জোহর ইলে’র গল্প: ফিসারম্যান’স স্টিউ

 

ও’ হেনরি পুরস্কার প্রাপ্ত গল্প:

অনুবাদ: বিপ্লব বিশ্বাস

 

নিরাপত্তার কারণে সদর দরজায় হুড়কো লাগিয়ে তালা মেরে দিল নিমি। যে ঘরে সে একবছর যাবৎ শোয় সেই হলঘরে যাওয়ার পথের ও রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে দিল। পুরনো পা-চালিত সিঙ্গার সেলাইকলের ওপর ডাঁই মেরে পড়ে থাকা বুননের কাপড়চোপড়ের দলা পাকানো ছায়া আড়াআড়ি পড়ছে সরু বিছানায়। খোলা পরদা টেনে দিয়ে জানলার খড়খড়ি তুলে দিলেও কোনও হাওয়া চলাচল করে না। জানলা বাঁচানোর পেটা লোহা থেকে গরম ভাঁপ উঠছে। 

পড়শিদের বাড়ির আলোও নিভে যাচ্ছে একে একে ; তাদের জেনারেটারের মৃদু ঘরঘর আওয়াজও কমে আসছে। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে – রাস্তা থেকে গাড়ি চলাচলের ক্যাচক্যাচ শব্দ আসছে না, জোর আওয়াজে সদরদোর বন্ধেরও শব্দ নেই, রাস্তায় কোনও কুকুর চরছে না, বাইরের দোকানগুলো থেকে কারও গলা পাওয়া যাচ্ছে না – সবকিছু এত শান্ত যে মন ভরে যায়। বিছানায় দেহটা এলিয়ে দেওয়ার পর নিমির মনে হল আলতো পায়ে জানলার পরদা তুলে ধরে কেউ রাত- খাবারের শুকিয়ে যাওয়া সুগন্ধ ছড়িয়ে দিল। ঠিক সেই সময়েই বাইরে কারও পায়ের খসখসানি শুনতে পেল সে, রান্নাঘরের কাছে, সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, যেন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।সে তক্ষুনি বুঝতে পারল তার স্বামী বেনজি শেষ অব্দি ফিরে এসেছে। তালা খোলার শব্দ হল এরপর। বেনজি’র কাছে চাবি তখনও ছিল। ঘরে ঢোকার সময় আলো জ্বালল না সে। বেল্টের বকলস খোলার ঠং শব্দ হল, প্যান্টের চেন টানার শব্দ, খোলা পোশাক পড়ার খসখস শব্দ : তুমি যখন সাতষট্টি এবং তার মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ বছর সেই একই লোকের সঙ্গে শুয়েছ তখন এইসব শব্দের মাঝ থেকে উঠে আসা কামনার অভিঘাত বুঝতে পারবে। স্যাপিয়ো মেহগনির তৈরি বাঁকা কাবার্ডটা আর তার গা ঘেঁষে থাকা দেওয়ালে লন্ঠনের মৃদু আলোয় বেনজি’রের ছায়া নড়াচড়া করছে। নিমির মনে হল সে পরদার ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখের পাতা ক্লান্তিভার বইতে পারছে না যেন মাইলের পর মাইল ধোঁয়াটে ছোট্ট নদীতে বৈঠা ঠেলেছে, এখানে আসার জন্য। নিমি সব সময় ভেবেছে,সে আসবে,যেভাবে বেনজি বরাবর করেছে; তার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় বসে থেকেছে নিমি। ছুতোরখানা থেকে সোজা এসেছে, তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে ছোট্ট অ্যালিসকে টুকুন সামাল দেওয়া ; কিংবা হয়তো উদুয়াকের পান-টেবিলে খানিক সময় কাটিয়ে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে জিন জাতীয় স্ন্যাপস কিনে খেত যাতে যুবক ও বুড়োদের শরীরে উত্তেজনা জাগে ও যার মধ্যে তেজ পুনরুদ্ধার করার শক্তিপূর্ণ গাছের ছাল ও শেকড় মেশানো থাকে। এখন হল- পথে রাখা চেয়ারের পেছনে পরনের জামাকাপড় টাঙিয়ে রেখে সে দিবালোকের মতো নগ্নদেহে শোবার ঘরে ঢুকল, তার বাহুতে জ্বলজ্বল করছে পুরনো দাগটা।
 
নিমি এরপর বিছানায় সরে শুয়ে বেনজি’কে জায়গা করে দিল, মিলিত হল তারা – বেনজি তখন ঢিলেঢালা, ছড়ানো, ঠোঁট ফাঁক করে ধনুকাকৃতি – আর তারপরই নিমির ওপর তার দেহটা চাপিয়ে দিল। নিমি তখন এক ঝলক শুকনো কাঠ, ঘাম আর হাতকরাতে লেগে থাকা গ্রিজের গন্ধ পেল। তার কড়াপড়া হাতদুটি নিমির গলাবেড়ে হড়কে গেল , তারপর কাপ ধরার ঢঙে তার মুখটা চেপে ধরল। নিমির চোখের ওপর তার চোখদুটো পড়লে বেনজি’র ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠল। নিমি তার অধর হাঁ- মুখে পুরে নিল, তাকে শান্ত করল। বেনজি এক হাতে তার মুখে হাত বোলাল আর অন্য হাত দিয়ে তার কোমরে বাঁধা ঢিলেঢালা পোশাকটা খুলে অন্ধকারে ছুঁড়ে দিল আর তা বিছানার পাশে নাইটস্ট্যান্ডে রাখা কোনও ভঙ্গুর বস্তুকে ফেলে ঝনঝনিয়ে ভেঙে দিল ; এরপর তলপেটে ও নাভিমূলে মাথা রেখে নিচের নরম চুলের পথে ঢুকে গেল ।
 
বেনজি ততক্ষণ সেভাবে থাকল যতক্ষণ না নিমি তীক্ষ্ণ চিৎকারে পাশ ফিরে নিজেকে উদ্ধার করে যেভাবে একটা কুক্কুরী তার কামার্ত সঙ্গীকে ঝাঁকি মেরে ফেলে দেয়। সে ঘুরে শুয়ে যতক্ষণ না বেনজি চিৎ হয়ে শোয় ততক্ষণ তার কাঁধে চাপ দিল এবং তারপর তার ওপর নেমে আসল। বেনজি’র অণ্ডকোষ নিরাপদে মুখে পুরে নিমি তাকে চাগিয়ে ধরল যতক্ষণ না সে কাকুতিমিনতি করল আর তার কণ্ঠস্বর জানলার বাইরে ভেসে গেল । নিমি নরম হয়ে নিজের দেহটা তুলে নিল যখন একে অপরের চোখে চোখ রেখে একই শ্বাস নিতে থাকল। এরপর বেনজি দ্রুত ঘুরে নিমিকে তার শরীরের নিচে হড়কে দিল। নিমির হাত তখন তার গলায় আটকে, হাঁটুদুটো তুলে সে তার থাই ফানেলের ঢঙে ছড়িয়ে দিল। অসংখ্য উত্তেজক আঘাত নিমির দেহের ভিতর চালিয়ে গর্জাল বেনজি। তারপর অন্ধকার গাঢ় হলে তারা চুপ মেরে শুয়ে পড়ল।
 
সকাল হতেই চলে গেছে সে। ঘুম ভাঙার পর ঘরের হালকা সবুজ দেওয়াল অপরিচিত ঠেকে নিমির। পুরনো সেলাইকলটির দিকে তাকায় সে যেখানে সুতি, লিনেন, মসলিন, ডোরাকাটা সুতির রোল আর গজকয়েক নীল- কালো সুতির কাপড় ডাঁই মারা আছে। নাইলন কাপড়ে মোড়া হাতব্যাগগুলো ওয়াড্রোবের ওপর পড়ে আছে যা এখনও খোলাই হয়নি। এ সবই ফিরে এসেছে তার কাছে। অ্যালিস যখনই এসেছে উপহারসামগ্রী এনেছে যা নিমি ছুঁয়েই দেখেনি প্রায়। ফাঁকা দিন সব। শোবার ঘরে না শুয়ে ইদানীং সেলাই – ঘরের সংকীর্ণ বিছানায় শোয় সে। গত সপ্তাহে যখন অ্যালিস তার স্বামী আসারি আর তাদের দুই ছেলেকে নিয়ে এসেছিল, নিমি তাদের খোঁচা দিয়ে বলেছিল কিছু জামাকাপড় রেখে যেতে যাতে পরে হালকা হাতে আসতে পারে। মেয়ে- জামাই ফের তার কাছে জানতে চেয়েছিল তার জন্য নতুন বাসস্থান খুঁজে দেবে কি না, তারা উইম্পিতে যেখানে থাকে তার কাছাকাছি, কিন্তু নিমি ‘ না ‘ করেছিল, সে এই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র যেতে চায় না। এখন সে বিছানায় উঠে বসে দেওয়ালে হেলান দিল। পড়শি ইবিফুরো উঠোনে গান গাইছে – একটি সুরেলা, অসৎ লোকের বিরুদ্ধে গির্জার প্রতিবাদী সমবেত সঙ্গীত। ইবিফুরো উলটো দিকের ফ্ল্যাটে থাকে, তিন সন্তান আর স্বামী ইনেফা’র সঙ্গে – ইনেফা বনিতে একটা তেল কোম্পানির সেফটি টেকনিসিয়ান। নিমি পরদা ফাঁক করে লম্বা ইবিফুরোকে উঁকি মেরে দেখে। সে একটা গামলার ওপর ঝুঁকে গায়ের জোরে কাপড় কাচছে আর গলা ঘুরিয়ে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে গাইছে : আমি প্রভুর উদ্দেশে গাইব, কেননা ঘোড়া ও তার সওয়ারকে সাগরে ছুঁড়ে দিয়ে তিনি গৌরবের সঙ্গে জয়লাভ করেছেন। ‘ নিমি পরদা টেনে দেয়। বিছানা থেকে নেমে বাইরে পরা প্লাস্টিকের চটি পরে নিল। দরজা টানার সঙ্গে সঙ্গে কবজা থেকে শিসের মতো আওয়াজ উঠল আর তার সামনে দোল খেতে লাগল দিনের আলো। উঠোনজুড়ে আলোয় ভেসে যাচ্ছে। সাধারণত পড়শিরা ওঠার আগেই সে উঠে পড়ে এই কাজের সঙ্গে টুকটাক রোজ-কাজ সারে।
 
আজকাল ভালোই ঘুমুচ্ছ তুমি, ইবিফুরো ডাক পেড়ে বলে।
 
তুমি কাপড়চোপড় কাচছ, সে উষ্ণতার সঙ্গে পালটা বলল বটে, কিন্তু ঠাট্টা – ইয়ার্কির মেজাজে ছিল না সে। তবু্ও জানতে চাইল, তোমার রাত কেমন কাটল?
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ইবিফুরো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
হাতে ধরা স্ট্রাইপ দেওয়া জামাটা আবার গামলার ফেনাজলে চোবাল ইবিফুরো আর একই সমবেত গান গম্ভীরভাবে গুনগুনিয়ে উঠল। ততক্ষণ নিমি অপেক্ষা করতে লাগল।
 
তারপর ইবিফুরো বলল, জানো, দাউতা নামের মহিলাটি, ওই যে, যে নিজেকে ক্যাটারার বলে পরিচয় দিয়েছিল, তাকে চেনো? কী হয়েছে জানো, আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ওর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম, বন্ধুর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য।
নিমি এই দাউতার নাম শুনেছে বলে মনে করতে পারল না, কিন্তু ইবিফুরোর কথার ভাঁজ থেকে বুঝতে পারল যে সেই আলাপের ফল ভালো হয়নি মোটেও।
 
সুতরাং আমার মনের অবস্থাটা একবার ভাবো, ইবিফুরো বলে গেল, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই বন্ধুর মেসেজ দেখে আর অচেনা লোকেদের কাছ থেকে ভয়েস মেসেজ শুনে যা বুঝলাম যে সেই ক্যাটারার মহিলা পুরো অনুষ্ঠানটাই মাটি করে দিয়েছে ; নিমন্ত্রিত অনুপাতে খাবারদাবার কম পড়ে গিয়েছিল।
 
কোনও বিয়েবাড়িতে এমনটা ঘটলে আমার কাছে তা অত্যন্ত ঘৃণ্য ব্যাপার মনে হয় , নিমি মন্তব্য করল।
আমি তাই দাউতাকে ডাকলাম, কী হয়েছিল জানার জন্য, আর তুমি বিশ্বাস করবে না, মহিলা বলল যে দোষ তার নয়, তারা তাকে একশো লোকের খাবারের বরাত দিয়েছিল আর আশা করেছিল সেই খাবার দিয়ে অনুষ্ঠানে আসা প্রায় তিনশো লোককে খাওয়ানো যাবে।
 
তোমার প্রশ্নের উত্তরে সে কি এমন খারাপভাবেই বলেছিল?, বিরক্ত নিমি জানতে চাইল।
 
ইবিফুরো মুরগির ডাকের মতো কঁকিয়ে উঠল যেন সে মহিলার কর্কশ আচরণে তখনও ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। তাকে সমর্থন করার মতো মানুষ সে নয় এবং তার সততা ও যশ কলঙ্কিত হোক তা বসে বসে দেখারও মানুষ নয় সে।
ঝামেলা পাকানোর দরকার নেই, নিমি সতর্ক করল।
 
অপ্রাসঙ্গিক ভেবে তুড়ি মেরে বিষয়টা উড়িয়ে দিল ইবিফুরো আর বলল, খানিক পরেই ওষুধের দোকানে যাব, পথে ওর বাড়ি ঢুকব যাতে এ বিষয়ে ওর কথা শুনতে পারি ; তারপর বুঝতে পারব কী করতে হবে। এ নিয়ে ঝামেলা পাকানোর সময় নেই আমার।
 
কল্পনায় সেই বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান দেখতে চাইল নিমি – বাইরের মাঠে রংচঙে প্যান্ডাল বা বিশাল তাঁবু খাটানো, নাইজেরিয়ো বিশেষ নাচ- গানের হাই-লাইফ গসপেল ব্যান্ডের পুরোদম হইচই, আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের শ্রেষ্ঠ পোশাকে সেজে এসেছে যখন কনে ও বর তাদের জন্য বরাদ্দ বিশেষ আসনে বসে মৃদু হাসছে, সরু লম্বা হাতলহীন শ্যাম্পেনের ফ্লট এক হাত থেকে অন্য হাতে বয়ে চলেছে, এরমধ্যে কেউই খাবারের কমতির ব্যাপার জানে না আর তার ফলেই অতিথিরা শান্তভাবে চলে যাচ্ছে, পার্কিং লট থেকে তাদের গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে, ট্যাক্সি যাত্রীদের হাতনাড়ায় তাড়াতাড়ি থেমে যাচ্ছে আর ছোটো ছোটো দল কাছাকাছি বাসস্টপের দিকে হেঁটে চলেছে। খুবই অস্বস্তিকর, নিমি ভাবে। এমন কি শ্রাদ্ধবাড়িতেও পানাহার দিনরাত জুড়ে চলে।
 
বেনজি গতরাত্রে ফিরে এসেছিল, আমার কাছে, নিমি বলল।
 
ইবিফুরো মাথা নিচু করে গামলায় মন দিয়েছে। মাথা তুলছে না বা কোনও চিন্তাশীল প্রশ্নও করছে না। পরিবর্তে জলে চোবানো একটা জামা তুলে চিপে নিল আর পরিষ্কার জলে ভরা অন্য একটা গামলায় রাখল।
অস্থিরমতি নিমি বুঝে নিতে চাইছে কথাটি ফের বলা ঠিক হবে কি না।
—————-
বেনজি’র দুঃসংবাদ যখন এল, ইবিফুরো তখন সেখানে ছিল। দুজন মহিলা উঠোনে বসে ইগুসির খোসা ছাড়াচ্ছিল যখন দুই যুবক চিমা আর চিডি যারা বেনজি’র দোকানের গায়েই লোহালক্কড়ের দোকান চালায়, এসে বলল, ইকউইরের রাস্তার সংযোগস্থলে বেনজিকে মোটরবাইক ধাক্কা মেরেছে এবং সে হাসপাতালে। এরা লক্ষণীয়রকম বেঁটে, শক্তপোক্ত আর ভালোমানুষ গোছের। নিমি আর বেনজি প্রায়ই ওদের কথা বলত, পেটালোহার ব্যবসায় কীভাবে তারা নাম কিনেছিল, কীভাবে একে অপরের দক্ষতার প্রশংসা করে ব্যাবসা বাড়িয়েছে, খদ্দেরদের সঙ্গে কখনোই ঝগড়া করেনি, দৃঢ়তা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনোই তাদের উষ্ণ আচরণকে ছেড়ে যায়নি। তারা তিনজন একটা ট্যাক্সি ধরে দ্রুত ব্রেথওয়েট মেমোরিয়াল হাসপাতালে গেল। হাসপাতালে ঢোকার মূল রাস্তা এড়িয়ে তারা কেন পেছনের বাংলোর দিকে গেল, তা ছেলেদুটো খুলে বলেনি নিমিকে। সেই পথ জুড়ে সার দেওয়া রক্তরাঙা রঙ্গন ফুলের ঝোপ। ফরমালডিহাইডের গন্ধে তার নাক কুঁচকে যাচ্ছিল। পুরো বাড়িটা নজরে আসতেই ছেলেদুটো হাঁটা থামিয়ে দিল, চিডি নিমির কাঁধে হাত রাখল।
কী হচ্ছে?, নিমি জানতে চাইল। উত্তর পেল না।
 
ফুলগাছের ঝোপগুলো তার চোখ থেকে দ্রুত সরে সরে যাচ্ছে, নিচের মাটি পথ করে দিচ্ছে তাকে, সে চিডির বুকে জোরে আঘাত করল, জামার কলার চেপে ধরল। চিডির চোখদুটো রক্তলাল। ম্যাডাম, ম্যাডাম… সে বলেই যেতে লাগল। চিমা নিমিকে সংযত করে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু সে তাদের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে বেনজিকে দেখতে গেল যেখানে সে নিমির সুতিকাপড় দিয়ে বানানো নীল গোলাকার আর মরা সবজে পাতার নকশাদার জামাটি গায়ে শুয়ে আছে, স্ট্রেচারে, প্রাণহীন।
 
যখন সে দেখল ইবিফুরো তার কাচা জামাকাপড় দড়িতে ক্লিপ মেরে আটকাচ্ছে, সে আবার যেন তার জিভে বেনজি’র টকে যাওয়া নিঃশ্বাসের স্বাদ পেল। সে যেন তখনও তার কোমর চেপে জড়িয়ে ধরা অনুভব করছে যেখান থেকে বেনজি তাকে হাঁটুর ওপর তুলে নিয়েছিল, গতরাত্রে, আলতোভাবে,আর সে তার প্রিয় মানুষটির কথা স্মরণ করল যে যখন আমরা ফিরে আসব, যৌবনের তেজ নিয়ে আবার এমনভাবেই মিলিত হব।
বেনজি গতরাত্রে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, নিমি আবার বলল।
ইবিফুরো নিমির দিকে ঘুরে দাঁড়াল – মহিলা মোটাসোটা, রাতের পোশাকের নিচে স্তনদুটো দোল খাচ্ছে। একটা শাদা প্লাস্টিক ক্লিপ হাত থেকে ছিটকে পড়লেও সে নিমির ওপর থেকে চোখ সরালো না।
এই মেয়ে , শোনো, ইবিফুরো কাকুতিমিনতি করল।
 
নিমি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সে জানত এরপর কী হবে। ইবিফুরো অ্যালিসকে ডাকবে বা মোবাইলে মেসেজ পাঠাবে আর সে দূর দেশ থেকে চলে আসবে। প্যাস্টর ওসাগি পরদিন এমনি এমনিই আসবে, নিমির সঙ্গে সময় কাটাতে। গির্জার মেয়েদের দল এক বিকেলে এসে তার কিছু খসাবে, সব পরিষ্কার করবে, ঝাঁটঝুট দেবে, তার জন্য খাবার বানাবে যা ফেলা যাবে আর তখন ভৎর্সনার বন্যা বইয়ে দেবে। সপ্তাহান্তে যুবকের দল জড়ো হবে, তার বসার ঘরে তারস্বরে গাইবে আর তার হয়ে আশিস চাইতে প্রভুর কাছে প্রার্থনা জানাবে।এসবই সে কৃতার্থমনে গ্রহণ করবে, কিন্তু তারা যা যা করবে সবই অপ্রাসঙ্গিক।
আমি তাকে স্বপ্নেই একমাত্র দেখেছি, নিমি আস্তে বলল। এটি আমাকে স্বস্তি দিয়েছে।
———————–
একটা তোয়ালে বের করে নিমি তাকওয়ালা ছোট্ট ফরমাইকা টেবিলটা আর ওবিজকাঠের দেরাজওয়ালা আলমারিটা ঝাড়াঝুড়ি করল। গায়ের চাদরটাদর ভাঁজ করল আর পরনের গাউন ওয়াড্রোবের মধ্যে পছন্দমতো সাজিয়ে রাখল। তারপর গোটা বাড়ির মেঝে ঝাঁট দিল। সন্ধ্যায় গির্জায় একটা মিটিং আছে, সে বলে পাঠাল, তার আকস্মিক দুর্ঘটনার কারণে যেতে পারবে না। বেনজি’র ফিরে আসার খবর দেওয়ার পর ইবিফুরোর চোখমুখের প্রতিক্রিয়া মনে পড়ল নিমির। সেদিন অবিন্যস্ত বিছানায় ঘুমঘুম চোখে জেগে ওঠা বিস্ময়াবহ সকালের কথা ভাবতে লাগল সে। তার শিরদাঁড়া বেয়ে বিদ্যুৎ নামল যেন। তার মনের কোনও ফাটলে যদি বেনজি ফিরে আসার জায়গা পায়, সে ভাবল, তাহলে ইচ্ছে করেই সেই ফাটল সে খুলে রাখবে, অনেকটা ফাঁক করে। তার পরিকল্পনা হল, সন্ধ্যায় বাজারে যাবে, ফিরে এসে স্টিউ বানাবে। সে জানত, যদি কাউকে ভালোবাসা যায় ও পরিবর্তে তারাও ভালোবাসে, তুমি তাদের জন্য এমন কিছু রাঁধবে যা তাদের তোমার কাছে টেনে আনে, তারা ইহজগতে না থাকলেও।
 
বিকেল পাঁচটার কিছু আগে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল। এলিয়োজুর আকাশ তখন কমলা রঙে জীবন্ত। পাহাড়ের উতরাই বরাবর বাড়িগুলোর তেরছা মরচেধরা ছাদে সেই আলো পড়ে সোনার মতো ঠিকরোচ্ছে। হাতে বাজারের থলে নিয়ে সে আস্তে করে গেট বন্ধ করল। অ্যালাগবোর আকাশ -নীল নিসান সানি গাড়িটা তার বাড়ির ঢোকার মুখে রাখা, চকমক করছে, তার পুরো তিনমাসের বকেয়া মাইনের টাকা দেওয়ার পর মেকানিকের কাছ থেকে শেষ অব্দি গাড়িটা এসেছে। অ্যালাগবোর অভিযোগ, গাড়িটির শোচনীয় অবস্থা, নতুন এঞ্জিনের খরচ আর মোটর মেকানিকের দক্ষতা নিয়ে। নিমি মনে মনে ঠিক করল পরে তার সঙ্গে দেখা করে স্যালুট জানাবে, তার পরিবারকে অভ্যর্থনা জানাবে এবং সবকিছু সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ায় প্রভু জিশুকেও ধন্যবাদ জানাবে। চিতুরু তার ডিভিডি’র দোকানে একটা উঁচু টুলে বসে দুজনের দাবা খেলা দেখছে, গুটিগুলো কাঠের পাটাতনের ওপর হড়কে পড়ে আওয়াজ করছে।
 
বড় রাস্তায় নেমে নিমি বাজারপানে ঘুরল। এটা সেই সময় যখন সন্ধ্যা নামার আগে মানুষজন কাজ থেকে ঘরে ফিরছে, অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে, বাজারে ভিড় করা লোকজন কমে আসছে, রাস্তা জনশূন্য হয়ে পড়ছে। তার চোখে পড়ল এক আইসক্রিমওয়ালা সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফিরছে ; সেদিনের মতো তার বিক্রিবাটা শেষ, বেল বাজিয়ে ছেলেমেয়েদের ডেকে ডেকে আইসক্রিমের কাছে আনা নেই। নিজের পা ফেলার শব্দ, উজ্জ্বল সবজে- হলুদ স্কার্ফ মাথায় সামনে হেঁটে যাওয়া মহিলা, বাজারপথে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসা গুঞ্জন, গাড়ির হর্নের আওয়াজ, ভিড়পথে তাড়াহুড়ো করে তাদের ছুটে চলা – সবই তাকে সচকিত করে তুলল।
 
ভিড়- রাস্তা সামলে-সুমলে, ডোবাটোবা এড়িয়ে,ঠেলাগাড়িতে ভরে পেঁয়াজের বস্তা নিয়ে ‘রোখকে, রোখকে’ বলে সাবধান করতে করতে চলা লোকটাকে সযত্নে এড়িয়ে নিমি এগোতে লাগল।বাজারের শেষ প্রান্তের দোকানগুলোতেই যাবে সে।
 
বোনা ঝুড়িতে রাখা একগাদা কাঁকড়া খলবলিয়ে উঠছে, খোলা ঝুড়িতে রাখা বিশাল শামুকগুলো পা দিয়ে পিছলে পিছলে চলছে আর সারিসারি টেবিলে তেলাপিয়া, বাদামি স্ন্যাপার, ছোটো ছোটো কার্টন বেয়ে মুচড়ে উঠে আসা বরফজমা ম্যাকারেল, ছোট্ট ছোট্ট সিলভারসাইড, বংগা, নদীর টাটকা উভচর চোখফোলা মাডস্কিপার টেবিলে পড়ে আছড়াচ্ছে আর খাবি খাচ্ছে। এরপর নিমি এক দোকানের সামনে দাঁড়াল যেখানে গামলাভর্তি ডাঁইমারা ক্যাপসিকাম – দাগদুগ নেই, পাতলা-,পুতলা, সবজে – তার পছন্দ হল খুব।
 
একটার দামে দু গামলা পাবেন, ছাউনির নিচ থেকে যুবতী বিক্রেতা বলল। মাথা নেড়ে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিল বিক্রেতা।
ধন্যবাদ মেয়ে, নিমি বলল। রাতের বাজারের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ভালো।
 
যৌবনকালে অ্যালিসের জন্মের আগে নিমি আর বেনজি শহর থেকে অনেকটা দূরে ইস্ট -ওয়েস্ট রোডে একটা ছোট্ট বাড়িতে থাকত। সামনের বারান্দাতে বেনজি’র কারখানা ছিল। নতুন আসা যুবক ছুতোরের কাছে কাজের বরাত দিতে লোকজন অনিচ্ছা প্রকাশ করত এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে সেই সব কাজের বরাত পেতে বেনজি প্রায়ই তার কাজের অভিজ্ঞতাকে রং চড়িয়ে বলত, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাড়িয়ে দিত অভিজ্ঞতার বছর : মা সকল, আমি এটা বানাতে পারি ; মশাই, আমি আগেও এমন আর্মচেয়ার বানিয়েছি- এভাবে নিজেকে তুলে ধরত। আর কাজশেষে মালপত্র ডেলিভারি দেওয়ার পর কেউ কোনও অভিযোগ জানাত না। তবু্ও তার ব্যাবসা ছিল ছোটো আকারের যাতে অবশ্য তাদের না খেয়ে থাকতে হত না। এরপর গ্রামে ফিরে এসে সে সেই ধরনের ক্রেতা পেতে লাগল যারা স্কুল ইউনিফর্ম পরা সন্তানকে নিজস্ব গাড়িতে করে তার কারখানার সামনে এসে দাঁড়াত।
 
এতদিন ধরে নিমি যে সমস্ত তাকিয়া, টেবলক্লথ বানিয়েছে তার প্রথম সেট বিক্রি করল। সে বানিয়েছে মাথার, হাতের ঠেকনো বালিশ, টেবলক্লথ সঙ্গে মানানসই ম্যাট। সে বসে সেলাই করছে আর প্রাইমারি স্কুলে শেখা সূচিকাজের কৌশল স্মরণ করছে ; কেমনভাবে নকশার যত্রতত্র বাড়তি কাজ যোগ করত আর কানে আসত বেনজি’র হাতুড়িপেটা, করাত দিয়ে কাঠচেরাইয়ের শব্দ যা পেছনের দিকে চলত, সন্ধ্যা না হওয়া অব্দি যখন সব গোছগাছ করে তারা বাসায় ফিরত। রাত্রে সেদ্ধ মিঠে আলু পাম তেলে ভেজে টুকরো টুকরো করে নুন ছিটিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেয়ে পবিত্র তৃপ্তি নিয়ে অনেকক্ষণ জেগে থেকে তারা কী সব নিয়ে কথা বলত, আজ আর মনে করতে পারে না নিমি। অনেকক্ষণ জেগে থাকার পর ঘুমনোর আগে হালকা জলখাবারের নেশা উঠলে নিমেষে ঝলসে নেওয়া টাটকা ভুট্টা, উবে ফলের সঙ্গে মাখন মিশিয়ে নরম করে খেত বেনজি। বাজারে গাদাগাদা তাজা টমেটো দেখে নিমির মনে পড়ল, এমনই এক রাত্রে বিছানায় শুয়ে থাকার সময় বেনজি তার হাঁটুফাঁকে হাঁটু দিয়ে চাপ দিয়েছিল, নিমির বাঁকা পায়ের তলে তার পায়ের পাতার উপরিভাগ পিছলে দিয়ে বলেছিল, শুধু তুমি আর আমি।
নিমি গড়ান মেরে তার সামলা করেছিল।
আমি যখন ফিরে আসব, সে বলেছিল, আমাদের পরের জন্মে, তোমাকে খুঁজে নেব।
 
নিমিকে অবাক করে এই কথাগুলি চেঁচিয়ে বলেছিল সে। নিমি বুঝেছিল সে এমন মানুষ যে কথা যা দিয়েছিল, করেছিল তার থেকে অনেক বেশি।
 
নিমিও বলেছিল, আমিও তোমায় খুঁজে যাব। এভাবেই আমাদের অর্ধেক সময় কেটে যাবে।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই নিমি দেখল পড়শিদের বাড়ির আলো একে একে জ্বলতে শুরু করেছে। গুঁড়িবৃষ্টি আগেই শুরু হয়েছিল, এবার জোর ঝড় উঠল।বাড়ির ভিতর ঢুকে সে বাজারের থলেনামাল, একটা তোয়ালে খুঁজে নিয়ে মুখহাত মুছল।
 
বাড়িওয়ালার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে সে আসল কাঠটাঠ দিয়ে আগুন জ্বালল, ধোঁয়া বেরুনোর জন্য জানলাগুলো খুলে দিল। দুটো পাত্র এক সঙ্গে চাপিয়ে দিলে তাড়াতাড়ি রান্না হত কিন্তু তার কোনও তাড়া নেই। একটা ট্রে নিয়ে সে স্মোকড ক্যাটফিস, তাজা চিংড়ি, ছোট্ট পেরিউইংকিল শামুক, জলশামুক, সামুদ্রিক ক্লাম সব রাখল। তারপর একটা বড় পেঁঁয়াজ কুচিকুচি করে কাটল, তা গরম তেলে ছাড়ল। সেখানে এমন ছ্যাঁক করে উঠল যে মনে হল জোর প্রশংসা করছে। আঁচ কমানোর জন্য উনুন থেকে একটা চ্যালা বের করে নিল সে। ট্রেতে রাখা জিনিসগুলো একটা বড় জায়গায় রেখে পাশে সরিয়ে রাখল। পেঁয়াজ তখনও সোঁ সোঁ শব্দে ভাজা হচ্ছে। এরপর সে বাজার থেকে কিনে মিশিয়ে আনা তাজা লঙ্কা আর টমেটো রাখল। কিছুক্ষণ তা ভাজল। ঘরময় সুগন্ধ ছড়াল আর নাকে ঢুকে তাকে পুলকিত করল। গতরাত্রে তারা যখন শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় তখন বেনজি তার চুলের গহিনে নাক ডুবিয়ে জোর টানছিল। উটাজির সুগন্ধে সে সব সময়ই মোহিত হত। তাক থেকে একটা প্লাস্টিকের পাত্র নামাল নিমি যেখানে গুঁঁড়োমশলা রাখে – শুকনো পুদিনা, উকাজি, উডা, গোলমরিচ জাতীয় উটাজি, উজিজা ইত্যাদি। এরপর কিছু শুকনো উটাজি পাতা গুঁঁড়ো করে স্টিউয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিল। আগুন হিসহিসিয়ে ফেটে পড়ল, স্টিউ ফুটতে লাগল। মাথার স্কার্ফ খুলে সে পাশে ছুঁড়ে দিল। আজ রাত্রে সেদ্ধ মিঠে আলু ফালিফালি করে কেটে স্টিউ দিয়ে খাওয়া শেষ করার পরেও তাদের হাতে অনেকটা সময় থাকবে, বকবক করার।
—————
মূলগল্প: ‘Fisherman’s Stew’ by Jowhor Ile ( Nigeria)
 
শিরোনাম বিষয়ে অনুবাদকের ভাষ্য: ফিশারম্যান’স স্টিউ গল্প সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের একটি বিশেষ চটজলদি রান্নাকৃত খাবার। খাবারটি অন্যত্রও চলে। যেহেতু এটি বহু এলাকার পরিচিত খাদ্য তাই মূলগল্পের ইংরেজি নামটিই রাখা হলো।
 
লেখক পরিচিতি:

অনুবাদক পরিচিতি:

বিপ্লব বিশ্বাস
গল্পকার।অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
কলকাতায় থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *