দানিয়েল খারমস’এর দুটি গল্প : জনতার রায় ও একটি স্বপ্ন

অনুবাদক : চকোরি মিত্র
লেখক পরিচিতি
দানিয়েল খারমস লেনিনগ্রাদে জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি এ্যাবসার্ড কবি ও নাট্যকার হিসেবে পরিচিত। এছাড়া তিনি ছোটোদের জন্য বেশ কিছু বই লিখেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁকে রুশ সরকার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে নির্দেশ দেয়। তিনি যোগ দিতে অস্বীকার করায় তাকে গ্রেফতার করে মানসিক কারাগারে রাখা হয়। সেখানে তিনি অনাহারে মারা যান ১৯৪২ আলে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর। 



জনতার রায় 

পেত্রোভ ঘোড়ায় চড়ে হাজির হলো সমবেত জনতার সামনে, বক্তৃতার বিষয় হলো- সাধারণের পার্কের পরিবর্তে মার্কিন গগনচুম্বী অট্টালিকা কতটা ক্ষতিকারক। সমবেত মানুষজন স্পষ্টতই সম্মতি জানালো তার বক্তব্যের বিষয়ে।
পেত্রোভ কিছু একটা লিখলো তার নোটবুক বার করে। এমন সময় মাঝারি উচ্চতার এক কৌতুহলী মানুষ মুখ বাড়ালো ভিড়ের মধ্য থেকে। পেত্রভকে প্রশ্ন করলো- কি লিখলে পেত্রোভ তোমার নোটবুকে? 
উত্তর এলো- এ তোমার জানার বিষয় নয়। 
মাঝারি মাপের মানুষটি তবুও নাছোড়বান্দা, এক কথা থেকে আর এক কথা, কথায় কথায় বিবাদ শুরু হয়ে গেল। সমবেত জনতা এই মধ্যমাপের মানুষটির পক্ষ নিলো। প্রাণ বাঁচাতে পেত্রোভ তাই ঘোড়া হাঁকিয়ে বেরিয়ে গেলো। পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেলো । পেত্রভ চলে যেতে জনতা অস্থির-অধৈর্য্য হয়ে পড়লো, তাদের প্রয়োজন এখন একটি শিকার। সকলে সেই মাঝারি উচ্চতার মানুষটিকে ঘেরাও করলো, সেই ব্যক্তিই এখন যেন বলি প্রদত্ত। মুন্ডচ্ছেদ হলো তার। ছিন্ন মুণ্ড গড়িয়ে গিয়ে পড়ে রইলো শান বাঁধানো রাস্তার ধারে, ম্যানহোলের পাশে। আর জনতা! জনতার প্রচণ্ড আবেগঘন রোষ চরিতার্থ হলো। এবার তারা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হলো। 
একটি স্বপ্ন 



ঝোপের মধ্যে বসে সে, আর একজন পুলিশ হেঁটে গেলো তার পাশ দিয়েই……ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলো কালুজিন। ঘুম ভেঙে উঠে বসলো কালুজিন, স্বস্তিতে গাল চুলকে আবার শুয়ে পড়লো। আবার স্বপ্ন, দৃশ্যপট এক-ই কিন্তু দিক পরিবর্তিত। সে দেখলো– পুলিশের উর্দি পরা লোকটি বসে আছে ঝোপের মধ্যে আর কালুজিন হেঁটে যাচ্ছে তার পাশ দিয়ে।
কালুজিন এবার উঠে মাথার তলায় একটা খবরের কাগজ পাতলো, পাছে ঘুমন্ত অবস্থায় মুখ থেকে লালা গড়িয়ে পড়ে বালিশ না ভিজে যায়। ফিরে গেলো সেই স্বপ্নের জগতে, আবার প্রথমবারের স্বপ্নের ঘটনা ফিরে এলো–সে বসে আছে ঝোপের মধ্যে আর পুলিশের উর্দি পরা লোকটা হেঁটে চলে গেলো।
খবরের কাগজের পাট বদলে সে আবার একবার শুয়ে পড়লো, ঝোপ-ঝাড়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে, পুলিশ বসে আছে সেই ঝোপের ভিতর, আবার শুরু হয়েছে স্বপ্ন।
না! আর ঘুম নয়, নিজের মধ্যে দৃঢ়তা আনার চেষ্টা করলো কালুজিন। তবে, পারলো না; তৎক্ষণাৎ গভীর ঘুমে ঢলে পড়লো। শুরু হলো স্বপ্ন, পুলিশ আর কালুজিন বসে আছে আর ঝোপগুলো সরে যাচ্ছে। কালুজিন বিছানার মধ্যে ছটফট করে উঠলো, আর্তনাদের শব্দ বেরিয়ে এলো তার মুখ দিয়ে। তবু উঠতে পারলো না। একটানা চারদিন চাররাত ঘুমের মধ্যে কাটলো, পাঁচ দিনের দিনে ঘুম ভাঙলো। শীর্ণকায় হয়ে গেছে সে, এতই শীর্ণ যে তার পায়ের লম্বা বুট টাও বাঁধতে হলো আলাদা দড়ি দিয়ে। চেনা যাচ্ছে না তাকে। তার পরিচিত দোকানিও চিনতে পারলো না তাকে, ভুল পাউরুটি ধরিয়ে দিলো। কি ভাঙাচোরা বিষণ্ণ এক চেহারা হয়েছে আজ তার!
ইতিমধ্যে স্যানিটারি কমিশন এসেছে আপার্টমেন্ট পর্যবেক্ষণে। কর্তা-ব্যক্তিরা যখন আপার্টমেন্টের মধ্যে যাচ্ছে তখন তাদের নজর পড়লো কালুজিনের দিকে–সেই শীর্ণকায়-মলিন চেহারা। আপার্টমেন্টের পরিবেশ-পরিচ্ছন্নতায় এ মলিনতার দাগ অপ্রয়োজনীয়, তাই একে বিতাড়ন করাই ভালো। স্যানিটারি কমিশন তাই জহকৎ-কে জানালো কালুজিনকে সরিয়ে দিতে, কালুজিনকে তুলে নিয়ে ফেলে দেওয়া হলো ডাস্টবিনে।

অনুবাদক
চকোরী মিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *