কামরুন নাহার শীলার গল্প : ব্যাট-বল

 

বাংলাদেশ ভার্সেস নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে বোলিঙের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম বলটা খেলার জন্য ওপেনিং ব্যাটসম্যান রস টেইলর ক্রিজে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত। অপরপ্রান্তে বল-হাতে সেও তৈরি ইনিংসের প্রথম বলটা করার জন্য। বিশ্বকাপে এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচ। আগের ম্যাচে অস্ট্র্রেলিয়ার সাথে গোহারা হেরেছে তারা। পরের প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত সহজ, আফগানিস্তান। কিন্তু সেকেন্ড রাউন্ডে উঠতে হলে জেতা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই আজকে।
আগের খেলায় টিমে তার জায়গা হয়নি। বলতে গেলে অনেকটা ভাগ্যের ফেরে সুযোগ পেয়ে গেছে সে এই ম্যাচে। গতকাল প্র্যাকটিস সেশনে পায়ে হঠাৎ চোট পেয়েছে শফিউল। ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে তার। বেশ কিছুদিনের জন্য টিম থেকে ছিটকে গেছে সে। মূল পেসার মোস্তাফিজও ইনজুরিতে গত দুইমাস। ওয়েটিং থেকে তাই তাকে ডেকে নিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। মূলত অলরাউন্ডার হিশেবে চান্স পেয়েছে সে। সুযোগটা কাজে লাগাতে হলে আজকে কিছু একটা করে দেখাতেই হবে তাকে, নইলে আবারও বাদ পড়ে যাবে।
রাখে আল্লা মারে কে!
গভীর শ্বাস টেনে ফুসফুস ভরে নেয় সে কানায় কানায়, তারপর ধীরে ধীরে সব বাতাস ছেড়ে দিয়ে তুলার মতো হালকা করে নিজেকে। তিন আঙুলে বলটা গ্রিপ করে প্রচণ্ড বেগে দৌড়াতে শুরু করে ক্রিজের দিকে। প্রতি পদক্ষেপে একটু একটু করে গতি বাড়ায় দ্রুত। বাধাহীন ঢেউয়ের মতো তার লম্বা চুলগুলো ভাসতে থাকে বাতাসে…
এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি পুরো ঘটনা ঘটতে। কিছু বুঝবার আগেই আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে ব্যাটটা সামনে এগিয়ে দিয়েছিল টেইলর। দেড়শো কিলো বেগে আউটসুইং করা বলটা দেখতেই পায়নি যেন সে। ব্যাটের কানায় লেগে ফার্স্ট স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা সৌম্যের হাতে জমা হয়েছে বলটা।
‘আউট!’
সমর্থকদের চিৎকারে মুখর হয়ে ওঠে ইডেন গার্ডেন। পরের বলটাও দেড়শোর কাছাকাছি। লেগ থেকে ইনসুইং করে চোখের পলকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে মিডল স্ট্যাম্প।
ক্লিন বোল্ড।
হতভম্ব ম্যাককুলাম একবার সেদিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে সোজা হাঁটা দিয়েছে প্যাভেলিয়নের দিকে। পরেরটা আবার আউট সুইং। দেড়শো ছাড়ানো গতি। ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রতগতির ডেলিভারি। ব্যাটসম্যানের সব প্রস্তুতি নস্যাৎ হয়ে যায় গতির কাছে। আবারও ব্যাটের কানায় লেগে ফার্স্ট স্লিপে সৌম্যের হাতে ক্যাচ। হ্যাটট্রিক! জীবনের প্রথম আর্ন্তজাতিক ম্যাচে প্রথম তিন বলে তিন উইকেট।
ওয়ার্ল্ড রেকর্ড!
না, কোনোভাবেই আসছে না ঘুমটা। চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য; হুট করে আবার ছিঁড়ে গেছে সুতাটা। মেজাজটা খিঁচড়ে ওঠে তার। গায়ের নীচে বেডশিটটা কুঁচকে নেই কোথাও; গায়ের উপর পাতলা কাঁথাটাও মোটামুটি টানটান। না। ধীরে ধীরে একটা ভয় ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। তিনটা বেজে গেছে নিশ্চয়ই! কিছুক্ষণ পরেই আলো ফুটে যাবে। মাথার ভার আলতো করে বালিশে ছেড়ে দেয় সে। ভেতরে ছটফট করতে থাকা গরম বাবলটাকে যেকোনও উপায়ে বের করে দিতে হবে মাথা থেকে। নইলে ঘুম আসবে না আর আজকে। কোলবালিশটা আরও ঘন করে পায়ের নীচে টেনে নেয় সে। চোখের পর্দার ভেতর শান্ত করে আইবল দুটো। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে একবার চুলকে নেয় বাম পায়ের গোড়ালি। তারপর যতটা সম্ভব রিলাক্সড মুডে পরের ম্যাচের কল্পনায় চলে যায়।
ইদানীং খেলাগুলোকে অনেকক্ষণ ধরে চালিয়ে নিতে হচ্ছে ঘুমটাকে বাঁধবার জন্য। কখনও কখনও একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত গড়িয়ে দিতে হচ্ছে বলটাকে। বেশিরভাগ সময়ই ফোকাস ঠিক থাকতে চায় না, সরে যায় জায়গা থেকে। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয় সব; প্রথম বল থেকে।
ফার্স্ট রাউন্ডে প্রতিপক্ষ সাধারণত নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড। সাথে একটা দুর্বল অপোনেন্ট। নিজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য লাগে এতে। সেমিতে পাকিস্তান আর ফাইনালে ভারত। ভারত-পাকিস্তানে এসে কিছুটা স্বস্তি পায় সে। মোটামুটি বেশ কয়েকজন প্লেয়ারের নাম জানা আছে তার। ভাবনার লাগাম ছেড়ে দিতে সুবিধা হয় এতে। নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগই অপরিচিত! রস টেইলর, ম্যাককুলাম, উইলিয়ামসন; এই দুয়েকটাকেই চিনে শুধু। ভারত-পাকিস্তানের আরও একটা সুবিধা আছে। ক্রিকেট মাঠে এরা চিরশত্রু। এদের পরাজয়ে উল্লাসটা বেশি হয় অনেক। দেশপ্রেমের কানা দৈত্যটাকে খাবার জোগানো যায়। তাই শেষ খেলাটা এদের সাথে হলেই জোশটা জমে ওঠে।
ফাইনালে বাংলাদেশ সবসময় বিশাল ব্যবধানে জেতে। একতরফা খেলায় নাকানিচোবানি খায় মহা-ভারত। সেইসব ম্যাচে ব্যাট হাতে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকায় সে। কিংবা বল হাতে আট উইকেট। তাও মাত্র ছয় রানের খরচায়। এটাও ওর্য়াল্ড রেকর্ড। এতকিছুর পরও দুর্ভাগা রাতগুলোতে ঘুম আসতে চায় না অনেকসময়। তখন শুরু হয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তারপর আইপিএল…
নিজের চুলগুলো নিয়েই যত দুশ্চিন্তা তার। কী করবে এগুলোকে! কদমছাঁট দিয়ে দিবে! নাকি হরভজনের মতো মাথায় পাগড়ি বেঁধে নেবে চুড়ো করে? চুলগুলোর নাহয় কোনও গতি করা গেল। কিন্তু বুকদুটো? এগুলো ঢাকবে কী করে! নিজের বুকে হাত দেয় হোমায়রা। বেশ ভারী; লুকানো মুশকিল হয়ে যাবে। ছেলেদের বিশ্বকাপটা তাইলে সে কীভাবে খেলবে!
হোমায়রা নিজেই জানে না এতকিছু থাকতে প্রতিরাতে সে ক্রিকেট খেলার কল্পনাকেই কেন বেছে নিয়েছে ঘুমাবার জন্য! কখন থেকে বেছে নিয়েছে? তাও আবার ছেলেদের ক্রিকেট! কিছুদিন আগে মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছিল হঠাৎ। চলেছিলও কয়েকদিন। সালমা, রুমানা, নিগার সুলতানা; কী কী সব নামও শোনা গিয়েছিল তখন। তারপর যেইকে সেই। এসব কারণেই হয়তো মেয়েদের ক্রিকেট খেলতে কখনোই ইচ্ছে হয়নি তার। কোনো চার্ম পায়নি সেখানে। এসব খেলা দেখার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকে না, কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচ জিতলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় না কোথাও। এই যে সবার মধ্যমণি হয়ে থাকা, আঠারো কোটি মানুষের বুকের ধন হয়ে থাকা; এর একটা তীব্র আকর্ষণ আছে। তাই কল্পনাতেও সে পুরুষদের ক্রিকেটই খেলেছে। চুল কেটে, বুক দাবিয়ে, সমস্ত কমনীয়তা লুকিয়ে রেখে…
রূপকথা হওয়ার আগে আগে একটানা শুয়ে থাকতে হতো তাকে। সারাদিন সারারাত। সময় কাটতেই চাইত না যেন। ইন্টারনেটেও আসক্তি ছিল না তেমন। বরং উদ্ভট সব ভাবনা ভাবতে ভালো লাগত তার; ভাবতে ভালো লাগত এমন কিছু একটা করছে সে, যা দেখবার জন্য সারাদেশ উন্মুখ হয়ে আছে; তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে তার সূক্ষ্মতম নড়াচড়াও পর্যবেক্ষণ করছে মানুষ। যেন তার উপরই তুলে দেয়া হয়েছে জাতির পুরোটা ভার; সে ফেলে দিলেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছিটকে যাবে সব। অনেক হিশেব মিলিয়ে দেখেছে সে, একমাত্র ক্রিকেটই তাকে সেই চূড়ান্ত আত্মতৃপ্তি দিতে পারে। জাতীয় দলের ক্রিকেট, পুরুষ দলের ক্রিকেট।
সেইসময় একদমই ঘুম আসতে চাইত না। সারা শরীর ম্যাজম্যাজ করত, মন অবসন্ন হয়ে থাকত প্রতিমুহূর্তে, কিন্তু চোখে ঘুমের লেশমাত্র নাই। টিভি দেখতে ভালো লাগত না, বইয়ের পাতাগুলোও বিস্বাদ লাগত। কিছুতেই মন বসত না তখন, কিচ্ছুতে না। শুয়ে শুয়ে শুধু আবোল-তাবোল ভাবতে ভালো লাগত। সে তার গর্ভের বাচ্চাটার কথা ভাববার চেষ্টা করেছে বারবার। ভেবেছেও কোনও কোনোদিন। কিন্তু ভয় লাগত তার। মনে হতো একটা পাপ করতে যাচ্ছে সে শিশুটাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসে। যে-শিশুটা জন্মের পর তার বাবাকে পাবে না, পাবে না বাবার দিকের কোনও আত্মীয়ের আদর। বাচ্চাটা হয়তো সবকিছুর জন্য তাকেই দায়ী করবে। বলবে, কেন সে মানিয়ে নিতে পারেনি, অন্তত তার জন্য আরেকটু মেনে নেয়নি কেন সে!
হোমায়রা বুঝতে পারে না কতটুকু মানিয়ে নিলে তাকে মানিয়ে নেওয়া বলে। বিয়েটা তো তার একার ইচ্ছায় হয়নি; আরিফেরও পূর্ণ সম্মতি ছিল তাতে। তাছাড়া সেও তো ফেলনা কিছু নয়! পাল্লায় মাপলে বরং তার দিকটাই ভারী হবে কোথাও কোথাও। আরিফ তাকে একগাদা মানুষের সামনে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল। অথচ বিয়ের আগে এমন কথা ছিল না। বাপের বাড়ির হট্টমেলায় অতিষ্ঠ হোমায়রা কৈশোর থেকেই নিজের একটা ঘর চেয়েছে মনে মনে; যেখানে কোনও খবরদারি নেই, নেই কোনও উৎপাত। বাড়িতে পুরুষ অতিথির আগমন ঘটলে বারান্দায় শুকোতে দেওয়া অন্তর্বাস লুকানোর জন্য ছুটতে হয় না যেখানে। তাদের রুমটা শুধু দুইবোন নয়, দাদির জন্যও বরাদ্দ ছিল। আর এই রুমেই বাড়ির প্রধানা মুরুব্বির বাস বলে গ্রাম থেকে আসা সকল উৎপাতের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই রুম। তাছাড়া দিন-রাত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দাদিবুড়ির খ্যাচড়-খ্যাচড় তো ছিলই! অথচ বড় ভাই, সারাদিন টো-টো কোম্পানির ম্যানেজারির ফলে তার ঘর ভোঁ ভোঁ, তবুও ঘরখানি তার দখলে। গোছ-গাছ করা ছাড়া ওই ঘরে ঢোকারও অনুমতি ছিল না কারও।
হোময়রার এইসব আক্ষেপ জানত আরিফ। তাই কথা দিয়েছিল নিজেদের একটা ঘর হবে তাদের, শুধু দুজনের একটা ঘর। যেখানে সমস্ত কিছুই কেবল দুজনের মনের মতো করে হবে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টো। প্রথম প্রথম তবু সহ্য করে নিয়েছিল সে। আরিফ আশ্বাস দিয়েছিল; বলেছিল, ‘মাত্র কয়টা দিন, একটু গুছাইয়া নিতে দাও।’ কিন্তু দুই বছরেও যখন ‘কয়টা দিন’ আর শেষ হচ্ছিল না তখন সে বুঝে নিয়েছে চাপ না দিলে কোনোদিনও শেষ হবে না।
এর আগেই অবশ্য তার গায়ের গন্ধ খোঁজা শুরু হয়ে গেছে পরিবারে। ‘কেন সে অফিস থেকে দেরিতে ফেরে, ছুটির দিনেও কেন বাইরে যায়, শ্বশুর শ্বাশুড়ির কেন খেয়াল রাখে না…’ কত কত অভিযোগ! সব এখন মনেও নাই। এমনকি পুচকে ননদটাও, যে কি না প্রায়ই তার কাছ থেকে এটা ওটা চেয়ে নিত, চুরিও করত, সেও ভাইয়ের কাছে কান ভারী করা শুরু করে দিয়েছিল তার নামে। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়!
এসব নিয়ে কোনো বাহাসে যায়নি হোমায়রা, এত ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে কথা বলার রুচি হয়নি তার। সমস্ত ঝগড়া সে একবাক্যে শেষ করতে চেয়েছে- ‘আমার বাসা কোথায়!’
নিজের বাসা, যেখানে হাত-পা ছড়িয়ে দুপুরবেলা সটান শুয়ে থাকলে দরজার ফাঁকে কেউ উঁকি দিয়ে দেখবে না, গজগজ করে বলবে না- ‘ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ; মাইয়ামাইনষের এমুন বেহাইয়াপনা বাপের জন্মেও দেহি নাই!’
সে তো তার নিজের পরিবার ছেড়ে এসেছিল আরিফের এক কথায়। আরিফেরও তা-ই কথা ছিল। আরিফ তার কথা রাখেনি। এক দঙ্গল মানুষের জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল তাকে ধরে নিয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে সে দিনের পর দিন। ক্ষেপে ওঠেনি, চেঁচামেচি করেনি, অশোভন আচরণ করেনি কারও সাথে। পরিবর্তে সে একনাগাড়ে নিজের ইচ্ছাটুকু পেশ করে গেছে- ‘চলো, এমন একটা বাসা নিই, যেইখানে পুরো পরিবার পাশাপাশি দুটো আলাদা ফ্ল্যাটে থাকা যায়, একটা বন্ধ দরজার এপারওপারে।’ একটা দরজাই তো চেয়েছিল সে, যেটার খোলা-বন্ধের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকবে। এমনও বলেছিল সেই ঘরের ভাড়া সে নিজেই দেবে, খরচও। আরিফ তার মা-বাবারটা দিক। কানে তোলেনি আরিফ, সমাজ তার কান আগেই এঁটে দিয়েছিল; পুরুষত্বে আঘাত লেগেছিল তার। বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে; শুধুমাত্র এই একটি প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে হোমায়রা এক কাপড়ে বাড়ি থেকে চলে আসার এমন হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অথচ সবাই উল্টো তাকেই দোষ দিয়ে বসে। মা-বাবা থেকে সন্তানকে আলাদা করবার ঘৃণ্য চক্রান্তের হোতা বানিয়ে তোলে কথার মারপ্যাঁচে। সেই মুহূর্তেও আরিফ সম্পুর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল, এমন একটা ভঙ্গি করে ছিল যেন সে ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে শেখেনি; যেন হোমায়রা জাদুটোনা করে এমন ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটাকে মায়াবী জালে পুরে নিয়েছে। আরিফ একবারও সবার সামনে মুখ ফুটে বলেনি- ‘এই মেয়েটাকে বিয়ের আগে আমি কথা দিয়েছিলাম, বলেছিলাম আমাদের নিজেদের আলাদা একটা ঘর হবে, নিজস্ব একটা পৃথিবী হবে চার দেয়ালের ভেতরে।’ আরিফ না বলুক, সে বলেছে সবার সামনে। জোরগলায়। এতেও সবাই তার ডাইনি রূপটাই দেখেছে। কেউ ফোড়নের টানে লম্বা শেকল বুনেছে, ‘ ও…! তাইলে বিয়ার আগেই বেবাগ ফিটিং দিয়া রাখসিল ম্যাডামে!’ অন্যরা বলেছে, ‘হইব নিশ্চয় একদিন, অহনই এত বেদিশা হওনের কী আছে!’ এমনকি তার নিজের বড় ভাই পর্যন্ত বলেছে- ‘সবার সাথে মিলমিশ কইরা থাকাটাই সমাজ।’ এতে নাকি জীবনে পূর্ণতা আসে!
তার একটিমাত্র চাওয়া এমনভাবে উপেক্ষিত হবে, মানতে পারছিল না হোমায়রা। এমনকি পিচ্চি ননদটার হাসি থেকেও বিদ্রূপের ছিটে এসে লাগছিল গায়ে- ‘আইছে লাডের বেডি, ভাইরে যুদা করতে, থোঁতা মুখ ভোতাইয়া দিমু এক্কেরে!’
নিজেকে প্রচণ্ড পরাজিত লাগছিল তার, অপাঙ্ক্তেয় মনে হচ্ছিল। কোথাও আশ্রয় পাচ্ছিল না সে তখন; জোর করে তাকে মুছে দেওয়া হয়েছে দৃশ্যপট থেকে; ধীরে ধীরে পুরো পরিবারের কাছে ইনভিজিবল হয়ে গিয়েছিল সে। এমনকি আরিফের কাছেও! নিজের ব্যর্থতা ঢাকতেই বুঝি তার কাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করেছিল আরিফ। না, আর পারেনি সে নিতে। একটা অক্ষম ক্রোধ তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। এই ক্রোধটাই তার বিড়াল শরীর থেকে বাঘটাকে টেনে বের করে এনেছিল শেষমেশ। লাথি মেরে চলে এসেছিল সে সংসার ছেড়ে।
এরপর থেকেই কেন যেন সবসময় তার মনে হতো, এমন কিছু একটা করবে সে যাতে আশেপাশের সবাই তার দিকে উন্মুখ হয়ে চেয়ে থাকবে; তার বাচ্চাটা জন্মের পর থেকে তাকে সুপারহিরো ভেবে বড় হবে; তাকেই মা, তাকেই বাবা ভাবতে শিখবে। সুপারহিরো হওয়ার সুপ্ত বাসনা অবশ্য হোমায়রার ছেলেবেলা থেকেই ছিল। নিজেকে কতবার সে মৌসুমী, শাবনূরের জায়গায় কল্পনা করেছে। বিমান দুর্ঘটনায় ফারিয়া লারার মৃত্যুও তাকে প্রভাবিত করেছিল। তখন নিজেকে পাইলট ভেবে বেশ সুখ পাওয়া যেত। কল্পনা চাওলার মৃত্যু, বুকসেল্ফের সায়েন্স ফিকশন বইগুলো আর এইচ.বি.ও.তে দেখানো আর্মাগেডন-এর মতো মুভিগুলোর কারণে নিজেকে নভোচারী কল্পনা করে দারুণ এক্সাইটমেন্ট পাওয়া যেত তখন! রাতের বেলায়, ঘুমুতে গেলে, দাদির পুরাতন দিন নিয়ে আক্ষেপের বিনুনি শুনতে শুনতে কতবার যে সে স্পেসশিপের ক্যাপ্টেন হয়েছে! জরুরি পরিস্থিতিতে স্পেশ-স্যুট গায়ে আর সাকশান জুতো পায়ে জিরো গ্র‍্যাভিটিতে ব্যালেন্স করতে করতে দলের অন্যদের চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে। ইমার্জেন্সি বাটনের ভোঁ…ও..ও.. সংকেতের বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে দলের অন্যদের কাছে কেবল তার অঙ্গুলি হেলনই একমাত্র ভরসা, কল্পনাগুলোয় শাবনূর-মৌসুমীর রংঢং কিংবা অ্যাঞ্জেলিনা জোলির অ্যাকশনের চেয়েও বেশি উত্তেজনা দিত তাকে, যদিও তখন আজকের মতো সকলের নয়নের মণি হওয়ার জন্য এমন মরিয়া ছিল না। ভাবনাগুলো ভাবতেই কেবল ভালো লাগত। কিন্তু এখন কেন এমন হয়?
বহুদিন পর্যন্ত হোমায়রা বুঝে উঠতে পারেনি কী করলে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া যাবে। কত আউলফাউল ভাবনা ভেবেছে সে এ-দিনেও; সিনেমার নায়ক হওয়ার কথা ভেবেছে একবার। একেবারে নাম্বার ওয়ান সাকিব খান! আরেকবার ভেবেছে নেতা হবে; তুখোড় পলিটেশিয়ান! তার বাক-বৈদগ্ধের ক্যারিশ্মায় উপচে পড়ছে ময়দান, ভাবতে ভালো লেগেছিল কিছুদিন, কিন্তু দানা বাঁধেনি ভেতরে। তারপর কেমনে যেন ক্রিকেট খেলার চিন্তাটা মাথায় ঢুকে গেল। এতদিনে মোক্ষম মন্ত্রের সন্ধান পেয়েছে সে! একমাত্র ক্রিকেটই নতজানু করে দিতে পারে সবাইকে। আশরাফুলই আশার ফুল হতে পারে এই দেশে। সব প্রাপ্তি, সব প্রতিষ্ঠা সেখানে। আর কোনও দীর্ঘমেয়াদী বীরত্ব নাই কোথাও।
কবছর আগে পরপর কয়েকটা মেয়ে এভারেস্টের চূড়ায় উঠে হইচই ফেলে দিয়েছিল খুব। তারও আনন্দ হয়েছিল শুনে। সেও তাদের মতো শাদা শাদা কল্পনার বরফ ভেঙে অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই ঠান্ডা পাহাড়চূড়ায় উঠেছে, অ্যাভালাঞ্জের নীচে চাপা পড়েছে, দড়ি ছিঁড়ে শূন্যে ঝুলে থেকেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেনি। কয়েক রাত যেতে না যেতেই চোখ বিদ্রোহ করেছে ঘুমাতে। সবার মতো তার ভাবনাও বিস্মৃতির আড়ালে বিলীন হয়ে গেছে দ্রুত। তারও আগে, নিজেকে একবার সানিয়া মির্জার স্থলে কল্পনা করতে চেয়েছিল সে। লন টেনিসের গ্যালারি কাঁপাচ্ছে তার হাতের র‍্যাকেট, বল পেটানোর দমকে মিনিস্কার্ট পরিহিত উরুর উদ্বেলে যেই রোমাঞ্চিত হতে গিয়েছে, মনে পড়ে গেছে মির্জা সাহেবার কথা, যত ভালো খেলুন না কেন, খেলার চেয়ে তার উরুতেই যেন বেশি মজে থাকত দর্শক। নাহ্, আরাম পাওয়া যায়নি না আর। কল্পনার লাগামহীন ঘোড়াটার রাশ টেনে ধরেছিল সে তখন।
তার মধ্যে কি তবে পুরুষালি হরমোনের প্রভাব বেশি? মনে পড়ে, আরিফও একবার এরকম বলেছিল বিয়ের পরপর। একটু আহত হলেও উড়িয়ে দিয়েছিল সে দুষ্টুমির ছলে বলা স্বামীর সন্দেহটাকে। নিজেকে তো সে চেনে। অন্য কোনোকিছুতেই তার এমন পুরুষালি ইচ্ছা হয় না, কখনোই হয়নি। তবে এটা সত্যি; ছোটোবেলা থেকেই একটু ডানপিটে ছিল সে। হরহামেশা গাছে চড়েছে, বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলেছে, হাডুডু খেলেছে। খেলেছে ব্যাডমিন্টন। ফুটবলও তো খেলেছে! গ্রামে গেলে পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করেছে, মারামারি করেছে, একবার তো সমবয়েসি চাচাতো ভাইয়ের মাথাই ফাটিয়ে দিয়েছিল র‍্যাকেট দিয়ে। তাইলে শুধু ক্রিকেট নিয়ে তার এই অবসেশন কেন? হিরো হিশেবে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য নিশ্চয়ই। তাছাড়া…, তাছাড়া এর মধ্যে অন্যরকম এক পৌরুষের ঝাঁজ পায় সে। অন্তত তার তা-ই মনে হয়। কিংবা এমনও হতে পারে বিদ্ঘুটে সমাজব্যবস্থা অন্য সবার মতো তার উপরও আরোপ করেছে এই পৌরুষ! হিরোবিহীন এই দেশে হিরোর খুব দরকার হয়ে পড়েছিল হয়তো, তাই ভারত-পাকিস্তানের দেখাদেখি ডামি হিরো বানিয়ে নিয়েছে এদেশের মানুষ।
বড় ভাইয়ার ক্রিকেট ব্যাগটার কথা মনে পড়ে হোমায়রার; শাদা রঙের একটা ব্যাগ। পাশাপাশি লম্বা ধরনের ভারী ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দুপুর শেষ না হতেই বের হয়ে যেত ভাইয়া। সেই ব্যাগে ব্যাট, প্যাড আর তোবড়ানো সুতা-ছেঁড়া লাল রঙের বল ছিল কয়েকটা। এর আগে সে জানতই না বল যে সেলাই করে বানানো যায়! ভীষণ বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল সেটা তার জন্য। ব্যাগটা ধরা তাদের দুইবোনের জন্য নিষেধ ছিল। মারাত্মক নিষেধ! তারপরও তারা বহুবার ব্যাগটা খুলে কাঠফাটা ব্যাটটা, চামড়া-ওঠা প্যাডগুলো আর ফ্যাকাশে লাল বলগুলো দেখত, ধরত। একবার লুকিয়েও রেখেছিল একটা বল। ব্যাগটা কেন তাদের আকর্ষণ করত সেটা সে বহুবার ভাববার চেষ্টা করেছে সে। অনেক পরে; যখন সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার অনাগত সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিল তখন কিঞ্চিৎ আবিষ্কার করতে পেরেছে বলে মনে হয়। সেই আবিষ্কারে নিঃসন্দেহ হওয়ার কিছু নাই হয়তো, কিন্তু সম্ভাবনা আছে।
সে দেখেছে ব্যাগটা কাঁধে ঝোলানোমাত্র ভাইয়ার চোখের মণি দুটো বদলে যেত। একটা প্রচ্ছন্ন হলুদ আভা জ্বলজ্বল করত চোখে। এটা বহুবার খেয়াল করেছে হোমায়রা। এক ধরনের বেটাগিরি এসে ভর করত ভাইয়ার উপর তখন। যেন নিঃশব্দে বলত তাদের, ‘চাইয়া দ্যাখ আমারে, আমার হেডম আছে যহন খুশি চাইর দেয়ালের বাইরে যাওনের, তোগো নাই। আমার পৌরুষ আমারে এই অধিকার দিছে!’
এটা একটা কারণ হতে পারে। কিংবা কোনও কারণ নাও থাকতে পারে। সে যে এখন, ইদানীং, গত ছয়-সাত বছর ধরে, প্রতিরাতে অথবা বেশিরভাগ রাতে বিশ্বকাপে ছক্কা না মেরে কিংবা কোহলির উইকেট না নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারে না এই সত্যকে জাস্টিফাই করার জন্য নিজেকে কোনও কারণ দর্শানোর মানে হয় না। এতে তার ঘুমের আকুতি, মুহুর্মুহু হাততালি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা; কোনোটাই মিথ্যা হয়ে যাবে না।
আজান হচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আলো ফুটে যাবে। চোখের পাতাও ভারী হয়ে আসতে শুরু করেছে এর মধ্যে। হোমায়রা সরাসরি ফাইনাল খেলায় চলে যায়। একশো চুরান্নবই রান তার। ডাবল সেঞ্চুরি হতে মাত্র ছয় রান লাগবে আর। রবিচন্দন অশ্বিনের আলতো বাঁক খাওয়া স্লো বলটাতে সপাটে ব্যাট চালায় সে। সোজা গ্যালারিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে বলটা।
সিক্স!
‘হোমায়রা, হোমায়রা!’
চিৎকারে ফেটে পড়েছে গ্যালারি। একটা বিক্ষুব্ধ সমুদ্র যেন চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে তার দিকে। আবেশে চোখদুটো আরেকটু ভারী হয়ে ওঠে তার। বন্ধ চোখের ভেতরে সে একটা বিশাল প্ল্যাকার্ড দেখতে পায়-
‘হোমায়রা, প্লিজ! ম্যারি মি!’
হোমায়রা হাসে।
হাসতে হাসতে তলিয়ে যায় ঘুমের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *