অনির্বাণ বসু্র গল্প : উত্তরঅরণ্যকাণ্ড

গৎ সত্য। জীব সত্য। জড় সত্য। বচন সত্য। বাক্য সত্য। ইতিহাস সত্য। লেখ্য ইতিহাস সত্য। কথা সত্য। কথকতা সত্য। কিংবদন্তী সত্য। কথ্য ইতিহাস সত্য। কাব্য সত্য। মায়াপ্রপঞ্চময় এই ভবসংসারে সত্য সেই সকলই, যা গুরুর বিশ্বাস। একক গুরুর দিব্যদৃষ্টি। সংখ্যাগুরুর সংস্কার। যে-বিশ্বাস নিজেকে লিখে রেখেছে প্রাচীনে, পুরাণে—সেই একদা উপাখ্যানসমূহ, বহু পথ পেরিয়ে হয়ে ওঠে ইতিহাস। কাব্য হয়ে যায় ইতিহাস। একটি আচমকা জেগে-ওঠা চর ইতিহাসের কুরুক্ষেত্র হয়ে যায়। একটি পথ তার সংলগ্ন সমাজের পরিবর্তনের বয়ান হয়ে যায়। একটি অরণ্য হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক। এমনই এক দুর্গম বনে, যেখানে দেবতা গন্ধর্ব কিন্নরদলের আগমন ঘটত না কখনও, যে-স্থান ছিল রাক্ষসদের আবাসভূমি, আমার সঙ্গে আসুন, আমি আপনাকে নিয়ে যাই সেই গহন অরণ্যে; শুধু কোনও প্রশ্ন করা চলবে না, নিঃসংশয় হতে হবে, কারণ এসবই বিশ্বাস—জনশ্রুতি : মানুষ জীবনের স্রোত ভালোবাসে, তার শোনা কি ভুল হতে পারে কখনও? আপনি বুঝি আপনার কানকে বিশ্বাস করেন না? এও তেমনই বিশ্বাস : বিশ্বাসে মেলে রাম, তর্কে হারাম।
আসুন, আমায় অনুসরণ করুন এবং আমি আপনাকে নিয়ে যাই সেই গহন অরণ্যে—দণ্ডকবনে।
চারপাশ জুড়ে, যেদিকেই চোখ যাবে, শুধু সবুজ আর সবুজ। জঙ্গল এখনও তার প্রবল অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে এখানে, এই বস্তার জেলায়। এখানে পা ফেলতে হয় ধীরে, মেপে-মেপে, সাবধানে। পথ এখানে সমান নয় কোথাও, উঁচু-নিচু, এবড়ো-খেবড়ো; জঙ্গলের মাঝে স্থানে-অস্থানে পাথুরে জমি। এই যে আজকের ছত্তিশগড়, বেশিদিনের পুরোনো নয়, মাত্র কয়েক বছর আগেও এসবই ছিল মধ্যপ্রদেশে। তারপর তো ভাগ হয়ে নতুন রাজ্য হল। ছত্তিশগড়। ক্ষমতা নিজের মর্জিমতো নাম বদলায়, সীমানা বদলায়, সৌধ বদলায়, ইতিহাস বদলায়, নয়তো এসব তো আগে ছিল না; কাব্যই এক এবং অবিকৃত সত্য। আজকের এই বস্তার এবং তার পর থেকে বিস্তীর্ণ দক্ষিণাঞ্চল প্রাচীনকালে ছিল রাক্ষসদের বসবাসের স্থান। তাদের উৎপীড়নে মুনি-ঋষিদের সাধনা-তপস্যা দায় হয়ে উঠত থেকে-থেকেই। এইভাবেই চলে গেল সত্য যুগ; তারপর এল ত্রেতা যুগ। সেই ত্রেতা যুগে ইক্ষাকু বংশের রাজা দশরথ, অপুত্রক, পুত্রার্থে প্রত্যুদ্‌গমন করে রাজধানীতে নিয়ে এলেন ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে; যজ্ঞের শেষে ঋষি দুই পাত্র পরমান্ন তুলে দিলেন রানি কৌশল্যা আর কৈকেয়ীর হাতে। দুই রানি নিজেদের থেকে সেই পরমান্নের ভাগ দিলেন কনিষ্ঠা রানি সুমিত্রাকে। যথাসময়ে পিতা হলেন রাজা দশরথ। কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নিলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত, আর দু’বার পরমান্ন খাওয়ার ফলে সুমিত্রার গর্ভে জন্ম নিল দুই পুত্র—লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীরাম ক্রমে হয়ে উঠলেন সর্বগুণান্বিত, সর্ববিদ্যায় পারদর্শী। পুত্রেরা বিবাহযোগ্য হলে পর মিথিলার রাজা জনকের কন্যাদের সঙ্গে বিবাহের বন্দোবস্ত করলেন রাজা। শ্রীরামের পত্নী সীতামা, ভরতের শ্রুতকীর্তি, লক্ষ্মণের ঊর্মিলা এবং শত্রুঘ্নের মাণ্ডবী। ক্রমে যুবরাজ শ্রীরামের রাজ্যাভিষেকের কাল এসে পড়ল; আর এই সময়ই দাসী মন্থরা এবং রানি কৈকেয়ীর ষড়যন্ত্রে রাজা দশরথ প্রিয় পুত্রকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে নির্বাসনের দণ্ড দিতে বাধ্য হলেন। শ্রীরামের নির্বাসনের শোক সহ্য করতে না-পেরে মৃত্যুবরণ করলেন রাজা, তবু পিতৃদেশ পালনের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন ভগবান। বনবাসে তাঁর সঙ্গী হলেন সীতামা আর ভাই লক্ষ্মণ। স্থিতধী প্রভু শ্রীরাম তাঁর বনবাসকাল অতিবাহন করেছিলেন এই দণ্ডকারণ্যেই। এখানকার মাটি প্রভু শ্রীরামের পদধূলিধন্য, এখানকার প্রতিটি মৃত্তিকাচূর্ণে মিশে আছে আমাদের অতীত, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি। দূরে, ঈষৎ ঝাপসা হয়ে আছে যেখানটা, সেই অগ্নি কোণে আরও কিছুটা এগোলেই দেখা মিলবে অঝোর জলধারার, জলপ্রপাতের : চিত্রকূট জলপ্রপাত। সেখান থেকে ঈশান কোণের দিকে এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে গাঙ—গোদাবরী গঙ্গা। চিত্রকূট থেকে বেরোনো জলধারা গোদাবরীতে নয়, মেশে ইন্দ্রাবতী নদীতে; সে আরও পশ্চিমে।
এই অরণ্য তখন রাক্ষসদের চারণভূমি। ভগবানের রূপ দেখে এক দিন কামমোহিত হয়ে পড়ল রাক্ষসী শূর্পনখা। শ্রীরামের সমীপে উপস্থিত হয়ে আপন মনোবাঞ্ছার কথা জানাল সে। ভগবান স্বীয় পত্নী সীতাকে দেখিয়ে তাকে জানালেন, তিনি ইতোমধ্যেই বিবাহিত; শূর্পনখা বরং লক্ষ্মণের কাছে যেতে পারে।
আপনার কপালের বলিরেখা বোঝা যাচ্ছে, ভ্রূকুঞ্চন স্পষ্ট। এইভাবে মনে সন্দেহ অথবা কূট জিজ্ঞাসা নিয়ে ভগবানের নামসংকীর্তন শোনা চলে না। ইতোপূর্বেই আমি বলেছি, নিঃসংশয় হতে হবে, প্রশ্ন চলবে না কোনও—ভগবান বিশ্বাসীদের জন্য, অবিশ্বাসীদের প্রতি তাঁর অনিঃশেষ আশিস অর্পিত হয় না। আমি বলছি, কারণ ভগবানের নাম-গানে আমি অক্লান্ত; কিন্তু এও বলছি, যদি আর-একবারও আপনার তরফে সামান্য সংশয়ের উদ্রেক হয়, তবে আমি মৌন হয়ে যাব; যে-মানুষ বিশ্বাসী, যে-মানুষ অন্তরে ভক্ত, তাকে শোনাব; অভক্তির সঙ্গে ইষ্টনাম জপ করা চলে না। বিলক্ষণ বুঝতে পারছি, আপনি নিশ্চিত ভাবছেন যে, স্বয়ং ভগবান নিজে বিবাহিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই রাক্ষসীকে আর তারপর তাঁর ভাইয়ের কাছে পাঠালেন, যিনিও আগে থাকতেই বিবাহিত—তাই তো? শুনুন, কার্যসিদ্ধির জন্য অমন একটু-আধটু ছলনার আশ্রয় নেওয়া কোনও অন্যায়ের নয়—বিশেষত, বৃহত্তর স্বার্থে যখন আপনি যুদ্ধে অবতীর্ণ। যুদ্ধে শুধু একটাই লক্ষ্য থাকে, বিজয়; আর তার জন্য কোনও কিছু অন্যায় নয়। শূর্পনখাকে দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই মহাযুদ্ধ : প্রভু শ্রীরাম আর রাক্ষসাধিপতি রাবণের যুদ্ধ—দেবাসুরের সংগ্রাম। এই বসুধাকে রাক্ষসহীন করার মহৎ সংকল্প।
প্রভুর কথায় শূর্পনখা এরপর আসে লক্ষ্মণের কাছে এবং প্রেম নিবেদন করে। লক্ষ্মণ তাকে অপমান করলেন, শুধু অপমান করলেন না, তার নাক-কান কেটে দিলেন। দণ্ডকবনে সেই প্রথম রাক্ষসদের একচ্ছত্র আধিপত্যের উপর আঘাত এল; আর কে করল সেই আঘাত? স্বয়ং লক্ষ্মণ; প্রভুর অনুসারী ভ্রাতা—একমাত্র। জীবনে কোনও দুঃস্বপ্নে, কোনও দুর্বিপাকে, কোনও দুর্ভাবনাতেই ভগবানকে ত্যাগ করেননি তিনি। ভগবানের এখানে আগমনের আগে রাক্ষসদের যৎপরোনাস্তি অত্যাচারে কেউ তিষ্ঠোতে পারত না। লক্ষ্মণ সেই যে শূর্পনখাকে অপমান করলেন, সেটাই ছিল প্রথম প্রত্যাঘাত। রাক্ষসদের বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সসাগরা ধরিত্রী আসলে দেবতা এবং মানুষের; রাক্ষসদের সেখানে কোনও স্থান নেই। অবশ্য ভগবানের লীলা তার আগে ঋষিরা দেখেছিলেন, বিশ্বামিত্র মুনির উদ্‌যোগে তারকা রাক্ষসীকে হত্যা করেছিলেন প্রভু।
লক্ষ্মণ প্রভু শ্রীরামের যোগ্য ভ্রাতা; দ্বাপরে যেমন শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম, ত্রেতাতেও তেমনই শ্রীরাম আর লক্ষ্মণ। ওই যে বলছিলাম না, কখনও প্রভুসঙ্গ থেকে সরেননি লক্ষণ, কখনও শ্রীরামচন্দ্রের আদেশের অন্যথা করেননি তিনি; বারেকের জন্যও নয়। লক্ষ্মণ ব্যতীত আর কারও পক্ষেই ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। ইন্দ্রজিৎ শুধু তাঁর হাতেই বধ হত, যিনি চোদ্দো বছর খাননি, চোদ্দো বছর ঘুমোননি, চোদ্দো বছর কোনও নারীর মুখদর্শন করেননি। ইন্দ্রজিতের অমরত্ব লাভের যজ্ঞের আগের রাতে রাবণের সঙ্গ ছেড়ে-আসা বিভীষণ যখন এই তিন শর্তের কথা জানিয়েছিলেন শ্রীরাম এবং সুগ্রীবকে, শুনে উপস্থিত সকলের তখন দিশাহারা দশা; সেই সময় এগিয়ে এসেছিলেন লক্ষ্মণ, সর্বসমক্ষে নিজেকে যোগ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন।
আপনি বোধহয় ভাবছেন, লক্ষ্মণ তো শ্রীরাম আর সীতামার সঙ্গে এই দণ্ডকবনেই চোদ্দো বছর অতিবাহিত করেছেন, সীতামাইয়া তো নারী, তাহলে? আসুন, আমার দেখানো পথে। উঠে আসুন এই গিরিশৃঙ্গের উপর, দৃষ্টি স্থির করুন সূর্যের দিকে, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি ভারতবর্ষের দক্ষিণে—সমুদ্রোপকূলে।
নিন, এইবার দেখুন—।
সমুদ্রের উপর পাথর ফেলে সেতুবন্ধনের কাজ করে চলেছে বানরদল। সেই ঘন তমিস্রপক্ষেও মুহূর্তের বিরাম নেই। দেবনাগরী লিপিতে ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা প্রতিটি পাথরের গায়ে; সেই কারণে জলে না-ডুবে ভেসে থাকছে। সকলই প্রভুর লীলা। প্রভুর নির্দেশে সমুদ্রও শান্ত রেখেছে নিজেকে। প্রভুকে কেন্দ্র করে ঘিরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণ সুগ্রীব জাম্বুবান বিভীষণ সুষেণ অঙ্গদ আর হনুমান। বিভীষণের মুখে সব শুনে উপস্থিত প্রত্যেকেই চিন্তামগ্ন; অন্যদের মুখ নিরীক্ষণ করে লক্ষ্মণ তখন বললেন : ‘এই প্রতিটি গুণই আমার মধ্যে বর্তমান। জ্যেষ্ঠ, আপনার সম্মতি থাকলে আমি ইন্দ্রজিৎকে বধ করতে প্রস্তুত।’
সমুদ্রতটের সেই সভায় তখন সবার চোখে-মুখে বিস্ময়ের অনাবিল প্রকাশ। ধনুর মতো কুঞ্চিত প্রভুর ভ্রূযুগল। কিঞ্চিৎ সংশয়াতুর বিভঙ্গে কথা বললেন তিনি : ‘লক্ষ্মণ, এই চোদ্দো বছর তুমি পলকের জন্যও ঘুমোওনি?’
‘না, জ্যেষ্ঠ। বনবাসের প্রথম রাত্রে আপনি এবং মা সীতা পর্ণকুটিরে শয়নের জন্য প্রবিষ্ট হলে বাইরে আমি আপনাদের প্রহরায় নিয়োজিত করেছিলাম নিজেকে। কিয়ৎকাল পর চোখে ভার অনুভব করে ধনুকে তির যোজনা করতে যাব, মনে সংকল্প করে নিয়েছি নিদ্রাকে হত্যা করার, তখনই এক দেবীমূর্তি—নিদ্রাদেবী—এসে দাঁড়ান আমার সামনে। কাতর স্বরে প্রার্থনা করেন আমি যেন তাঁকে হত্যা না-করি, তিনি নিহত হলে জগতে কোনও প্রাণীর চোখেই আর ঘুম থাকবে না। তাঁর প্রাণের বিনিময়ে আমি অনিদ্রার বর লাভ করেছিলাম। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত আমি মুহূর্তের জন্যও ঘুমোইনি।’
‘তুমি যে আমার আদেশ অমান্য করবে, তা আমি কখনও ভাবিনি, লক্ষ্মণ। প্রত্যহ আহারের জন্য একটি করে সুমিষ্ট ফল তোমার হাতে দিতাম আমি, অথচ এখন বলছ তার একটিও তুমি খাওনি! এ তো আমার আদেশের উল্লঙ্ঘন!’
‘আপনি অপরাধ নেবেন না, আমি মুহূর্তের জন্যও আপনার আদেশ অলঙ্ঘন করিনি। প্রত্যহ একটি করে ফল আমার হাতে দিয়ে আপনি বলতেন, লক্ষ্মণ, এটি তোমার। আপনি আমায় কখনওই আহারের জন্য আদেশ করেননি। সঞ্চিত সেই ফল আমার কাছে সুরক্ষিত আছে, সেখানে শুধু তিন দিনের ফল মিলবে না। যেদিন মা সীতাকে খল রাবণ অপহরণ করেছিল, সেই দিন এবং তার পরবর্তী দিন আমাদের আহার হয়নি। মেঘনাদের নাগপাশ যেদিন আমাদের বেঁধে ফেলেছিল, সেদিনও আহারের সময় গত হলে পর গরুড় এসে আমাদের উদ্ধার করেছিলেন।’
‘পরন্তু সীতা তো আমাদের সঙ্গেই বনবাসে ছিলেন, এতদ্ব্যতীত শূর্পনখার নাসিকা কর্তনের ক্ষণেও তো তুমি তার মুখদর্শন করেছ!’
‘আমার দৃষ্টি সর্বদা মা সীতার পদযুগলে আবদ্ধ থাকত, সেই কারণেই ওঁর ফেলে-যাওয়া গহনার মধ্যে শুধুমাত্র পায়ের অলংকারাদি সকল চিনতে পেরেছিলাম, অন্যগুলি নয়। আর শূর্পনখা রাক্ষসী, নারী নয়।’
লক্ষ্মণের থেকে আশ্বস্ত হয়ে শ্রীরাম হাত রাখলেন ভাইয়ের কাঁধে। জীমূতবাহন সহায়, ওই মুহূর্তে বজ্রালোকে অন্ধকার কেটে গেল সাময়িক, প্রভুর মুখে দেখা গেল আসন্ন বিজয়ের উল্লাস।
আপনার দেখা সম্পন্ন হয়েছে। এবার সূর্যের থেকে চোখ সরিয়ে নিন। সাময়িক অন্ধকার দেখবেন চারপাশ। আসলে এই আয়োজন সকলই প্রভুর অসীম লীলার যৎসামান্য; ভগ্নাংশ মাত্র। স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে এলে আসুন আমার সঙ্গে। এবার আমরা প্রবেশ করব অরণ্যের আরও গভীরে। আপনাকে দেখাব ত্রেতা যুগের সেই পর্ণকুটির, দেখাব পঞ্চ বটের সমাহার।
আসুন, সাবধানে। জঙ্গলের এই অংশ ঠিক আগের মতো নয়। এখানে লতানেগাছ আর গুল্ম জাতীয় গাছে ছেয়ে আছে চারপাশ, এমন-কি কোথাও-কোথাও পথ বোঝা যায় না ওদের দৌলতে। চারপাশ জুড়ে অগোছালো বেতসলতার গুচ্ছ ঝোপের আকার নিয়েছে। এইসব ঝোপঝাড় পেরিয়ে ওই দিকে যে-বড়ো গাছগুলি দেখা যায়, তার কোনওটা অর্জুন, কোনওটা অশ্বত্থ, কোনওটা-বা জারুল। তারও পিছনে সার দিয়ে শালের সারি। এই গহন বনে দেখে পা ফেলতে হয়। যেহেতু মাটির সঙ্গে পাথুরে জমিও প্রায় সমান তালে, ফলে যেখানে-সেখানে দেখা মিলে যায় বিষধর সাপের : শঙ্খচূড় গোখরো চন্দ্রবোড়া শাঁখামুঠি কেউটে শঙ্খিনী ব্রাহ্মণী আঁচিল দুধরাজ ফণীমনসা বেতআঁচড়া দাগীগলা ঘরগিন্নি উদয়কাল শামুকখোর দাঁড়াশ লাউডগা—আরও কতরকম! বাকি সাপেদের তেমন বিষ নেই; তারা মূলত জলে থাকে, মাঝে-মধ্যে যদিও দেখা পেয়ে যেতে পারেন পথ চলতে গিয়ে। তাই বারবার বলছি, সাবধানে। ওই যে, ওই মেহগনি গাছটার সামনে দেখুন—। অবশ্য ময়ূর বলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ারই কথা, গায়ের রঙের কারণে মিশে আছে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে; এটার রং সাধারণ ময়ূরের মতো নীল বা সবুজের ধারে-কাছেও নয়, এখানে এর পরিচিতি কাঠময়ূর নামে। ইন্দ্রাবতী নদীর পারে দেখা মেলে ধলাকপাল রাজহাঁসের। গোদাবরীর চরে চড়ে বেড়ায় বালিহাঁস। বনটিয়া আর বনমুরগির পাশাপাশি জঙ্গলে ইতিউতি নজরে পড়ে মরালী মথুরা গুন্দ্রী বটেরা বসন্তবৌরী তিতির; বনে কালো-তিতির আর মেটে-তিতিরের সঙ্গে সাদা চিবুক-তিতিরের ওড়াউড়ি নজরে আসে। জলার তিতিরের সবটুকু খুনসুটি গোদাবরী গাঙের তীরে—কাদাখোঁচার সঙ্গে।
দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে তো, সামনে ঘন জঙ্গল, পথ নেই কোনও? ভয় পাবেন না একদম। আপনি প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, দেখবেন, সে কখনও আপনার পথে বাধা হবে না; যদি তাকে আঘাত করেন, তবে কিন্তু সমস্যা তৈরি হবে। দূর থেকে যাকে বাধা মনে হচ্ছে আপনার, কাছে যান, দেখবেন, গুল্মলতারা এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে পরস্পরকে—ভালোবাসায়, আদরে—আপাতভাবে প্রতীতি জন্মায় এই যে, হয়তো-বা সামনে পথ নেই কোনও। তাদের সামনে যান, পরম স্নেহে হাত বোলান, ওরাই পথ করে দেবে আপনার গমনাগমনের। আসুন, আসুন—।
এই দেখুন, আমার হাত বোলানোর সঙ্গে-সঙ্গে কেমন সাড়া দিচ্ছে ওরা, কেমন বাধ্যের মতো ঘাড় নেড়ে সরে যাচ্ছে, পথ করে দিচ্ছে আমাদের। এই সামান্য পথটুকুই যা অন্ধকার; এত ঘন ডাল-পাতার ফাঁক গলে সূর্যের সামান্য আলোও আসে না, অন্ধকার অতএব। এইটুকু পথ শুধু, এরপরই আলো এসে পড়বে এই আদিম অরণ্যে, আমাদের ইতিহাসে; সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ প্রকাশিত হবে আপনার সম্মুখে। এই আঁধারে আমায় নির্ভয়ে অনুসরণ করুন আপনি, আমার পদক্ষেপ দেখে পা ফেলুন অনুরূপ।
আলোর উদ্ভাস দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়। ওই আলোর উৎস ধরে এগিয়ে চলুন। আর সামান্য এগোলেই আমরা এসে পড়ব গোদাবরীর তীরে—সেই পুণ্যভূমিতে।
এই মুহূর্তে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি সেই পুণ্যভূমির উপান্তে। দূরে একটি আশ্রম তুল্য গৃহ দেখতে পাচ্ছেন আপনি? ওই যে ভগ্নপ্রায় বিধর্মীদের উপাসনাগৃহ, তার লাগোয়া অংশে? ওইখানেই ছিল প্রভুর বনজীবনের আবাস। মাঝে দীর্ঘ এক যুগ অতিক্রম করে আজ যে কলি যুগে দাঁড়িয়ে আমরা, সেই অস্থির সময়ে বিধর্মীদের উল্লাস থেকে আমাদের উদ্ধারকল্পে আকাশ থেকে শ্বেত অশ্বে আরূঢ় ভগবান নেমে আসবেন এই ধরার বুকে। যথাকালে আগমন ঘটবে তাঁর; কিন্তু ভগবানের আবির্ভাবের আগে আমাদের যা-কিছু ঐতিহ্য, বিধর্মীদের হাত থেকে তাকে রক্ষার দায়িত্বও আমাদেরই—অন্যের নয়। আমাদের ইতিহাসকে আমাদেরই সুরক্ষিত রাখতে হবে।
আপনি হয়তো জানেন, দণ্ডকারণ্য ক্রমে বারণাবত হয়ে উঠছে। এই শান্ত, সমাহিত অরণ্যপ্রদেশকে জউঘর বানানোর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বহুদিন। আমাদের দেশে বহির্শত্রুরা আসতে শুরু করার পর, দেশের দখল নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তাদের নজর পড়ল আভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর। এই দণ্ডকবনেও এসে পড়ল তারা : প্রয়োজনমতো জমি বাসযোগ্য করে গড়ে তুলল বসতি। প্রভু শ্রীরামের কুটির যা আগে থেকে ছিল, সেই ভূমিখণ্ডটুকুই মনে ধরল বিধর্মীদের : অতীতকালীন স্মারকের উপস্থিতি বর্তমানের অভিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনায় অধিক প্রাচীনত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে অন্তরায়। প্রভুর কুটির অতঃপর রাহু গ্রাস করল। ত্রেতা যুগে রাক্ষসদের নির্মূল করে যে-আদিম অরণ্যকে ভগবান সাধনার ক্ষেত্রে উন্নীত করেছিলেন, কলি যুগে আর-এক দল রাক্ষসের আস্ফালনে তা আবারও অবরুদ্ধ হল। আমাদের পূর্বপুরুষরা যদি সেই সময় জোটবদ্ধ থাকত, তবে—আমরা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ধর্ম, সনাতন ধর্ম—প্রভুকে এমন লাঞ্ছনা সহ্য করতে হত না। সেই আকালের দিনে আমাদের পূর্বজদের কৃতকর্মের পাপ স্খলনের ক্ষণ আর বেশি দূরে নয় যদিও। ওই দেখুন, ছোটো-ছোটো ফালি কাপড়, গৈরিক বর্ণের, রশিতে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে আশ্রমের চারপাশে। বিধর্মীদের এই প্রার্থনাগৃহ আর বেশিদিন প্রভুর পুণ্যভূমি অধিকার করে থাকবে না; আমরা থাকতে দেব না।
আপনার মনে হতে পারে, বিধর্মীদের এই স্থাপত্য তো ইতিহাস; মানি, কিন্তু আমাদের ইতিহাস, যা এরও আগের? তার কী হবে? আপনি বলতেই পারেন, ওদের উপাসনালয়টি বহু বছরের পুরোনো, হয়তো কয়েক শত বছর আগের; আমাদের প্রভু তো ত্রেতা যুগের, আর এটা কলি যুগ, মাঝে চলে গেছে আরও-একটা যুগ। যুগান্তরের সময়কালকে কোন সংখ্যাতত্ত্বে ধরবেন আপনি? যুগকে কি সত্যিই কোনও সংখ্যার গণ্ডিতে বাঁধা সম্ভব? তা গণ্ডির কথা এলই যখন, তখন আপনাকে আমি ঘুরিয়ে আনি ত্রেতা যুগে; যদি-বা ন্যূনতম কোনও সংশয় থেকেও থাকে মনের অন্ধকারতম প্রকোষ্ঠে, জ্ঞানের আলো পড়ুক সেখানে। আসুন, সূর্যের দিকে চোখ রাখুন আবার, আমি আপনার সামনে নির্মাণ করি বিভ্রম। মায়াপ্রপঞ্চময় এই সমগ্র জগৎ-সংসার, প্রকৃত প্রস্তাবে, বিভ্রমের বশে চলে।
দু’ চোখ ভরে দেখুন, দেখে নয়ন সার্থক করুন; দেখুন, অন্তরীক্ষে লীন হয়ে গেছে বিধর্মীদের উপাসনালয়। যে-আশ্রম খানিক আগেও আপনার নজরে এসেছিল, তাও আর নেই; মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক পর্ণকুটির। তার এক পাশে নিষিন্দা, অন্য পাশে শিশু। নৈর্ঋত কোণে বিগত দিনের সন্ধ্যাপ্রদীপ; নির্বাপিত।
প্রভু শ্রীরামের সমীপবর্তী সীতামাইয়া, কিঞ্চিৎ অদূরে লক্ষ্মণ। সীতামার কোলে একটি মৃগশাবক, পরম নিশ্চিন্তে মাতার হাত থেকে তৃণাদি ভক্ষণে রত। অকস্মাৎ এক স্বর্ণমৃগ দেখা দিয়ে পলকে হারাল। পরক্ষণেই আবারও। দ্বিতীয় উদ্ভাসে সেই দ্রুতপদীর উপর দৃষ্টি গেল মা সীতার। তিনি স্বামীর দিকে ফিরলেন, বললেন : ‘স্বামি, যে-মৃগের শরীর স্বর্ণের, আমি তাকে এই কুটিরে আকাঙ্ক্ষা করি। আপনি সত্বর ওকে ধরে আনুন।’
সীতামাইয়ার কোনও কথাতেই প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না শ্রীরামচন্দ্র, এই ক্ষেত্রেও পারলেন না। ধনুর্বাণ সহযোগে স্বর্ণমৃগের সন্ধানে গমনের প্রাক্কালে, মা সীতার রক্ষার্থে ভ্রাতা লক্ষ্মণকে নিয়োজিত করে গেলেন প্রভু। বনমধ্যে যখন সেই মায়ামৃগ তাঁর শরের আঘাতে মৃত্যুমুখে পতিত হতে চলেছে, তখন, মরণের সেই অন্তিম মুহূর্তে, স্বরূপে ফিরে এল মায়াবী রাক্ষস মারীচ এবং দণ্ডকবন বিদীর্ণ করে অবিকল পুরুষোত্তম শ্রীরামের চিৎকৃত কণ্ঠে সাহায্যের আর্তিটুকু উচ্চারণ করল, মারা গেল তারপর। এদিকে স্বামীর আর্তনাদ শ্রবণে ব্যাকুল সীতামাইয়া সাহায্যার্থে লক্ষ্মণকে গমনের জন্য অনুরোধ-উপরোধ শুরু করলেন। লক্ষ্মণ বহুবার বোঝানোর প্রচেষ্টা করলেন, শ্রীরামের কোনওরূপ ক্ষতি হতে পারে না ইত্যাদি বললেন, তবু সকলই ব্যর্থ হয়ে ফিরল মা সীতার অঝোর ক্রন্দনের সামনে। অনন্যোপায় লক্ষ্মণ সীতামাইয়াকে রেখে-যাওয়ার পূর্বে বাণের অগ্রভাগ—তীক্ষ্ণ ফলা—দিয়ে কুটিরের চতুর্পার্শ্বের ভূমিতে গণ্ডি কেটে দিলেন এবং সাবধান করে গেলেন এই বলে যে, তাঁর এঁকে-দেওয়া সেই রেখা—লক্ষ্মণরেখা—যেন কোনও অসামান্য কারণেও অতিক্রমের স্পর্ধা না-করেন সীতামা।
ধীরে-ধীরে চোখ সরিয়ে আনুন সূর্যের থেকে। এবার শুনুন কবি কী লিখেছেন :
প্রবোধ না মানে সীতা আরো বলে রোষে
আজি মজিবেক সীতা আপনার দোষে
গণ্ডী দিয়া বেড়িলেন লক্ষ্মণ সে ঘর
প্রবেশ না করে কেহ ঘরের ভিতর
স্বয়ং বিষ্ণু রঘুনাথ, তাঁর পত্নী সীতা
শূন্য ঘরে রাখি ওহে সকল দেবতা
এবার বুঝলেন তো যে, এই যে এত কথা, তার প্রতিটিই আঁকাড়া সত্যি; এক বর্ণও মিথ্যা নয়! আমি তো আগেই বলেছিলাম, বচন সত্য। বাক্য সত্য। ইতিহাস সত্য। লেখ্য ইতিহাস সত্য। কথা সত্য। কথকতা সত্য। কিংবদন্তী সত্য। কথ্য ইতিহাস সত্য। কাব্য সত্য। ইতিহাস মূলত কাব্য।
সামনের ঢাল বেয়ে যে-পথ, পাকদণ্ডীর মতো অনেকটা, সেদিকে উঁকি দিয়ে দেখুন, দেখবেন, পরপর সার দিয়ে চলেছে কয়েকটি বিষনীল যান। সেই সকল যানবাহনের ভিতর গাদাগাদি করে বসে আছে জলপাই উর্দির বানরসেনা। হাতে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। এখন আবারও রাক্ষসদের বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই দণ্ডকারণ্য। যুগ বদলে গেছে আসলে। আগে রাজা স্বয়ং অবতীর্ণ হতেন রণক্ষেত্রে, এখন রাজা রণনীতির নির্ণায়ক। যে-যুদ্ধে রাজার প্রাণসংশয় হয় না, তা যুদ্ধ নয়, বিশুদ্ধ রাজনীতি—কলি যুগে এই ধারণারও বদল ঘটে গেছে। আগে রাক্ষস চেনার উপায় ছিল গাত্রবর্ণ, কথ্যভাষা—এইসব; এখন সেসবের স্থান নিয়েছে পোশাক এবং খাদ্যাভাস। বিশেষ করে যাদের মাথায় শ্বেত জালিকাবিশিষ্ট আচ্ছাদন, কোনও-এক কালে যারা এখানে ছিল, যাদের এই অরণ্যে দেখা যায় না আর; শূন্য পড়ে আছে তাদের উপাসনাগৃহ। এই বনের মধ্যে পথ চলতে গিয়ে দেখে ফেললেও ফেলতে পারেন যে-রাক্ষসদলকে, তাদের প্রত্যেকের পরনে জংলা পোশাক, মাথাতেও ওই রঙের আচ্ছাদন। এই পবিত্রভূমি উদ্ধারের পথে আপাতত এরাই আমাদের বাধা। যদিও আমাদের কাছে এসব তৃণাদপি তুচ্ছ; স্বয়ং ভগবান আছেন আমাদের সঙ্গে। শ্রীরাম পুরুষোত্তম দীর্ঘ সংগ্রামের শেষে মুক্ত হয়েছেন বিধর্মীদের কারাগার থেকে, এবার তাঁর ভাই লক্ষ্মণের পালা; লক্ষ্মণরেখার ভিতরের ভূমিখণ্ডে তাঁর নামের মন্দির হবে—হবেই। শ্রীশ্রীভগবান শ্রীরামচন্দ্র সহায় : বিজয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী। জয় শ্রীরাম!

ঋণ : কৃত্তিবাস ওঝা
লেখক পরিচিতি
 অনির্বান বসু
গল্পকার। প্রবন্ধকার।
কলকাতায় থাকেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *