তার একটা বিরক্তিকর অভ্যাস হলো সঙ্গে থাকা লোকটিকে প্রথমে সে হাঁটুতে এবং পরে কাঁধে চাপড় মারে। 
‘এবং আমি আমার ইয়ানশকাকে এত ভালোবাসি যে তার জন্য আমি সব করতে পারি! তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?’ 
আমি পুরোটা সময় মাথা নাড়তে থাকলাম। সেটাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল। 
দীর্ঘ সময় আমরা সেখানে বসে থাকলাম। যে কোন ভাবেই হোক এক বোতল যথেষ্ট ছিল না এবং সে নিজের জন্য আরো মদের অর্ডার দিতে থাকলো।
কোভালেভ আমাকে তার ব্যবসা সম্পর্কে কিছু গোপন ও অস্পষ্ট ধারণা দিল। কোন ধরনের অপরাধীদের সঙ্গে তাকে লেনদেন করতে হোত এবং এই ঘৃণ্য কাজে অংশ নেয়া তার জন্য কতটা ন্যক্কারজনক ছিল, এবং শুধুমাত্র আলিনা এবং ইয়ানশকার জন্যই সে কতভাবে এ কাজটি করছিল তাও জানালো। 
“দেখো,”বলে সে এত জোরে চিৎকার করল যে পানশালার সবাই আমাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখছিল। 
ইয়ানশকার চেয়ে প্রিয় এই পৃথিবীতে আমার আর কিচ্ছু নেই। তার ভালোর জন্য আমি যে কাউকে হত্যা করতে পারি। যদি কেউ এক আঙুল দিয়েও তাঁকে ছোঁয়- আমি তার জন্য নিজে খুনী হয়ে যাবো! আমার চেহারাটা একজন ঘৃণ্য মানুষে পরিণত হবে! আমি আমার বানিটার জন্য সব করব, বুঝতে পেরেছো? এবং তারপর সে বিশ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে আমার কানে কানে নিশ্চিত করে বলল যে যদি তার জীবনে কিছু ঘটে যায় সেকারণে সে সুইজারল্যান্ডে তার স্ত্রী এবং কন্যার ভবিষ্যত রেখে গেছেন। 
কেউ বলতে পারেনা, সে ব্যাখ্যা করল। যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। কিন্তু ইয়ানশকা যাতে ফুল এবং চকলেটের মধ্যে বড় হতে পারে এখানে, সেজন্যে আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। এমনভাবে ঠিক করেছি যাতে সবকিছু সময়মত সরবরাহ করা হয়! 
যখন সে মদ খেতে খেতে একেবারে বরবাদ অবস্থায় পৌছুল তখন সে তার পাপ স্বীকার করে বলল যে শত্রুরা তাকে মেরে ফেলবে। 
“দেখ,আমি ইতিমধ্যেই একজন চিহ্নিত মানুষ! এবং এটা আমি জানি! এবং আমি কে তাও জানি!” 
আমার মনে হয় সে সত্যিই বুঝতে পারছিলনা কোথায় সে আছে এবং কার সঙ্গেই বা সে কথা বলছিল। মাতাল অবস্থায় সে গোঁ গোঁ শব্দ করছিল।… “কিন্তু আমি তাদের আমাকে ধরতে দেবো না! দাঁতে দাঁত চেপে জীবনকে ধরে রাখবো, বুঝেছো? এই দাঁত দিয়ে! ” 
আমরা পানশালাটি ছেড়ে বাইরে রেরুলাম এবং হ্রদের ধারে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে গেলাম। 
হ্রদের সামনে দাঁড়িয়ে কুয়াশায় জন্য পাহাড় দেখতে পারছিলাম না আমরা। এবং মনে হচ্ছিল কোন বিশাল সমুদ্রের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। 
কোভালেভ রাতের লেম্যান নামের হ্রদটিকে চিৎকার করে গালি দিলো… 
“তুমি কি মনে কর তারা আমাকেই শুধু মৃত্যুর জন্য চিহ্নিত করেছে? না,তারা আমাদের সবাইকে চিহ্নিত করেছে! সব! তুমিও, বুঝেছ? না,তুমি ফালতু জিনিস, বোঝো না! তোমার এখন বাঁচতে হবে! হয়তোবা এই হ্রদটি আগামীকাল আর এখানে থাকবেনা! 
আমি হাসি। তাহলে এটা কোথায় যাবে? 
সে বাহু দিয়ে আমার দিকে হাত নাড়ল এবং বলল, তুমি শালা কিছুই বোঝনি! এবং ক্লান্তভাবে টলতে টলতে হোটেলে ফিরে গেল। 
আমি হ্রদের সামনে একা আরো কিছুক্ষণ থাকলাম। নিজেকে মাতাল মনে হচ্ছিল, যেন নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলছিলাম। দুর্লভ পথচারীরা আমার দিকে ঘুরে তাকাচ্ছিল। নিজেকে বললাম, “যদি তোমার কিছু হয়? সে তো তার স্ত্রী ও সন্তানের জন্য একটা নিশ্চিত জীবন রেখে গেছে, তুমি রাখোনি। তুমি তাকে তুচ্ছ করছ,কিন্তু তুমিই বা কীভাবে তার চাইতে শ্রেষ্ঠ? ” 
এবং তখন আমি খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করলাম যে আগামীকাল এই হ্রদের অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। 
পরদিন সকালে আমরা উভয়কে বিদায় জানালাম। কোভালেভকে শুকনো দেখাচ্ছিল। তার চোখগুলো ছিল লাল ও মাতাল । সে অদ্ভুত বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। 
“গতকাল আমি হয়ত একটু বেশী কথা ফাঁস করে ফেলেছি ভুলে যাও! বুঝতে পারলে?” 
আমি মাথা নাড়লাম। কোভালভের কাছ থেকে আমি যে বখশিশ পেলাম তা একজন রাজার জন্য উপযুক্ত। একটা ভাল সিনেমার দৃশ্য হলে আমি হয়ত টাকাটা একটা টেবিলে রেখে গর্বের সংগে হেঁটে চলে যেতাম। কিন্তু আমরাতো কোন সিনেমায় ছিলাম না। 
আলিনা এবং আমি বন্ধুর মতন দুজন দুজনকে বিদায় জানালাম, এবং ইয়ানশকা আমার গায়ে লেপ্টে ছিল, ছাড়তে চাইছিলোনা। 
আমরা একে অপরকে আর কোনদিন দেখিনি। 
জন্মদিনে আমার স্ত্রী উপহারের বাক্সগুলো খুললো। তার সুখী হাসির শব্দ শোনার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে ছিলাম। আমাদে্র ছেলেটা বিছানা থেকে কিভাবে হাসে তা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলাম। প্রিয়জনদের কাছাকাছি থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আর সবকিছুর সামান্যই অর্থ আছে। 

কয়েক মাস পর এক সকালে কম্পিউটারে বসে ইয়ানডেক্স সংবাদ পত্রিকার নিউজফিডে একটি পরিচিত শেষ নাম দেখে হোঁচট খেয়ে পড়লাম। কোভালেভ নামের সুপরিচিত একজন ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তাকে তার ভবনের সামনের রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সেই সময়ের মস্কোর জন্য খুব সাধারণ একটি খবর এটি। শিকারের জন্য লবির পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল খুনিটি এবং মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তার মাথায় অতিরিক্ত গুলি চালিয়েছিল–প্রতিবেশীরা জানালা দিয়ে এই দৃশ্যে দেখেছে। 
আমি জানি না তার স্ত্রী এবং কন্যার কী হয়েছিল। অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। ইয়ানশকা হয়তোবা এতদিনে অনেক বড় হয়ে গেছে। কল্পনা করছি এখন সে দেখতে কেমন হয়েছে। সে কেমন মানুষ হয়েছে? বাবার মৃত্যুর পর তার জীবনটার কি হলো? সে নিশ্চয়ই এখানে সুইজারল্যান্ডের কোথাও না কোথাও বড় হয়ে উঠেছে। 
যদি তুমি এখানে থাকো,আর এই লেখাটা পড়ো,ইয়ানশকা। অদ্ভুত সব বিষয় ঘটতে পারে জীবনে… 
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি, আমাদের সেই ভ্রমণের কতটুকু স্মৃতি তোমার মনে আছে? শুধুমাত্র বাচ্চা ঘোড়াটা ছাড়া হয়ত সবটাই মুছে গেছে… পিঙ্গা কেমন আছে? সম্ভবত অনেক আগেই সে চলে গেছে। বাবাকে তুমি কতটুকু মনে করতে পারো? তার নিজের সম্পর্কে,আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে,অন্যান্য সব বিষয়ে, এমনকি কেন সে নিহত হয়েছিল সে সম্পর্কেও তার ব্যাখ্যা তোমাকে দেয়া উচিত ছিল। 
বা,হয়ত তিনি সেটা করতে চান নি। 
তুমি জানো, সবচেয়ে খাঁটি বিষয়টি হলো, একজন মানুষ ছিল, যার জন্য তুমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ছিলে।

বাকি সব সবকিছু অর্থহীন এবং তুচ্ছ । 

বলো, তোমার কি কালির ছিটে দাগগুলো– ইঙ্কব্লটের কথা মনে আছে?

——————————————————————————————————————-

অনুবাদকের পরিচয়
মৌসুমী কাদের
গল্পকার। অনুবাদক।

4 thoughts on “মিখাইল শিশকিনের গল্প : নবোকভের কালির ছিটে

  • June 24, 2019 at 8:04 am
    Permalink

    অসাধারণ গল্প আর খুব ভালোঅনুবাদ

    Reply
  • June 24, 2019 at 8:05 am
    Permalink

    অসাধারণ গল্প আর খুব ভালো অনুবাদ।
    (হাসান আহমদ)

    Reply
  • June 18, 2021 at 5:41 pm
    Permalink

    সত্যিই অসাধারণ গল্প। শুধু কগনাকটা কনিয়াক হলে ভালো হতো। সুন্দর অনুবাদের জন্য ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *