প্রিয়তোষ মুখোপাধ্যায়’এর গল্প : শ্রীকৃষ্ণের পট

যেমন ধরা যেতে পারে যে-কোনো একটা সম্পর্ক। আমার মা ছিল না। কথাটা নির্বিকার হতে কিন্তু এত সহজে হয় নি। গুন গুন করে গান বা রাত্রের পাতা নড়ার শব্দে মাকে মনে পড়ত। মনে পড়ায় অল্প ব্যথার আঁচে একটা আনন্দ যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে সেঁকে উঠত। 
তাই বলে মাকে আমি দেখেছি─তা নয়। 
মা মারা যায় তখনও আমি এক বছরের হই নি।
সিঁড়ির নিচে একটা কাঠের বাক্সের ওপর বসে একটা ইংরেজি বইয়ের ছবি কাটতাম─বায়স্কোপ হবে। রমা আমার সাফল্যে আস্থা রাখত─সেলায়ের কাঁচি মা ঘুমলে নিয়ে আসত। আমি নিজে আনতাম না। মা আমাকে শনি বলে। বলে যে-কাজে আমি হাত দি দ’ পড়ে। শনি বললে আমি ভীষণ চটে যেতাম। একদিন ছাদ থেকে টব ফেলে দিয়েছিলাম। 
দুপুরবেলা একটা পুরনো ব্লেড জোগাড় করে আমার সেই সিঁড়ির নিচে কাঠের বাক্সের ওপর বসে ছবি কাটছিলাম। আজ শনিবার। দাদা স্কুল থেকে ফিরল। মা বোধহয় এখনও ঘুময় নি। সিঁড়িতে খালি পায়ের শব্দে বুঝলাম রমা।─এত দেরি করলি যে? 
─ছাদে গিসলাম─নে। 
─কী, ইস্ কুলের আচার─আর একটু দে-এ। 
─আর চাইবি না। 
─কাঁচিটা আনলি না? 
─মা ঘুময় নি। 
─দাদা কী করছে রে? 
─মার কাছে শুয়ে গল্প করছে। 
ব্লেডটা চাপ দিতে গিয়ে ভেঙ্গে গেছে। আমি উঠে পড়লাম।─’যাই মার কাছে শুইগে।’ আমি মার কাছে শুতে কোনো দিন ভালোবাসি না। আজ হঠাৎ কি জানি কেন জেদ চাপল। 
রমা বলল, ‘না। আয় ছবি কাটি।’ আমি শুনলাম না।─নাঃ। 
রমা বলল, ‘আমার মা তোর মা নয়।’ আমি রমার দিকে তাকিয়ে রইলাম। 
রমা বলল, ‘আমার মা তোর জেঠাইমা।’ আমি বিশ্বাস করলাম না। আমি মার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। মা দাদার দিকে পাশ ফিরে শুয়েছিল। মা কথা বলল না। আমি মার গায়ে হাত দিলাম। মা কথা বলল না। 
লণ্ঠনের আলোয় আমরা পড়ি। চোখ দুটো ঘষে নিলাম। চার্জ অফ্ দি লাইট ব্রিগেড পড়ছিলাম। রমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছে। ও আজকাল শাড়ি পরে। ও আমার লণ্ঠনের আলোয় পা ছড়িয়ে বসে রুমালে ফুল তোলে। আমি পড়লে রমা চুপ করে। জিজ্ঞেস করল, ‘তোর চোখ লাল হয়েছে কেন রে!’ 
বললাম─কী একটা পড়েছে। রমা আমার কথা বিশ্বাস করল না। আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। আমি রমার কথা বিশ্বাস করি। রমা আমার চেয়ে এক বছরের বড়। আমাকে অনেক কথা বোঝাবার চেষ্টা করে। উপদেশ দেয়। 
আমি শুনি। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি ওর কথা শুনি না। আমি অন্য কথা ভাবি। হয়ত আমার মা রমার মতো দেখতে ছিল। রমা খুব ফর্সা। আমার মাও খুব ফর্সা ছিল। 
আমি রমাকে হঠাৎ প্রশ্ন করি, তোর মুখটা আমার মার মতো! কথার মধ্যে রমা বলে─’হ্যাঁ। তাই হবে─কি জানি─আমি তো কাকিমাকে দেখি নি। কাকাকে একটা চিঠি লেখ না।’ 
একদিন আমি চিঠির বাক্স খুলতাম। 
এখন কাকার নাম শুনলে ভীষণ রাগ হয়। আমি নিমগাছের পাতার দোলা দেখি। ছাদে দাঁড়িয়ে পাতা নড়ার শব্দ শুনি। 
কাকাই আমার বাবা। রমার কাকা আমার বাবা। কাকার অনেক টাকা। রমা বলে, তোকে দেবে। আমি ঠিক করি কাকার টাকা নেব না। কোনো দিন ছোঁব না। রমার কাকা আমার বাবা। 
─আমি তো জানি না। ‘আপনাকে আমি চিনি না।’ 
─ছিঃ। রমা রাগ করে। রমা আমাকে অনেক কথা বলে। 
─একদিন রমা বলল, জানিস মামিমা কলকাতা থেকে আসছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মামিমা ভালো না রাগী? 
রমা বলল, রাগী নয়। দেখিস খুব সুন্দর দেখতে। 
মামিমাকে দেখলাম। লম্বা ফর্সা গোল গোল হাত। খুকুকে পাউডার মাখিয়ে দেয়। খুকু মামিমার মেয়ে। আমি দেখি মামিমা খুকুকে আদর করে─চুমু খায়। 
আমার খুকুকে খুব ভালো লাগে। আমি খুকুর হাত ধরে বেড়াতে যাই। আমি খুকুর সঙ্গে খুব কথা বলি। মামিমার সঙ্গে বেশি কথা বলি না। মামিমা বলেন, এদের দুজনের দেখছি খুব ভাব। বলে হাসেন। আমি মামিমার মুখের দিকে একবার দেখে নি। মামিমাকে আমার মা বলতে ইচ্ছে হয়। আমি মনে মনে মামিমাকে মা বলি। রমার মাকে আজকাল মা বলতে লজ্জা হয়। 
রাত্রে আমরা লাইন করে পর পর শুই। আমি, রমা, খুকু, মামিমা আর শেষে রমার মা। আমরা তিনজনে শুয়েছিলাম। প্রথমে খুকু ঘুমল তারপর রমা। আমার ঘুম এল না। আমি শুয়ে শুয়ে কত কী ভাবছিলাম। মামিমা আর রমার মা এ-সময় শুতে এল। আমি ঘুমবার চেষ্টা করলাম। 
মামিমারা ধীরে ধীরে গল্প করছে। অনেক কথা আমার কানে আসছে─আমি বুঝতে পারছি না। আমি চোখ বুজিয়ে ঘুমবার চেষ্টা করছি। একটা বাজল। অন্ধকারে সাদা সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি কি যেন ভাসছে। আমি চোখ খুললাম। এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে কষ্ট হচ্ছিল। আমার ঘুম আসছে না। শরীরটা ঘামে ভেজা-ভেজা। এবার ওদের কথার মধ্যে রমার কাকার কথা এল। কাকার কথা উঠলে আমি সজাগ হই। আমি চুপি চুপি নিঃশ্বাস ফেললাম। রমার মার কথাগুলো আমার বিশ্রী লাগছিল। মামিমাও যেন কথায় সায় দিচ্ছে। আমার কাকার ওপর ভীষণ রাগ হয়। মামিমাও কি যেন বলছে। আমার ঘুম আসছে না…। আমার চোখ জ্বালা করছে। আমি ওদের কথা শুনব না। আমি একটা পা দিয়ে আর একটা পা চাপছি। আমার ঘুম আসছে না। আমার কি আজ ঘুম আসবে না? কান্না চাপতে চাপতে আমার শরীর কেঁপে উঠল। 
আমি রমাকে বললাম। রমা বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাশ করে আয়নার দিকে তাকিয়ে কাঁধের ওপর আঁচলটা ছোট করছিল। আমার কথায় রমা মন দিল না। আমি আয়নার সামনে আড়াল করলাম। রমা এগিয়ে এল─সর। কী বলছিস! কাল রাতের কথা বললাম। বললাম─মামিমাও সায় দিচ্ছিল। 
রমা হাসল। রমার কথা শুনে মনটা আরও ভার হল। মনে মনে বললাম, মামিমাকে আর মা বলব না। কিন্তু একদিন মামিমা কি এক ঠাকুর পুজো দিয়ে এসে আমায় মিষ্টি দিয়ে মাথায় হাত রাখলেন। আমার সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি মামিমার হাতের নিচ থেকে মামিমার মুখের দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম, আমার মা। আমার খুব ভালো লাগল। 
আমি শান্ত হয়ে গেছি। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে অন্ধকার দেখছিলাম। মোষের পিঠের মতো কালো অন্ধকার। অন্ধকার কেটে কেটে বাদুড়গুলো উড়ে যাচ্ছে। রমা বলত বাদুড়ের নাম করলে ওদের খাওয়া হয় না। আমি হাসলাম। রমার বিয়ে হয়ে গেছে। রমা নেই। কেউ ছাদে আসে না। আমি ছাদে থাকলে দাদা ছাদে ওঠে না। দাদা থাকলে আমি উঠি না। 
আমি কলেজ ফেরৎ রোজ চিঠির বাক্স খুলি। শব্দ হয়। শব্দর সঙ্গে রমার মা একটা-কিছু কথা ভাসিয়ে দেয় আমার কানে আসে বা আসে না। দাদার কথা─থাক। 
আমি মামিমাকে চিঠি দি। রমা আমাকে চিঠি দেয় না। আমি সেবার যখন কলকাতায় গেলাম রমা কাঁদল। বলল, ‘তুই কাকার সঙ্গে দেখা কর।’ 
আমি মামিমার সঙ্গে দেখা করলাম। মামিমা প্রথমে আমায় চিনতে পারেন নি। আমি নাকি ভীষণ বড়সড় হয়ে গেছি। মামিমা মাথায় ঘোমটা তুলছিলেন। আমি হাসলাম। অন্ধকারের মধ্যে কত কথা ঘুরছে। 
মনে হয় মামিমার কাছে চলে যাই─কলকাতায় লেখাপড়া করব। কিংবা দূরে কোথায়। মামিমার কষ্ট হবে। ভাবতে ভালো লাগে─আমার জন্যে মামিমার কষ্ট হবে। মামিমা আমাকে ছেলেমানুষ ভাবেন। ছেলেমানুষের মতো করে ব্যবহার করেন। সেবার আমার লজ্জা করছিল। মামিমা হেসে হেসে আমার বয়স শরীর বাড়াটাকে উড়িয়ে দিলেন─ছতু বাবু─ইঃ─বা-বু না। আমার মুখ মামিমা নিজের মুখে চেপে ধরলেন। আমার লজ্জা করছিল। ঘরে খুকু ছিল। খুকু অনেক বড় হয়েছে। মামিমার মনে হল বয়স বাড়ে নি। পানে ঠোঁট লাল─কপালে লাল সিঁদুর। 
মামিমার কথা মনে পড়লে আমি বুঝতে পারি সমস্ত মুখে একটা খুশির আমেজ শিশিরের মতো নিঃশব্দে জমতে থাকে। কিন্তু মামিমা আমাকে চিঠির উত্তর দিল না। আমি মামিমাকে যে চিঠিটা দিয়েছিলাম তার উত্তর এখনও এল না। আমি লিখেছিলাম─আমি মিলিটারিতে ভর্তি হচ্ছি। আমি জানতাম মামিমা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেবেন। আমি মিথ্যে মামিমাকে ভয় দেখাই নি। 
দাদা আমার সঙ্গে কথা বলে না। আমি রমার মার সঙ্গে কথা বলি না। দাদার সঙ্গে আগে তবু বা ঝগড়া হত, আজকাল আমরা এড়িয়ে চলি। দুজনেই। আমি যদিও বা কখনও অসতর্ক হই দাদা সর্বদা সচেতন। সেদিন জানতাম না দাদা ছাদে, আমি উঠতে দাদা নেমে গেল। 
আমি কোনো একটা অজুহাতে এখান থেকে চলে যেতে চাই। আমি যদি কলকাতা যাই এরা মনে করবে খুকুর জন্যে আমি কলকাতা গেলাম। এরা বলে আর বলবে এমনকী রমাও─যে আমি খুকুর প্রেমে পড়েছি। আমি খুব সহজে কলকাতা যেতে পারি। কিন্তু আমি যেতে পারব না। আমি যে খুকুর প্রেমে পড়ি নি, আমি প্রমাণ করব। আমি কলকাতায় তাই মামিমার জন্যে যাবার প্রচণ্ড ইচ্ছে থাকলেও যাব না। আমি জানি তা সত্ত্বেও রমার মা চিবিয়ে বলবে, আমরা তো এখন পর হয়ে গেছি। আমি মনে রাখি আমি তোমাদের কাছে মানুষ হয়েছি। কিন্তু আমি যে মামিমার কাছে মায়ের স্নেহ পেয়েছি। 
ছোটবেলায়, যদিও এখন হাসি পায়, রাস্তায় চলতে চলতে ভাবতাম কোনো একজন বৌ আমার মার মতো দেখতে আমায় দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে─যদি সত্যি সত্যি হয়। বলবে আমার খোকাকে পেয়েছি। চল খোকা বাড়ি চল বাবা। চোখে জল। চল বাবা বাড়ি…। কত কী কল্পনা করতাম। 
মামিমা অসুস্থ নয় তো! চিঠির জবাব দিতে পারছে না। এতদিন তো হয় না। 
এতদিনে হয়তো বা আমি কোনো ভারতীয় সৈনিক। আজ এইভাবে অন্ধকার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জানি না কী ভাবতাম। কিন্তু আজ আমি কলকাতার কোনো একটা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দূরে রাস্তার ট্রামের তারের স্পার্ক দেখছি। নিচে বস্তির অনেক ঘর তারপর একটা বাড়ি। বাড়ির বারান্দায় লণ্ঠনের আলোয় একটি ছেলে আর একটি মেয়ে মাদুর বিছিয়ে। মেয়েটা পা ছড়িয়ে বসে, ছেলেটা চিৎকার করছে M-A-N ম্যান। ম্যান─মানে… 
আমি দেখছি ওই ছেলেটা; ওই মেয়েটা─মেয়েটা পা ছড়িয়ে─হ্যাঁ হয়তো রুমালে ফুল তুলছে।─রমা। 
রমা নাকি কাকার কাছে গিয়ে কেঁদেছিল, বলেছিল, সতু চলে যাবে। আমার মিলিটারিতে যাওয়া হয় নি। 
কাকার চিঠি পেয়ে ছিঁড়লাম না। কাকার চিঠি পড়লাম। পড়ে মনে হল লোকটা আমার বাবা। আমি কলকাতায় এলাম। কাকা বললেন, তুমি হোস্টেলে থাকবে। 
আমার মামিমার কাছে থাকবার ইচ্ছে মনে মনে রয়ে গেল। এতদিন সত্যি কথা সোজা প্রকাশ করতে পারি বলে মনে যে একটা দম্ভ ছিল এই লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে রইল না। আমি বললাম, আচ্ছা। 
আমি রোজ মামিমার কাছে যেতাম। খুকু আমাকে এড়িয়ে যেত বা লজ্জা পেত তা নিয়ে ভাবতাম না, ইচ্ছে হলে খুকুকে ডাকতাম। সব সময় ও আসত না। ওর না আসা আমার উপেক্ষা মনে হত। রাগ হত। 
রোজ এসে আমি মামিমার গা ঘেঁসে বসতাম। বিরক্ত করতাম। মামিমা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় মাখিয়ে ধমক দিত। হয়তো বলত─আমি কখন থেকে খাবার করে ঠায় বসে আছি। দুষ্টু ছেলে, এতক্ষণে আসা হল। আমি রোজ দেরি করতাম। 
রমার সঙ্গে দেখা করতাম অনেকদিন অন্তর অন্তর। একটা হিসেব-করা সময়ের পর দেখা করতাম। হিসেব ভুল হত না। আমি গণিতজ্ঞ, আমার ভুল হল মারাত্মক ভুল। তারপর আমি আমাকে উপহাস করি। এই ছাদ থেকে মুড়ে-ঝুড়ে খালি সিগারেট প্যাকেটের মতো ফেলে দিতে পারলে যেন নিশ্চিন্ত হতাম। 
আমি দেখছি আমি শুনছি ওই ছেলেটা পড়ছে─M-A-N─ম্যান মানে…। ছাদের অন্ধকার আমাকে ঘিরে ধরেছে। বস্তির মাঝখানে যে নিমগাছটা — পাতা অল্প অল্প দুলছে। ওই ছেলেটার পাশে পা ছড়িয়ে বসে আছে ওর দিদি, কাঁথায় নকশা করছে। দূর থেকে মনে হল রুমালে ফুল তুলছে। আমি পড়তাম রমা রুমালে ফুল তুলত। এই ছাদ সেই কতদিনের পুরনো─আমি কোথায়─আমার বয়স কত আমি কে, সমস্ত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল─আমিও…। কে যেন ছাদে উঠল। আমার পাশে এসে দাঁড়াল─রমা। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি মন খারাপ করে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকলে রমা এসে আমার মুখের দিকে তাকায়। একটা হাত আমার কাঁধের ওপর রাখতে আমি চমকে উঠলাম।─রমা মারা গেছে ছ-সাত মাস। রমা নেই। 
─আমি খুকু। 
─খুকু! খুকু! 
আমি খুকুকে বিয়ে করেছি। 
সত্যি বলতে আমি কিন্তু খুকুর জন্যে মামিমার কাছে যেতাম না। মামিমা। 
মামিমা যদি বলত, সতু এই বাটিতে বিষ আছে নাও খেয়ে নাও।─আপনি বলছেন─আপনি আমায় বিষ খেতে বলছেন? আমি মামিমার কথায় মরতে পারলেও যেন ধন্য হতাম। 
আমি মামিমার হাত ধরে টানলাম, চলুন শুতে যাই। কারণ এটা আমার ইচ্ছে হল তাই। তবে এ-ইচ্ছেটা একদিনে আমার দিক থেকে পুষ্ট নয়। 
মামিমা আমায় আদর করে যেন আমি সেই ছোট্ট সতু। আমার মুখে মুখ ঘসে বলে, আমার পাগল ছেলে। মামিমা এখনও সুন্দর। আমার শরীর নিঃশব্দে অবশ হয়। আমার তেইশ বছরের ভ্রামক যৌবন নিজেকে চোখ রাঙায়। 
আমার শেষ পরীক্ষার ফল ভালো হল না। কাকা আমার দিকে সোজা তাকালেন। আমি কলকাতায় থাকার প্রয়োজনীয়তা আগেই বলেছিলাম। আমি কাকার কাছে চুঁচুড়ায়। এই কদিন মামিমাকে না দেখে আমার চুঁচুড়ায় থাকা অপাঙক্তেয় হয়ে উঠেছে। 
কাকা বললেন─যাও। পরে চাঁদুর ওখানে ব্যবস্থা করে নেবে। আমি লিখে দেব। চাঁদু আমার খুড়তুতো ভাই। এক সামাজিক অনুষ্ঠানে সেদিন আত্মীয়দের সমাগমে উক্ত চাঁদুদার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কাকা বললেন─জানি মামিমা তোমাকে ছেলের মতো স্নেহ করেন। দুচার দিন থাকো, তারপর প্রয়োজন হলে চাঁদুর ওখানে যাবে। 
প্রয়োজন কথাটা এল কারণ কাকার একটা বাড়ি হয়তো তার আগেই খালি হতে পারে তেমন কথা আছে। 
কাকার কথায় আমার মনে অতর্কিতে চাবুক পড়ল। ‘তোমাকে ছেলের মতো স্নেহ করেন।’ এ লোকটার সামনে আমি সোজা হতে পারলাম না। আমি মামিমার কাছে কয়েকদিন থাকব। 
থাকবটাকে আমি কেমন সন্দেহের চোখে দেখছিলাম। একটা অপরাধ বোধ আমার মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল। আমি মামিমাকে ঠিক মায়ের মতো ভাবতে ভীষণভাবে চেষ্টা করে মনটাকে একটা চিন্তা থেকে বার বার সরাতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। তবু আমি আমাকে মামিমার কাছে নিয়ে এলাম। 
আমি আর মামা এক ঘরে, অন্য ঘরে খুকু মামিমা নন্দ। ভোরে গঙ্গাস্নানে মামা ভাঙ্গা স্বাস্থ্য ফেরাতে একাগ্র। মামার অনেক দিনের অভ্যাস। আমি মামা বেরিয়ে যাবার অপেক্ষায় অনেক রাত থাকতে জেগে চোখ বুজিয়ে পড়ে থাকি। অপেক্ষায় থাকার মধ্যে আমি বা ঘুমিয়ে পড়ি। মামিমার আলিঙ্গনে যেটা কী আমার রোজকার অভ্যাস এবং যার, আমি মনে করি স্বত্বাধিকারী, আমার ঘুম ভাঙ্গে। একটা নীরব পাপবোধ আমার মনটাকে জারিয়ে তোলে। আমার সমস্ত দেহ মামিমার সমস্তকে মাতৃত্বের অবয়ব বলে স্বীকার করতে পারে না। আমার কষ্ট হয়। ভীষণ কষ্ট হয়। মামিমার আলিঙ্গনে আমার শরীর কেমন এক অদ্ভুত হয়ে কাঁপে। একটা প্রশ্ন আমায় কোপায়─মামা বেরিয়ে গেলে মামিমা আসে…তবে কী? 
তবে কী-কে আমি অতিক্রম করতে পারি না। কোনো দিন পারছি না।─’আমার পাগল ছেলের কত আব্দার।’ 
আমি মামিমার বুকে মুখ গুঁজে দি। 
আমি হোঁচট খাই। আমি ছেলে! ছেলে!─নাঃ না-আ। আমি পাগলই হলাম। এক চরম নিষ্পত্তির জন্যে আমি তলিয়ে যাচ্ছি। আমি মরিয়া হলাম। আমি মামিমার মুখে চুমু খেলাম। 
─সতু─এ কী─তোমার মন─ছিঃ ছিঃ আমি তোমার মায়ের মতো না? 
─আমি কিছু জানি না। জানি না।─নাঃ─আমায় যা কিছু ভাবুন। যা কিছু ভাবুন বলেছিলাম। কিন্তু আমি সমস্ত সকাল ধরে ভাবলাম। মামিমার ছিঃ কথাগুলো আমায় ছেঁচে ছেঁচে অবশ করেছে। 
দুপুরে আমি মামিমার হাত ধরে টানলাম, চলুন শুইগে। আমি সকলের সামনে মামিমাকে নিয়ে যাব। আমি পরীক্ষা করব। শুধু মামার অনুপস্থিতিতে আমার প্রতি ওইরকম না সত্যি ওটাই মাতৃত্বের আবেশে মামিমার নির্জলা প্রকাশ। 
মামা ঘরে ঘুমচ্ছেন। খুকু অন্য ঘরে বসে হয়তো লুডো খেলছে। 
মামিমা বললেন─এখন না। অনেক কাজ আছে। আমি জোরে টানলাম─না চলুন… 
─আঃ কী যে ছেলেমানসী করো─ 
─না যেতেই হবে। 
─পাগলামী করো তুমি─। নাঃ ছাড়ো। 
কিন্তু ওই বিরক্তিকর বন্ধ্যা শব্দগুলোয় আমার রক্তে নেশা ছড়িয়ে দিল।─না। আমি কিছু শুনব না। আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেবেন আমি ঘুমব। 
মামিমা হাসি টেনে আমার দিকে তাকালেন।─তুমি বড় অবাধ্য। বলছি এখন নয়। 
অবিশ্বাসে আমার মন দাপছে। এক হেঁচকায় মামিমাকে তুলে ধরলাম─চলুন। মামিমার চাবির গোছা বাঁধা আঁচল মাটিতে শব্দ করে পড়ল। মামিমা আমাকে চড় মারল।─ছাড়ো বলছি। 
জোর করে হাত ছাড়িয়ে আঁচল জড়াতে জড়াতে মামিমা মামার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। 
আমি চিৎকার করে উঠলাম─খুলুন। আমি লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে দেব। আমি…। খুকু সামনে এসে আমার এক হাত ধরল─কী হচ্ছে তোমার এ সমস্ত! 
এ সমস্ত…আমার…। আমি খুকুর দিকে মরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম। 
─শোনো। এসো আমার সঙ্গে। 
আমি হঠাৎ কী হয়ে গেলাম─আমার ভারী অন্যায় হল…। 
─তুমি মাকে এখনও চিনলে না! 
আমি একটু আগেই যেন কী করে বসতাম। আমার মাথা দপদপ করছে। আমি খুকুর সব কথায় মন দিতে পারলাম না। 
সম্পর্কে খুকুর কাকা এখানে ছিল─মামিমার সঙ্গে…কী যেন…। খুকু তখন ছোট─তবে মামা নাকি মামিমাকে মারতে উঠেছিলেন। সেই নিয়ে খুকুর কাকাকে মামা চলে যেতে বলেন। 
আমি চুঁচুড়ায় যাচ্ছি। খুকুকে বললাম। 
কথাগুলো আমার মনে সাংঘাতিক স্তর ফেলল। খুকু হঠাৎ এ সমস্ত…মামিমা তাহলে…আমি কী। 
কাকার প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে পারতাম।─হঠাৎ─! 
চাঁদুর বাড়িতে উঠে গেছ তো? 
─কাল যাব। হঠাৎ কী মনে হল তাই এলাম। 
চুঁচুড়ায় থাকব বলে এসেছিলাম। আবার ফিরলাম। এবার চাঁদুদার বাড়ি। কলকাতা থেকে দূরে─মামিমার সংস্রব থেকে দূরে থাকব বলে স্থির করলাম। আপাতত আমি কলকাতায়। চাঁদুদার বাড়িতে। আমাকে দেওয়া ঘরখানা ভালো। আমার ঘরের একপাশে জানলার পাশ দিয়ে জলের পাইপ। খানিকটা জং-ধরা। খুব আল্প প্রায় অদৃশ্য ভাঙ্গার জলে ওই জং আর দেয়ালটা একটু ভেজা কালচে। 
আমি চাঁদুদার বৌয়ের সঙ্গে কথা কইলাম যাকে আগে অনেক বার এড়িয়ে গেছি। 
কারণ খুব সতর্ক মাপা ওজন-করা কথায় আমি কথা হারিয়ে ফেলি। 
আমি হাঁপিয়ে ছাদে উঠলাম। গরু খেদানোর মতো করে মনটাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছি। মনে হচ্ছে মামিমার বাড়ি তো খুব কাছে─মন থেকে নানা কায়দায় কথাটা তাড়াতে চেষ্টা করছি। ছাদটা পরিষ্কার। এক কোণে জলের ট্যাঙ্ক। এই ট্যাঙ্কের পাইপ আমার জানলার পাশ দিয়ে নিচে নেমেছে। দুটো বাঁশের মধ্যে এরিয়াল ঝুলছে। আমি কলকাতায়, মামিমা কলকাতায় থাকে। বেড়াতে বেড়াতে একবার ওই দিক দিয়ে ঘুরে এলে…ভাবলাম। খুকুর কথাগুলো মনে পড়ল। ঘৃণায় মুখ বিকৃত হয়। রাত্রে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি বাইরে এলাম। সিঁড়ির দরজায় তালা। আমি ছাদে উঠলাম। জলের পাইপ ধরে নিচে নেমে মামিমার বাড়ির কাছাকাছি ঘুরে আসি। দূরে কোথায় বারোটা বাজল। এখন মামা খুকু নন্দ মামিমা সবাই ঘুমচ্ছে। ছাদে পাইচারি করতে করতে আমি ক্লান্ত হলাম। চারটেয় মামা গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে যান। আমি ঘুমিয়ে নি। আমি ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। 
আমার উঠতে বড় দেরি হল। আমি লজ্জিত হলাম। রাত্রে আমায় যদি কেউ দেখত! 
দুপুরে আমি কোনো কাজের গুরুত্ব বোধে বাড়িতে থাকতে পারলাম না। রাস্তায় হঠাৎ একটা সিনেমা-হলে ঢুকে পড়লাম। রাত্রে বাড়ি ফিরলাম। ট্রামের বাসের টিকিটের সঙ্গে সিনেমার টিকিট দেখলাম। মনে পড়ল সিনেমা দেখেছি। হলটার নাম দেখলাম। 
রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিকারগ্রস্তের মতো আমি ছাদে উঠে এসেছি। আমি আজ একবার মামিমার বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে এসেছি। মামিমার ঘরে আলো ছিল। আমি। শরীর ভীষণ ভারী। চারিদিক নিস্তব্ধ, বন্ধ। মামিমাকে গিয়ে বলব আমি এলাম। আমি ট্যাঙ্কের দিকে এগিয়ে গেলাম। পাইপে হাত দিলাম। পাইপ ধরে আমি কেমন করে যেন নেমে এলাম। আমার মনে পড়ল না─পাইপে জং-ধরা, ভাঙ্গতে পারে। 
আমি মামিমার বাড়ির কাছে এলাম। শুনলাম তিনটে বাজছে। চারটেয় মামা গঙ্গাস্নানে বার হল। আমি নানাভাবে ঘুরে ঘুরে সময় কাটালাম। অনেক বার ঘুরে এসে সময় কাটালাম। অনেক বার ঘুরে এসে দেখলাম মামা বার হন নি। 
মামা গঙ্গাস্নানে বেরুলেন। আমি ঢুকলাম। আমার মনে আর ভয় নেই। মামিমা অবাক হলেন না। মামিমা বললেন─জানতাম। আমাদের বাহুর আলিঙ্গনে মামিমার কথা জড়িয়ে গেল। 
─সতু। থাক্। 
আমি মামিমার ভেজা-ভেজা কথা শুনতে পাচ্ছি না। আমার আদিম আমি সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে প্রাগৈতিহাসিক মুক্তি চাইছে। 
মামিমার সোনার চুড়ি হাতে বেঁকে গেল। 
─না─না। আমি তোমার মায়ের মতো…। 
─বেশ্যা। দাঁতে দাঁত চাপলাম। 
না হ্যাঁ ঘুরতে লাগল। 
তারপর…। 
তারপর…তারপর অনেক তারপর পেরিয়ে আমি খুকুকে বিয়ে করলাম। 
——————————————-
পরিচয় : ৩২ বর্ষ ১২ সংখ্যা, আষাঢ় ১৩৭০ 
[ মূল বানান অপরিবর্তিত ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *