সোহরাব হোসেন ‘এর গল্প ; দোজখের ফেরেস্তা

মেটের হাটের বুক চিরে সোজা পুবমুখী চলে গেছে টাকিরোড, বারাসাত থেকে বসিরহাটের দিকে। লম্বালম্বি মেটের হাটটাকে দু’ভাগ করেই রাস্তাটা চলে গেছে। ফলে গঞ্জ-মাটিয়ার দোকান-পসারগুলো এই টাকিরোডকে সামনে রেখে উত্তর ও দক্ষিণমুখী অবস্থানে দ্বিধাবিভক্ত থেকে গেছে অনন্তকাল।
বাজারে ঢোকার মুখেই রাস্তার দখিনদিকে মুরগিপটির গলি। রাস্তাটাকে আড়াআড়ি অতিক্রম করে যেই না আমার নিত্যকার সান্ধ্য-আড্ডা মুরগিপটির গলির মোশারাফের দর্জি-দোকানের দিকে পা রেখেছি, অমনি একটি অমোঘ ও কাতর আহ্বান আমার পথ রোধ করে দেয়—‘মাস্টার এট্‌টা কতা ছেলো’। আমি পিছন না-ফিরেই বুঝতে পারি পাগলা-প্যাংলা সাহেবালি আমার পিছন নিয়েছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি গলির পথেই। গরহাটবার, তাই ভিড় নেই আজ। দাঁড়িয়ে পড়ি। অমোঘ নিয়তির মতো এক আকুল আর্তির জন্য অপেক্ষা করি। ভাবি। ভাবতে চেষ্টা করি রোগা-রক্তহীন-ফ্যাকাশে মুখের সাহেবালিকে। ভাবি আর ঈশ্বরকে এক-চোখো বলে গালাগালি দিই। ভাবতে চেষ্টা করি সহায়সম্বলহীন নিষ্পাপ মনের এই মানুষটির জন্মগত কোন পাপ একে নিদারুণ দুস্থ করে তিলে তিলে শেষ করে চলে যাচ্ছে। ভাবি। মেটের হাটের পরিত্যক্ত প্রয়োজনীয়তার প্রত্যন্ত নোংরাগুলো আমার মাথার ঘিলুতে এলাটিং-বেলাটিং খেলা করে। 
আমি মোহময় হয়ে পড়ি। সাহেবালির মুখের দিকে ফিরে নতুন করে কোনো ভিন্ন অর্থ পড়ার চেষ্টা করি। তার চোখের স্বপ্নকে নিমন্ত্রণ করে আমার চোখ। সয় না—সয় না।
অমনি আমাকে কিছুটা সময় চুপ করে থাকতে দেখে সে বলে : 
—এট্‌টা কতা ছেলে মাস্টার! 
–তা বলো ও সাহেবালি ভাই। শরীর-গতিক ভালো যাচ্ছে তো?—আমি উত্তর দিই। 
—তা যাচ্ছে। কিন্তুক এট্‌টা কতা ছেলে বলবার। 
–কিছু বলবে তুমি? 
–দেড়ডা টাকা হয় মাস্টার, 
–কেন, কাজ-কাম বইছে না তোমার? 
—তা বচ্ছে। কিন্তুক আমার উপায় কী? রোগা শরিল। ফি-রোজ আর খাটতি পারিনেকো। লোকে জোন নেয় না। 
—তা কত দিলে কাজ মিটবে তোমার? 
–আটাডা কোনোরকমে কিনিছি। এখন গুড়টুড় যা-হোক কিনতি হয়। 
– -তা আমাকে কত দিতে হবে। কত দিলে কাজ মেটে তোমার? 
–দেড়ডা টাকা দাও তেবে। 
কথা শেষ করেই হাত বাড়ায় সাহেবালি। নিষ্পাপ হাত। কোনো দিকেই তার এখন ভ্রূক্ষেপ নেই। অন্য হাতখানিতে ধরা আছে আটার প্যাকেট। চোখে তার প্রার্থনার প্রত্যাশার আকুলি-বিকুলি করে। রাস্তা দিয়ে সাঁই-সাঁই শব্দ তুলে সরকারি বাস চলে যায় কলকাতার দিকে। পাশ দিয়ে মন্দাক্রান্তা ছন্দে চলে যায় কিছু মানুষ। যাবার সময় সাহেবালির দিকে চকিত তাকায়। একটু হাসির আঘাত ছুড়ে মারে। প্রতি-উত্তর দেয়। সাহেবালি আমার দিকে হাতখানাকে আরও খানিকটা দৃঢ়বদ্ধ করে–-‘দেড়ডা টাকা তো দিতি হয় মাস্টার!’ 
‘মোশারাফ দর্জির দোকানে এসে দিচ্ছি’—বলে আমি সাহেবালির পাশ কাটিয়ে মুরগিহাটার গলিতে ঢুকে পড়ি। পায়ের শব্দে বুঝতে পারি সাহেবালিও আসছে পিছন পিছন । তাকে উদ্দেশ্য করেই বলি—‘কেমন চলছে তোমার সংসার? বাচ্চা-কাচ্চাগুলো ঠিকমতো খেতে পায়, ও সাহেবালি ভাই?’ কথার-পিঠে কথা-কাটে সাহেবালি : 
—সাংসারডা মুক থুবড়ে পড়তেছে। শালা সোংসারের শিরদাঁড়াখানা ভেঙে গেছে মাস্টার। 
–মাঠ-ঘাটে তো এখন অনেক কাজ, তুমি লাগতে পার না? 
—পারিনে মাস্টার। ফি-দিন পারিনে। আর শালার মানুষজোন-গেরস্তরাও হয়েছে য্যানো আজরাইল। রক্তখোরো সপ। মুখির গোড়ায় দাঁড়ালিই সটান জবাব দেবে—হবে না। তুই পারবিনে সায়বালি। আরে গায়-পায় রক্ত নায় আজ নিকো। কিন্তু একদিন তো ছেলো। তুমি বলো মাস্টার তখন কি দেড়-দু’জোনার খাটনি একলা খাটিনি? সব শালা বেইমান বিশ্বাসঘাতক। 
—তা খেটেছ সাহেবালি। গতরে তোমার শক্তি খানিকটা ছিল বটে। তা সে-সব গেল কোথায় ? 
প্রশ্ন ছুড়ে সচকিত হয়ে হাঁটতে থাকি। পিছন পিছন সাহেবালি। কোনো উত্তর দেয় না। নিজের মনে বোধ হয় সাত-পাঁচ খানিকটা ভেবে নেয়। কিংবা হয়তো নিজের বিচিত্র খেয়ালে এই বিশ্বাসঘাতক দুনিয়াটাকে এখনও মনের সাধ পুরিয়ে গালাগালি দিয়ে নিচ্ছে। 
মোশারাফের দর্জি-ঘরে ওঠার আগে পিছন-ঘুরে একবার সাহেবালিকে দেখে নিতে যাই। ঘরের উপরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সাহেবালিকে দেখি। আমার জন্য সাহেলিকেও দাঁড়াতে হয়। সিঁড়ির নীচের-ধাপে দাঁড়ানো সাহেবালির মুখ যেন অপরিচিত ঠেকে আমার কাছে। যেন ভিন গ্রহের কোনো মানুষের রং ও রেখা সাহেবালির মুখে। মুখের চেহারা ও রং সেখানে পলকে-পলকে পালটে যাচ্ছে। আমি খানিকটা চমকে উঠি। মানুষের মুখের রং যে এত দ্রুত বদলে গিয়ে নতুন-নতুন মাত্রা পেয়ে যেতে পারে তা আমার কাছে প্রবল বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। বুকের মধ্যে কীসের যেন শিরশির যাতায়াত প্রত্যক্ষ করি। এটা কি ভয়? হয়তো। এত দিনকার পরিচিত সাহেবালির মুখটাকে অপরিচিত হয়ে উঠতে দেখে খানিকটা ভীত হয়ে পড়ি আমি। একটা অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। 
পিছন-দিকে ঘরঘর-ঘরঘর করে সেলাই মেশিন চালায় মোশারাফ দর্জি। যেন আধিভৌতিক জগতের কোনো আর্তনাদ। কোনোরকমে পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার বাসনায় সাহেবালিকেই প্রশ্ন ছুড়ি পূর্ব-কথার জের টেনে। 
–তোমার পায়ের বল-শক্তিগুলো সব কোথায় গ্যালো সাহেবালি?—সাহেবালি এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। পল-মুহুর্তেরা দুদ্দাড় বয়ে যায়। আমি আবার বলি : 
-কী হল কথা বলছ না কেন ও সাহেবালি ভাই? 
–দেড় টাকার দরকার ছেলে মাস্টার। দ্যাও দেড়ডা টাকা? 
–তোমার শরীর এমন ভেঙে গেল কেন? 
-দেড়ডা টাকা না-হলি তো চলবে না মাস্টার। আটাডা কিনিছি কিলো-দেড়েক। গুড়টুকু এট্‌টুস কিনতি হয়। এখোন কি অতো কতা বলতি পারা যায় তুমিই বলো মাস্টার। 
আমি চমকে উঠি। সাহেবালি যেন প্রবল চপেটাঘাত বসিয়ে দেয় আমার গালে। সারাদিনের অভুক্ত হয়তো। টাকাটা এক্ষুণি তাকে দিয়ে দেওয়া দরকার। পকেটে হাত ঢোকাবার মুহূর্তে আবারও বিস্মিত হতে হল। সাহেবালি আমার পাশ কাটিয়ে দোকানঘরের ভিতর ঢুকল ত্বরিত। বেঞ্চে বসল জম্পেশ করে। আমার দিকে ফিরে হড়হড় করে কথা শুরু করল সাহেবালি—“বোসো মাস্টার ভাই। এট্টুস পরামর্শ লেই তোমার কাছতে।’ 
‘কপাল তোমার খুলে যাতি পারে।” 
দরজা থেকে পা উঠতে চায় না আমার। বিস্মিত দৃষ্টিতে সাহেবালিকে নিরীক্ষণ করতে থাকি। মাথার মধ্যে আমার ঘিলুরা হা-ডুডু খেলার গণ্ডি কাটে। সেখানে আধপাগলা প্যাংলা-হ্যাংলা সাহেবালিকে অদ্ভুত অচেনা লাগে। সাহেবালির পরিচিত মুখের আদলে যেন আজ অন্য পুরুষ এসে বাসা বাঁধছে। সে আবার বলে : 
–বোসসা মাস্টার। তুমি তো এম. এ. বি. এ পাশ দেছো— মানুষির হাল-হকিকত কিছু বুঝদি পারো? 
সাহেবালির এমন প্রশ্নে আমি চমকে উঠি। কী বলতে চায় সে? এ-তো দার্শনিক কথা সাহেবালির মুখে জোগান আসছে কোথা থেকে। আমি অবাক হতে-হতে বলি—“না আমি মানুষের পরিণাম বুঝতে পারিনে সাহেবালি ভাই। তুমি পার ? 
–খুউব পারি। 
–পার? 
–পারি-পারি। তার জন্যি তো তোমার কাছে পরামর্শ চাচ্ছি। 
–তুমি কী বুঝতে পার? 
–মরণের পর কেডা বেহেস্তো পাবে, কেডা দোজোক পাবে তা আমি শালা এখন বুঝদি পারি! 
সাহেবালির এমন কথা শুনে ঘোরের রেশ ভাঙে আমার। মনে মনে একটু হাসি পায়। তার প্রকাশ ঘটে মুখের অস্তিত্বে। বুঝতে পারি আধপাগলা সাহেলি নতুন এক খেয়ালে মেতে উঠেছে। আমার হাসি দেখে বোধ হয় বেশ বিরক্ত হয় সে। তা গোপন রাখে না। ঘরঘর-কলকল সেলাই কল ঘোরে। সাহেবালি প্রবল অভিঘাত হেনে বলে ; 
–তুমি হেসতোছো? তোমার বিশ্বেস হচ্ছে না তোর তুমি মিলগে ন্যাও মাস্টার, আজগে ও-পাড়ার হৈবুতুল্লোরে তো মাটিতি শুবগে দেইছি, বেহেস্তে পাবে। 
–তুমি কী করে বুঝলে—আমি প্রশ্ন করি। 
–ও আমি বুঝদি পারি। কবরে যখন লাশ শুবগে দেই তখোন এটা সোন্দর বাস নাকে পাইগো মাস্টার। গোলাপ ফুলির ছেন্টের মতন। 
মোশারাফ-দর্জি থামিয়ে দেয় তার সেলাইকল। আমার মাথার ভেতর দমবন্ধ ঘিলুদের অবশ অবস্থান। পাগলা সাহেবালির কথারা সেখানে যেন কারফিউ জারি করেছে। বলে কী পাগলা! কথা ঘোরানোর জন্য আমি বলি—‘তা’লে কবর খোড়ার কাজ ধরলে তুমি পাকাপাকি?’ সাহেবালি যেন আমার কথা শুনতেই পায়নি। সে আপন খেয়ালেই বলে চলে–‘আর শালা যে-সব লাশ দোজোক পাবে কী দুর্গোন্দোরে শালা সে-সব লাশ। নাক-মুখ শালা ফেটে যাবার জোগাড়। শালা য্যানো বছরে পচা ইঁদুরির দেহ।’ 
কথাগুলো যেন সাহেবালির অন্তর থেকে স্বতোৎসারিত গতি নিয়ে বেরিয়ে আসছে। আমার মস্তিষ্ক ও যুক্তি একথা মানতে চাইছে না। তবুও বলার স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাসের সামনে আমি যেন বোবা হয়ে গেছি। মুখ দিয়ে কোনো রকমে অবিশ্বাস ঝরাতে পারছি না। সাহেবালি এখন আমার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ গ্রহের জীব। সর্বজ্ঞ দার্শনিক। 
মোশারাফ দর্জি ঘরঘর-ঘরঘর শুরু করে পুনরায়। চোখে তার অবিশ্বাসের কৌতুক। বলে—‘কবরখানায় তো হাজার মানুষের ভিড় থাকে, তা ওই বেহেস্ত-দোজখের গন্ধ আর কেউ পায় না—শুধু তুমি পাও নাকি?’ 
ভেবেছিলাম মোশারাফ দর্জির কথায় রেগে উঠবে সাহেবালি। কিন্তু তেমন হল না। সে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিল—একেনেই তো মজা-গো দর্জি। আমি পাগলা-সাগলা মানুষ আমিই তো বুঝদি পারবো। তোমরা চালাকরা পারবা না!’ 
সাহেবালির কথায় এবার চমকে উঠি আমরা দু’জনেই। সাহেবালিকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। দেখি বাতাসে শ্বাস টানছে সে। জোরে-জোরে বাতাস টানতে-টানতে বলে—‘নিশেষ টানো মাস্টার, দ্যাখো এখোনো আমার গা দে বেহেস্তের গেন্ধো এটটুস বেরোচ্ছে।’ 
আমার মাথার ঘিলুতে লাটু-পাক। হাজার-হাজার মৃত মানুষের হল্লা—আর্তনাদ। মেটের হাটের পরিত্যক্ত সময়েরা হুড়হুড় করে নেমে আসে। রাত ভারী হতে থাকে। কালো রাত এখন রহস্যমাখা অস্তিত্ব নিয়ে আমাকে বেষ্টন করে। সাহেবালির অপরিচিত মুখটাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে কোনো একটি জিজ্ঞাসার নিরসন ঘটাতে চাই। বুকের গভীরে কাতলা মাছের হুপ-হুপ। আমি বোধ হয় পাগল হয়ে যাব এবার। ভাবনার এমন তালগোল পাকানো মুহূর্তে আবার কথা বলতে শুরু করে সাহেলালি : 
–আমারে কোনো শালা ফাঁকি দিতে পারবে না মাস্টার। দোজাক-বেহেস্তো কার নামে লেকা পড়তেছে সব আমি বুঝে লেবো শালা। 
–চুপ করো সাহেবালি–আমি যেন কঁকিয়ে উঠি। প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বলি–তালে তো তোমার চলা-চলতির একটা হিল্লে হল। 
–কই আর হলো?–সাহেব আলি উদাস হয়। 
–কেন কবর খুঁড়ে তো কিছু মিলবে। 
–সে তো প্যাটভাতা। কোলখানির দিন খাবা-দাবা শুধু। সোংসারডার কী হবে? 
কথা বলা থামিয়ে দেয় সাহেবালি। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কিছু আধিভৌতিক কথা শুনতে চাই পুনরায়। সাহেবালি হিসহিসানির মতন বলে–দেড়ডা টাকা দিতি হয় মাস্টার। নালি পরিবারডা না-খেয়ে মরে যে।’ আমি পকেটে হাত ঢোকাই। দুটি চকচকে কয়েন দিই সাহেবালির হাতে। কোনো সাড়াশব্দ না-করে সে মুরগিপটির গলিতে মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়। 
দুই 
মুরগিহাটের গলিতে পা-দিয়েই বুঝতে পারি মোশারাফের সেলাই কলটা ঘরঘর-ঘরঘর শব্দ তুলে জীবনের অর্থ খুঁজে চলেছে। এ-শব্দ যেমন গতিময়, যেমন নিজস্ব খেয়ালে উদাসীন, তেমনি তা করুণ। বেদনার রাগিণীও। দিন ও রাত্রির ক্রান্তিলগ্নে মেটের হাটটা আজ যেন ভরা সোমত্ত যুবতির মতো ঐশ্বর্যময়ী। তার বুকের মধ্যে এখন নামগোত্রহীন হাজার-হাজার মানুষের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্নার সম্মিলিত কোরাস। তারই মধ্যে মোশারাফের সেলাই কলটা যেন রূপকথার দুয়োরানির মতো ইনিয়ে-বিনিয়ে একঘেয়ে টানা-কান্নার বিলাপ করে চলেছে। 
আমি প্রাত্যহিক রীতির দাসত্ব করে দোকানঘরের দখিনকোণে রাখা তক্তপোষটায় বসি। হাত বাড়িয়ে ক্যাস বাক্সের উপর রাখা জলের জগটা নিই। ঢকঢক করে আলগোছে খানিকটা জল খাই। হাতের চেটোর উলটো দিক দিয়ে মুখ মুছি। তারপর খানিকটা তৃপ্তির শ্বাস ছাড়তে-ছাড়তে ঘরের অবস্থানটার দিকে নজর ফেলি। মোশারাফ দর্জি তার পায়ে ব্যস্ততা জাগিয়ে সেলাই কলটাকে কাঁদিয়ে চলেছে। আজ তার হাটবার। কোনোদিকে তাকাবার ফুরসত নেই যেন। তার মাথার অনেক উপর জ্বলছে ষাট ওয়াটের বাতি। ঘরঘর-ঘরঘর করে সেলাই কলটা ঘুরেই চলেছে। আর সে-দিকে অপলক চেয়ে ঘরের এককোণে বসে রয়েছে সাহেবালি। হ্যাংলা-বোকা সাহেবালি। 
মস্তিষ্কের বোধ ও বুদ্ধিতে যেমন সাহেবালি হ্যাংলা, তেমনি মাস-আঁশহীন কঙ্কালসার চেহারাটা তার সেই বোধেরই সঙ্গে মানানসই। পরনের ছেড়া-খোঁড়া লুঙ্গি-পাঞ্জাবি দেখে যে-কউই আন্দাজ করে নিতে পারবে–সাহেলি মরা-গরিব। 
সেলাই কল চলছে কলকল-বনবন করে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে সাহেবালি। উদাসীনভাবে। উদাসীনভাবেই। যেন জগতের আর কোনো কিছুর দিকে তার খেয়াল নেই। যেন নৈঃশব্দ্যে থেকে সেলাই কলটার সঙ্গে মনের হাজারো সুখ-দুঃখের কথা বলে নিচ্ছে। তবে আমি ঘরে ঢোকার পর অন্তত তিনবার সসংকোচ দৃষ্টিতে আমাকে সে দেখে নিয়েছে। কোনো কথা বলেনি। মনে হয় সেলাই কলটার যান্ত্রিক কথোপকথন সবাইকে নগ্ন রেখেছে। সেই শব্দের আড়ালে, দিন-আনা-দিন-খাওয়া মুটে-মজুর-খাটা সাহেলি নিজেকে ধরে ফেলেছে। ঘরে নীরবতা কেটে দিয়ে সাহেবালির উদ্দেশ্যে যেমনি আমি প্রশ্ন রাখতে যাব, অমনি দর্জি থামিয়ে দেয় তার কল। মুহূর্তেই হাটুরে মানুষের নিত্য-নৈমিত্তিক আর্তি এসে দাগা মারে আমাদের সকলের মনে। আমরা একে-অপরের সামানসামনি দাঁড়িয়ে পড়ি। বিশেষত, সাহেবালি তার চল্লিশ-বছুরে রোগা-রক্তহীন চেহারাটা নিয়ে আমার চোখের পর্দায় খোঁচা দিতে থাকে। আমি বলি—‘বলো সাহেবালি ভাই, কাজ-কাম কিছু জুটেছিলো আজ?’ সাহেবালি নীরব থাকে। উদাসীন থাকে। আমি আবার বলি—‘সাহেবালি ভাই শরীর গতিক ভালো তো?’ এবার সাহেবালি তাকায় আমার দিকে। শুন্য দৃষ্টি। দুঃখের দোয়েল পাখিরা সে-দৃষ্টির অভিসারী রশ্মিতে ছুটোছুটি করে। 
কয়েকটি পল নীরবে কাটে। সামনের গলি দিয়ে লাখো মানুষ যায় আর আসে। ঘরঘর শব্দ তুলে চালু হয় সেলাই কল। সাহেবালি সেলাই কলের ঘূর্ণমান চাকাটার উপর নজর ফেলে যেন আরও গুটিয়ে যায়। জগৎ ও জীবনকে সে কি গ্রাহ্য করবে না আজ? অস্বস্তিতে পড়ি আমি। বেশ চেঁচিয়ে বলি—‘কি কথাটথা বলবে না নাকি সাহেবালি ভাই?’ কোনো উত্তর আসে না ও-প্রান্ত থেকে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করি: 
-কী দেখছ চাকাটার দিকে? 
–মানুষ দেখি।–এতক্ষণে সাহেবালি জবান খোলে। 
–চাকার মধ্যে কীসের মানুষ? 
–সাহেবালি-পাগলা সাহেবালিকে দেখি। 
–কেমন দ্যাখো? 
কলের ঘুরন্ত চাকাটার দিকে আমিও দৃষ্টি নামিয়ে নিই। কোনো কিছুই আমার চোখে পড়ে না। সাহেবালির দিকে তাকাই। দেখি, স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে। হঠাৎই ছন্দ কেটে যায় সেলাই কলটার। দেখি, চাকার থেকে দড়িটা ছিঁড়ে গিয়ে সেটা বিকল হয়ে গেছে। সাহেবালির মুখে দেখি যন্ত্রণার ছাপ। দুঃখের বলিরেখারা সেখানে তসবিমালা গাঁথে। চোখ থেকে কপোল পর্যন্ত অত্যন্ত ঘনেটি বুননে সে-মালা সাহেবালিকে স্বতন্ত্র করে। সেই জগৎ থেকে সাহেবালি কথা বলে—‘শালা সব দড়িগুলো কোথায় এরাম ছিড়ে যায়!’ আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি। সাহেবালিকে নতুন করে চেনার জন্য তাকে নেড়ে-নেড়ে প্রশ্ন করি : 
-কোন দড়ি ছিড়ে যায় ও সাহেবালি ভাই ? 
–কীসির আবার সোংসারের দড়ি। বোঝে কিনা, বে করে যে-দড়ি বুকি জড়াগে রেখিলুম সেই দড়ি। 
-কেমন করে যাচ্ছে তা বলবে একটু ? 
প্রশ্ন করার পর উত্তরের জন্য আমি উৎসুক হয়ে থাকি। চোখ-মুখসহ সাহেবালির মাথাটাকে আমার চোখের মধ্যে পুরে নিতে চাই। কিন্তু সাহেবালি কোনো কথা বলে না। চোখে তার রাগ ও ক্ষোভের দলা কেউটে সাপের গতি নিয়ে যেন শিকারে বের হয়। হ্যাংলা-প্যাংলা বুকের মধ্যে কামারের হাফর অনন্তকাল দম দিয়ে যায়। 
আমি সাহেবালির থেকে মন তুলে নিই ক্ষণিক। মোশারাফের দিকে ফিরি। দেখি হেঁট-হয়ে সেলাই কলটার নীচে মাথা ঢুকিয়ে ছিঁড়ে যাওয়া সত্তাটিকে পরম মমতায় বাঁধতে শুরু করেছে। বেঁধেই ফেলেছে। তারপর কোনো দিকে না-তাকিয়ে ঘরঘর শব্দ তুলে সে সেলাই কলটাকে আবার টানতে শুরু করে। 
দোকানের বাইরে, গলিতে, লাখো মানুষের কান্নাধ্বনি যেন। সেখানে হাটবারের ব্যস্ত হিসেবি জীবন তৈরির আটপৌরে রাজত্ব। আমার চোখে ঘোর ও বিস্ময়! সাহেবালির দিকে তাকাই। দেখি পুনরায় সে সেলাই কলটার ঘুরন্ত চাকাটার দিকে দৃষ্টি ফেলে সসংকোচে বসে আছে। স্থির দৃষ্টি। ঘরের মধ্যে অদ্ভুত নীরবতা। আমি তা ভেঙে দিয়ে বলি : 
–সেলাই কলের চাকাতে কী দ্যাখো সাহবোলি ভাই? 
–দেড় কিলো আটা দেকি। দেড় টাকা দেকি–চকিত জবাব আসে। 
–আর কিছু দ্যাখো নাকি তুমি? 
–দেকি-দেকি। মাংসবুকির বউ দেকি। তার পাছার বাঁধন খুলে যাতি দেকি। মোল্লেগা লিচু বাগান দেকি। সেখানে বউ আর মরদের শঙ্খ-লাগা দেকি। 
পরের জিজ্ঞাসা আমার গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে গোল হয়ে থাকে। আমি কিছুতেই তাকে উগরে দিতে পারিনে। ব্যথার যন্ত্রণারা আমাকে গ্রাস করে। সাহেবালির মুখের দিকে তাকাই। দেখি দুঃখেরা সেখানে পাথর হয়ে সাহেবালির মুখের আদলটাকে শক্তপোক্ত করে গড়ছে। ওদিকে থেমে গেছে সেলাই কলের ঘরঘর কান্না। মোশারাফ দর্জি এত সময়ের নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে—‘বউরে মোল্লেগা বাড়ির কাজতে ছাড়িয়ে নাও সাহেবালি।’ সাহেবালির চোখে দোয়েল-দুঃখের বাসা। সে তবুও বলতে পারে : 
-তালি সোংসারডা ছারেখরে যায়। প্যাটটা সবার খালি থাকে একবেলা। 
–কিন্তু এটাই-বা তুমি মেনে নেবে কেমন করে। দশজনেই-বা মানবে কেন? 
–মানতে হয় দর্জি। বউডা মাংসবুকির। কতা শোনবে কেন? খাতি দিতি পারিনে। আল্লাদ দোবো কন্‌তে? 
পরিবেশটা ভারী হয়ে ওঠে। সাহেবালি আবার সেলাই কলটার চাকায় নজর বেঁধায়। অজান্তে দর্জি তাতে পায়ের চাপ দেয়। চাকা চলতে শুরু করে বনবন, ঘরঘর। আমি বলি। : 
–কেন সাহেবালি, তোমার তো আয়পাতি এখন ভালো হবার কথা। কবর খুঁড়লে তো বেশি কিছু নগদ টাকা আসার কথা! 
–তুমি দুনিয়ার কিছুই জানো না মাস্টার। শুধু লেখাপড়া শিখে মুখ্যুমানুষির মতন থেকে গেলে! 
–কেন? 
–মুখ্যু না? কবরে মানুষ রোজ শোয় কি? তার ফেরে কবর খুললি তো ফুলপেটা খাবার জোটে। কলমাখানির দিন বরাত জোটে গোস্তরখানা। টাকা তো ওরা দেয় না ওরা। টাকা কনে? 
–তুমি চাইতে পার না? 
–না। 
–কেন? 
–চাবো কী করে? সব শালার লাশের গা দে পচা-দোজোকের গোন্দোই পাই। বোঝে কিনা মাস্টার বেহেস্তোর ফুলির বাগানের গোন্দো আর কোনো লাশের দেহর-তে পাইনে। 
–বলো কী তুমি, সবাই কি দোজখবাসী হবে নাকি? 
–তুমিই বলো মাস্টার যেদি কেউ পাপ করে দোজোকবাসী হয় তাতি আমার দোষ কী? শালা কবর-তে উঠলি সায়বালির কাছে কত খাতির। তকোন সবাই জানতি চায় লাশের গাদে বেহেস্তোর গোন্দো বেরোচ্ছে কিনা! 
আমি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি। সাহেবালির বিকে অপলক চেয়ে থাকি। সেলাই কলটা বিরতি নেয় বোধ হয় একটু। সাহেবালি আপন খেয়ালে বলেই চলে—‘বোঝ কিনা মাস্টার, তারপর আর টাকা পয়সা চাবার কতা মুখি আনতি পারিনেকো আমি।’ 
আমি সাহেবালির কথার কোনো উত্তর দিই না। পাশ থেকে সেলাই কলটা চালু করতে-করতে মোশারাফ দর্জি বলে– তালে চলা-চল্‌তির খুব কষ্ট যাচ্ছে তোমার? 
–দেড় কিলো আটাও জোগান করতি পারিনে ফি-দিন। বউডা দড়ি ছিঁড়ে লেচ্ছে শালা। সাহেবালি উদাসীন উত্তর দেয়। । 
–বউরে শাসনে রাখো তবে! 
–বউডা পরের হয়ে যাচ্ছে–বেইমান হয়ে যাচ্ছে দর্জি। 
ঘরের মধ্যে সেলাই কলের একটানা গোঁ-গোঁ আওয়াজ। মাথার ওপর ষাট ওয়াটের বাতির লো-ভোল্টেজের মরামরা আলো। মুরগিপটির গলিতে জীবনের বিকিকিনি। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেবালির দিকে তাকাই। দেখি শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সেলাই কলের চাকাটার দিকে মনোনিবেশ করে বসে আছে। আমাদের দু’জনের দিক থেকে যেন মন তুলে নিয়েছে। তবু বলি,–চাকার মধ্যে কী দ্যাখো সাহেবালি। 
–দেড় কিলো আটা। দেড় টাকা। দোবা মাস্টার? দ্যাও। 
–আর কী দ্যাখো চাকাতে? 
–বেহেস্তের সুবাস। দেড়ডা টাকা। মাংসবুকির বউডা। 
–সত্যি দেখতে পাও? 
সাহেবালি কোনো কথা বলে না। অতি সন্তর্পণে ওঠে দু’হাঁটুতে ভর দিয়ে। সেলাই কলের পাশ-কাটিয়ে আমার সামনে দাঁড়ায়। প্রসারিত করে দেয় তার হৃদয় ও হাত। বলে—‘দ্যাও’। 
তিন 
দীর্ঘকাল মাস্টারি করার অভিজ্ঞতার নিরিখে এতদিন দাবি করতুম যে, মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। এখন দেখছি আমার এই দাবি খুব একটা জমাট ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নেই। অন্তত সাহেবালির ক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ এই কথা অবনত মস্তকে মেনে নিতে কোনো দ্বিধা নেই। বস্তুত সাহেবালিকে এখন যত দেখছি ততই আমি বিস্মিত হচ্ছি। এমনকী মনের মধ্যে এই চিন্তা বিশ্বাসের মতো প্রবেশ করেছে যে, সাহেবালি এই মর-জগতের কেউ নয়। স্বর্গীয় ঐশ্বর্য ও পরিবেশের কোনো বিশেষ কাজে ঈশ্বর তাকে নররূপে মর্ত্যে পাঠিয়েছেন–এমন ভাবনায় এখন আমি সাহেবালির প্রতি খানিকটা শ্রদ্ধাশীলও। সাহেবালিকে ঈশ্বর প্রেরিত ফেরেশতা ভেবে নিয়ে চিন্তা করে দেখেছি হাজারবার– কোথাও কোনো কিছুই যেন বেমানান মনে হয়নি। প্রাত্যহিক সান্ধ্য-আড্ডায় মোশারাফ দর্জির সঙ্গে আলোচনা করেছি অনেক। আমার এমন বিশ্বাস দেখে সে অবাক হয়েছে। এমনকী সাহেবালির উপর দেবদূতের মহিমা আরোপে সে মৃদু হলেও আপত্তি জানিয়েছে। বলেছে—‘তোমার মাথা খারাপ হয়েছে মাস্টার? সাহেবালির দেহে কখনও ফেরেশতা বাসা বাঁধতে পারে? ও হল হাবা-হ্যাংলা মানুষ’। মোশারাফের কথার যুক্তি আমি বুঝি, কিন্তু মন যেন মানতে চায় না। বলি—‘তা যদি না হবে, তবে ওই যে বেহেস্ত দোজখের গন্ধ পাওয়ার ব্যাপারটা কী করে ঘটে’? 
মোশারাফ কোনো কথা বলে না। এক মনে সেলাই কলটাকে ঘোরাতে থাকে। বোধ হয় ওর মনেও এই নিয়ে একটা সুবিপুল দ্বান্দ্বিক অস্তিত্বের সংকট এখন তৈরি হয়েছে। আমি একমনে সেলাই কলটার ঘূর্ণমান চাকাটাকে দেখি। চাকায় জীবনের ওঠানামা। দাবা-ওলা। তার মধ্যে পাগলা সাহেবালির বিস্তীর্ণ প্রসারিত হাত। হাতে সুখ-দুঃখের পালতোলা নৌকা। সাতটা সমুদ্র। ভাবি, একা সাহেবালি অতটা পথ পাড়ি দেবে কেমন করে! 
সাহেবালির কথা ভাবতে-ভাবতে বোধ হয় বেশ খানিকক্ষণ আনমনা ছিলুম। সম্বিত পাই দর্জির কথায়—‘বেশ কটা দিন কিন্তু সাহেবালিকে এদিকে দ্যাখা যাচ্ছে না, এটা লাক্ষ করেছো মাস্টার’? 
-না। 
–তার খোঁজ রাখ কোনো? 
–না। তুমি? 
–রাখি কিছু-কিছু। মনে হয় তার সুদিন ফিরিছে। আশ-পাশের গ্রাম থেকে এখন কবর খোঁড়ার ডাক পাচ্ছে সহেবালি। 
–ওর সংসারটা একটু সুসার যাচ্ছে কি বলে। 
এ-কথার কোনো উত্তর দেয় না দর্জি। ঘরঘর-ঘরঘর কল চালায়। যেন শুনতে পায়নি আমার কথা। আমি পুনরায় জানতে চাই—‘সাহেবালির জীবনটা একটু তৃপ্তি পাচ্ছে তা’লে?’ এ কথারও কোনো উত্তর দেয় না মোশারাফ দর্জি। সেলাই কলটার দিকে অত্যন্ত বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে সে। আমি এর অর্থ বুঝি। বুঝি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দর্জির জানা নেই। বুঝি হাজারো দোজখ-বেহেস্তের খবরাখবর জানুক-না-কেন, সাহেবালি সুখে নেই। 
একটি-একটি করে দিন প্রবাহিত হয় দুঃখের কাঁধে হাত রেখে। দুঃখের দোয়েল পাখিরা সাহেবালির খবর এনে দেয় আমাকে। আভাসে-আভাসে শুনতে পাই পৃথিবীর মানুষেরা এখন দলা পাকায় সাহেবালির কুঁড়ে ঘরের দাওয়ায়। হত্যে দিয়ে পড়ে সদ্য মৃতজনের নিকট আত্মীয়েরা। আকুল জানার আগ্রহ নিয়ে সাহেবালির হাবা-হ্যাংলা দেহটার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর এক সময় চোখে শ্রাবণের মেঘ নিয়ে ত্রস্ত পায়ে নেমে যায় মিলিয়ে। 
সাহেবালি সংক্রান্ত এতসব কথা শুনি ও মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠি। মোশারাফ দর্জির সান্ধ্য-আড্ডায় আর আসে না সাহেবালি। দর্জিকে জিজ্ঞাসা করে ভাসাভাসা ও অসমর্থিত খবর শুনে অসহিষ্ণু হই। দিনের-পর দিন যায়। আমি আশা করে থাকি সাহেবালি এবার নিশ্চয়ই কোনো বেহেস্তবাসীর দেহের সুবাসের গল্প নিয়ে এসে হাজির হয়ে আমাকে চমকে দেবে। কিন্তু না, তেমনটি ঘটে না। আমার হৃদয়ে আশারা মোহভঙ্গে হতাশ হতে শুরু করে। হঠাৎ একদিন দর্জি খবর দেয়—‘শুনেছ মাস্টার। সাহেবালির বউটা মোল্লেদের ছোটো ছেলের সাথে পালিয়েছে। শালার নারী জাতটাকে বিশ্বাস করাও পাপ’। 
খবরটা শুনে আমি চমকে উঠি। দর্জির দোকান থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। একবার অন্তত সামনাসামনি সাহেবালির সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করি। মুরগিপটির পথে দ্রুত হাঁটি। পিছনে পড়ে থাকে সেলাই কলের ঘরঘর কান্না। হিসহিসানি। 
মেটের হাট থেকে সাহেবালিদের সাংবেড়ে গ্রাম মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ। আমি নিমেষেই তা অতিক্রম করে ফেলি। রাতের অন্ধকার একটু আগে পৃথিবীতে নেমে বেশ জমাটি করে জাবড়ে বসেছে। আমি সাহেবালির দু’চালা ঘরের কানাচে এসে দাঁড়াই। ঘরে মৃদু আলোর সূত্র। একপাশে গোটাচারেক ছেলেমেয়ে ঘুমের দেশে নেতিয়ে গেছে। অন্যপাশে জীর্ণ-শীর্ণ সাহেবালি তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে, আমাকে দেখেই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন রাখে—‘কেডা, কেডা ওখানে?’ 
–আমি তোমাদের মাস্টারগো সাহেবালি ভাই। তোমার খোঁজ-খবর নিতে এলাম একটু। 
কেটে গেল বেশ কটা মুহূর্ত। ভেবেছিলাম আমার উপস্থিতিতে সাহেবালি আতিথেয়তায় মেতে উঠবে। কিন্তু তেমনটা হল না। বেশ নিশ্চিন্ত দৃঢ় গলায় সে বলে—‘ও! তুমি মাস্টার ! এসো।’ সাহেবালি একটা ছেড়া মাদুরের অংশ ছুড়ে দেয় আমার দিকে। নিজেকে বেশ অপমানিত মনে করলেও কীসের যেন এক অমোঘ টানে গুটি মেরে বসে পড়ি দাওয়ায়। বলি : 
–শরীর-গতিক ভালো তো সাহেবালি ভাই? 
–মাগিডা বাঁধন খুলে গেল।–নিরাসক্ত উত্তর সাহেবালির। 
–সংসারটা তোমার ভেসে গেল এবার। 
সাহেবালি কোনো কথা বলে না। উদাস দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ভেঙে-যাওয়া সাহেবালির বুকের মধ্যে দৃষ্টি চালিয়ে তন্নতন্ন করে তার সুখী অস্তিত্বের উপস্থিতি খুঁজতে থাকি। পাই না। জিজ্ঞাসা করি—‘কবর খোঁড়ার কাজটা কি ছেড়ে দিলে’? 
-হ্যাঁ দিলুম। 
–কেন? কিছু না হোক জাহানে দুটো খেয়ে তো বাঁচতে। 
–ডাকে না আর কেউ। 
–কেন, ডাকে না কেন? 
–ডাকপে কী! শালা সব লাশের গা দে তো দোজুখে-পচা গোন্দো পাই। বোঝো কিনা মাস্টার, দুনিয়ার সবাই বোধহয় পাপী-তাপী মানুষ। শালা বেহেস্তের গোলাপফুলির সুবাস এত খুঁজি তেবু তারে আর দেখতি পাইনে। 
একটানা এতগুলো কথা বলে কিছু সময়ের জন্য থেমে যায় সাহেবালি। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি কেন আর সাহেবালি কবর খোঁড়ার ডাক পায় না। সেই আন্দাজে বলি– তা তুমি তো দোজখের সংবাদ না-দিলেই পার সবার কাছে’। 
–‘তুমি বল কী মাস্টার’–যেন চিৎকার করে ওঠে সাহেবালি। তার ভেঙে নুয়ে-পড়া দেহটা ধনকের ছিলার মতো টানটান হয়ে ওঠে। বলে—‘না গো মাস্টার তুমি আজো মানুষ হলে না। মুখ্যুই থেকে গেলে। আমার তো মিথ্যে কতা বলতি নিকো’। 
সাহেবালির কথাতে আমি চমকে উঠলাম। আমার নাগরিক অস্তিত্বের ভিত্তিমূল দোল খেয়ে উঠল। হ্যালো-হাবা সাহেবালির সামনে মাথা নত হয়ে এল। মুখে বেশ কিছু সময় কোনো কথা জোগাল না। মাথার ভেতর সেলাই কলের ঘরঘর শব্দেরা হি-হি হাসতে শুরু করেছে। মৌন থেকে আমাকে সেই ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। হঠাৎ বাতাসে জোরে-জোরে শ্বাসচ টানার শব্দ পেলাম। একটু ভয়ও পেলাম । চারিদিকে নিস্তব্ধতা। তার মধ্যেই সাহেবালি বাঁচার জন্য বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে। আমি তার দিকে তাকানো মাত্র সে বলে–গোন্দো পাচ্ছ মাস্টার কোনো পচা গোন্দের ইশারা?’ 
আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বললাম। সাহবালি আর বলে–‘আমার মরার সোময় ঘুনগে এয়েছে মাস্টার। বউডা হুড়কে গ্যালো। জোন মজুরি জোটে না’। আমি একটু উৎসাহিত হয়ে উঠলাম এই কথায়। এত সময় যেন দমবন্ধ ছিলাম। দোজখ- বেহেস্তের সম্মিলিত আবহাওয়ায় বাতাস ভারী ছিল। এবার মর্ত্যের গন্ধমাখা কথায় বলতে পারলাম—‘আজ কিছু খাওয়া হয়েছে সাহবোলি ভাই? কাছে টাকা পয়সা কিছু আছে?’ সাহেলি মাথা নেড়ে ‘না’ বলে। 
–খাবে কিছু–আমি উৎসুক হয়ে উঠি। 
–আচ্ছা মাস্টার তুমি সত্যিই কোনো গোন্দো পাচ্ছ না? পচা গোন্দো? 
–না, পাচ্ছি না সাহেলি ভা–আমি যেন প্রতিবাদ করে উঠলাম। 
— জানো মাস্টার, শালা আমার কপালে দোজোক লেকা রয়েছে। দেখতি পাচ্ছো-না সারাটা দেহ দুর্গোন্দে ভরে উঠেছে। 
আমি চমকে উঠি। ভীত হই। কথা ঘোরানোর জন্য বলি: 
– -টাকা নেবে সাহেবালি ভাই? দেড় টাকা? 
–না মাস্টার তুমি মানুষ হলে না? টাকা দে কি বেহেস্তে কেনা যায়? বউ বেঁদে রাখা যায়? মুখ্যু। শালা লোকাপড়া শিকে তুমি মহামুখ্যু থেকে গেলে। সরো। পত দ্যাও। 
আমাকে অবাক করে দিয়ে সাহেবালি ঘর থেকে বাইরে নামে। নেমে দাঁড়ায় একটু। বলে–‘বাড়ি যাও মাস্টার। এই দোজোকে তুমি থেকো না’। বলেই হনহন করে রাতের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল সে,আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে। 
সাহেবালির পরিত্যক্ত বারান্দাতে আমি একা বসে থাকি। জোরে-জোরে শ্বাস নিতে থাকি। না, কোনোরকম গন্ধই আমার মাথার প্রবেশ করে না একটুও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *