এমদাদ রহমান : গল্পের কাছে কী চাই

পড়তে পড়তে কথকের সঙ্গে কথা বলাই আমার গল্পপাঠ

গল্পে আমি নিজেকে খুঁজি, নিজেকেই চাই; এ চাওয়ার ক্ষেত্রে আমি কঠোর, কট্টর এবং এ চাওয়া বহুমুখী। বহুভাবেই আমি গল্পে নিজেকে খুঁজে চলি, খুঁজে পেয়ে গেলে পাঠ বন্ধ রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে- সেই নাম ফলকটির কথা ভাবি, যেখানে বহুবছর ধরে খোদাই করে লেখা- ‘বুলভার ম্যাক্সিম গোর্কি’; তার পাশে শীতকালের পড়তে থাকা হলদেপাতা, যা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে যে কেউ চিৎকার করে বলে উঠবে- ‘ঐতিহ্যের হলদে পাতায় চিরহরিৎ তান’; আর ভাবতে থাকি এই মুহূর্তে পড়তে থাকা ‘তুষার’ উপন্যাসটির প্রথম লাইনের আশ্চর্য গোলকধাঁধা- তুষারের নৈঃশব্দ্য; আর এক দশক থেকে বুকের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা এক দেশ জেগে ওঠে মায়ের ঘুমভাঙা মুখের মতো! গল্পে নিজেকে খুঁজে পেলেই আমার মনে পড়ে যাবে মার্তিনিকের কবি এমে সেজায়ারের ‘দেশে ফেরার খাতা’র কথা, বহু যত্নে বইটির ভাষান্তর করেছিলেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়; মনে পড়ে যাবে- প্যারিসের লা শ্যাপেলের সেই সব উন্মুল শরনার্থীর করুণ মুখগুলো যারা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দশ কি বিশ সেন্তিমের আশায়, মুঠোয় জমে জমে সন্ধ্যায় হয়তো এক ক্যান বিয়ার কেনার দেড়, দুই ইউরো হয়ে যাবে! 
কেন লেখা!? এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন লেখক; আর, এই আমি নিজেকে যখন পাঠক বলছি, সে আমি কেন পড়ছি? পড়ছি কেন? এই যে এতো ভাঙচুর, এতো উন্মাদনা, এতো গ্লানি আনন্দ বেদনার যাপন, তাতে তো দেখছিই অনবরত! তবু, কেন আবার শব্দের ওপর এতো গভীর পর্যবেক্ষণ? আমি পড়ছি কেন? আমার তো কান ভ’রে শোনার কথা ছিল গল্পটি; কিন্তু তাতে তো মন ভরে না, বয়স বেড়েছে বলে। এখন পড়তে হয়। মারিও বারগাস ইয়োসা যে বলেছিলেন- ‘আমি লিখি কেননা আমি অসুখি’, তাহলে- আমি যে পড়ি, সে কি আমার উদ্ধার? সে কি নিরাময়? নিরাময় খুঁজি? অসুখি বলেই কি আমরা পাঠক? 
হ্যাঁ, আমি চাই- গল্পের প্রতিটি কথায় দৃশ্যের জন্ম হোক। ‘এখন নির্দয় শীতকাল। ঠাণ্ডা নামছে হিম’- এই কথাদু’টি দিয়ে যে-গল্পটি শুরু হয়, সে-গল্পে আরও কিছু দৃশ্য- কলাপাতা একবার বুক দেখায়, একবার দেখায় পিঠ- অল্প বাতাসে, ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল ঝক ঝক করে। এ গল্প পড়ার আগেই আমাদের প্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ- হাসান আজিজুল হক গল্পের নাম রাখেন ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’, যে-গাছের বীজে আছে বিষ আর গল্পের কেন্দ্রে আছে দেশভাগ! রবিশংকর বলও এক আশ্চর্য গল্প লেখেন- ‘ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ’। এই গল্পের নামটি এমন- মনে থেকে যায়; দিনের পর দিন নামটি রক্তের ভেতর হাটাহাটি করে। কী যেন গল্পটিকে ভুলে যেতে দেয় না। এই যে ভুলতে চাই না- এমন সংবেদনার একটি ধারাল অনুভূতিই কি আমি গল্পের কাছে চাই? 
গল্পে চাই- সমকাল বাজুক, যেমন- রুমা মোদকের গল্প ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’, এবং সাদিক হোসেনের টম্যাটো সস্‌; আবার, এমন গল্পও পড়তে চাই, যে-গল্পে জাদুশক্তির ব্যবহার আছে, যাকে বলে ‘জাদুবাস্তবতা’। কুলদা রায়ের ‘মার্কেজের পুতুল’ গল্পটির কথাই জোর দিয়ে বলবো; বলবো তাঁর ‘দ্য জায়ান্ট গ্রেপ’ নামের আত্মা খামচেধরা এমন এক গল্পের কথা, যে-গল্পে আছে হিস্পানি বুড়ো বেনি আর বুড়ি এলা বার্টন; আর আছে আত্মার ভেতরে বিশ্বযুদ্ধের বিশাল ক্ষতের মর্মান্তিক বিবরণ! লেখকের কাজ এখানে পাঠককে দর্শকে পরিণত করা, যেন পাঠক পড়ছে না- দেখছে! সমস্ত ‘জায়ান্ট গ্রেপ’ আনন্দ বেদনার এরক মহাকাব্য- লেখক যেভাবে গল্পটিকে লেখেন, অর্থাৎ বলেন, তাঁর বলার ভঙ্গিতে চমকিত হই। গল্প পড়ে চমকে যাওয়াই পাঠকের কাজ! ঝুম্পা লাহিড়ীর একটা কথা আমার কাছে বেশ কাজের মনে হয়- ‘সেই গল্পগুলোই আমি পড়তে আগ্রহ বোধ করি যে গল্পগুলো আমাকে প্রথম বাক্যটি থেকে পরের বাক্যটিকে পড়তে টেনে নিয়ে যাবে। এ ছাড়া আমার কাছে আর কোনো মাপকাঠি নেই।’ গল্পে আখ্যান থাকুক না থাকুক, কিংবা ভাষাই আখ্যান হয়ে উঠুক- একদম প্রথম লাইনই আমাকে টেনে নিয়ে যাবে শেষ অব্দি, আমি কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হবো না! গল্প তার পাঠককে সব সময় সচল রাখবে, অচল কিংবা নিষ্ক্রিয় হতে দেবে না। 
গল্প, আরও বড় পরিসরে- যদি সাহিত্যের কথাই বলি, তাহলে বলতে হবে, নস্টালজিক হতে চাই বলেই সাহিত্য পড়ি; মনে করি- তাতেই আমার আত্মার মুক্তি, তা-ই আমার স্মৃতি; আমার পুনর্জন্ম এবং পূর্বজন্ম। উইনচেস্টার স্ট্রিটে একবার এক অলৌকিক শাদা রাত নেমে এসেছিল! তুষার ঝরছিল বড় নীরবে! আজ যখন ওরহান পামুকের উপন্যাসে ‘তুষারের নৈঃশব্দ্য’ কথাটি পড়ি, সঙ্গে সঙ্গে পূর্বস্মৃতি জেগে ওঠে; সেখানে দেখি, সেই অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে ভরা রাতটি রুশ লেখক দস্তয়েভ্‌স্কির কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছিল; মনে পড়ে- উত্তেজনায় সে মধ্যরাতে ছুটে গিয়েছিলাম হ্যাম্পশায়ারের পুরোনো টাউনহল চুত্বরে- যেখানে, তুষারে-ঢাকা-পড়ে-যাওয়া-গোলাকার স্তম্ভগুলোকে মনে হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক ডিম, মার্কেসের সেই মাকোন্দো গ্রামের মতো, আর মনে পড়েছিল, উপন্যাসের একদম শুরুর লাইনটির কথা, যেখানে কর্নেল বুয়েন্দিয়া নস্টালজিক হয়ে পড়ছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বাবার কথা মনে করছেন, ফিরে চলেছেন সেই দিনটিতে, বাবা যেদিন তাঁকে বরফ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন! তুষারের নৈঃশব্দ্য, মার্কেস, বুয়েন্দিয়া, প্রথম বরফ দেখার অভিজ্ঞতা, শাদা রাত, উইনচেস্টার স্ট্রিট, পুরোনো টাউনহল চত্বরের প্রগাঢ় নৈঃশব্দ্য আর অতিকায় ডিম- সব মিলিয়ে সে রাতে আমি স্তব্ধ দাঁড়িয়ে ছিলাম- বহুক্ষণ; মাথার উলের টুপিতে তুষার জমছিল, যেন তুষার নয়, যাপিত জীবনের নস্টালজিয়া! সাহিত্য এভাবেই বাঁচিয়ে দেয়, তৃষিত করে; আরও আরও পা ফেলতে শেখায়, কল্পনার সীমারেখা ভেঙে আবারও গড়ে দেয়! 
আশ্চর্য শক্তি ফিকশনের! 
কিন্তু, কেন তবু, ফিকশনের ঘোরলাগা জগতে পাঠক ঢুকে পড়তে চায়?
কারণ, লিখিত গল্পে পাঠকের অবচেতনে থাকা বহুকিছু জেগে ওঠে। একটা গল্পের কথা বলি, গল্পটি রবিশংকর বল লিখিত- ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ। গল্পটি শুরু হচ্ছে এমন একটি বাক্য দিয়ে- ‘জানালাটা অনেক পুরোনো’। লেখক তারপর করছেন কী, শব্দ নিয়ে কিছু কথা বলছেন, তখনও আমরা কিছু বুঝে উঠতে পারছি না যে কী কারণে শব্দ কিংবা ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা তিনি বলছেন; যাক, এভাবে প্রথম প্যারার শেষে, গল্পের দ্বিতীয় প্যারার প্রথম বাক্যে লিখছেন- যতদুর জানি, ‘একটা দেশ দু’ভাগ হওয়ার অনেক আগেই জানালাটা তৈরি হয়েছিল।’ 
মানে, দেশভাগ! মানে দেশভাগের ক্ষত! মানে দেশভাগের বেদনা, যা আমরা অবচেতনে দশকের পর দশক বুকে অনুভব করি, লেখক আমাদের সেই বেদনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন! 
সেই বেদনা হাসান আজিজুল হকও মনে করিয়ে দেন তার আত্মজা ও একটি করবী গাছের গল্পটিতে, মনে আছে সেই বুড়োকে? সে করবী গাছ লাগিয়েছিল, ফুলের জন্য নয়, বিষের জন্য! 
এই বুড়ো কি দেশভাগের শিকার উন্মুল মানুষ নয়? আমরা সবাই মিলেই কি এমন করবীর বীজ রোপন করিনি? কেবল বিষের জন্য? একটি গল্প লেখক শুধু একাই লেখেন না, এই লেখায় গোপনে যুক্ত থাকেন অনেক লেখক, শিল্প শিল্পের জন্ম দেয়, এক লেখক এক লেখায় বহু লেখক হয়ে ওঠেন! 
গল্পে নিজেকেই খুঁজি- বেদনা জাগাতে ভালোবাসি বলেই, নিজেকে খুঁজে পাবো বলেই! আর, মনে মনে লেখকের সঙ্গে কথা বলবো বলে। 
সাগুফতা শারমীর তানিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘লিখবার আনন্দ নির্মিতির আনন্দ, পাঠের আনন্দ সমবেত সঙ্গীতের’; – কী অসামান্য আর মূল্যবান এ অনুভূতি! হ্যাঁ- কোরাস! কনসার্ট! সমবেত সঙ্গীত! 
সমবেত সঙ্গীতের আনন্দটুকু পাবো বলেই আমার এইসব দিনরাত্রির গল্পপাঠ!
প্যারিস, ৩ জানুয়ারি, ২০২১ 

One thought on “এমদাদ রহমান : গল্পের কাছে কী চাই

  • January 14, 2021 at 3:24 am
    Permalink

    পড়ছিলাম। হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *