সুচরিত চৌধুরীর গল্প : ওয়াইন

 
ব্যালকুনির রেলিংয়ের ওপর দু’হাতের কনুই রেখে জাফর সাহেব গর্বোন্নত দৃষ্টি মেলে সামনের দিকে তাকালেন। বাগানের সুরকি ছড়ানো রাস্তাটার মতো মনে হল তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ–বিসর্পিল, দিগন্ত প্রসারিত। নানারকম ঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি আজ পঞ্চাশের কোঠায় এসে পৌঁছেছেন। অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি—অনেক কিছুই পেলেন। তবু বিরাট একটা শূন্যতাকে মনে মনে উপলব্ধি করেন। একটা ছায়া ছায়া স্বপ্ন যেন তার মনশ্চক্ষে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। দিগন্ত বিস্তৃত জমির ওপর তৈরী হয়ে উঠেছে একটা বিরাট কারখানা, চিমনির ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছে আকাশের ঘন নীল রং, নোংরা কুলীদের হট্টগোল ও মেশিনের ঘর্ঘর শব্দে ধ্বনিত হচ্ছে সভ্যতা ও সৃষ্টির ছন্দ। এর মাঝখানে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিরাট প্রস্তর মূর্তির মতো, কপালে আভিজাত্যিক অহংকারের আলপনা—যেন দিগ্বিজয়ী সম্রাট, মানুষের প্রতিনিধি।
‘আব্বা।’
চমকে উঠলেন জাফর সাহেব।
সালমা ময়ূরপুচ্ছের মতো আঁচল দুলিয়ে জাফর সাহেবের পাশে এসে দাঁড়াল। বা’হাতে কানের দুলটাকে ঈষৎ নাড়তে নাড়তে জিজ্ঞেস করল, ‘পার্টিতে যাবে না?’
জাফর সাহেব আঁৎকে উঠলেন, ‘তাই তো! একেবারে মনেই ছিল না যে! কটা বেজেছে?’
ছোট রিওয়াচটার দিকে চোখ বুলিয়ে ষ্টাইল করে সালমা বলল, ‘হাফ পাস্ সিক্স…’
‘ও…সরি…’ বাক্‌স্কিনের চটিজুতোয় চট চট শব্দ তুলে জাফর সাহেব ভিতরে চলে গেলেন। বাথরুমে ঢুকে সাবান দিয়ে মুখটাকে ঘষে মেজে নিলেন, তারপর ট্রাউজার ছেড়ে একটা কালো রংয়ের স্যুট পরতে পরতে সালমাকে ডাক দিলেন, ‘এই আসছি।’
‘তোমার কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গেল আব্বা’
‘ও…সরি। তোমার আম্মা রেডি তো?’
‘আম্মা যাবে না।’
‘সেকি ? এমন একটা গর্জিয়াস পার্টিতে যাবে না তো যাবে কোথায় ?’
‘সেই নারীচক্রের বৈঠকে।’
প্রকাণ্ড হাসিতে ফেটে পড়লেন জাফর সাহেব। সিল্কের রুমালে খানিকটা এসেন্স মেখে তির্যক হাসিতে সালমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বুঝি বাদ পড়েছো?’
‘উহু… আমার ওসব ভালো লাগে না।‘
‘গুড।’
বিরাট আয়নাটার সামনে নিজের সুসংযত চেহারাকে পর্যবেক্ষণ করে জাফর সাহেব বলে উঠলেন, ‘চলো।’
দু’জনে দোতালার সিঁড়ি বেয়ে নেমে সোজা চলে আসলেন নীচের বারান্দায়। অষ্টিন কারের দরজা খুলে ড্রাইভার সোজা হয়ে দাঁড়াল। এদিক ওদিক তাকিয়ে জাফর সাহেব হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহের কোথায়?’
‘সিনেমায় গেছে।’…উত্তর দেয় সালমা।
‘ও… আই সি…। কার সংগে গেছে?’
‘ও বাড়ির বেবির সংগে।’
যাক ছেলেটার নির্বাচন প্রশংসনীয়। রেলওয়ের বড় অফিসারের মেয়ে বেবি। চালচলনে অফুরন্ত ফ্যাসান। এবার মেয়েটাকে ভালো একটা ছেলের পাল্লায় ফেলতে পারলেই রক্ষে। ভালো ছেলে মানে, বিলেত ফেরৎ ডিগ্রিধারী যুবক নয়, হাই সোসাইটির সরকারি অফিসার। অষ্টিন কারের নরম তুলতুলে সোফায় ঠেস দিয়ে জাফর সাহেব এই কথাই ভাবতে লাগলেন।
মি. আমানুল্লার বাংলোতে লনের একপাশে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে পার্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মি. আমানুল্লা খ্যাতনামা লোক। সোসাইটির এক তৃতীয়াংশ লোক তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ । সবাই বলেন, তিনি যা করেন তার চুলচেরাও খুঁত নেই। সত্যিই তাই। পার্টির সংগে সংগে কিছুটা নৃত্য গীতেরও ব্যবস্থা করেছেন। শহরের নামজাদা কয়েকজন শিল্পীকেও সেখানে দেখা গেল।
জাফর সাহেবের অষ্টিন কারটি এসে থামল মি. আমানুল্লার বাংলোর সামনে। মিসেস আমানুল্লা অভ্যর্থনা জানালেন। দামী গয়না ও শাড়ীর জৌলুসে তাঁকে দেখাল একটা নাদুসনুদুস চিতাবাঘের মতো। সালমার দিকে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার আম্মা আসলেন না বুঝি?’
‘উহু…৷’ সালমা স্বভাবসুলভ ইতস্ততঃ ভঙ্গিটাকে রোধ করবার চেষ্টায় বোকার মত তাকাল জাফর সাহেবের দিকে। জাফর সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খানিকটা কেঁশে বলে উঠলেন, ‘ও নারীচক্রের বৈঠক নিয়ে ব্যস্ত।’
মিসেস আমানুল্লা পাখির মতো কিচির মিচির করে উঠলেন অর্থাৎ হেসে উঠলেন।
‘কাওয়ার্ড।’
জাফর সাহেব চমকে উঠে বললেন, ‘কে ?’
‘মিসেস খান। পুরুষদের সংগে কমপিটিশান করবার জন্যে আবার আলাদা বৈঠক কেন ? এখানেই তো ভীষণ গলদ মি. জাফর।’ •••এই বলে মৃদু হাসলেন মিসেস আমানুল্লা। আরেকটা কার এসে থামতেই তিনি বলে উঠলেন,এক্সিকিউজ মি,জাফর। ওই বুঝি মিসেস চৌধুরীরা এলেন।’
টায়ারের মতো গড়াতে গড়াতে মিসেস আমানুল্লা তাঁর বিরাট দেহটাকে নিয়ে গেলেন। সালমা আসমানী রংয়ের শাড়ীটার কাজ করা আঁচল টেনে দিল বুকের দু’ভাজের ওপর। এদিক ওদিক তাকাল টানা টানা চোখ মেলে।
‘এই যে মি. হোসেন, কি খবর?’…বলতে বলতে জাফর সাহেব গিয়ে বসলেন সামনের চেয়ারে। সালমা বাগানের চারদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তার সংগীদের ভতর এখনও কেউ এসে পৌঁছয়নি। অন্তত সুলতানাটা এসে পৌঁছলে এই নিঃসংগতা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতো।
সন্ধ্যা সমাগত। ইলেকট্রিক লাইটের জ্বলজ্বলে আলোয় সমস্ত বাগানটা ঝলমল করে উঠল। টেবিলে টেবিলে ডিস ভর্তি চপ, কাটলেট, পেষ্ট্রি, ফলমূল। টুকরো টুকরো কথা ও চাপা হাসি। কালো শেরওয়ানী পরা একজন আধবয়সী লোককে নিয়ে মি. আমানুল্লা এসে দাঁড়ালেন। সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি হলেন স্বভাবগত কবি দেলওয়ার হোসেন। এর অনেকগুলো বই বেরিয়েছে।’
‘কনগ্রেচুলেশন’। …বলে বিলেতী কায়দার ব্যারিষ্টার আলী সাহেব হাত বাড়ালেন।
জাফর সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনার কবিতায় সত্যিকারের প্রাণ আছে।’
কবি দেলওয়ার হোসেন গর্ব অনুভব করলেন। এতদিনে তাঁর কাব্য জীবনটাকে সার্থক বলে মনে হল। খান চারেক বই বের করেও এ পর্যন্ত কোনো পাঠকের কাছ থেকে এরকম উচ্চ প্রশংসা আশা করেননি। একজন ধনী-ব্যবসায়ী পাঠকের দেওয়া এই সার্টিফিকেট হোসনের কাছে মূল্যবান সম্পদ। বেচারার জনম সার্থক। আজকালকার প্রগতিশীল কবিদের দিকে কটাক্ষপাত করে দেলওয়ার হোসেন মনে মনে বলে উঠলেন : তোমরা আমার কবিতাকে পছন্দ করলে না করলে বয়েই যায়। চোখ মেলে দেখো, কারা আমার কবিতার ভক্ত।
মি. আমানুল্লা বললেন, ‘বসুন কবি সাহেব।’
সার্কাসের পোষমানা হাতীরা যেমন চেয়ারের ওপর আলগাভাবে বসে, ঠিক সেই রকম করে কবি বসলেন। খরগোসের মতো চোখ দুটোকে পিট পিট করে চারদিকে বুলিয়ে নিলেন। জাফর সাহেব গলা বাড়িয়ে চাপাসুরে বললেন, ‘আলাপ হয়ে ভালই হল। তাছাড়া অনেকদিন থেকে ইচ্ছে ছিল আপনার ওখানে যাই, নানা ঝামেলার দরুণ সময় পাইনি। আমার মেয়েটাও আবার কবি কবি গোছের।’
কবি দেলওয়ার কথা কমই বলেন। তবে এটা তাঁর ইচ্ছাগত স্বভাব। কবিরা সাধারণত কম কথার লোক। উদাস উদাস ভাব, এলোমলো চুল আর বাঁকা ধনুর মতো শরীর যাদের নেই তাঁরা নাকি কবি-ই নয় (দেলওয়ার হোসেনের মতে)। এর প্রত্যেকটি গুণ দেলওয়ার হোসেনের মধ্যে পাওয়া যায়। মেয়ের কথা শুনে কবি দেলওয়ার একটু চাঙা হয়ে উঠলেন।
মিসেস আমানুল্লা এসে দাঁড়ালেন। সংগে তানপুরা নিয়ে ঝাকরা ঝাকরা চুলওয়ালা একটা লোক। ব্যারিষ্টার আলী সাহেব একরকম চিৎকার করেই বলে উটলেন, এই যে ওস্তাদজি—’
ওস্তাদজী তানপুরাটিকে হাত বদল করে সবিনয় হাসিতে মৃদু মৃদু বললেন, ‘আপনাদের যখন ডাক পড়েছে তখন না এসে কি পারি’!
মিসেস আমানুল্লা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, ‘আপনাকে আসতেই হবে। আমাদের মতো গুণমুগ্ধ ভক্তদের উপেক্ষা করে যাবেন কোথায় ?
সবাই হেসে উঠলেন।
কবি দেলওয়ার হোসেন পাশের চেয়ারটি দেখিয়ে ওস্তাদজিকে বললেন, ‘বসুন ওস্তাদজি।’
‘ধন্যবাদ।’
মিসেস আমানুল্লাহ একটা বয়কে ওস্তাদজির তানপুরাটি নেবার হুকুম দিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘চলুন ওস্তাদজি।’
ওস্তাদজি মন্থরগতিতে মিসেস আমানুল্লার পেছন পেছন চললেন যেখানে সংগীতাসরের আয়োজন করা হয়েছে।
কতক্ষণ পর ছোট্ট খাটো ষ্টেজের ওপর জ্বলে উঠল ইলেকট্রিক লাইটের কড়া আলো। সমস্ত টেবিলের গুঞ্জনধ্বনি স্তব্ধ হয়ে গেল।
ওস্তাদজি তানপুরার গায়ে ডান হতের আঙ্গুল বুলিয়ে মুখটাকে দু’ফাঁক করে শুরু করলেন পুরিয়া ধানেশ্রী রাগের আলাপ।
কবি দেলওয়ার হোসেন হাতের চামচটাকে ডিসের উপর রেখে দিয়ে চাপা সুরে বলে উঠলেন ‘বাহ্বা–‘
সকলের মুখে একই কথা। অথচ এরা ক্লাসিকেলের ‘ক’ই বুঝতে পারে না। তবুও সমঝদারের মতো মাথা নাড়েন। না হলে পরস্পরের চোখে খারাপ ঠেকে। ব্যারিষ্টার আলী সাহেব মাথা নাড়ছিলেন সঙের মতো। জাফর সাহেব সকলের দিকে আড়চোখে চেয়ে মাথা দোলাতে শুরু করলেন। কবি দেলওয়ার ব্যারিষ্টার আলী সাহেবকে বললেন, ‘তোহফা, ওস্তাদজির মেজাজ দেখেছেন?’
‘ওয়াণ্ডারফুল। তা ছাড়া জয়জয়ন্তটা হীল মেজাজের রাগ’। …দেশলাইয়ের আগুনে সিগারেট জ্বালিয়ে বলে উঠলেন ব্যারিষ্টার আলী সাহেব। ওস্তাদজি গাইছিলেন ‘পুরিয়া ধানেশ্রী’, ব্যারিষ্টার বললেন এ ‘জয়জয়ন্তী’। কারণ ইনি দু’একটা রাগের নাম মুখস্থ করে রেখেছিলেন। সময় বিশেষ এরই ব্যবহার করে থাকেন।
কবি দেলওয়ারও সায় দিলেন, ‘হুঁ, জয়জয়ন্তীই বটে!’
জাফর সাহেবও একমত।
সালমা প্রায় ঘেমে উঠছিল! সুলতানারা কেউ আসেনি। সুলতানা আসুক না আসুক অন্তত তার ভাইটা তো আসতে পারত!
সুলতানার ভাই লুৎফর যেন একটা ঝিরঝিরে বাতাস। ওর চোখ দুটো ও বিস্ফারিত বুকটাকে সালমার ভারী অদ্ভুত লাগে। বুকে যেন সমুদ্র-জোয়ার আর চোখ দু’টিতে যেন তারই ভ্রুকুটি। হোপলেস! পার্টির সমস্ত আবহাওয়াকে তার অসহ্য বলে মনে হোল।
মিসেস আমানুল্লা থপ থপ করে ভারী পায়ে এসে বসে পড়লেন সালমার পাশের চেয়ারে। তার চোখে মুখে বিষন্নতা। গরুর মতো ড্যাবড্যাবে দৃষ্টি মেলে বললেন, ‘আমাকে ডোবালে’।
‘কে?’
‘বেবিটা। এখন আমি কী করি বলতো? ওর ড্যান্সের প্রোগ্রামটা না হলে যে ফাংশানটা মার্ডার।’
সালমা মৃদু মৃদু হাসল।
মিসেস আমানুল্লা দমবার পাত্রী নন। কিছু একটা না করে ছাড়বেন না। বয়কে বললেন, ‘বেবি কোথায় গেছে বলতে পারিস?’
‘সিনেমায়।’
‘কোন হলে?’
‘ব্রিটানিয়ায়।’
আর বলতে হল না। মিসেস আমানুল্লা উঠে পড়লেন। মোটর কার থেকে ছেলে আতাউল্লাকে ডেকে বললেন, ‘এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি না করে সালমার সঙ্গে গল্প করো’গে। বেচারীর বড্ড একলা লাগছে।’
আতাউল্লা প্রায় লাফ দিয়ে উঠল আনন্দে। মুখ থেকে বড় একটা গন্ধ ভেসে এল। মিসেস আমানুল্লা নাকটা উঁচিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, ‘এদিকে এসো তো–’
আতাউল্লা বোকার মত হেসে পিছু হঠতে হটতে বলল, ‘বেশী খাইনি আম্মা। এই এইটুকুন–’
‘নটি বয়। যাও ওপরে গিয়ে শুয়ে পড়ো গে।’…বলেই ড্রাইভারকে বললেন, ‘ব্রিটানিয়ায় চলো।’
শেষ সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার ছিঁড়ে মোটর কারটা অমিত বিক্রমে বেরিয়ে গেল। ‘নটি বয়’ আতাউল্লা মুচকি হেসে চলল সালমার কাছে।
এদিকে ষ্টেজের ওপর চলল ওস্তাদজীর ভাংগা গলার সংগীত, শ্রোতাদের ভেতর চাপা, চাপা গুঞ্জরণ : মার্কিন সাহিত্যের গুণ বর্ণনা, পাকিস্তানের বৈদেশিক নীতির পর্যালোচনা, অর্থনৈতিক চালের সমালোচনা, এরেস্ট্রোক্রেসীর ঘষা আলাপ। আর টেবিলের চারপাশে কলের পুতুলের মতো বয়দের যান্ত্রিক আনাগোনা।
সালমার উদ্দীপ্ত কালো ভূরু টানা চোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আতাউল্লা বলে উঠল, ‘আপনি নিশ্চয়ই বিপদে পড়েছেন মিস্ খান?
‘উহু…, ঠিক বিপদে নয়, তবে আপদে পড়েছি বলতে পারেন।’ …খানিকটা হাসল সালমা। হাসলে ওর নরম তুলতুলে গালে একটা টোল খেয়ে যায়।
‘এক গ্লাস সরবৎ ?’- |
‘থ্যাংকস।’
‘বয়…বয়…য়..’ .দস্তুরমতো চেঁচাতে লাগল ‘নটি বয়’ আতাউল্লা। বাইশ তেইশ বছরের যুবক, তার উপর বসন্তের ঝিরঝিরে হাওয়া এবং বিশেষ করে একটা সুন্দরী তণ্বীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হুকুম দেওয়ার বীরত্বে চেঁচানোটা অস্বাভাবিক নয় বরং লাফানোই উচিৎ।
বয় সরবৎ দিয়ে গেল।
সালমা মনে মনে বললো মন্দ কি! আতাউল্লাকে বেশ রোমান্টিক বলেই মনে হল তার। চোখ দুটোতে প্রশান্তির দৃষ্টি, অগোছালো চুল, লম্বা ছিপছিপে দেহের গাঁথুনীতে একটি পরিণত যুবকের প্রোজ্জ্বল মূর্তি। লুৎফর সাগর সেঁচানো মেঘ আর আতাউল্লা ফেনসিক্ত বালির বাসর। লুৎফর আগুনে জল ঝরায়, আতাউল্লা আগুন জ্বালায়। আতাউল্লাকে মন্দ লাগল না সালমার। যৌবনোদ্দীপ্ত যুবককে যৌবনোদ্দীপ্তা যুবতীরা সহজে উপেক্ষা করতে পারে না।
‘আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন যে? বসুন।’…সালমা বলল।
আতাউল্লা খুশি। সে বসেই বলে উঠল, ‘আজকের পার্টিটার কেমন জানি মরামরা ভাব’।…আলাপের প্রথম সোপান।
‘বেশই তো হচ্ছে।’
‘আমার কিন্তু ড্রাই ড্রাই মনে হচ্ছে। ‘
‘কেন ?’
‘এই দেখুন না—’
একটা কড়া গন্ধে সালমা চমকে উঠল। রুমালটা নাকে চেপে বলে উঠল, মনে যদি কিছু না করেন তো, একটা কথা বলতে পারি।’
‘বলুন’।
ওয়াইনের গন্ধটা আমি সহ্য করতে পারি না।
আতাউল্লা চোখ দুটোকে বিস্ফারিত করে বলল, ‘হাউ ওয়াণ্ডার’! ইউরোপের মেয়েরা এক টেবিলে বসে পেগের পর পেগ শেষ করছে আর আপনি বলছেন, ওয়াইনের গন্ধ সহ্য কোরতে পারেন না।
সালমা আড়চোখে চাইল আতাউল্লার দিকে। বলল, ‘কিন্তু এটা তো ইউরোপ নয়’!
‘ইউরোপ নয় তা মানি। ইউরোপীয় ফ্যাসান যাকে আমরা এরেস্ট্রোক্রেসী বলে জানি, তা তাকে তো মানতে হবে।’
‘উহু …ওয়াইন খেলে যে এরেস্ট্রোক্রেসী বজায় থাকে তা তো কোনোদিন শুনিনি?’
‘শুনেন নি অবশ্য। কিন্তু এবার থেকে শুনবেন আর খেতেও শুরু করবেন।’ ..আতাউল্লা এই বলে তাকাল সালমার দিকে।
সালমা দস্তুরমতো ঘেমে উঠল। ওয়াইন প্রসংগ তুলে যেন তার ওয়াইনের নেশা পেয়ে বসল। বাঁকানো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল সে, ‘আপনি বুঝি আগে থেকেই শুরু করলেন।’
‘অন্তত আপনার আগে’। …বলেই মৃদু মৃদু হাসল আতাউল্লা। সালমা সাপের মতো ফোঁস করে উঠতে চাইল। অবস্থাটা বুঝতে পেরে আতাউল্লা বলে উঠে, ‘রাগ করবেন না মিস খান। আমার কথাগুলো একটু বাঁকাচোরা হলেও একেবারে খাঁটি। আসল কথা কি জানেন, ওয়াইনটা হল নিউরেটিক মনের প্রশান্তি। শক্তি যাদের ফুরিয়ে গেছে তারা এর আশ্রয় নেয় আর এরই মিথ্যের প্রলেপে ঢাকা ঘুনেধরা শক্তির সদ্ব্যবহার করেন।’
সালমা মাটিতে হাই হিলের জুতো ঠুকতে ঠুকতে বলল, ‘কথাটা বুঝলাম না।’
‘বুঝলন না তো ? আচ্ছা ধরুন, আমাদের সোসাইটির কথা। আমরা সবাই একটা স্বপ্নে মেতে উঠেছি’–
বাধা দেয় সালমা ‘আমরা নই আপনি।’
‘আঃ বলতে দিন্ না! স্বপ্নটা হল : মুঠো মুঠো টাকা জমাবো, গাড়ি করবো, বাড়ি করবো, দশজনের সংগে ফ্যাসান করে কথা কইবো, এরেট্রোক্রেসীর বড়াই করবো। এই দশজনেরাও আবার ফ্যাসান দুরস্ত। এবার আসল কথায় আসা যাক। কিন্তু এই স্বপ্নসৌধের মাটি ধ্বসে গেছে। এরা টের পেয়েও স্বাপ্নিক মনটাকে আজও নাড়াচাড়া করে থাকেন এবং এই ভঙ্গুর স্বপ্নের সান্ত্বনা জোগায় ওয়াইন। শক্তি এদের ফুরিয়ে গেছে তাই এরা এরেষ্ট্রোক্রেসী বজায় রাখতে গিয়ে দু’পেগ বেশিই গেলেন। …’ এই বলে নড়েচড়ে বসল আতাউল্লা। বসন্তরাগের আলাপ করতে এসে শুরু করে দিল মিঞামল্লারের তান। আকাশের নীল রং দেখতে এসে দেখল ধূসরাভ
সালমা ঠোঁট কামড়াতে লাগল। সত্যি আজকে সন্ধ্যেটা একেবারে মাটি। সমস্ত রাগ নিয়ে পড়ল লুৎফরের ওপর। অন্য কোন জায়গায় এনগেজমেন্ট করলে অন্ততঃ দু’চারটে ভাষা ভাষা কথা শোনা যেতো। টেবিলের ওপর চোখ ফেলতেই দেখল আতাউল্লার নুয়েপড়া মাথাটা!
‘বড্ড টায়ার্ড বলে মনে হচ্ছে কি ?’ সালমার শ্লেষোক্তি।
মাথা তুলে টানা চোখ দুটিতে এক দৃষ্টে চেয়ে আতাউল্লা বলল, ‘নিশ্চয়। না হলে পেগের পর পেগ গিললাম কেন?’
সালমা ফস্ করে বলে উঠল, ‘ব্ল্যাকে না লাইসেন্সে?’
‘কোনোটিতেই নয়। ওয়াইন যারা খায় অর্থাৎ পতনের রোমাঞ্চ নিয়ে যারা শেষ আনন্দে মেতে উঠে তাদের জন্যে ব্ল্যাক আর লাইসেন্স কোনোটিরই দরকার হয় না।’
‘তবে কোত্থেকে গিলেছেন?’
‘আজকের পার্টি থেকে।’
সালমা চমকে উঠল। বিরক্তিকর একটা শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।
‘রাগ করবেন না মিস্ খান। আমাদের এইসব পার্টি, হেনোতেনো সব রকমের এরেষ্ট্রোক্রেসীর মান বজায় রাখবার জন্যেই তো লাইসেন্স ও ব্ল্যাকের উৎপত্তি।’
সালমা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
‘উঠলেন নাকি।’
‘হুঁ…।’ আতাউল্লার সামনে থেকে পালিয়ে সালমা সোজা দাঁড়াল জাফর সাহেবের টেবলে।
ওস্তাদজি তখনও ভাংগা গলায় গেয়ে চলছিল। শ্রোতাদের ভেতর কিছুটা ক্লান্তি নেমেছে। টেবিলে টেবিলে মৃদু মৃদু গুগুরণ । সালমাকে
ল টেবিলে মৃদু মৃদু গুঞ্জরণ। সালমাকে দেখতে পেয়ে জাফর সাহেব কবি দেলওয়ারকে বললেন, ‘এই আমার মেয়ে মিস্ সালমা’–
কবি চাইলেন মুগ্ধ দৃষ্টিতে, উটের মতো বাঁকা পিঠটাকে সোজা করলেন। জাফর সাহেব বললেন সালমাকে, ‘ইনি তোমাদের জনপ্রিয় কবি দেলওয়ার হোসেন।’
সালমা তসলিম জানাল। ব্যারিষ্টার আলী সাহেব মস্ত একটা হাই তুলে বলে উঠলেন, ‘কবি নয়, মহাকবি। কায়েদে আজমকে উৎসর্গ করে শ’ তিনেক কবিতা বোধহয় এর মতো আর কেউ লেখেন নি।’
আবার সেই কড়া গন্ধ ওয়াইনের। সালমা চমকে ফিরে দাঁড়াল।
‘কোথায় চললে?’
‘ষ্টেজের দিকটায় ঘুরে আসি।’
‘গুড…’ জাফর সাহেব হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কবি দেলওয়ার সালমার নিটোল দেহের লাবণ্য দেখে বেড়ালের মত চুপসে গেল। আজ রাত্রেই একটা কবিতা লিখবেন। এই কথাই তিনি ভাবলেন।
‘আমার কথাটা ঠিক তো ?’…সালমার পিছন থেকে বলল আতাউল্লা। বাঁকা তেজালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সালমা ফুঁসে উঠল, ‘দেখুন ভদ্রতার একটা সীমা আছে।’
অর্ধ নিমীলিত চোখে, একটু হেসে আতাউল্লা নির্ভীকভাবে বলে উঠে, ‘ভদ্রতার সীমা থাকুক না থাকুক কিন্তু আপনার এই সস্নিগ্ধ মনের সীমা কিন্তু নেই মিস সালমা।’
সালমা থমকে দাঁড়াল।
‘আপনি কি মীন্ করতে চান্ ?’…সালমার টানা টানা চোখে জ্বলে উঠল অগ্নিদীপ্ত রেখা।
আতাউল্লা নির্বিকার। মাধবীকুঞ্জের বাঁকানো একটা লতা ছিঁড়ে নিয়ে বলল, ‘কিছু না, আমি বলতে চাইলুম, ওয়াইনটা হল আমাদের প্রশান্তি। একটা ঐতিহাসিক সত্যকে স্বীকার না করে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারে। এই পতনের আরম্ভে কিছুটা আনন্দ জোগাচ্ছে ওয়াইন।’
সালমা দস্তুরমতো রেগে বলল, ‘আপনার সংগে আর দশজনকে জড়াচ্ছেন কেন?’
হেসে উঠল আতাউল্লা। বলল, ‘এইখানে ভুল করলেন মিস্ সালমা। নিজের চোখে দেখে এলেন অথচ অস্বীকার করছেন। ব্যারিষ্টার আলী সাহেব, কবি দেলওয়ার হোসেন, আপনার আব্বা জাফর সাহেব—’
‘ থামুন মি. আতাউল্লা’। …এই বলে ছিটকে বেরিয়ে পড়ল সালমা। গেটের সামনে আসতেই একটা মোটর এসে থামল। মিসেস আমানুল্লা গাড়ি থেকে নেমে এসে সালমাকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, ‘হোপলেস্! হোপলেস্!’
‘কি হল চাচি আম্মা?’
‘বলিস না আর বেবিটার কথা। কোথায় ব্রিটানিয়া আর কোথায় সে। খুঁজতে খুঁজতে শেষকালে পেলুম রীজ রেষ্টুরেন্টে। দেখি তোর ভাই তাহের আর সে পেগের পর পেগ গিলছে–‘
একটা অস্ফুট স্বর বেরিয়ে পড়ল সালমার মুখ থেকে। মিসেস আমানুল্লারই মোটরে গিয়ে উঠে ডাইভারকে বলল, ‘আমাকে পৌছিয়ে দিয়ে এসো।’
ড্রাইভার ষ্টার্ট দিল। চলে গেল মোটর। মিসেস আমানুল্লা থমকে দাঁড়ালেন,মোষের মতো বিরাট শরীরটাকে নিয়ে থ’ বনে দাঁড়িয়ে রইলেন। আতাউল্লা এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। চলন্ত মোটরের পিছন দিকটায় দৃষ্টি ফেলে সে মৃদু মৃদু হাসতে লাগল। মিসেস আমানুউল্লা ভ্রু কুঁচকে বল উঠলেন, ‘নটি বয়।’
পিচঢালা রাস্তার ওপর সোঁ শব্দ তুলে মোটর চলেছে। দু’পাশের জ্বলন্ত গোলাকার লাইটকে সালমার ঝাপসা লাগল। সমস্ত মনটা বিষিয়ে উঠল। ড্রাইভারকে হঠাৎ থামতে বলে নেমে পড়ল রেস কোর্সের কাছে।
রাত্রির প্রথম প্রহর। নীল রঙের ওড়নার মতো আকাশে ঘন নীল রং, কপালের পর মতো কয়েকটি মিট মিট তারা। কিছুই ভাল লাগছিল না সালমার। রেস কোর্সের শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়ল সে। আর ভাবতে লাগল এলোমেলো সব কথা। আতাউল্লার শ্লেষাত্মক কথাগুলি যেন বাতাসের সংগে মিশে মিশে একটা ধারালো ঝড়ে হাওয়ার সৃষ্টি করেছে : কিন্তু এই স্বপ্ন সৌধের মাটি গেছে ধ্বসে। এরা টের পেয়েও স্বাপ্নিক মনটাকে আজও নাড়াচাড়া করে থাকেন এবং এই ভঙ্গুর স্বপ্নের সান্ত্বনা জোগায় ওয়াইন। …সালমা আস্তে আস্তে বুঝতে পারল কথাটা। মি, আমানুউল্লা সাহেব, ব্যারিষ্টার আলী সাহেব ও অনেকগুলো লোকের মুখ ভেসে উঠল তার মনশ্চক্ষে। বিশেষ করে তার আব্বার মুখটা যেন জ্বলজ্বল করে উঠছিল। ছেলেবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সে তার আব্বাকে দেখে আসছে একই স্বপ্নপ্রবণ ভংগিতে। আব্বা সব সময় বলে থাকেন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও জনসাধারণেরা হল সমাজের জঞ্জাল। এদের ছোঁয়াচ থেকে বাচতে না পারলে জীবনে সুখ নেই, স্বাচ্ছন্দ্যও নেই। কিন্তু আব্বা কি এখন সুখী? এই কথাই সালমার মনকে বিপর্যস্ত করে তুলল। অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি পেয়েও অনেক সময় তাকে অন্যমনস্ক দেখায়। তবে সুখ কোথায়? এই সুখ না পাবার ট্রাজেডি নিয়েই কি আজ তিনি মদ খাচ্ছেন ? বেবিটার কথা মনে উঠতেই সালমা চমকে উঠল। এটা চারিত্রিক দোষ, না সোসাইটির দোষ? এরকম কতকগুলো প্রশ্নের ধাক্কায় তার মনটা এলোমেলো হয়ে গেলো। আতাউল্লার কণ্ঠস্বর যেন ভেসে আসতে লাগল : ওয়াইনটা হোল নিউরেটিক মনের প্রশান্তি। শক্তি যাদের ফুরিয়ে গেছে তারা এর আশ্রয় নেয়।…
সালমার কপালে দেখা দিল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আর কজনের কথা মনে পড়লো তার। কলেজের মেয়ে জুবেদা একদিন বলেছিল, ‘দুনিয়ায় আজকে দুটো দল। একটি কোটি কোটি লোককে যাঁতাকলে গুঁড়ো করে শান্তি লুটছে। অন্যটি কোটি কোটি লোকের শান্তির জন্যে লড়াই করছে।’ সালমার চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল তার আব্বার মুখটা। সেদিন কয়েকজন ছাত্র ‘ অনুরোধ করেছিল শান্তির আবেদনে সই দিতে, কিন্তু আব্বা রেগেই ওদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ান দস্যুদের ওপর এটম বোমা না তবে ফেলবে কোথায়? ওগুলোকে শায়েস্তা না করলে সারা দুনিয়ায় ছোট লোকের রাজত্ব বসবে।
ঢং ঢং একটি আওয়াজ হতেই সালমা উঠে পড়ল। ভাবতে ভাবতে হেঁটেই চলন বাংলোর দিকে। সহজ সরল একটা মন্তব্য করল মনে মনে, কোটি কোটি লোকের শান্তির জন্য শান্তির আবেদনে আব্বার সই দেওয়া উচিৎ।
এ হলঘরের বাঁদিকটায় বাঁকানো সিঁড়ির উপর উঠতে উঠতে উঁকি মেরে দেখল সালমা, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আব্বার রুমটার কাছে থমকে দাঁড়াল সে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। লাইট জ্বলছে। দরজার গায়ে কান পেতে শুনল আব্বার মুখের জড়িয়ে যাওয়া বিকৃত প্রলাপ : ‘দিগন্ত বিস্তৃত জমির ওপর তৈরি হয়ে উঠছে একটা বিরাট কারখানা, চিমনির ধোয়ায় ঢাকা পড়েছে আকাশের ঘন নীল রং, নোংরা কুলীদের হট্টগোলে ও মেশিনের ঘর্ঘর শব্দে ধ্বনিত হচ্ছে সভ্যতা ও সৃষ্টির ছন্দ। এর মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি, বিরাট প্রস্তরমূর্তির মতো, কপালে আভিজাত্যিক অহংকারের আলপনা—যেন দিগ্বিজয়ী সম্রাট, মানুষের প্রতিনিধি।
‘আব্বা।
জাফর সাহেব চমকে উঠে লাইটটা ধপ করে নিভিয়ে দিলেন। সালমার চোখে ফিল্মের মতো ভেসে উঠল কতকগুলো অক্ষর…ওয়াইন…ওয়াইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *