শাহাব আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস: পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু

৩৫ ৩ম পর্ব
“অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তাহে তৃণসম দহে।”
সুদীপ জানে কবিগুরুর বেশির ভাগ শিষ্য ও অনুসারীরা এই বাণী মেনে চলে। বিশেষ করে যারা বামপন্থী রাজনীতি করে বা মস্কো শহরে পড়াশুনো করে, তারা আরও একধাপ এগিয়ে। নিজেরা অন্যায় তো করেই না এবং যারা করে তাদেরও তীব্রভাবে ঘৃণা করে। তাদের প্যারামিটারে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে যারা ব্যবসা করে, তারা অন্যায়কারী। সুতরাং স্বদেশের হলেও তাদের সাথে মেলামেশা করাটাও সন্দেহজনক।
সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশুনা করতে আসা সিনিয়রদের অনেকের জীবনেই একটি মহান স্মৃতি আছে।

১৯৭৪ সালের ২১/২২ জুলাই রবিবার গণভবনে মস্কোর পথে রওনা হবার প্রাক-অপরাহ্নে অনাড়ম্বর এক বিদায় সম্বর্ধনায় তাদের সাথে কথা বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, “আজ থেকে তোরা প্রত্যেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। দেশের মান সবার উপরে রাখবি, তোদের দেখেই কিন্তু সোভিয়েতরা বাংলাদেশকে চিনবে, জানবে … … … …।”

যদিও দানবচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র ছাত্রীরা বঙ্গবন্ধুর আদেশ মান্য করেছে। হাতে গোনা মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ ছাত্র সোভিয়েত জনগণের কাছে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা সত্ত্বেও সুদীপের খুব মনে আছে কিভাবে তাদের মিটিংগুলোতে তাদেরই স্বদেশী ছাত্রদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিভেদের বিষ ঢালা হয়েছে।

সবই করা হয়েছে দেশপ্রেম, প্রগতি ও সমাজতন্ত্রের নাম নিয়ে। এখন সব বদলে গেছে। কমরেড, নন-কমরেড সবার জন্য ব্যবসা এখন বৈধ। নীতিগতভাবে সে কবিগুরুর বাণীর সাথে একমত, যদিও বাস্তব জীবনে তা সব সময় মেনে চলতে পারে না। সে অন্যায় করে না, কিন্তু যারা করে তাদের তাকে সইতে হয় এবং তাদের সাথে কাজও করতে হয়। সে ঘুষ খায় না, কিন্তু ঘুষ দেয়। না দিলে তার বৈধ কাজটিও অসম্পন্ন থেকে যায়। সুতরাং ঘুষ দেয়াটা তার কাছে আর আগের মত অত তীব্রভাবে অন্যায় মনে হয় না।
 

ছোট্ট মানুষ সে, অন্যায় করার সিঁড়িতে বেশ নিচে এবং অন্যায় সহ্য করার সিঁড়িতে বেশ ওপরে, প্রতিটি সাধারণ মানুষ যেমন। অসাধারণ মানুষ যারা তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টা।ওর এখন মনে হয় কবিগুরুর আমলে বা তারও আগে লোকজন বেশি সৎ ছিল। অন্যায় খুব একটা করতো না। এখন তা শরতের ঝরা পাতার মত, পা ফেললেই পায়ে মচমচ করে, পরিমাণেও এতবেশি যে পা দিয়ে ঠেলে নেয়া যায় না। তারপরে আছে অন্য দর্শন। এই যেমন চেখভ, তিনি যা বলেন, তা কি একজন বামপন্থীর পক্ষে মানা চলে? “Do silly things. Foolishness is a great deal more vital and healthy than our straining and striving after a meaningful life.”
 
সুদীপের কলেজের বন্ধু ইদ্রিশ এবং ইব্রাহিমরা কবিগুরুর কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে চেখভের কথা মেনে নিয়েছে হুবহু শাব্দিক অর্থে। ওরা এমনিতেই বুদ্ধিমান ছিল, চেখভের দেশে এসে রীতিমত প্রাজ্ঞ হয়েছে। ইদ্রিশ চালাক চতুর, বাঘের দুধের সাথে পাখির দুধ মিশিয়ে তাতে দু টুকরো মিছরি আর তিন স্তপকা ভদকা মিশিয়ে বিক্রি করে টাকা কামাই করায় ওর জুড়ি নেই। ইব্রাহীম ছিল নিরীহ, ভদ্র ও নামাজী। তারই সৎকারে যেতে হয়েছিল সুদীপকে সোভিয়েত ইওরোপীয় এক রিপাবলিকের ছোট্ট শহরে। সেখানে ইদ্রিশও ছিলো এবং ওদের দেখা হয়েছিল অনেক বছর পরে। বন্ধুকে সমাধিস্থ করার কাজটা খুবই অপ্রীতিকর। সেখানে উপস্থিত না হতে পারাটাই বরং ভালো। মনের ওপরে চাপ কম পড়ে। কিন্তু জীবন সব সময় ভালোটা সামনে ছুঁড়ে দেয় না।

সেই ১৯৮২ সালে ইব্রাহিম মস্কো থেকে ওর শহরে হোস্টেলে পৌঁছেই খোঁজ করে কাদের সাথে নামাজ পড়া যায়। শুওর খাওয়া নাস্তিক দেশে ২ সপ্তাহ পরে একদল সুদানী- ইয়েমেনীর খোঁজ পায়, যারা রুমে জামাত করে নামাজ পড়ে। ইব্রাহিম মনে স্বস্থি খুঁজে পায়। জামাতে নামাজ পড়ার পূণ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে প্রায় ২ সপ্তাহ। ২ টা জুম্মার জামাত মিস্ করেছে। জ্ঞান হবার পরে এমন কখনও হয়নি। হাজী বাড়ির ছেলে সে। নিজেদের বাড়িতে মসজিদ, পারিবারিক গোরস্থান। ওদের মান ইজ্জত কত! সৎ ও ধার্মিক পরিবার।

সে এসেছে সরকারি বৃত্তি নিয়ে। তুলনামূলকভাবে ভালোছাত্রেরা সরকারি বৃত্তি নিয়ে নিজেরা টিকেট কিনে এই দেশে আসে। রাজনৈতিক বৃত্তি নিয়ে আসে ভালো-মন্দ সব ধরনের ছাত্র-ছাত্রীরা। টিকিট কিনতে হয় না বলে অনেকে আবার সরকারি বৃত্তি পেয়েও পথ ঘাট জানা থাকলে রাজনৈতিক লাইনে চলে আসে।
 

ইদ্রিশ দেশে ছাত্রলীগ করতো, সুতরাং আওয়ামী লীগের বৃত্তি নিয়ে আসাটা অসম্ভব নয়। ইব্রাহিম ইতিমধ্যেই কয়েকবার বার্লিন লন্ডন গিয়েছে ইদ্রিশের “আদম বা পাইলট” হয়ে। দুটো জিনসের প্যান্ট, দুটো শার্ট সাথে, একজোড়া সুন্দর ক্যাটস পায়ে, একটি রেকর্ড প্লেয়ার কাঁধে নিয়ে এসেছে। সাথে কয়েকবাক্স বিদেশি কন্ডম। আসার সাথে সাথে রুম থেকে ইদ্রিশ জিনিসগুলো নিয়ে গেছে। বিক্রির লাভ থেকে ওকে ২শ ডলার দিয়েছে। ২শ ডলার সেই ৮৩ সালে ছিল ৮০০ রুবল, প্রতিটা ছাত্রের প্রায় ৯ মাসের বৃত্তির সমান। আলিবর্দী খানের পুকুরভরা মাছ ও গোলাভরা ধানের মত। তবে এটা শুধু যারা মাটির গর্তে ঘুমানো দিগম্বর ডায়োজিনিসের শিষ্য, তাদের জন্য। সবার জন্য এই টাকা পর্যাপ্ত নয়, ব্যস্ত জীবনের মান বজায় রাখতে তাদের বছরে কয়েকটি ট্রিপ দিতে হয় ।

ইব্রাহীমের পড়াশুনা, ব্যবসা, আল্লা বিল্লা চলতে থাকে সুস্থির মতই। কিন্তু শয়তান তো বসে থাকে না, আসে নারীর রূপ ধরে। পাশের রুমের মেয়েটা সুন্দর। হিজাব পর্দা মানে না। শীতে যা-ও কিছু ঢাকা থাকে গ্রীষ্মে একেবারে উন্মুক্ত ফুল-বাগানের মত। আল্লার দেয়া চোখ, বুজে রাখা যায় না সব সময়। খুললেই চোখে পড়ে ফুল; নাভির ফুল, বুকের ফুল, মুখের ফুল, ফুল বেহেশতি খুশবুর।

কিচেনে একই স্টোভে রান্না করার সময়ে একটু আধটু কথাবার্তা হয়, আস্তে আস্তে খাতির বাড়ে। খুশবু ওকে রুমে দাওয়াত করে, এবং ওর রুমে গেলে ইব্রাহিমের মাথা ঘুরায়। কেমন কেমন লাগে ঠিক বর্ণনা করতে পারে না।

সুদানী- ইয়েমেনীদের সাথে ওর যোগাযোগ কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যায়। নামাজেও মন বসে না। মেয়েটির রুমেই বেশি ভালো লাগে, ওর বিছানায় বসা যায়, গা এলানোতেও বাঁধা নেই, মেয়েটিও বসে খুব কাছাকাছি। বয়েস ৭৫ নয়, পঁচিশও নয়, বড়জোর ২০। খুব একটা ড্রিংক করে না কিন্তু ইব্রাহিম বুঝে ফেলেছে যে একটু আধটু ড্রিংক করলে সে বেশি প্রাণবন্ত, প্রগলভ ও নিবিড় হয়, বন্ধুত্বের রং আরো বেশি তীব্র হয়। তাই সে শ্যাম্পেন আর ফুল কিনতে শুরু করে। নারীকে কাছে পেতে পুরুষ কী না করে? আর নারী যদি হয় পরপারের হুর পরীর চেয়েও উষ্ণ এবং জাগতিক রক্ত-মাংসের, তাহলে তো কথাই নেই। শ্যাম্পেনের স্বাদ মিষ্টি। এতবেশি বুদবুদ সেখানে যে দেখতেও অপূর্ব লাগে। ক্রিস্টালের গ্লাসে হলদে-সোনালি তরল সত্যই যেন অমরাবতীর পানীয়। জিনিসটা ইব্রাহিম ভালোবেসে ফেলে। বোতল খুলতে হয় খুব সাবধানে, একটু ঝাঁকি লাগলেই সবটা বেরিয়ে আসে ফোয়ারার মত। একবার বোতল খুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে, অসাবধানতাবশত পুরো ফোয়ারই সে ঢেলে দেয় খুশবুর বুকে। কিন্তু ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। খুশবুর সম্পূর্ণ ভেজা ড্রেস বদলাতে হয়, রুমে আড়াল হবার জায়গা নেই, কাছের বন্ধুকে বের করে দেয়াও শালীন নয়।
 

বলে ,”তুমি একটু চোখ বুঝে থাকো, খবরদার তাকাবে না কিন্তু।”
 
কিন্তু আল্লা চোখ দিয়েছে তার নিয়ামত দেখার জন্য, চোখ বুজে কি থাকা যায়? ও চোখ খুলে তাকিয়ে পাগল হয়ে যায়। আর পাগলে কী না করে? মেয়ে বাধা দেয় না। শ্যাম্পেনে ভেজা নারী রাজহাঁসের চেয়েও সুন্দর হয়।

তবে ভদকার ঝাঁজ একটু বেশি, কাজ করে তাড়াতাড়ি। রুশ মেয়েরা ভদকা খায় না। কিন্তু পুরুষরা শ্যাম্পেনে মজা পায় না, খুব হাল্কা জিনিস। মাথার ভেতরে গরুর পেছনের পায়ের ছিটা-লাত্থির মত ভদকার স্বাদ। পুরুষ তা-ই পছন্দ করে। মেয়েদের সাথে পুরুষের এটা মৌলিক তফাত।
 

আস্তে আস্তে ইব্রাহিম সসেজ ও কালবাছা খেতে শেখে। সসেজ আঙুলের মত চিকন, আর কালবাছা বাঁশের মত মোটা। কিমা জাতীয় মাংস দিয়ে বানানো, সাথে বিভিন্ন রকমের স্পাইস। মাংস সচরাচর মিশ্র, যেখানে বরাহ বাফালো ভাই ভাই। নরম “দক্তরস্কায়া” কালবাছার চেয়ে শক্ত “কাপচেওন্নায়া” কালবাছা বেশি স্বাদু। ইব্রাহীম বুঝতে পারে না, এত সুস্বাদু একটা মাংসকে সারা দুনিয়া খায় কিন্তু আমাদের দেশে খায় না কেন। তবে এসব নিয়ে সে এখন আর ভাবে না। পৃথিবীর হুরী পরকালের হুরীর চেয়ে উষ্ণ ও নগদ। মরে-পচে কিয়ামতের ময়দান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। পরকালের শরাবের চেয়ে ইহকালের ভদকা খারাপ এই সাক্ষী কেউ দেয় নাই। তাই খেতে চাও খাও, চাখতে চাও চাখো। তবে নরম খুশবু সব স্বাদের সেরা। রূপে বর্ণে গন্ধে ঘ্রাণে স্পর্শে যত্নে সব কিছুতেই….

ইব্রাহিম ‘স্মিতানা’ খুব পছন্দ করে। দুধ দিয়ে তৈরী দৈয়ের মত একটি জিনিস, সামান্য টক, বেশ ফ্যাটিও সুস্বাদু। অন্যদেশে বলে ‘টক ক্রিম।’ বাংলাদেশে হয় না। প্যালেস্টাইনের নাসের বলেছে ওটা খেলে পুরুষের পটেন্সি বাড়ে এবং বান্ধবীরা খুশি থাকে। ত্যানার মত পটেন্সি নিয়ে এমনিতেও মেয়েদের কাছে যেতে নেই। ইব্রাহিম উপদেশটা খুব সিরিয়াসভাবে নিয়েছে। এবং সে সুচারুরূপে পালন করে, ফলাফল ঈর্ষণীয়।
 

তবে সে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ সবাইকে এত সুন্দরভাবে, বিনা প্ররিশ্রমে, বিনা দায়িত্বে জীবন ভোগ করার তৌফিক দেন নাই। এইদেশে আসার কারণেই এই সুযোগ হয়েছে। আমেরিকা লন্ডনে হলে গাড়ি চালিয়ে বা খবরের কাগজ বা স্যান্ডউইচ বেচে জীবন যেত। কিসের খুশবু, কোনো কালু বা ল্যাটিন মেয়ে জোগাড় করতেও খবর ছিল। তাই আল্লার নিয়ামত থেকে জীবনকে বঞ্চিত করার কোনোই অর্থ হয় না। বাংলাদেশ কমিউনিষ্টগুলো প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ, ওরা নিজেরা খাবে না, অন্যদেরও খেতে দেবে না। খোদার দুনিয়ায় এই অন্যায় কখনই চলতে পারে না।

ইব্রাহিম শেষ পর্যন্ত খুশবুকেই বিয়ে করে। বাচ্চা হয় দু’মাস পরেই। তারপরে আরও ১ টা। মেয়েটা ভালো, সংসারী। পেরেস্ত্রইকার ডামাডোলে ডলার কিনে, ডলার বেচে ইব্রাহিম প্রচুর কাঁচা টাকা কামাই করতে থাকে। ওর মদ খাবার মাত্রা বেড়ে যায়। স্ত্রীকে লুকিয়ে অন্য গোয়ালেও দুধ খায় নিয়মিত। শেষপর্যন্ত স্ত্রী বিরক্ত হয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে ওকে ফেলে চলে যায়। অবাধ যৌনাচার তাকে হেপাটাইটিস সি এনে দেয়। এই রোগ ও মাত্রাতিরিক্ত মদে লিভার সিরোসিস হয়। সে এমনিতেই মারা যেত। কিন্তু আল্লাহর মর্জি কে বোঝে?

একদিন সে তার এক স্বল্প পরিচিত বান্ধবীর বাসায় যায়। মেয়েটি “ভাল্যুতনায়া প্রস্তিতিউতকা”, হোটেলের কলগার্লদের জন্য ডলার কিনে কমিশন খায়। এ কাজের মাধ্যমেই ইব্রাহিমের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্টতা হয়।

মাঝে মধ্যে ব্যবসা ছাড়াও একে অন্যের সান্নিধ্য বিনিময় হয়। সে-ই ওকে বাসায় ডেকেছিল, কিছু ডলার ভাঙাবে প্লাস একটু আনন্দ ফুর্তি করবে। আনন্দ ফুর্তির পরে সে বান্ধবীর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে।

মেয়ে নি:শব্দে দরজা খুলে দেয়। ওর সহচররা এসে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে জার পাভেলসহ ইতিহাসের বহু রাজা বাদশার মত ওকে …..
 

তারপরে ওর ডলারের ব্যাগটা রেখে বাইরে নিয়ে নির্জন কোথাও ফেলে দেয়। আল্লার নিয়মের বিরুদ্ধচারণ করে ওর মত বিশ্বাসী মানুষের জন্য কমিউনিষ্টরা যে স্বর্গোদ্যান তৈরি করেছিল তার পতন দেখার আগেই সে চলে যায়।

৩৬ ৩ম পর্ব

চেখভ বলেন ,”Even in Siberia there is happiness”- সুদীপ সাইবেরিয়ায় না থেকেও জানে কথাটা সত্য। জানে ইদ্রিশও। পৃথিবীতে কোনো দেশ এত সুখের নয়, যতটা সোভিয়েত ইউনিয়ন। সুখী হবার জন্য যা যা দরকার সব ওখানে আছে।তবে শর্ত একটাঃ বিদেশি হতে হয়। এইদেশিরা সুখের ব্যাপারে অন্যমত ধারণ করে বলেই পেরেস্ত্রইকার প্রয়োজন পড়ে। তা নইলে রূপকথার রাজপুত্র – রাজকন্যার মত চিরকাল তারা সুখেই থাকতে পারতো। আর গর্বাচভ ক্ষমতায় থাকতে পারতো ব্রেজনেভের মত হাত, পা জিভ ও গলার স্বর কাঁপা পর্যন্ত। পেরেস্ত্রইকার শুরু হয়েছিল যে সম্পূর্ণভাবেই অবজেকটিভ কারণে এবং এটা মোটেও কোন ব্যক্তিনির্ভর ব্যাপার ছিল না, বাংলাদেশের রোমান্টিক বিপ্লবীরা এ কথাটা এখনও বিশ্বাস করতে পারে না। বিশ্বাসের ওপরে কারো হাত নাই। বিশ্বাসের ভাইরাস আর অবিশ্বাসের ভাইরাস- দুই জিনিস মনে হলেও, আদতে চরিত্র তাদের একই, অন্তত মানুষকে লঘু করার ক্ষেত্রে।
 

ইদ্রিশ ছিল চাপাবাজ ও প্যাথোলজিকাল লায়ার। দেশে থাকতেই সোভিয়েত ফেরত এক বড় ভাই ওকে কিছু মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিল ব্যবসা বিষয়ে। বলে দিয়েছিল জিন্স, ক্যাটস, বাক্সভর্তি কনডম, বিদেশি চুইংগাম, কমদামি চাইনিজ লিপস্টিক ও কসমেটিকস বক্স নিয়ে যেতে। সোভিয়েত মেয়েদের নাক ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মানদের মত অত উঁচা নয়। ওরা ভালো, রেসিজম কম, বন্ধুত্বপরায়ন, আদর দিলে আদর ফেরত দেয় এবং খুব সামান্য উপহার পেয়ে শিশুর মত খুশি হয়। সুতরাং তারই সাথে আসা অন্যান্যদের তুলনায় ইদ্রিশ ছিল ‘ওয়েল ইনফরমড এন্ড ওয়েল প্রিপেয়ার্ড’।
 
ইদ্রিশ যখন বাংলাদেশ থেকে এসে পৌঁছায়, ট্রেনস্টেশন থেকেই নাকি ধরে নিয়ে ওকে খুঁজলি পাচরা উকুনের ক্যারান্টিনে হাসপাতালে ঢোকানো হয়। এটা ওরই বলা গল্প। সুদীপের এমন কোন অভিজ্ঞতা নেই। হাসপাতালে বিশাল এক গোসলখানায় নিয়ে বাথটাবপূর্ণ জলে ডুবিয়ে ওকে গোছল করাতে শুরু করে এপ্রোনপরা যুবতী নার্স। সেই বন্ধ গোছলখানায় সমবয়সী দুজনের মধ্যে খাতির হতে সময় লাগে না। সে হাসতে হাসতে মেয়েটাকে জল দিয়ে ভিজিয়ে দেয়। আর সেই মেয়ে “আ তি হুলিগান ” বলে তেড়ে এসে ওর বাহু বন্ধনে আটকা পড়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য।

মেয়েদের এমন হয় কখনও কখনও। বিশেষ করে যৌবন যাদের আষাঢ়ে গল্পের মত আষাঢ়ে পরিপূর্ণ। আর নার্স বলেই যে তার রেসপন্স সিস্টেম অফ থাকবে এমনও কোনো কথা নেই। ইদ্রিশ অবশ্য ওকে দেশ থেকে নিয়ে আসা উপহার দিয়ে আনন্দে আটখানা করে রেখেছে এবং বেশ কিছুদিনের জন্য ওকে অন্য কোনো নারী খুঁজতে হয়নি।
 

এটা ছিল ঘনিষ্ট মহলে ইদ্রিশের সবচেয়ে বড় গর্ব করার বিষয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে ভাষা না জানা সত্ত্বেও তৃতীয় দিনে সে বান্ধবী জোগাড় করে সর্বোচ্চ গভীরতায় ঝাঁপ দেয়ার মত বীরত্ব দেখিয়েছে এমন ইতিহাস আর নেই।
 
“আর কোন্ হালায় এই কথা কইতে পারবো?” সে প্রায় বুক চাপড়ে বলতো। নি:সন্দেহে এটা ছিল ইদ্রিশের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।

সে দেশে ভালোছাত্র ছিল কিন্তু এখানকার ব্যবসা এবং কচি কচি মিষ্টি মেয়েগুলো ওর মাথাটা খেয়ে ফেলে। সে ফেল করে না, কোনোভাবে বছরের পর বছর ক্লাশ পার হয়ে যায়। কারো কারো জন্য সে দেশে ক্লাশ পার হওয়া নরকের নদী অ্যাচেরন পার হওয়ার মত ছিলো না। আর সব শিক্ষকও অ্যাচেরনের খেয়া মাঝি শ্যারনের মত কাঠ খোট্টা নয়, কেউ কেউ তোবারক দিয়ে তাদের তুষ্ট করতে পারে সহজেই।
 

ইদ্রিশের দুর্নির্ময় রোগ হল নারী। এছাড়া সে প্রাণোচ্ছল, বন্ধুবৎসল ও উদার। সাহায্য করে সবাইকে। এই রোগ অন্যদের নেই বলা যাবে না, বললে অনেকেরই আত্মসম্মানে লাগবে। কিন্তু ওর অ্যাপেটাইট প্যাথলজিকাল। প্রায় প্রতিদিনই দরকার এবং ভ্যারাইটিও দরকার। একজনের সাথে দীর্ঘদিন থাকার চেয়ে ও বরং জেলে থাকবে।

ওর সুবিধা আছে। কথা বলতে ভীষণ পটু, শরীরের গঠন এবং চেহারা সুন্দর, বিদেশি জামা-কাপড়ে খুব ফিটফাট থাকে। পকেটে পয়সাঅলা পুরুষ দেখতে সবচেয়ে সুন্দর মোরগের চেয়েও সুন্দর।
 

“শালা সুদীপ একটা গাধা! শালার ভেতরে কোনো মাল নাই বইলাই কমিউনিষ্ট সাইজা বইছে।” এটা ইদ্রিশ সুদীপের সামনেই বন্ধুদের বলে জোর গলায়, আর হাসে হা হা করে।
 
বাবুই পাখির মত বিভিন্ন ক্ষেতে ধান খেলেও সে যৌনরোগ ও প্র্যাগন্যান্সি প্রতিরোধের ব্যাপারে খুব সচেতন। তা সত্ত্বেও একবার সে ধরা খায়। সে বার্লিন থেকে ট্রেনে ফিরছিল। দুই জার্মানি এক হয়ে গেছে, সেখানে উৎসব চলছে। পৃথিবীর সব মানুষের মত সেও বিস্মিত হয়ে বার্লিনে বসে শুনেছে দুদিন আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির খবর। অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য। তাড়াতাড়ি সওদা পত্র কিনে ফিরতি ট্রেনে চড়ে বসেছে। ট্রেন প্রায় খালি। সারা ওয়াগনে সে আর একজন মাত্র যাত্রী। নি:সঙ্গ লাগে। লম্বা এক ক্যান বিয়ার হাতে নিয়ে ট্রেনের এক ওয়াগন থেকে অন্য ওয়াগনে হাঁটতে থাকে সে। শেষপর্যন্ত তার দেখা হয় একটি মেয়ের সাথে, কোনো ঈশ্বরীর লিকলিকে ছোটবোন। সে নি:সঙ্গ করিডোরে দাঁড়িয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়েছিল বাইরের দ্রুত ছুটে যাওয়া তারাময় আকাশের দিকে। ইদ্রিশ তার স্বভাবজাত চুম্বক দিয়ে তার সাথে খাতির জমিয়ে ফেলে।

গ্রুস্তিস? (বিষণ্ণ লাগছে?)

মেয়ে মাথা নাড়ে।

“বিয়ার খাবে?”

রাজি হয়।

“পাইদোম কাম্নিয়ে- চল আমার সাথে।

দুজনে চলে আসে ইদ্রিশের ফাঁকা কামরায়।

বিয়ার চলে এক ক্যান, দুই ক্যান, তারপরে তিন। পেস্তাবাদামের খোসা খুলে খেতে গল্প জমে উঠে।

রাহুল সাংকৃত্যায়নের গঙ্গা ভোলগার নির্জন নির্ঝরের অরণ্যে হাঁটা নর নারীর মত ওরা, যেখানে নর ফুল তুলে গেঁথে দেয় নারীর চুলে আর নারী মুগ্ধ সম্মোহিত হয়ে থাকে। তারপরে আকাশে ঘনীভূত সাদা মেঘের মত নিবিড়তায় বিলীন হয়ে যায়। মান্দ্র নেশার পরাবাস্তবতায় শূন্য ট্রেনের ঝাঁকুনির সাথে ওদেরও একাকার হয়ে যেতে সময় লাগে না। মেয়ে তাকে শুধুমাত্র আনন্দের নীলপদ্মই নয়, নরমগুল্মের মাঠ থেকে উপহার দেয় কিছু উঁকুন। কদিন তার কাটে বেশ চুলকানির মধ্যে। তারপরে শুরু হয় পেসাবের জ্বালা-পোড়া এবং টিউব থেকে গলে গলে পড়ে হলুদ পুঁজ।

“সাবধান হে, গনোরিয়ার চিকিৎসা করা যায়, এইডসের কামড় কিন্তু মরন কামড়।”-ডাক্তার বলে।

মেয়েটি ভালো, ওর ব্যাগে এইডস ছিলো না। কিন্ত ফিরে এসে ইতিমধ্যেই সে এক বান্ধবিকে গনোরিয়া আর লাইস উপহার দিয়েছে। কয়েকদিন না যেতেই ওই বান্ধবি ওর রুমে এসে বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ে।

“পিজদুন”, “ব্লিয়াত” -ইত্যাদি যত ঝাঁঝালো শব্দ আছে রুশ ডিকশনারিতে উচ্চারণ করতে করতে কিল, ঘুষি, চড়, চাপড় মেরে ওর চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করতে থাকে। ভাবটা এমন, সে একজন স্বাধ্বী সন্ন্যাসীনি আর ইদ্রিশ বহুগামী লোচ্চা। ওর রুমের অবস্থা হয় রাশিয়ার ‘বরোদিনো’ যুদ্ধপরবর্তী বিশৃংখল মাঠের মত।

ট্রেনের ওই মেয়েটি সম্ভবত সাধারণ ছিল না। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে সোভিয়েত সমাজে পতিতাবৃত্তি নির্মূল করা হয়েছিল কিন্তু যেখানেই বিদেশি বা ইনট্যুরিস্ট হোটেল ছিল, সেখানেই ছিল এরা। তারা সিস্টেমের রক্তচক্ষু এড়িয়ে বিদেশিদের প্রতি নিবেদিত ও অতিথিপরায়ন থেকেছে ডলারের বিনিময়ে।

স্থানীয় পুলিশ ও গুপ্তপুলিশ এদের জানতো, চিনতো এবং এদের আয়ের একটি অংশের বিনিময়ে চোখ বুজে থাকতো। এদের সাথে জড়িত থাকতো আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাদভূমির প্রচ্ছন্ন অপরাধ চক্র। আপাত স্বাধীন এই মেয়েরা ছিল যে কোনো সমাজের সমপেশার নারীদের মতই বহু অদৃশ্য সুতায় আষ্ঠে-পৃষ্ঠে বাঁধা।

স্বাধীনতা একটি রোমান্টিক আইডিয়া। স্বাধীন শুধু প্যারাসাইট। এই মেয়েদেরও মেনে চলতে হতো কঠোর বিধি নিষেধ, অবাধ্য হতে পারতো না। অবাধ্য হওয়ার শাস্তি ছিল কঠিন, সব দেশের মতই। কখনও কখনও মিলিশিয়াকে সমাজ বা পার্টি নেতৃত্বকে দেখাতে হতো যে তারা কাজ করছে, অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ছে, সমাজের বিশুদ্ধতা রক্ষা করছে। তখন এদের অনেককেই ধরে জেলে পুরে দেয়া হয়। তবে বেশির ভাগ সেখান থেকে ছাড়া পায়, শুধু কেউ সুনজর বঞ্চিত হলে জেলে পচে। জেল হাজতে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে হরদম। কেন নয়, জেলাররা ও তো মানুষ!

পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার পরে বাইরে যাবার ব্যাপারে যখন শিথিলতা শুরু হয় তখন কিছু নারী তাদের দেহ ও দৈহিক সৌন্দর্যকে এক্সপোর্ট করা শুরু করে। বাইরে যাতায়াতের মাধ্যমে তারা অর্থ কামাই করতে থাকে। ইদ্রিশের এক বন্ধু এই সময়ে রীতিমত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। সে জাপান, থাইল্যান্ড, আরবী মহাদেশ ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক রম্ভা, ঘৃতাচি ও উর্বশী পাঠাতে শুরু করে ট্যুরিস্ট হিসেবে। বাংলাদেশের নামাজ রোজা করা বেশ কিছু ব্যবসায়ি ও দেশপ্রেমি জাতীয় রাজনীতিবিদ তাদের সান্নিধ্য উপভোগ করে এবং মেয়েরা ভ্রমণশেষে হার্ড কারেন্সি নিয়ে ঘরে ফেরে।

ট্রেনের ওই মেয়ে হয়তো জানেই না সে কী বহন করছে তার শরীরের গহীনে। বহুক্ষেত্রে মেয়েরা এইসব রোগ উপসর্গহীনভাবে ক্যারি করে। সবচেয়ে ট্র্যাজিক হল উপসর্গহীন এইডস। ওরা অমৃতের পেয়ালায় মৃত্যু বিতরণ করে করে একদিন নিজেরাও ঝরে যায়। আদর্শগত তফাত যাই থাকুক না কেন, এইডস পুঁজিবাদী বা সমাজবাদী পতিত নারীকে ভিন্ন চোখে দেখে না।
 

ইদ্রিশ ব্যবসা করা শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নে আসার কিছুদিনের মধ্যেই। বার্লিন গিয়ে শুল্কমুক্তভাবে ১টা টিভি, ১ টা ক্যাসেট প্লেয়ার, ৩টা জিন্সের প্যান্ট, জিন্সের শার্ট, ৩ টা কডের প্যান্ট, ১ টা সোয়েটার, ১০ টা গানের ডিস্ক নিয়ে আসা যেতো। লাভ হয় প্রচুর। তারপরে সে আস্তে আস্তে অন্যান্য বিদেশিদের পাঠাতে শুরু করে ‘আদম’ বা ‘পাইলট’ হিসাবে। তারা বার্লিনে গিয়ে মাল-পত্র এনে দেয়ার বিনিময়ে কিছু টাকা পায়। তবে ভিয়েতনাম, কিউবা, নিকারাগুয়া এবং সমাজতান্ত্রিক দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্যাপিটালিস্ট দেশে যাওয়া নিষেধ ছিল।
 
প্রতিটি ডিন অফিসে বিদেশি ছাত্রদের ছুটির সময়টাতে বাইরের থেকে নির্দিষ্ট ওজনের পার্সেল আনানোর লাইসেন্স দেয়া হয়। বিদেশ থেকে জামা কাপড় জুতা ইত্যাদিসহ পার্সেল পাঠালে যার নামে পার্সেল, তাকে লাইসেন্স ও পাসপোর্টসহ পোস্ট অফিসে গিয়ে তুলে আনতে হয়। শুল্ক দিতে হয় না। সব বিদেশির জন্যই এই লাইসেন্স বরাদ্ধ ছিল, যদিও সবাই এটা জানে না। যে সব বিদেশি বাইরে যায় না বা যেতে পরে না তাদের লাইসেন্সগুলো অব্যবহৃত থেকে যায়।

ইদ্রিশ একটি অত্যন্ত ক্রিয়েটিভ ও অভিনব ব্যবসা শুরু করে। সে খুঁজে খুঁজে বের করে কারা লাইসেন্স ব্যবহার করে না। সে তাদের ১০০ ডলার করে অফার করে। শর্ত সে বার্লিন থেকে পার্সেল পাঠাবে তাদের নামে। তারা পোস্ট অফিস থেকে সেই পার্সেল তুলে এনে ওকে দেবে এবং ১০০ ডলার পাবে। এটি এক বড় ব্যবসার দ্বার খুলে দেয়। তার বিভিন্ন চ্যানেল দিয়ে মাল আসতে থাকে। বিক্রি হতে থাকে পরীক্ষিত চ্যানেলে। সে অনেক টাকার মালিক হয়ে ওঠে। এরপরে সে বৈদেশিক বানিজ্য ব্যাংক ভালো একটি কানেকশন খুঁজে পায়। এর মাধ্যমে ওর বাইরে টাকা পাঠানোর পথ উন্মুক্ত হয়। কোনো এক ব্যবসায়ি বড় ভাই তাকে ট্রিকটি শিখিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে ঢোকার সময় যে পরিমাণ ডলার (বা হার্ড কারেন্সি) ডিক্লেয়ার করা হতো, শুধুমাত্র সেই পরিমাণ টাকা বাইরে নিয়ে যাওয়া যেত বা বৈদেশিক বানিজ্য ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রান্সফার করা যেত।

সে প্রতিবার বর্ডার পার করে ফেরত আসার সময় যে কোনো অংকের ডলারের ডিক্লারেশন করে ঢোকে। তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল কাস্টমসের সিলটি। সে সাথে নিয়ে আসে এয়ারপোর্টে থাকা বেশকিছু ব্লান্ক ডিক্লারেশন ফর্ম। পরে এই ব্লান্ক ফর্মটি পূর্ণ করে একটি বড় অংকের ডলারের সংখ্যা লিখে। এরপরে সদ্য ডিক্লেয়ার করা কাস্টমসের সিলসহ অরিজিনাল ফর্মটির ওপরে রেখে সিদ্ধ গরম ডিম ধরলে সিলটি অবিকলভাবে ট্রান্সফার হয়ে যায় জাল ডিক্লারেশনে। আসল নকল ধরা প্রায় অসম্ভব।

আর ব্যাংকে যারা ধরবে তারা যেহেতু পরিচিত, সে উল্লেখিত সংখ্যক ডলার বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে সহজেই। এক গ্রীষ্মে সে এভাবে পঞ্চাশ হাজার ডলার পাচার করে, যার অপরাধ এতবড় যে, সারাজীবন জেল খাটলেও শোধ হবে কিনা সন্দেহ। মাঝে মাঝে সে অন্যদের টাকা পাঠিয়েও কমিশন অর্জন করে।

পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার পরে সে ব্যবসার পাইওনিয়দের একজন হয়। অন্য যে শহরে সে ছিল, তা ছেড়ে সাথে সাথে মস্কো চলে আসে। বড় ব্যবসার জন্য মস্কো হচ্ছে সর্বোত্তম স্থান। একটি জাঁকজমকপূর্ণ অফিস নেয়। মস্কোর সুন্দরি এবং সবচেয়ে প্রফেশনাল সেক্রেটারিগুলোকে বেছে বেছে নেয় অফিসের জন্য কিন্তু প্রায় প্রতিমাসেই দেখা যায় নতুন মুখ। ওরা বেশিদিন থাকে না। কাজ করতে আসা সবাই ওর অ্যাপেটাইটের খাদ্য-পানীয় হতে রাজী হয় না। ফলে তাদের যেতে হয়। যারা রাজি হয়, তারাও দ্রুত পুরোনো হয়ে যায় এবং তাদেরও যেতে হয় কারণ ওর প্রয়োজন নতুন নতুন পুতুলের। মস্কো ক্যাপিটালিজমের পথে হাঁটছে না, দৌড়াচ্ছে খুব সফিস্টিকেটেড শাখের করাত হাতে নিয়ে। সাধারণ মানুষ পুঁজির দাস বা দাসী। ক্যাপিটালিজমে মানুষ একটি সংখ্যা। পদ্মলোচন সমাজতন্ত্রেও সে সংখ্যাই রয়ে গেছে। শুধু ক্যাপিটালিজমে মানুষ বিষ খাবে না বিষ্ঠা খাবে তা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অন্যত্র রাষ্ট্র এবং পার্টি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

৩৭ তম পর্ব

ইদ্রিশ বেশ বড় বড় কনট্রাক্ট পায়, বহু বড় বড় কোম্পানিকে কম্পিউটার ইলেকট্রনিক সরবরাহ করে। অর্থ আসে চারিদিক দিয়ে। তবে সে অসংখ্য ছাত্রকে বুদ্ধি, পরামর্শ ও অর্থ ধার দিয়ে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে তার অফিস ছিল সতীর্থ ও স্বগোত্রের লোকজনের জন্য বেশ ভালো চায়ের আড্ডা। মনটা উদার। হাসিটা ছোঁয়াচে।

একদিন আসে প্রায় দেড় লাখ ডলারের কম্পিউটার সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্ট। তখনও মিলিয়ন বা মাল্টি মিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট আসা শুরু হয়নি। ইদ্রিশ বা কেউ ধারণাই করতে পারেনি তুষার ধ্বসের মতই এই মেগা কন্ট্রাকটগুলো আসবে শিগগিরই। এবং সারাদেশটাই পরিবর্তিত হয়ে যাবে হরিলুটের বাতাসায়।

যারা এতকাল ক্ষমতায় ছিল মার্কস-লেনিনের শিষ্য হয়ে, যারা সারা দুনিয়ার কম্যুনিষ্ট পার্টিগুলোকে মূলা ও মুগুর দিয়ে পোষ্য রেখেছে এবং তাদের মেষশাবক থেকে মেষে উত্তরণে হতে দেয় নাই, সেই তারাই রাতারাতি পার্টি বদল করে। ১৯৬৪ সালে মাও সে তুং একটি তীক্ষ্ণ ভবিষৎবাণী করেছিলেন : “১৯৫৩ সালের পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতায় এসেছে জাতীয়তাবাদী, সুবিধাবাদী এবং ঘুষখোরের দল। ক্রেমলিন তাদের পৃষ্ঠপোষক। সময় আসবে যখন ওরা মুখোশ ও পার্টির কার্ড ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রকাশ্যে নিজ নিজ এলাকায় শাসন করবে ফিউডাল ও ভূমিদাস প্রথায়।”

কী নির্ভুল উপলব্ধি!

অথচ নিজের দেশে অবিকল স্ট্যালিনের মতই “জাতীয়তাবাদী, সুবিধাবাদী এবং ঘুষখোর” তৈরির কল-কব্জা প্রতিষ্ঠা করে তিনি ভেবেছিলেন যে তার মৃত্যুর পরে অন্যথা হবে। তার দেশে তৈরি হবে লাল ফেরেশতার দল।

কিন্তু তারও আগে স্ট্যালিনকে “বিপ্লবের গোরখোদক” উল্লেখ করে ট্রটস্কি বলেছিলেন, “যদি আমলাতন্ত্র ক্ষমতায় থাকে এবং শ্রমিকদের কোনো সমাজ বিপ্লব তাদের উৎখাত না করে, সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান হবে।”

মার্কসও অতি আগ্রহী আমলাদের আগমন সম্পর্কে জানতেন, তাই তিনি নিজেকে তাদের থেকে সরিয়ে বলেছিলেন : “If anything is certain, it is that I myself am not a Marxist.”

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত রাজবন্দী ভ্লাদিমির বুকোভস্কিকে বিনিময় করা হয়েছিল চিলির রাজবন্দী কম্যুনিস্ট নেতা লুই করভালানের সাথে, সোভিয়েত ইউনিয়নে বেঁচে থাকলে মার্কসকেও হয়তো সেভাবেই বিনিময় করা হত বিদেশের তারই কোনো অন্ধ অনুসারীর সাথে।

ইদ্রিশ অসম্ভব চতুর হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার মার্ক্সিস্টদের চিনতে ভুল করে। অবশ্য একমাত্র সে-ই নয়, খাপড়া ওয়ার্ডে যারা নিহত ও আহত হয়েছেন তারাও এদের চিনতে পারেন নি। তারপরে যে অসংখ্যজন নিহত ও আহত হয়েছেন জেলের বাইরে, রাজপথে বা যারা জেল খেটেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, আত্মগোপনে ও অনাহারে রয়েছেন, নিজেদের জমিদারী বিলিয়ে দিয়ে চিরকুমার থেকেছেন তারা সবাই ইদ্রিশের সাথে দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেও একই ভ্রান্ত উপাত্তে উপনীত হয়েছিলেন।
 

তাই ইদ্রিশের মনে হয়েছিল এ এক বিরাট সুযোগ, এত টাকা হাতছাড়া করা যায় না। সরকারি যে বিশাল কোম্পানির থেকে টাকাটা সে পায়, তাদের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ পরামর্শে সে তা গায়েব করে দিয়ে তাদের সাথে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। কোনো মাল সরবরাহ দেয় না। তখনকার দিনের এসব ঘটনা ছিল গয়রহ। সবসংস্থাই তখন ভীষণভাবে ব্যস্ত চুরির মহামারীতে। কে কাকে ধরে? কিন্তু সারা জীবন ভাগ্য ফেভার করলেও এখানে বেঁকে বসে। গুপ্তপুলিশ তাকে খুঁজতে শুরু করে। সে তড়িঘড়ি অফিস গুছিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে যায়।
 
মাস ছয়েকের মধ্যেই সারাদেশে ব্যবসার অন্য মাত্রায় উল্লম্ফন ঘটে। এখন ব্যবসা হয় মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের, পাচার হয় বহু বড় বড় অংকের অর্থ, নিট এন্ড ক্লিন, কেউ কাউকে ধরে না। ইদ্রিশ ছিল এই ব্যবসায়ের জন্য আল্লাহর একেবারে নিজের হাতে তৈরী। কিন্তু পেরেস্ত্রইকার অমৃত থেকে সে বঞ্চিত হয়।
 
তারপরেও দেশে ফেরে সে মোটা অংকের টাকা হাতে নিয়ে। সময়টা ইলেকশনের। চেষ্টা করে ওর আদি পার্টি থেকে নিজ এলাকার এমপি নমিনেশন পেতে। কিন্তু দেশভরা এত দেশপ্রেমিক, টাকা তারাও কম লুটপাট করেনি, ক্ষমতাও তাদের যথেষ্ঠ। সঠিক স্থানের সঠিক লোকজনের সাথে যোগাযোগও তাদের বেশি। বিশেষ করে নেত্রী, নেত্রী হলেন সত্যিকারের জহুরী, তিনি ঠিকই জানেন কাকে তার দরকার, কোথায়। আউটসাইডার হয়ে নিজস্ব পার্টিতে সে নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হয়। তারা ওকে সজোরে উষ্টা মেরে দিল্লী পাঠিয়ে দেয়। সে ভীষণ দুঃখ পায়। কিন্তু দিল্লীর থেকে ঢাকার দূরত্ব সবার জন্য সমান নয়। সে অন্যনেত্রীকে ভালো চাঁদা দিয়ে নমিনেশন পেয়ে যায়।

ও বেশ খরচ করে, কাক চিল শকুন শুওরসহ বহু শক্তি হায়ার করে কিন্তু টাকাটাই গচ্চা যায়। না হারলে সে সুদে আসলে সব তুলে আনতে পারতো, এমনকি শালা রাশিয়ানদেরও গুষ্টি কিলিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু বিধি ডানদিক ছেড়ে গেলে কি আর করা?
 

দেশে ফিরে সবচেয়ে বিপদে পরে সে তার এক্সট্রিম লিবিডো নিয়ে। বাংলাদেশের মত বদ্ধ সমাজে বিষয়টির সমাধান সহজ নয়। কিন্তু সন্ধানী সব সময়ই কিছু না কিছু খুঁজে পায়। সে যেখানে থাকতো, তার ওপরের বাসায় একজন ভাবীর সাথে পরিচয় হয়। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে আছে। সে থাকে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে, ছেলে-মেয়ে নেই। মাছরাঙ্গার মত সুন্দর শরীর, নজরও তীক্ষ্ন।

তার রাত কাটে ঘুমহীন। অপচয়ের কদমফুল যৌবন নিয়ে জীবিত জ্বলজ্যন্ত মানুষ, স্বামী শুধু শব্দ, হাত, পা, শরীর ও ঠোঁটহীন।
 

তারই বিছানার নীচে বিদেশ থেকে আসা অপূ্র্ব এক যুবক, বাধা বন্ধনহীন দমকা হাওয়ার মত। বেশ ক’বার দেখা হয়েছে মুখোমুখি। কম্পলিমেন্ট ও দিয়েছে ওর শাড়ির ও শরীরের। অথচ মোটেও হ্যাংলার মত মনে হয়নি। মার্জিত, পরিমিত ও ছোঁয়াচে হাসি। চাহনির মধ্যেই এমন কিছু আছে যেন ত্বকে বিছা ছুঁড়ে দেয়। কথাও হয়েছে ক’বার।

একবার বলেছে, “ভাবী আসুন না, চা খেয়ে যাবেন।”

সে হেসে বলেছে, “না ভাই, আজ নয়, অন্য কোনোদিন।”

তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকায়। নারী পুরুষের দুর্বোধ্য ফেরোমন রসায়ন ডি-কোড করে দুজন দুজনকে চিনে নেয় খুব সহজে।

এক গহীন ঝর ঝর বৃষ্টির রাতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা যখন ঘুমে, সে তার ইতস্ততি ও বিবেকের শৃংখল ছিন্ন করে চলে আসে ওর দরজায়। অতরাতে চা নয়, সে চায় অন্যকিছু, সুন্দর, সুগন্ধি ও সুখস্পর্শের পাপড়ি মাখা স্বপ্নের ফুলকুঁড়ি।
 

তুলনায়ই কেবল জানা যায় ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতা, পুরুষের স্পর্শের অনুপমেয়তা। ওর স্বামীর স্পর্শে একটা ভীষণ তাড়াহুড়ো আছে। মনোযোগ শুধু তার নিজের প্রতি, রুক্ষ্ণ ও ত্রস্ত, ইটমুগুর দিয়ে ক্ষেতের চাকা ভাঙার মত। অথবা যেন তার হাট ধরতে হবে ৫ মাইল দূরে, এতই ব্যস্ততা। ওর ভালো লাগা মন্দ লাগা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। ওর মধ্যে যে আস্তে আস্তে লিবিডোর পাপড়িগুলো উন্মোচিত হয় তা সে জানে না, তার কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই কাছা দিয়ে হুট হাট গাছে ওঠার মত। এ যে একটি শিল্প, নন্দ্য ও নর্ম, সে কোনোদিন জানতেও চায়নি। সে জানেই না যে নারীর দেহ শুধু, ত্বক, পেশী, অস্থি, মজ্জা নয়, আরো কিছু। নারীর তৃপ্তির উৎসস্থল ইন্দ্রিয় নয়, মগজ। মগজে পরিপক্ক হয় পরিপূর্ণতা। দুই উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় টানা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা ম্যাজিশিয়ানের মত অখণ্ড মনোযোগে, অতি সাবধানে যে স্পর্শ করতে হয় নারীকে, এটা তার স্বামীর বোধের অতীত। কিন্তু এই পুরুষটি তা জানে, সে সম্পূর্ণ অন্যরকম। সেই তাকে বুঝতে শিখিয়েছে যে, সে এতদিন যে অপ্রাপ্তিকে নর্ম্ হিসেবে ধরে নিয়েছে তা আসলে ভুল। সেই বুঝিয়ে দিয়েছে যে নারী কর্ষনের জমি নয়, থপ থপ করে পা ফেলে হাঁটার কাদামাটিও নয় বরং হিজল ফুলের মত অসম্ভব নরম ও ভঙ্গুর। তার স্পর্শে তানপুরার তারের মত টান টান হয়ে পড়ে তার সমস্ত শরীর, সমস্ত সত্তা। অবশেষে গ্লেইসারের গহীন থেকে উঠে আসা উষ্ণ প্রস্রবনের মত পুলকিত ও উৎক্ষিপ্ত হয়ে চৌচির ছড়িয়ে পড়ে বিছানায়।

সে নিয়মিত বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে ঘুম পাড়িয়ে নেমে আসতে থাকে ইদ্রিশের কাছে। ভাদ্রের কাক-জলের বিলের মত পূর্ণ হয়ে ওঠে তার মন, সে পাগল ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু জগতে ভালো বা মন্দ সবকিছুই অতিক্রম হয়ে যায়। পূর্ণযৌবনা চাঁদ যায় ক্ষয়ে, তরতাজা কদম ফুলে সময় হুল ফুটিয়ে মলিন করে দেয়।

স্বামী ছুটিতে দেশে আসে। অতৃপ্ত লাইলীর দশা হয় তার। এতদিন যার জন্য সে অপেক্ষা করেছে এখন তার স্পর্শই কেমন নোংরা ও গা ঘিনঘিনে মনে হয়।ইচ্ছে হয় না সাড়া দিতে। মনে হয় সে সাথে সাথে গিয়ে স্নান করে ধুয়ে মুছে ফেলে, অথচ ইদ্রিশের দেয়া সবকিছু, সব স্পর্শ ও বীর্য ধরে রাখতে ইচ্ছে হয় শরীরে। সে স্বামীকেও ঘুম পাড়িয়ে নীচে নেমে আসতে থাকে। ইদ্রিশ হিসেবী, সে বিপদের আশংকা করে। একদিন চুপ করে বাসা পরিবর্তন করে চলে যায়। ঢাকা মহাবিশ্বের চেয়েও বড় একটি শহর হয়ে যায় সেই নারীর জন্য। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় বুক চৌচির করে ফেলতে ছুরির আঘাতে।
 

বহু নারীর সাথে মিশেছে ইদ্রিশ। কারো প্রতি দুর্বলতা তাকে স্পর্শ করেনি। বিজ্ঞ এরিস্টটলের মতই ওর মনে হয়েছে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে মগজে অনেক খাটো। পুরুষের থেকে বহু নীচে এবং একজন ক্রীতদাসের সামান্য ওপরে তার স্থান। শুধুমাত্র পুরুষের সেবা করার জন্যই নারীর জন্ম। এবং কোনো নারীর জন্য অপ্রয়োজনে বিপদে পড়তে সে রাজী নয়।
 
কিন্তু শেষপর্যন্ত সে বিয়ে করে বেশ সুন্দর, শার্প ও ধনাঢ্য এক মেয়েকে। এটি ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায়িক বিয়ে। ছাত্রজীবনে সেই মেয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরে খুব সক্রিয় ছিল। তার পুলসেরাত পার নিশ্চিত হয়ে যায়, ধর্মহীন স্বামীকে সে ধর্মে টেনে আনতে সক্ষম হয়। এখন ইদ্রিশ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, মসজিদে যায়। স্ত্রীর মাধ্যমে তার বেশ কিছু ব্যবসায়িক কানেকশন সৃষ্টি হয়। ও একটা নতুন জগতের সন্ধান পায়। সোভিয়েত নাস্তিক জগতে যেমন পার্থিব জগতের প্রাপ্তির খনি ছিল জৌলুসে ভরা, সে টের পায় এই ধর্মীয় ধুয়াশার জগতও মরুভূমি নয়। নয় ক্যাকটাসের ঝোপ ঝাড়। সেখানেও সুন্দর ওয়েসিস আছে। আছে কাঁচা টাকা প্রচুর!

প্রচুর!! পরহেজগারী ও অর্থ- এ যে সোনায় সোহাগা।
 

কিন্তু ঐ যে রোগটা! থিতিয়ে আসার মত যথেষ্ট বয়েস ওর হয়নি। একজন সুস্থ সবল মানুষকে যেমন হাসপাতাল বেডে নিশ্চল করে রাখা যায় না, একজন সক্ষম পুরুষকেও যায় না একঘেয়েমির আর্সেনিকে বিষাক্ত করে রাখা। উচিতও নয়।

দশ লক্ষ বছরের মানব ইতিহাস তাই বলে।

পুরুষের চাই নারী, ভালোবাসার জন্য, অবহেলা, অপমান ও নির্যাতন করার জন্য। সে খুব করে অনুভব করে যে স্ত্রী হল আর্সেনিক পূর্ণ টিউবওয়েলের জলের মত। একঘেয়েমির বিষবাষ্প মুক্ত হতে সে সোনারগাঁও শেরাটনে কিছু সুন্দর সময় কাটাতে চলে যায় নিভৃতে। গৃহে গৃহে ধর্মের সওগাত পৌঁছাতে ব্যস্ত স্ত্রী জানে স্বামী তার ব্যবসার কাজে আপাদ-মস্তক নিমজ্জিত।

রাতে সে বাসায় এসে ওজু করে নামাজ পড়ে স্ত্রীকে খুশী রাখে।

৩৮ তম পর্ব

লেনা সিঙ্গাপুর ঘুরে এসেছে স্বামীকে নিয়ে প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে। খুব এনজয় করেছে ওরা। স্বামী খুব খুশি এমন চমৎকার একটা দেশে যেতে পেরে। ওরা অভ্রের কম্পিউটারগুলো নিয়ে এসেছে। এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে কম্পিউটার নিয়ে আসার সাথে সাথে ভিক্টর টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে গেছে।
 

আজ লেনা অভ্রের হোস্টেলে এসেছে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে। অবশ্যই স্বামীকে না বলে। সে নিজের অন্ত:স্থল থেকেই প্রয়োজনটা বোধ করছিল। সুন্দর সেজে এসেছে। চোখ ফেরানো যায় না। নাস্তিয়ার সাথে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পরে প্রায় ৩ সপ্তাহ অতিক্রম হয়ে গেছে। অভ্র স্বেচ্ছায় শুষ্ক ও আমিষহীন সন্তের জীবন কাটাচ্ছে, কোনো বান্ধবীর কাছেই যায়নি বা কাউকে কাছেও ডাকেনি।
 
নাস্তিয়া রিয়াজানে।
 
ওদের দুজনের মধ্যেই একটা অসম্ভব ভালো লাগা কাজ করছে কিন্তু ভাষায় তা আজও অপ্রকাশিত।
 
সে কাজ-কর্ম ব্যবসা নিয়ে নিজেকে বেশ ব্যস্ত রেখেছে কিন্তু গহীনে কোথায় যেন একটা অপেক্ষা, নাস্তিয়ার জন্য। সিঙ্গাপুরে ওর কতগুলো ছবি তুলেছিল অর্কিডের সাথে। অপূ্র্ব ছবিগুলো! প্রায়ই এলবাম খুলে দেখে। সেন্টোসা দ্বীপের নারিকেলবহর শোভিত বীচেও কয়েকটি ছবি ওরই কিনে দেয়া সুইম স্যুটে।

নাস্তিয়া এখনও দেখেনি, ও চলে যাবার পরে মাত্র কয়েকদিন আগে প্রিন্ট করে এনেছে।

ঘরে বসে বই পড়ছিল। এ সময়ে দরজায় শব্দ। ঘরের বাইরের দরজায় “পিপিং হোল” বা “গ্লাজক” থাকে। দরজা খোলার আগে আগুন্তুক কে তা দেখে নিয়ে দরজা খোলা হয়। স্ট্যালিনের আমলে কালো জ্যাকেটপরা আগন্তুকেরা যখন আসতো রাতে রাতে জীপে করে শনির দৃষ্টিবিদ্ধ নাগরিকদের তুলে নিতে, সেই তখন থেকে, না তারও আগে থেকে এই গ্লাজকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তা অভ্র জানে না। পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার পরে যে সব বাসায় মূল্যবান কিছু ছিল সেখানে শক্তিশালি, ভারী লোহার দরজা বসানো হয় গ্লাজকসহ। হোস্টেলগুলোতেও ব্যবসায়ি ও অর্থবান বিদেশি ছাত্রেরাও তাই করে। অভ্র পিপিং হোল দিয়ে লেনাকে দেখতে পেয়ে অসংখ্য তালা, হুক, ডাসা ও ছিটকিনি খুলে ভারী দরজাটি উন্মুক্ত করে। ক্যাক্ ক্যাক্ আওয়াজ শুনে লেনা হাসে, বলে “তোমার দরজা দেখলেই বোঝা যায় যে তুমি একটা অর্থ গৃধ্ন বুর্জোয়া।”
অভ্র হাসে।
 

“আমাকে মিস্ করেছো?”
 
সে অভ্রের দেহের অন্তিক অগ্নিবলয়ে চলে আসে। লেনার শরীর ও পারফিউমের গন্ধের সংমিশ্রিত ঘ্রাণে অভ্র অসহায় বোধ করে। আগে এই নিবিড়তার রেসপন্স হতো মরু ঝড়ের মত তীব্র, কিন্তু আজ কোথায় যেন একটা বাধা বোধ করে। সরে গিয়ে বলে “বসো, কী খাবে বল? চা বানাবো?”
 
“আমি কি চা খেতে এসেছি? আগেরবার তুমি সাথে থেকে আমার এবারের সিঙ্গাপুরের ভ্রমণটি মাটি করে দিয়েছো। স্বামীকে পাশে রেখে তোমাকে মিস্ করেছি।”
 
অভ্র বলে, “ছিঃ তুমি একটা ছিনাল।”

লেনা হাসে, “তুমিই তো আমাকে নষ্ট করেছ।”

ও আরও কাছে আসে।
 

অভ্র বাধা দিতে চায়, কিন্তু কে মানে, অভ্র চেয়েও ওকে নিরস্ত করতে পারে না। অবিরল ধারায় যে প্লাবনের তীব্রতা থাকে, পাহাড়ের যে ধ্বস সবকিছু তছনছ করে দেয়, কোনো বাধা, কোনো পরিণতি মানে না, গহীনে প্রোথিত শিকড়ওয়ালা বৃক্ষও যেমন উৎপাটিত হয়ে ঢলে পড়ে, অভ্র তেমনি ছিন্নমূল হয়ে যায়।

বিছানা থেকে উঠে টিভি ছাড়ে। লেনা ইতিমধ্যেই ঠিক ঠাক হয়ে চুল আচড়ে নিপুণ গৃহিনীর মত চা বানিয়েছে। ও মিট মিটি করে হাসে,”আজ আমাকে এড়াতে চাচ্ছিলে কেন? “
অভ্র নির্লিপ্ত, “না কই?”

“ঠিকই এড়াতে চাচ্ছিলে, কেমন বিক্ষিপ্ত তুমি আজ। কি হয়েছে?”
“কিছু না, এমনি, ইচ্ছে হচ্ছিল না।”
“প্রেমে পড়োনি তো?”
চেখভের “ভালোবাসা সম্পর্কে” গল্পের নায়কের মত একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে ওর মধ্যে।
“ভালোবেসেও আমরা সব সময় প্রশ্ন করিঃ কাজটি ঠিক হচ্ছে, না অন্যায় হচ্ছে? এটা বুদ্ধিমত্তা, না নির্বুদ্ধিতা? এই ভালোবাসার পরিণতি কী? ইত্যাদি ইত্যাদি। ভালো কী মন্দ আমি জানি না, কিন্তু ভালোবাসা যে খুব বিরক্ত ও উন্মন করে, অতৃপ্তিতে উৎপূর্ণ এবং খিটখিটে করে তোলে এটা আমি খুব জানি।”
 

“কে সে মোর কেই বা জানে
কিছু তার দেখি আভা
কিছু পাই অনুমানে
কিছু তার বুঝিনা বা….”
 
হঠাৎ হাওয়া যেমন দুলিয়ে যায় তরুতনু, কিন্তু কী সেই হাওয়া, কোথা থেকে আসে সে এবং কোথায় মিলিয়ে যায় তার হদিস যেমন বৃক্ষ জানে না, তেমনি অভ্র জানে না কী এই অন্তঃস্থ অস্থিরতার নাম।

একদিকে তার পরিচিত, অভ্যস্ত, চিন্তাহীন, সেনসুয়াল, ইন্দ্রীয়তৃপ্তির জীবন, অন্যদিকে খরস্রোতা নদীর বৈঠাহীন নৌকার মত এক অজানা অনুভূতির ঘুর্ণিজলের অনিশ্চয়তা, সংশয় ও অভিঘাতের উর্মিল দিনরাত।

নিশ্চিত নয় সে কী করবে।বাবা চলে যাবার পরে দেশে মা এখন ভীষণ একা। তাকে দেখার কেউ নেই। বড় বোন দেশের বাইরে, ছোট বোন স্বামীর সংসারে। মহিলা পরিষদ নিয়ে সারাজীবন ব্যস্ত ছিলেন মা, কিন্তু বয়সের ভার, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পার্টি ভেঙে যাবার পরে আদর্শ ও বিশ্বাসের সংকট, সব মিলিয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তার থেকে বের হয়ে আসার শক্তি এখন আর আগের মত নেই। এতকালের সহযোদ্ধারা এখন শিবিরে শিবিরে বিভক্ত।

বন্ধু এখন আর বন্ধু নেই। দেশের প্রতি ভালোবাসা এখন আদর্শগত বিতর্কের বেড়াজালে বিভ্রান্ত বনহরিণী। খাপরা ওয়ার্ডে বা তার আগে পরে প্রাণ দিয়ে গিয়েছেন যে কমরেডরা তারা এখন শুধু স্মৃতি বা অবাস্তব শ্লোগানের মেটেরিয়াল। কে মনে রেখেছে সেই সম্পন্ন কৃষক কম্পরাম সিংয়ের কথা, যে ছেলেকে দাহ করে সরাসরি শ্মশ্মান থেকে সদ্যবিধবা পুত্রবধুকে নিয়ে যোগদান করেছিল কৃষক সমিতির সম্মেলনে? সেই বদ্ধ কুঠরিতে যখন প্রতিটি জানালা থেকে শিলাবৃষ্টির মত ঝরেছিল বুলেট বৃষ্টি, তারা জীবন দিয়েছেন কিন্তু মাথা নত করেন নাই।

অথচ ধর্ম যেমন দেশভিত্তিক হয় না, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদও দেশভিত্তিক হয়নি, হয়েছে শুধু মস্কোভিত্তিক, মস্কো যা সঠিক বলেছে শুধু তাই সঠিক, মস্কো যা বেঠিক বলেছে কার সাধ্য ছিল তাকে অন্য কিছু বলার? তাই মস্কো বিলীন হলে পার্টি ভেঙে যায়। মস্কোই সব, দেশ গৌণ। অথচ পার্টি কতবার বলেছে “আমরা ভুল করেছিলাম।” যেন বার বার সজ্ঞানে ভুল করাই পার্টির মত, পথ ও হাতিয়ার, তারপরে আবার ভুল স্বীকার করা।

মা অভ্রকে বার বার দেশে ফিরে যেতে ডাকছেন। তারা সারাজীবন যে দেশপ্রেমের মশাল হাতে হেঁটেছেন অভ্র পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুনভাবে তাই নিয়ে এগিয়ে যাবে এটাই মায়ের কাম্য। পার্টির যাই হোক, তাদের অন্তরে আদর্শের মূল সূত্রটি ছিল দেশ। সমাজতন্ত্রের আপাত ব্যর্থতা বা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলেও দেশ কোথাও চলে যায়নি। এখনও ভোরের সূর্য পূবের ধান ক্ষেতে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়। ঠুনকো সমাজতন্ত্র নেই বলে দেশকে ভালোবাসার দায়িত্ব থেকে কেউ কাউকে মুক্তি দেয়নি।

অথচ অভ্রের মনে হয় সে বাবা মায়ের তুলনায় অতি নিকৃষ্ট একটি প্রাণি। সুবিধাবাদী, লোভী ও লম্পট। একটি বহুমুখী নদীর মোহনার মত ওর মন। মস্কোতে অর্থ উপার্জন হয় বিশেষ পরিশ্রম ছাড়াই। অর্থ অনেক স্বাধীনতা এনে দেয়। জীবন উপভোগ করার জন্য এদেশের চেয়ে ভালো দেশ অন্য কোথাও নেই। আবার দেশে ফিরে না যাওয়ার কথাও সে ভাবতে পারে না। পরিবারে বিগত দুই পুরুষ দেশের প্রশ্নে ছিলো আপোসহীন। দাদুও সারাজীবন রাজনীতি করেছেন। দেশবিভাগের পরে ভারতে চলে যাওয়ার আহ্বান ও হাতছানি উপেক্ষা করে তারা কেউ দেশ ছেড়ে যায়নি। বাংলাদেশ তাদের দেশ, ভারত নয় ।

“এই দেশেতে জন্ম আমার, এই দেশেতেই মরি….”

এই কথাগুলো ওদের পরিবারের জন্য শুধুই কতগুলো শব্দ বা ধ্বনির সমন্বয় নয়, বরং নির্দিষ্ট অর্থ বহনকারী ও পরীক্ষিত প্রার্থনার স্তোত্র।

তাই বস্তু ও অবস্তুর অনর্গল প্রহেলিকায় সে এখন। শিমুল ফুলের আগুণের মত লেনার শরীর। আগে তার সাথে মিশে অপার আনন্দ পেত সে, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি কিন্তু ব্যতিক্রম চেখভের চরিত্রের মত এক অজ্ঞাত অপরাধবোধে। এটা আগে ছিল না।

শরীরে যেমন সিরিঞ্জ দিয়ে ঔষধ পুশ করা হয়, নাস্তিয়া ওর মগজে ইনফেকশনের মত তেমন কিছু একটা পুশ করে দিয়েছে। ঔষধ নয়, একটা রোগ, যা তার কোষে কোষে ব্যস্ত আছে ভাইরাল প্রজননে। নাস্তিয়া বাংলাদেশের জলে হাঁটা একটি হিজল গাছের মত বা মেঘমল্লার বরষার আর্দ্র উঠানে গুন গুন গান গাওয়া হাজার ফুলের শুচি শুভ্র নীপ বৃক্ষ তার মনে।
 

বাঙালির সংবেদনশীল মন ওর। সে জানে নাস্তিয়া বাঙালি নয়, একটি চলমান স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নের মত অপার্থিব। লেনা বাস্তব ও উষ্ণ। দেশ অবিচ্ছিন্ন মেঘের ফাঁকে হঠাৎ আসা একটি চোরা ছিদ্রের মত, যার ফাঁক দিয়ে আকাশের আরও একটু বেশি গভীরতা দেখা যায় কিন্তু যা খুবই সাময়িক এবং দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যায়। দেশের চিন্তা ভারি বোঝার মত দীর্ঘ সময় বওয়া যায় না। লেনা হাল্কা ফড়িংয়ের মত, পাখাওয়ালা, আর নাস্তিয়া আময়। এই রোগে ভোগার মানুষ সে নয় কিন্তু সবচেয়ে চালাক, সবচেয়ে শক্ত, সবচেয়ে ক্ষমতাশালীও নাকি কখনও কখনও হঠাৎ গর্তে পড়ে যাবার মত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

এমনি এক রোগ দিয়েছিল ফ্লোরেন্সের শিল্পী বতিচেলিকে আমেরিগো ভেসপুচির আত্মীয়া সিমোনিতা ভেসপুচি। সে ছিল বতিচেলির সৃষ্টির প্রেরণা, ফ্লোরেন্সের হৃদয় কেড়ে নেয়া ধরা ছোঁয়ার বাইরের এক উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক ।

কিন্তু মাত্র ২২ বছর বয়েসে সে নক্ষত্র হয়ে যায় ক্ষয়রোগে। ব্যথিত ও বিধ্বস্ত বতিচেলি বলেন তাকে যেন মৃত্যুর পরে সিমোনিতার পায়ের কাছে সমাধিস্থ করা হয়। বয়ে বেড়ান সেই রোগ তার হৃদয়ে সারা জীবন, অন্য কোনো নারীকে ভালোবাসতে পারেন না। ১৪৮৬ সালে সিমোনিতাকে বাঁচিয়ে তোলেন তার অমর কীর্তি “ভেনাসের জন্ম” ছবিতে। তারপরে যখন খ্যাতির তুঙ্গে, তার পৃষ্ঠপোষক মেদিচি পরিবারকে উৎখাত করে শুরু হয়

ধর্মগৃধ্ন সাভনারোলার (Girolamo Savonarola) ছদ্ম সাম্যের লড়াই, “শোষক হঠাও, গরীব বাঁচাও” , “ফ্লোরেন্স হল নতুন জেরুজালেম, আর যীশু তার শাসক” এই ডাকে তিনি বিভ্রান্ত ও বিদ্রোহী হন। তখন অশুভআত্মারা হাঁটে পথে পথে। রক্তপাত ও অরাজকতার মিছিলের ফ্যানাটিক ফেস্টুন হাতে আগুনে ছুঁড়ে দেন নিজস্ব শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মসমূহ। তারপরে নি:স্বতার নিভৃতে হারিয়ে যান। যখন তার মৃত্যু হয়, ফ্লোরেন্স স্মরণ করে তার শেষ ইচ্ছার কথা। সিমোনিতার পায়ের কাছে “অগ্নিশান্তি” চার্চে

( Church of Ognissanti) শুইয়ে দেয় চিরদিনের জন্য।

সিমোনিতার অনবতুল আভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বতিচেলি কিন্তু তাদের চোখে চোখে কোনো বিদ্যুৎ খেলেনি কোনোদিন,’কিছু তার বুঝি না বা’র প্রপঞ্চে তাকে দিকহীন হতে হয়নি, অথচ .. অথচ অভ্রের বুকের ভেতরে কী এক অন্য বোধ হু হু হু হু করে।

৩৯ তম পর্ব

টিভির পর্দায় বসে আছে বাঘা। ওর নিশ্চয়ই একটা ভালো নাম আছে কিন্তু পরিচিত মহলে ওকে বাঘা বলে ডাকা হয়। অভ্রদের সাথে ভাষা কোর্স করেছে। পেটানো পোক্ত শরীর। চোখগুলো ভীষণ বড় বড়, পদ্মানদীর ডাকাতের চোখের মত। খুবই ভদ্র, মদ না খেলে। ছোট বড় সবাইকে আপনি করে ডাকে।

আর মদ খেলে তুই। অভ্রর ক্লাসমেট এবং পাশাপাশি রুমে থাকতো। তাকেও আপনি করে ডাকতো।

দেশ থেকে আসার পরপরই পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ থেকে আসা ছাত্রদের নিয়ে যে মিটিং হয়েছিল বাঘা সেখানে টাল অবস্থায় গিয়েছিল। যা ছিল দেশ থেকে আসা কচি ও বিশুদ্ধ কর্মিদের কাছে খুবই বিসদৃশ। অভ্র এ নিয়ে মন্তব্য করায় বাঘা ভীষণ চটে উঠেছিলঃ

“আমি তর পেটের ঝোলায় ফুটা কইরা পেটিডা বাইর কইরা দিমু। আমি কোনো হালারে তোয়াক্কা করি না, গণবাহিনীতে থাকতে এই হাত দিয়া আমি বহু গলা কাটছি।”
 

সে খুব ইমপ্রেসিভভাবে হাত দিয়ে গলা কাটার ভঙ্গিটি দেখিয়ে দেয়। অভ্র ভয় পেয়েছিল, কেননা কোনো গলা কাটা কমরেডের সাথে তার কোনো মিটিংয়ে বসা এই প্রথম। ছাত্র ইউনিয়ন ভালো ছেলে, ভালো মেয়েদের হারমোনিয়াম তবলার পার্টি, এটা কে না জানে। আর এখানে কি ভয়ংকর সব কথা! এসবই ছিল পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার আগে, সমাজতন্ত্রের স্বর্ণযুগে, যখন কমজোড় ব্রেজনেভ বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালে একই শব্দ ভাঙ্গা রেকর্ড প্লেয়ারের মত আটকে যেত, আর মুখ দিয়ে চটাস চটাস আওয়াজ বের হতো, উদা.. উদা.. উদা..
 
বাঘা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন শ্রদ্ধেয়, ত্যাগী ও মর্যাদা সম্পন্ন নেতার ছেলে। ধারণা করা হয় ওর গণ বাহিনীর হুংকারটা বাস্তবিক নয়। সিংহ বা বিড়াল যেমন টেরিটরি মার্ক করে, এটা হয়তো তারই একটা প্রচেষ্টা।

নেতারা তাকে শান্ত ও আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। পরের দিন আবার যা, তাই। অভ্রের সাথে যেন কিছুই হয়নি। অভ্রও মাতালের মাতলামি বলে ও ঘটনা আর মনে রাখেনি। বাঘা অবশ্য বলে দিয়েছে সাফ সাফ, “আমি আপনাগো পার্টির গুল্লি মারি, আমার বাপ আপনেগো রাজনীতি করে এ-ই যথেষ্ট। আমারে জ্বালাইবেন না আগে ভাগেই কইয়া দিতাছি।”
প্রথমরাতে বিড়াল মারার কেচ্ছাটা যে কত সত্য তার বড় প্রমাণ বাঘা। কেউ দ্বিতীয় বার সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের ঐশী প্রমাণ নিয়ে ওর কাছে আর ভেড়েনি। এমন কি মস্কোর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নেতারাও। একটা সর্বগৃহীত উপাত্ত ছিল: “আমাদের ঘরানার ছেলে, বাপ এত বড় কমিউনিষ্ট, বাঘা যাবে কোথায়?” যুক্তির কথা। পার্টি বিপ্লব করতে পারুক আর না পারুক, দলে লোক টানতে পারুক আর না পারুক, কথা তো বলে অকাট্য যুক্তি দিয়ে। এটা তার শক্তির দিক।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশি বড় বিজনেসম্যান সেই বাঘারই একটা ইন্টারভিউ হচ্ছে টিভিতে, যার সবটাই অভ্র মিস্ করেছে লেনার সাথে ব্যস্ত থেকে। বাঘার সামান্য কিছু কালো দাড়ি, তা পেচিয়ে অনেকটা মিশরের ফারাওদের দাড়ির মত করা হয়েছে। তার লম্বা চুল বাঁধা হয়েছে রাবার ব্যান্ড দিয়ে, দেখতে কাঠবিড়ালির লেজের মত সুন্দর। ওর এক কানে চক চক করছে বিশাল ডায়মন্ডের দুল।
 

বুকের ক্লিভেজ ও দুই উরুর প্রায় সবটাই দেখিয়ে দেখিয়ে ইন্টারভিউ নিচ্ছে যে অপূ্র্ব সুন্দর মেয়েটি তার মুখে বেশ একটি ককেটি ভাব। সে প্রশ্ন করে: “তোমার কানে যে দুলটা দেখতে পাচ্ছি, সেটা কি আসল ডায়মন্ড?”
বাঘা খুব আত্মতৃপ্তির সাথে মাথা নাড়ায়।
মেয়ে প্রশ্ন করে : “এর দাম কত?”
 
বাঘা একটা মহাজাগতিক দাম বলে।
 
মেয়েটি অখ্ করে ওঠে। সারা স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বাঘার তৃপ্তির হাসিমুখ। সেই অপূ্র্ব মুহূর্তটিকে টিভির বুকে ধারণ করে ইন্টারভিউ শেষ হয়ে যায়।

দেশে বাঘা ছিল অন্যরকম। মদ গাঁজা খেত, রাস্তায় দাড়িয়ে মেয়েদের উত্যক্ত করতো। পড়াশুনো ছিল ওর জন্য অত্যাচার। একবার কোনো মেয়ের কারণে বচসা হয় কোনো এক ছেলের সাথে। বাঘা তার সাথে থাকা নিত্যদিনের সঙ্গী ড্যাগারটিকে নীরবে ঢুকিয়ে দেয় ওই ছেলের পেটে। গ্রেফতার হয়। কিন্তু পিতা তার সংযোগ ও জাতির শ্রদ্ধা খাটিয়ে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হন। মামলা মকদ্দমা চলতে থাকে। সারাজীবন শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতি করেছেন যেই পিতা, তিনি শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র থেকে কিছুটা উপকার তো পেতেই পারেন। একটি স্কলারশীপ জোগাড় করে ছেলেকে মানবতা মুক্তির দেশে পাচার করে দেন তড়ি ঘড়ি। দেশের জেলের খরচ বাঁচে, বাঘাও রক্ষা পায়, পিতা পান স্বস্থি আর শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র পায় পেরেস্ত্রইকার সময়কার এক অনিন্দ্য ইনস্ট্রুমেন্ট। একেবারে win win situation. তৃতীয় বিশ্বের গোয়ারগোবিন্দ নেতা নেত্রীরা এই win win situation এর ম্যাজিকটা বোঝে না বলেই চুলাচুলি করে ।
 

১ বছর ভাষা শেখে সে কোনো মতে। মূলত সময় কাটে ইনট্যুরিস্ট হোটেলে। মদ খায় প্রচুর। এখানে বিদেশি গিজ গিজ করে। ডলার পাউন্ডের লেনদেন প্রচুর। মস্কোর সবচাইতে সুন্দরি জোনাকীরা এখানে আনাগোনা করে অকাতরে বিদেশি অতিথিদের আনন্দ ফুর্তির অপ্রতুলতা মিটায়। বাঘা দিলদারভাবে ওদেরও মাঝে মধ্যে ড্রিন্ক অফার করে, বিনিময়ে ওরা দেয় বন্ধুত্ব, এমন কি ভালোবাসা।

কিন্তু রুশনারীর শ্রমিকশ্রেণির দেশে স্বেদ, রক্ত ও বীর্যার্জিত ডলার নিয়ে হাঁটতে নেই। ধরা পড়লে জেল। তাই প্রয়োজন হয় হোটেল থেকে বের হবার আগেই সেগুলো রুবলে বদলে ফেলা। বাঘা ওদের সেই উপকারটুকু করে দেয়, ডলার নিয়ে রুবল দেয়। হোটেলের সিকিউরিটি, মিলিশিয়া ও বিপ্লবী ক্ষমতার চোখ তাকে পছন্দ করে। নিজস্ব চ্যানেলে বা দূতাবাসে ডলার বিক্রি করে। বিদেশে যেতে সবারই ডলার লাগে এবং তা বাজারে বিক্রি হয় না। এই মেয়েরা শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, ওদের রক্ষণাবেক্ষণকারী বন্ধুরাও শক্তিশালী। তাদের ছায়া আছে মুখ নেই কিন্তু ক্ষমতার করিডোরে তাদের লম্বা হাত পা। পা গভীরে প্রোথিত, মাথা মেঘে মিশ খাওয়া। বাঘা আস্তে আস্তে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। বন্ধুতে পরিণত হয়।
 

দুতাবাসের একজন বড় কর্মকর্তার ছেলে ছিল বাঘার বোতল সঙ্গী। সে ওর রুমে এসে টাল হয়ে পড়ে থাকতো। বাথরুমে গিয়ে বমি করতো গল গল করে। তারপরে সেই বমির পাশেই ঘুমিয়ে পড়তো বাথরুমেই। এমন যে আত্মার বান্ধব তাকে দিয়ে ব্যবসা হবে এটা জানা কথাই।

মস্কোর ব্যবসার, বিশেষ করে ডলার পাউন্ড ব্যবসার মূল কেন্দ্রগুলোর একটি হল বিদেশি দুতাবাস ও ডিপ্লোম্যাট সম্প্রদায়। তারা ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে করে যে কোনো অংকের ডলার পাউন্ড আনা নেয়া করতে পারে। দুতাবাসগুলোতে কর্মরত সুইপারও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অভুত পরিমাণ অর্থ কামাই করে দেশে ফেরে। এটাই নিয়ম। তারা ডলার নিয়ে ট্রাভেলার’স চেক (টিসি) বিক্রি করে এবং ছাত্ররা তা নিয়ে বাইরে যাতায়াত করে।এই টিসি নিয়ে বাইরে যাওয়া বৈধ। দূতাবাসের কারো কাছ থেকে সরাসরি রুবলেও টিসি কেনা সম্ভব, তবে দাম একটু বেশি। তাই ব্যবসায়ীদের সবচাইতে বড় বন্ধু দুতাবাসের লোকজন। তারা ঘরে ঘরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার পোষে আর বাঘের দুধ বিক্রি করে। তাদের হাতে না রেখে বেশী দূর যাওয়া যায় না। তারা শুধু ডলার পাউন্ড বৈধ করার যন্তর মন্তর ঘরই নয়, আরও নানাবিধ সুযোগ সুবিধার খনি।

যেমন ‘ডিউটি ফ্রি শপ’ এবং ‘বেরিওজকা’গুলো ডিপ্লোম্যাটদের জন্য খোলা। এখানে শুধুমাত্র হার্ড কারেন্সিতে পণ্য কেনা যায়। সোভিয়েত ‘সমান অধিকার’ ভোগকারী সাধারণ জনগণের দোকানে যা আজীবন দুস্প্রাপ্য, তা-ই পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় এই ছোটখাটো সাদ্দাতের বেহেশত ‘ডিউটি ফ্রি শপ’ এবং ‘বেরিওজকা’য়।

কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বের জন্যও আছে আলাদা দোকানপাট। যে রাষ্ট্রে সবাই সমান, সেখানে সবার সব দোকানে যাওয়া মানায় না, যেতে হবে মার্কসবাদে এমন কোনো ডগমাও নেই। বাঘা তার ডিপ্লোম্যাট তনয় বন্ধুর মাধ্যমে কন্টেইনার ভরে রেকর্ড প্লেয়ার, টি-শার্ট, জিন্স, পারফউম, কন্ডম ইত্যাদি কিনে এনে নিজস্ব চ্যানেলে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা করে। মার্কসের উদ্ধৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব এখানে অচল। কারণ এখানে না-আছে বুর্জোয়া মালিক, না-আছে উৎপাদন, না-আছে ব্যবসা।

রাষ্ট্রের ভেতরে এই রাষ্ট্রিয় ব্যবসা করে বাঘা ধীরে ধীরে বড় হতে হতে, কালো দুনিয়ার আইনের সিড়ি বেয়ে একদিন পৃথিবীর দ্বিতীয় পরাশক্তির সর্বশক্তিমান পার্টি সেক্রেটারি এবং রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরবাচভের স্নেহভাজন হয়ে ওঠে। তাকে গর্বাচভের দাচায়ও দেখা যায় হাস্যজ্জ্বোল মুখে। সোভিয়েত পেরেস্ত্রোইকার যুগে যে ক’জন বিদেশী এতদূর যেতে পেরেছে তার মধ্যে বাঘা অন্যতম।
 

তৃতীয়বিশ্বের একজন ত্যাগী কমিউনিস্ট নেতার সন্তান॥ সে যদি এখানে না আসতো এই দেশ কত বড় অর্জন থেকে বঞ্চিত হতো। আগামী বহু প্রজন্মের জন্য বিশ্ব কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সে এক বিশাল মাইল ফলক হয়ে থাকবে, কারণ সে তার শিকড়ের সাথেও বেইমানি করেনি। মস্কোর “রয়েল বেঙ্গল টাইগার” নেতাদের ( যাদের একজনও আর পার্টির সাথে নেই) ভবিষ্যতবাণীকে আশ্চর্যজনকভাবে সত্য প্রমাণিত করে, সে এখনও বাংলাদেশের একটি মাইক্রোস্কোপিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পার্টিকে চাঁদা দেয়।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *