শার্লট পারকিনস গিলমান’এর গল্প : হলুদ ওয়ালপেপার

অনুবাদ : বিপ্লব বিশ্বাস
(পরিচিতি : আমেরিকান কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবতাবাদী শার্লট পারকিনস গিলমানের জন্ম ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে কানেকটিকাটে। মারা যান ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তার বাবা ছিলেন খুবই দরিদ্র। ফলে গিলমানের লেখাপড়া ছিল অনিয়মিত। তাঁত বিখ্যাত বইয়ের নাম –The Yellow Wallpaper, The Man-Made World এবং Women and Economics”

এটা কদাচিৎ ঘটে যে জন আর আমার মতো একেবারেই সাধারণ মানুষ গরমকালটা কাটানোর জন্য এমন কৌলিক বাড়ি জোগাড় করে ফেলবে৷ 
এক ঔপনিবেশিক বিশাল বাড়ি, উত্তারিধকার সূত্রে পাওয়া একটি তালুক, বরং বলা যায় এক ভূতুড়ে বাড়ি, এক রোমাঞ্চকর শখের চরম উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়া- কিন্তু তার জন্য বড়ই ভাগ্যবান হওয়া দরকার৷
 
তবুও আমি গর্বভরে বলতে পারি, এই বাড়িটার এক অদ্ভুুুত নিজস্বতা আছে৷ অন্যথায় এত সস্তায় কেন এটা ভাড়া দেওয়া হবেে? আর কেনই বা এতকাল এখানে কোনও ভাড়াটিয়া নেই? 
জন অবশ্যই আমাকে উপহাস করল, বিয়ে হলে এমনটা কেউ আশা করতেই পারে৷ 
জন চরম বাস্তববাদী৷ বিশ্বাস-টিশ্বাসের ব্যাপারে তার কোনও ধৈর্য নেই, নেই কুসংস্কারের গভীর ভয় বিষয়েও; আর সে খোলাখুলিভাবে ব্যঙ্গের হাসি হেসে উড়িয়ে দেয় সেইসব বিষয় যা দেখা বা অনুভব করা যায় না কিংবা যার কোনও আকার দেওয়া যায় না। 
জন একজন ডাক্তার এবং হয়তো (আমি অবশ্যই কোনও জীবিত আত্মাকে এ সব বলছি না কিন্তু এটা মৃত কাগজ এবং আমার মনের দারুণ স্বস্তি) – হয়তো এটা একটা কারণ যে জন্য আমি দ্রুত সেরে উঠছি না। 
দেখুন, ও বিশ্বাসই করে না, আমি অসুস্থ! 
আর এতে কেউ কী-ই বা করতে পারে? 
যদি নামকরা কোনও চিকিৎসক অসুস্থ স্ত্রীর স্বামী হয় যে কি না আত্মীয়, বন্ধুদের নিশ্চিত করে বলছে যে এক অস্থায়ী স্নায়বিক দুর্বলতা ছাড়া আমার কোনও অসুখ নেই- সামান্য হিস্টিরিয়া- তাহলে কে কী করবে? 
আমার ভাইও একজন ডাক্তার এবং সেও নামকরা আর সেও একই কথা বলে৷ 
আমি তাই ফসফেট অথবা ফসফাইট – যেটাই হোক না কেন, নিই ; তার সঙ্গে টনিক, ঘোরাফেরা, শুদ্ধ বাতাস, ব্যায়াম আর সুস্থ না হওয়া অব্দি ‘ কাজ ‘ করা পুরোপুরি নিষেধ৷ 
ব্যক্তিগতভাবে আমি ওদের কথায় সহমত নই৷ ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, রুচি অনুযায়ী উত্তেজনা,ও পরিবর্তনের সঙ্গে কাজটাজ করতে পারলে আমার পক্ষে ভালো হত৷ 
কিন্তু কে কী করবে? 
এ সব সত্ত্বেও কিছুক্ষণের জন্য লিখতে চেষ্টা করি; কিন্তু তাতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ি – তা নিয়ে বেশ চাতুরি করতে হয়, নইলে তীব্র বিরোধিতার সামনে পড়তে হবে৷ 
আমি কখনও কখনও কল্পনা করি আমার এই অবস্থায় যদি বাধা খানিক কম পেতাম আর বেশি করে পেতাম সামাজিকতা আর উদ্দীপনা – কিন্তু জন বলে, সবচেয়ে খারাপ কাজ যা আমি করতে পারি তা হল, আমার অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করা এবং আমি স্বীকার করি, এটা সব সময় আমার মনটাকে মিইয়ে দেয়৷ 
সুতরাং আমি একা নিভৃতে বাড়িটাকে নিয়ে কথা বলি৷ 
জায়গাটি সর্বোত্তম৷ একদম একা মাথা উঁচিয়ে থাকা একটি বাড়ি, রাস্তার দিকে পেছন ফিরে, গ্রাম থেকে মাইলতিনেক দূরে৷ বইয়ে পড়া ইংরেজদের জায়গাগুলোর মতো… ঝোপঝাড়, দেওয়াল, গেট, তালা আর মালি ও অন্যান্যদের জন্য আলাদা ছোটো ছোটো সব বাড়ি৷ 
আর আছে এক মন ভালো করা বাগান৷ এমন বাগান আগে কখনও দেখিনি – বিশাল, ছায়াঘেরা, বাক্সের আকারে সীমানা দেওয়া রাস্তাসব আর সার দিয়ে লম্বা লম্বা আঙুরলতার ছাউনি দেওয়া কুঞ্জবন, নিচে সব বসার জায়গা৷ 
গাছপালা লাগানোর কাচঘরও ছিল অনেক কিন্তু সে সব ভেঙেচুরে গেছে৷ 
এই সম্পত্তি নিয়ে আইনি জটিলতা আছে, আমার বিশ্বাস, উত্তরাধিকার, সহ-উত্তরাধিকার এই সব নিয়ে; যাই হোক, বাড়িটা বেশ কিছু বছর ধরে খালি পড়ে আছে৷ 
আমার ভয় হয়, এ সবে আমার অশরীরী আবছায়া ক্ষুণ্ণ হয়, কিন্তু আমি তা পাত্তা দিই না – এই বাড়িটাকে ঘিরে এক অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপার আছে – আমি সেটা বুঝতে পারি৷ 
এক চাঁদনি রাতে জনকে এ সব বলেছিলাম, কিন্তু সে বলল, এ এক দুর্বার আকর্ষণ বই কিছু নয় আর এ কথা বলে সে জানলা বন্ধ করে দিল৷ 
কখনও কখনও অযৌক্তিকভাবে জনের ওপর আমার রাগ হয়৷ আমি নিশ্চিত এমন সংবেদনশীল আগে কখনও হতাম না৷ মনে হয়, স্নায়ুঘটিত কারণেই এ সব হচ্ছে৷ 
কিন্তু জন বলে, আমার যদি এ রকম বোধ হয় তবে আমি নিজেকে ঠিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না; তাই কষ্ট হলেও নিজেকে সামলে রাখি – অন্তত তার সামনে – এবং এতে করে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ি৷ 
আমাদের ঘরটা খানিক অপছন্দ আমার৷ নিচতলায় একটি ঘর চেয়েছিলাম যার সামনে থাকবে খোলামেলা ঘোরাফেরার বাগান, জানলাজুড়ে ছেয়ে থাকবে গোলাপ আর সুন্দর ছিটকাপড়ের ঝোলানো পরদা! কিন্তু সে এ কথায় কোনও গা-ই করেনি৷ 
সে বলেছিল, শুধু থাকবে একটা জানলা আর দুটো বেডের জন্য ঘর নয়, আবার অন্য একটা নিলে তার জন্য কাছাকাছি কোনও ঘর থাকবে না৷ 
সে খুবই যত্নবান আর সদয়; বিশেষ নির্দেশ ছাড়া আমাকে নড়াচড়া করতে দেয় না, বললেই চলে৷ 
রোজ ঘন্টা ধরে ধরে আমাকে নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়া আছে; সে আমার সব কিছুর খেয়াল রাখে, আর তাই এ সবের কোনও মূল্য না দেওয়ার জন্য হীন অকৃতজ্ঞতা বোধ করি৷ 
সে বলে, পুরোপুরি আমার কারণেই আমরা এখানে এসেছি৷ আমার সঠিক বিশ্রামের দরকার ছিল আর এখানে প্রচুর মুক্ত বাতাসও পাওয়া যাবে৷ ‘ শোনো মণি, তোমার শক্তির ওপরেই শরীরচর্চা নির্ভর করছে ‘, সে বলেছিল, ‘ আর খাবার কিছুটা হলেও নির্ভরশীল তোমার খিদের ওপর; কিন্তু মুক্ত বাতাস তুমি সব সময়ই গিলে নিতে পারো৷’ তাই বাড়িটার একদম উঁচুতে নার্সারিটা আমরা নিয়েছিলাম৷ 
এটা একটা বিশাল ঘর, সব সময় বাতাস খেলছে ; বিশাল মেঝে, জানলাগুলি দিয়ে চারদিকের রাস্তা চোখে পড়ে আর প্রচুর পরিমাণে রোদ- আলোর ছোটাছুটি৷ প্রথমত এটি নার্সারি আর তারপর খেলার মাঠ ও জিমনাসিয়াম – এটাই মনে হয় আমার কেননা জানলাগুলি ছোটো শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ ; আর দেওয়ালজুড়ে গোলাকার সব ছবি আর অন্যান্য বস্তু৷ 
রং আর কাগজ দেখে মনে হয় কোনও ছেলেদের স্কুলের জন্য ঘরটা ব্যবহার করা হত৷ দেওয়ালের কাগজ সব ছিঁড়েটিড়ে ফেলা হয়েছে, আমার বিছানার মাথার দিকটায় দেওয়ালজুড়ে তাপ্তি লাগানো, ঠিক যতদূর আমার হাত পৌঁছয়, আবার ঘরের অন্যদিকের নিচ অব্দিও বেশির ভাগ জায়গাই এমন৷ 
এত খারাপ ওয়ালপেপার জীবনে দেখিনি৷ 
এই ছড়ানো উজ্জ্বল রঙের নকশার একটিতে যেন শৈল্পিক পাপের নিদর্শন৷ 
এই ম্যাটমেটে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ কেমন ধাঁধিয়ে যায়, অনবরত বিরক্তি উৎপাদন করায় কেমন সুস্পষ্ট যা ঘেঁটে দেখতে উসকানি দেয়; একটু দূরে যখন তুমি ভাঙাচোরা অনিশ্চিত বাঁকগুলোকে অনুসরণ করছ তারা হঠাৎই যেন আত্মহত্যা করে বসছে – সাংঘাতিক ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, অশ্রুতপূর্ব বৈপরীত্যে নিজেদের ধ্বংস করছে৷ 
বিরক্তিকর রং, প্রায় বিদ্রোহের ভঙ্গি ; একটা ধোঁয়াটে, অপরিষ্কার হলুদ রং, আস্তে ঘুরে যাওয়া সূর্যের আলোয় অদ্ভুতভাবে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। 
এটা কোথাও কোথাও নিস্তেজ হলেও বীভৎস, অন্যগুলোতে গন্ধকের মতো অসুস্থ হলদেটে ছাপ। 
শিশুরা যে একে ঘেন্না করবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! এই বিশাল ঘরে বাস করতে হলে আমিও ঘেন্না করতাম। 
জন ঢুকছে, এখন এ সব আমাকে সরিয়ে ফেলতে হবে – আমি একটি শব্দও লিখি, ও সেটাকে ঘেন্না করে। 
এখানে এসেছি সপ্তাহদুয়েক হল, আর সেই প্রথম দিন থেকে এ ভাবে লেখার মন করেনি। 
এখন জানলার ধারে বসে আছি, ওপরের এই নিষ্ঠুর নার্সারিতে, আমার খুশিমতো লিখব, কেউ সেখানে বাধা দিতে পারবে না – একমাত্র যদি না দেহমনে জোর কমে যায়। 
জন সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে এমনকি কখনও রাতের দিকেও যখন কোনও জটিল রোগী হাতে আসে। 
আমি খুশি যে আমার রোগটা মারাত্মক কিছু নয়।
কিন্তু আমার এইসব স্নায়বিক কষ্ট মারাত্মকভাবে হতাশব্যঞ্জক। 
জন জানে না সত্যি সত্যিই আমি কতটা ভুগি। সে জানে, কষ্ট পাওয়ার কোনও কারণ নেই এবং তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে। 
এটা অবশ্য শুধুই স্নায়ুর দুর্বলতা। এটা আমার ওপরেই ভর করে তাই কোনওভাবেই আমার কর্তব্য পালন করা যাবে না! 
আমি জনের কাছে এমনই সহায়ক বলে ভাবতাম, প্রকৃতপক্ষে এমনই বিশ্রাম ও আরাম আর এখানে আমি তুলনামূলকভাবে বোঝা হয়েই আছি! 
 
কেউই বিশ্বাস করবে না, আমি যেটুকু করতে সক্ষম তা করতেও কতটা চেষ্টা করতে হয় – পোশাক পরা, মনোরঞ্জন করা আর এটাওটার জন্য হুকুমহাকাম করা।
এটা সৌভাগ্যের বিষয় মা মেরি তার শিশুসন্তানের প্রতি কতই না যত্নশীল। কী আদুরে শিশু!
আর তবুও আমি তার সঙ্গে থাকতে পারি না, আমাকে তা এতটাই নার্ভাস করে দেয়৷ 
মনে হয় জন জীবনে কখনও নার্ভাস হয়নি৷ তাই সে এই ওয়ালপেপার নিয়ে আমাকে উপহাস করে৷ 
প্রথমে সে এই ঘরটিকে আবার রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়তে চেয়েছিল, কিন্তু পরে বলল, আমার অনেকটাই নাকি এ খেয়ে নেবে আর কল্পনার জগতে হারিয়ে যেতে দেওয়া, এক স্নায়বিক রোগীর পক্ষে এর চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না৷ 
সে বলেছিল, ওয়ালপেপারগুলো পালটানো হয়ে গেলে ভারি খাটটার কথা হবে, তারপর খিল দেওয়া জানলাগুলো, তারপর সিঁড়ির মাথার দরজা এবং আরও আরও কিছু৷ 
‘ তুমি জানো, জায়গাটি তোমার ভালো লেগেছে, ‘ সে বলল, ‘ আর সত্যি সত্যিই সোনামণি, তিন মাসের ভাড়ায় নিয়ে এ বাড়িটাকে সাজিয়ে তুলতে আমার বয়েই গেছে৷’ 
‘ তাহলে চলো, নিচে গিয়ে থাকি ‘, আমি বললাম, ‘ ওখানে সুন্দর সব ঘর আছে৷ ‘
এরপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট করে বলল, ‘ আমার ছোট্ট বোকা হংসী ‘ ; তারপর বলল, ‘ আমি চাইলে সে নিচের গুমঘরে যেতে পারে এবং অধিকন্তু চুনকাম করিয়েও নিতে পারে৷ 
কিন্তু বিছানা, জানলা আর অন্যান্য জিনিসের ব্যাপারে সে ঠিকই বলেছে৷ 
এই ঘরটি কারও ইচ্ছেমতো যথেষ্ট খোলামেলা, আরামদায়ক এবং অবশ্যই আমি অতটা বোকামি করতে পারব না যে সামান্য খেয়ালবশে ওকে অস্বস্তিতে ফেলে দেব৷ 
বাস্তবিকই আমি আস্তে আস্তে এই বড় ঘরটিকে ভালোবেসে ফেলছি, এই ভয়ংকর ওয়ালপেপার ছাড়া৷ 
একটি জানলা দিয়ে আমি বাগান দেখতে পাই, ওই রহস্যঘন গভীর ছায়ায় মোড়া কুঞ্জবন, অবাধ বেড়ে ওঠা পুরনো ফুলসব, ঝোপঝাড় আর গিঁটালো গাছসব৷ 
অন্য একটি জানলা দিয়ে দুই থামের মাঝের সুন্দর দৃশ্যটি দেখতে পাই আর দেখি এই এস্টেটের কাঠের তৈরি একটা ব্যক্তিগত ঘাট৷ বাড়ি থেকে নেমেই একটা সুন্দর আচ্ছাদিত গলিপথ চলে গেছে ওই অব্দি৷ আমি সব সময় কল্পনা করি, অনেকে এই রাস্তা আর কুঞ্জবন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কিন্তু জন সতর্ক করে বলেছে আমি যেন এমন কল্পনাপ্রবণ না হই৷ সে বলে যে আমার কল্পনাশক্তি আর গল্প বানানোর অভ্যেসের কারণে আমার মতো এক স্নায়বিক দুর্বলতা সমস্ত ধরনের উত্তেজক কল্পনার জন্ম দিতে পারে ; এবং সে কারণে এই প্রবণতা রুখতে আমার ইচ্ছেশক্তি আর সু-বোধকে কাজে লাগানো উচিত৷ আমি সেই চেষ্টাই করতে লাগলাম৷ 
কখনও কখনও আমার মনে হয়, আমি যদি সামান্য লেখালিখির জন্য যথেষ্ট সুস্থ হতাম তাহলে মাথার ভেতরকার চিন্তাসব খানিকটা মুক্ত হয়ে আমাকে বিশ্রাম দিত৷ 
কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করতে গিয়ে আমি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছি৷ 
আমার কাজের জন্য কোনও উপদেশ বা সাহচর্য না পাওয়াটা বেশ হতাশাজনক৷ প্রকৃতই আমি যখন সুস্থ থাকি, জন বলে, আমাদের উচিত তুতোভাই হেনরি আর জুলিয়াকে এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে যেতে বলা, কিন্তু সে এও বলে, এখন এইসব শক্তি জোগানো মানুষজনেদের ডেকে আনা মানে বালিশের ঢাকনার নিচে আগুন ধরিয়ে দেওয়া৷ 
মনে হল, আমি যেন তাড়াতাড়ি সেরে উঠি৷ 
কিন্তু এটা নিয়ে আর ভাবব না৷ এই কাগজ দেখে মনে হয়, এ যেন জানে কী বিষাক্ত প্রভাব এর ছিল! 
কাগজের নকশাটা যেখানে ঘাড় মটকে উলটে দুটো ঝুলে পড়া চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে সেখানে একটা দাগ যেন বারবার দেখা দিয়েছে৷ 
এর ঔদ্ধত্য আর চিরস্থায়িত্বের ভাব দেখে আমি খুবই রেগে গেলাম৷ ওপর-নিচে, পাশে ওরা হামাগুড়ি দিচ্ছে আর ওই উদ্ভট নিষ্পলক চোখদুটো যেন সর্বত্র দেখা দিচ্ছে৷ একটা জায়গা আছে যেখানে দুটি চওড়া ভাব ঠিক খাপ খাচ্ছিল না আর চোখদুটি লাইনের ওপর-নিচে চলে যাচ্ছে – একটা অন্যটার চাইতে খানিকটা উঁচুতে৷ 
কোনও জড়বস্তুতে এত সব প্রকাশভঙ্গি আগে কখনও দেখিনি আর আমরা সবাই জানি এদের কতরকমই যে প্রকাশভঙ্গি আছে! আমি শিশুর মতো জেগে শুয়ে থাকতাম আর ফাঁকা দেওয়ালের মাঝ থেকে অনেক বেশি মজা আর ভয় পেতাম- যা বেশিরভাগ শিশু খেলনাপাতির দোকান থেকে পেত না৷ 
মনে পড়ে আমাদের ব্যবহৃত বিশাল পুরনো লেখার টেবিলের হাতলগুলি কী ভালোবেসে ইশারা করত আর ছিল একটি চেয়ার যাকে সব সময় মনে হত, খুব কাছের এক বন্ধু৷ 
আবার মনে হত অন্যান্য জিনিসপত্রের একটিও যদি খুব হিংস্র হত তবে সব সময় লাফিয়ে গিয়ে চেয়ারটিতে বসে নিরাপদ বোধ করতাম৷ 
এ ঘরের আসবাবপত্র, যাই হোক, সামঞ্জস্যহীনের চাইতে খারাপ কিছু নয়, কেননা এ সবগুলোকে নিচ থেকে আনতে হয়েছে৷ মনে হয়, এই ঘরটা যখন খেলাঘর হিসাবে ব্যবহার করা হত ওরা নার্সারির জিনিসপত্র বের করে দিয়েছিল, আর অবাক হবার মতো কিছু নেই! বাচ্চার দল যেভাবে সব তছনছ করে রেখেছে তা আগে কখনও দেখিনি৷ 
ওয়ালপেপার যেমনটি আগে বলেছি, খাবলা খাবলা করে ছেঁড়া আর ভাইয়ের চাইতেও গায়ে গায়ে লেগে আছে – এদের অবশ্যই অধ্যবসায় এবং ঘৃণা, দুটোই ছিল৷ 
তারপর মেঝেটা এবড়ো- খেবড়ো, খুঁড়ে খুঁড়ে তোলা, তীক্ষ্ণ সুচের মতো হয়ে আছে, এখানে ওখানে প্লাসটার কুরে কুরে তোলা, আর এই বিশাল ভারী বিছানাটা যা এই ঘরে একমাত্র আসবাব, এটাকে দেখে মনে হয় যেন যুদ্ধের মাঝ দিয়ে এসেছে৷ 
কিন্তু তাকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবছি না – শুধু ওয়ালপেপার ছাড়া৷ 
এরপর এল জনের বোন৷ খুব ভালো মেয়ে আর আমার প্রতি খুব যত্নবান৷ আমার লেখাপত্তর তাকে দেখাতে চাই না৷ 
সে দক্ষ, উৎসাহী গৃহকর্ত্রী আর এরচেয়ে ভালো কোনও কাজ সে আশাও করে না৷ সত্যি সত্যিই আমি বিশ্বাস করি, সেও ভাবে, লেখালিখির জন্যই আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি৷ 
কিন্তু ও যখন বাইরে যায় তখন আমি লিখি, এইসব জানলা দিয়ে দেখি সে অনেকদূর চলে গেছে৷ 
একজন আছে যে রাস্তাটিকে শাসন করে, একটি সুন্দর ছায়াঘেরা ঘোরানো রাস্তা এ জায়গাটার ওপর অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে যেন৷ একটি সুন্দর দেশ যেখানে প্রচুর দেবদারু জাতীয় গাছ আর ভেলভেটের মতো চারণভূমি৷ 
এই ওয়ালপেপারের নানান মাত্রার উপ- নকশা আছে, বিশেষভাবে বিরক্তিকর কেননা বিশেষ কিছু আলোর ছটাতেই এদের দেখা যায় আর তাও পরিষ্কার নয়৷ 
কিন্তু যে সব জায়গায় তা ফিকে হয়ে যায়নি আর যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায়, সেখানে অদ্ভুত এক উত্তেজক আকারহীন চেহারা লক্ষ করি যা মনে হয় গোমড়ামুখে সামনের ওই বোকাবোকা স্পষ্ট নকশার আড়ালে লুকিয়ে থাকে৷ 
সিঁড়িতে জনের বোনের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে৷ 
ঠিক আছে, আমেরিকার জাতীয় ছুটির দিন জুলাইয়ের চার তারিখ শেষ হল৷ লোকজন সব বিদায় নিল, আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম৷ জন ভাবল, কারও খানিক সঙ্গ পেলে হয়তো আমার ভালো হবে, তাই আমরা মা, নেল্লি আর ছেলেমেয়েদের সপ্তাহখানেকের জন্য নিয়ে এলাম৷ 
আমি অবশ্য একটাও কাজ করলাম না৷ জেনিই সব দেখভাল করতে লাগল৷ 
তা সত্ত্বেও আমি যেন ক্লান্ত হয়েই চললাম৷ 
জন বলল, যদি আমি দ্রুত নিজেকে সামলে না নিই, সামনের শরৎকালে সে আমাকে উইয়ার মিচেলের কাছে পাঠিয়ে দেবে৷ 
কিন্তু আমার সেখানে একদমই যাবার ইচ্ছে নেই৷ 
আমার এক বন্ধু একবার ওঁর হাতে ছিল আর সে বলে মিচেল, জন ও আমার ভায়ের মতোই, খানিক বেশিও হতে পারে! 
এ ছাড়া, এতদূর যাওয়াটা এক কঠিন পরিকল্পনা৷ 
আমি মনে করি না যে কোনও কিছুর জন্য অপরকে দায়িত্ব দেওয়া যথার্থ কাজ, আর আমি ভয়ংকরভাবে খিটখিটে ও ঝগড়ুটে হয়ে পড়ছি৷ 
আমি বিনা কারণেই কাঁদি আর বেশির ভাগ সময়েই কাঁদি৷ 
অবশ্যই জন বা অন্য কেউ কাছাকাছি থাকলে নয় কিন্তু যখন একা থাকি…
এখন আমি যথেষ্টই একা৷ জন রোগীর জরুরি কারণে প্রায়ই শহরে আটকে যায়, আর জেনি এত ভালো যে আমি চাইলেই আমাকে একা ছেড়ে যায়৷ 
তাই আমি বাগানে খানিক হাঁটি বা ওই সুন্দর গলিপথ ধরে গোলাপের নিচে গাড়িবারান্দায় বসি, আবার বেশ কিছুক্ষণের জন্য শুয়েও পড়ি৷ 
ওই বিশ্রী ওয়ালপেপার সত্ত্বেও ধীরে ধীরে ঘরটিকে ভালোবাসতে শুরু করেছি৷ হয়তো ওই ওয়ালপেপারের কারণেই৷ 
এটা আমার মনে গেঁড়ে বসেছে! 
এই অনড় বিছানায় আমিও শুয়ে থাকি – এর উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যক্ত, আমার বিশ্বাস – এবং ঘন্টাখানেক ধরে ওই নকশাটাকে দেখতে থাকি৷ নিশ্চিত করে বলতে পারি এটা শারীরিক কসরতের মতোই উপকারী৷ আমি শুরু করি, আমরা বলব, একদম নিচ থেকে, নিচের ওই কোণ থেকে যেখানে এটা ছোঁয়নি আর আমি হাজারবার দৃঢ়্মনে ভাবি যে আমি ওই বিন্দুহীন নকশাকে অনুসরণ করে কোনও এক সিদ্ধান্তে আসব৷ 
নকশা তৈরির নিয়মকানুন বিষয়ে আমি খানিকটা জানি ; আমি এও জানি এই বস্তুটি বিকিরণ, বিকল্প বা পুনরাবৃত্তি বা সামঞ্জস্য অথবা অন্য কিছু যা এতদিন শুনে এসেছি – কোনও নিয়মেই সজ্জিত নয়৷ 
প্রস্থবরাবর এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে অবশ্যই কিন্তু অন্যভাবে মোটেও নয়৷ 
একদৃষ্টে এর দিকে তাকিয়ে দেখলে, প্রতিটা প্রস্থাঞ্চলই একা দাঁড়িয়ে আছে, ওই মোটা বাঁক আর আঁকা ছবিগুলি – এক ধরনের ‘ অপকৃষ্ট রোমান স্থাপত্য যেন ‘ যার সঙ্গে মিশে আছে অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত মাতাল পাগলামি – সেগুলো যেন টলতে টলতে বোকাবোকা বিচ্ছিন্ন সারিতে ওঠানামা করছে৷ 
কিন্তু অপরপক্ষে সেগুলো কোনাকুনিভাবে যুক্ত আর ছড়ানো প্রান্তরেখাগুলো দৃষ্টিবিভ্রমের তির্যক ঢেউয়ের ঢঙে বয়ে যাচ্ছে যেন প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক শৈবাল জোর ধেয়ে আসছে৷ 
পুরো বিষয়টি আনুভূমিকভাবে বয়ে চলেছে, অন্তত দেখে তাই মনে হচ্ছে, আর তার গতিপথের প্রণালীকে আলাদা করে বুঝতেই আমার কালঘাম ছুটে যাচ্ছে৷ 
ওরা একটা আড়াআড়ি চওড়া খসখসে পশমি কাপড় ব্যবহার করেছে এবং তাতে করে ধাঁধা বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেছে৷ 
এই ঘরের একটা প্রান্ত গোটাটাই প্রায় অক্ষত আছে আর সেখানে যখন আড়াআড়ি পড়া আলো মিইয়ে আসে আর এর ওপর সূর্যের আলো পড়ে, আমি প্রায় বিকিরণ কল্পনা করে ফেলি, মোটের ওপর মনে হয় সেখানে অসংখ্য অদ্ভুত মূর্তি সব গড়ে উঠছে, ঠিক মাঝখানটি ঘিরে আর সম- বিক্ষেপে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যেন৷ 
এইসব দেখতে দেখতে আমি হাঁপিয়ে উঠি৷ খানিক ঘুমোতে ইচ্ছে করে৷ 
জানি না, কেন এ সব লিখব৷ 
আমি লিখতে চাই না৷ 
মনে হয় না আদৌ লিখতে পারি৷ 
আর আমি জানি জন মনে করবে এটা উদ্ভট৷ কিন্তু আমি যেভাবে অনুভব করি আর ভাবি তা আমি বলবই – এটা এমনই এক স্বস্তি! 
কিন্তু স্বস্তির চাইতে চেষ্টা যেন অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে৷ এখন অর্ধেক সময়ই আমি আশ্চর্যজনকভাবে অলস আর বেশির ভাগ সময়ই শুয়ে থাকি৷ 
জন বলে, আমি যেন কোনওভাবেই দুর্বল না হই, তাই আমার খাওয়ার জন্য কডলিভার তেল, নানাজাতীয় টনিক আর অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী এনেছে ; মদটদ আর দুর্লভ মাংসের তো কথাই নেই৷ 
আদরের জন! সে আমাকে খুব ভালোবাসে আর অসুস্থ দেখতে খুব ঘৃণাবোধ করে৷ সেদিন ওর সঙ্গে বাস্তবিকই একান্ত যুক্তিযুক্ত কথাবার্তা বলতে চেষ্টা করেছিলাম আর বলেছিলাম তুতোভাই হেনরি আর জুলিয়াকে দেখতে যেতে কতই না ইচ্ছে করছে৷ 
কিন্তু সে বলল, আমি যেতে সক্ষম নই আর সেখানে গেলেও সে সব আমি সইতে পারব না ; আমি নিজের জন্য সঠিক অবস্থান খুঁজে পাব না, তাই কথা শেষ করার আগেই আমি কান্না জুড়ে দিলাম৷ 
সোজাসুজি চিন্তা করা আমার পক্ষে খুবই চাপের হয়ে যাচ্ছে৷ মনে হয় এই স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে৷ 
জন আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে নিল আর ওইভাবে ওপরতলায় নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল আর আমার পাশে বসে পড়ে শোনাতে লাগল যতক্ষণ না আমার মাথা ক্লান্তিতে কাজ করা বন্ধ করে দেয়৷
সে বলেছিল আমি তার সোনামণি আর তার আরাম- আয়েস যা কিছু এবং তার কারণেই আমার নিজের যত্ন নেওয়া আবশ্যিক, আর সুস্থ থাকাও৷ 
সে বলে, অন্য কেউ না, ভালো থাকার জন্য এভাবেই আমায় নিজেকে সাহায্য করে যেতে হবে, আর আমি যেন আমার ইচ্ছাশক্তি ও আত্মসংযম বজায় রাখি আর বোকাবোকা কল্পনার সঙ্গে যেন উড়ে না যাই৷ 
সেখানে একটিই স্বস্তির কথা, শিশুটি সুস্থ আর সুখী আর ভয়ানক ওয়ালপেপারের সাহায্যে এই নার্সারিটা দখলের চেষ্টায় নেই৷ 
আমরা যদি এটাকে এভাবে ব্যবহার না করতাম ওই আশিস- পুষ্ট শিশুটি করত৷ কী সৌভাগ্যের পলায়ন! কেন, আমার নিজের কোনও সন্তান হবে না? সহজে ছাপ রেখে যায় এমন ছোট্ট একটি প্রাণ গোটা জগৎজুড়ে এই ছোট্ট ঘরটিতে বাস করবে৷ 
আগে এ নিয়ে কখনও ভাবিনি কিন্তু আমি ভাগ্যবান যে মোটের ওপর জন আমাকে এখানে এনে রেখেছে৷ আর একটি শিশুসন্তানের চাইতে অনেক সহজভাবেই আমি এটা সইতে পারি৷ 
আমি অবশ্য এটা কখনও তাদের বলিনি – আমি এতটাই বুদ্ধি ধরি – তা সত্ত্বেও আমি এগুলোকে সর্বদা নজরে রেখে চলি৷ 
এই ওয়ালপেপারে এমন সব কিছু আছে যার বিষয়ে আমি ছাড়া কেউ জানে না বা কখনও জানতে পারবে না৷ 
বাইরের এই নকশার পেছনে ম্যাটমেটে আকৃতিগুলি রোজই একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছে৷ 
এ সব সময়ই ওই একই আকৃতি, শুধু সংখ্যায় অনেক৷ 
এবং এটা এক মহিলার মতো যে নিচু হয়ে ওই নকশার পেছনে গুঁড়ি মেরে চুপিসারে চলে৷ আমার এটা ঠিক পছন্দ হয় না৷ আমি অবাক হই – ভাবতে শুরু করি – ইচ্ছে হয় জন আমাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাক৷ 
আমার বিষয়টি নিয়ে জনের সঙ্গে কথা বলা খুবই কঠিন কারণ সে এতটাই বুদ্ধি ধরে আর আমাকে ভালোও বাসে খুব৷ 
কিন্তু গতরাতে আমি এ ব্যাপারে চেষ্টা চালালাম৷ 
জ্যোৎস্না রাত৷ চারদিকে চাঁদের আলো ফকফক করছে, ঠিক যেমন সূর্য তার ছটা ছড়ায়৷ 
কখনও কখনও এটার দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার ঘেন্না হত, এত আস্তে আস্তে এ চুপ করে গুঁড়ি মেরে সব সময় হয় এ জানলা নয় ও জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে৷ 
জন ঘুমিয়ে ছিল, ওকে জাগাতে আমার ঘেন্না লাগছিল, তাই আমি চুপচাপ ওই ঢেউখেলানো ওয়ালপেপারের ওপর পড়া চাঁদের আলো দেখতে থাকলাম যতক্ষণ না আমার গা ছমছম করে ওঠে৷ 
পেছনের আবছা আকারটা মনে হল নকশাটাকে কাঁপিয়ে দিল, ঠিক যেন সেই মহিলা ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ 
আমি আলতোঢঙে উঠে দেখা – বোঝার জন্য এগোলাম যে কাগজটা নড়ছে – টড়ছে কি না ; তারপর যখন ফিরে এলাম, জন জেগে গিয়েছে৷ 
‘ এটা কী হচ্ছে, ছোট্ট খুকি? ‘, সে বলে উঠল, ‘ ওভাবে হামা দিয়ে যাবে না – তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে৷ ‘ 
আমার মনে হল এটাই কথা বলার উপযুক্ত সময় তাই তাকে বললাম, আমি সত্যিসত্যিই ওটার নাগাল পাচ্ছিলাম না৷ আর তাই চাইছিলাম সে আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাক৷ 
‘ কেন সোনামণি! ‘, সে বলল, ‘ আমাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে তিন সপ্তাহ লাগবে আর আমি বুঝতে পারছি না তার আগে কীভাবে এখান থেকে যাব৷’ 
বাড়ির সারাসুরির কাজ এখনও হয়নি, আর আমি হয়তো এই মুহূর্তে শহর ছাড়তে পারব না৷ অবশ্য তুমি যদি কোনওভাবে বিপদগ্রস্ত হও তাহলে আমাকে পারতেই হবে এবং আমি তা করবও, কিন্তু সোনা, তুমি সত্যিই অনেকটা ভালো আছ – তা তুমি বুঝতে পারো আর নাই পারো৷ শোনো, আমি একজন ডাক্তার, আমি জানি৷ তোমার শরীরে মাস লেগেছে, রং খুলেছে; খিদে আগের চেয়ে বেড়েছে৷ তোমাকে নিয়ে বাস্তবিকই অনেকটা স্বস্তিতে আছি৷ ‘ 
‘ আমার ওজন একটুও বাড়েনি ‘, আমি বললাম, ‘ তেমন বেশি কিছু নয় ; আর সন্ধের দিকে খিদেটা খানিক বেশি হতে পারে যখন তুমি এখানে থাকো, কিন্তু তুমি যখন বাইরে থাকো সেই সকালের দিকে খিদে থাকে না বললেই চলে৷ ‘ 
‘ ওর এই ছোট্ট হৃদয়টিকে আশীর্বাদ করো প্রভু৷ ‘ আমাকে জোর জড়িয়ে ধরে এ কথা বলল সে, ‘ ও তার পছন্দমতো অসুস্থ হবে৷ কিন্তু এখন ঘুমোতে যাই, জ্বলজ্বলে মুহূর্তগুলিকে একটু ভালো করা যাক, সকালে এ সব নিয়ে কথা বলা যাবে৷ ‘ 
‘ তাহলে তুমি যাবে না? ‘, আমি বিষণ্ণভাবে জানতে চাইলাম৷ 
‘ কেন, কীভাবে যাব সোনা? আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি, তারপর আমরা একটি সুন্দর ছোট্ট ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ব যখন জেনি বাড়িটিকে ঠিকঠাক করে ফেলবে৷ সত্যিই সোনা, তুমি আগের চেয়ে ভালো আছ৷ ‘
‘ ভালো হয়তো শরীরে ‘- আমি শুরু করে খানিক থামলাম, কেননা সে সোজা হয়ে উঠে আমার দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে এমন কটমটিয়ে তাকাল যে আমার মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও বেরোল না৷ 
‘ শোনো সোনা, ‘ সে বলল, ‘ তোমাকে মিনতি করে বলছি, আমার জন্য, আমাদের সন্তানের জন্য এমনকি তোমার নিজের জন্যও তুমি আর এক মুহূর্তও এইসব ছাইপাঁশ ভাবনা মাথায় নেবে না৷ তোমার মেজাজের কাছে এমন বিপজ্জনক, এমন আকর্ষক আর কিছু হয় না৷ এটা একটা মিথ্যে আর বোকাবোকা কল্পনা৷ আমি যখন তোমাকে এ সব বলি তুমি কি চিকিৎসক হিসাবে আমাকে বিশ্বাস করতে পারো না?’ 
সুতরাং অবশ্যই আমি আর এ ব্যাপারে কোনও কথা বললাম না, আর অনেকটা আগেই আমরা শুতে গেলাম৷ সে ভেবেছিল আমি শোওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে গেছি কিন্তু আমি ঘুমোইনি, – দীর্ঘক্ষণ শুয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে বাস্তবিকই সামনের ও পেছনের নকশা এক সঙ্গে কাঁপছিল, নাকি আলাদাভাবে৷ 
দিনের আলোতে এই রকম নকশায় অনুক্রমের অভাব থাকে, নিয়মকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা থাকে – যা কিনা সাধারণ মানসের কাছে অবিরল বিরক্তিকর৷ 
রংটা অতি কুৎসিত আর যথেষ্ট অবিশ্বাস্য, ক্ষিপ্ত করে তোলে খুব কিন্তু নকশাটা পীড়াদায়ক৷ 
তুমি ভাবছ তাকে আড়পে ফেলেছ কিন্তু ঠিক যে পথে তুমি সেরে উঠছ এটা উলটো ডিগবাজি দেয় আর সেখানেই তুমি থাকো৷ এ তোমার গালে চড় কষায়, তোমাকে পেড়ে ফেলে পায়ে পিষে দেয়৷ এটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো৷ 
এর বাইরেটা ফুলফুল আরবি নকশার মতো, ব্যাঙের ছাতার কথা মনে হয় দেখলে৷ জোড়ায় জোড়ায় ব্যাঙের ছাতা কল্পনা করা যাক, অসংখ্য এ রকম সার দেওয়া ব্যাঙের ছাতা কুণ্ডলী পাকিয়ে মাটি ফুঁড়ে গজাচ্ছে – এ যেন অনেকটা সেই রকম৷ 
কখনও কখনও সে রকমই লাগে! 
এই কাগজটির এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল, যা মনে হয়, আমি ছাড়া কেউ লক্ষ করে না এবং তা হল আলোর বাড়া – কমার সঙ্গে এরও পরিবর্তন হয়৷ 
পুব দিকের জানলা দিয়ে যখন রোদ ঠিকরে ঢোকে – আমি সেই প্রথম দীর্ঘ সোজা আলোয় দেখি – এটা খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে পালটে ফেলছে যা আমি কখনওই পুরো বিশ্বাস করতে পারি না৷ 
আর এই কারণেই আমি সব সময় এর দিকে তাকিয়ে থাকি৷ 
জ্যোৎস্নায় – সারারাত চাঁদ যখন আলো ছড়িয়ে যায় – আমি জানতে পারি না এটা ওই একই ওয়ালপেপার কি না৷ 
রাতের বেলা যে কোনও রকম আলোতে – গোধূলির, মোমবাতির, প্রদীপের আর এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ চাঁদের আলোয় এই কাগজকে ডান্ডার মতো লাগে৷ বাইরের নকশা, আমি বলতে চাইছি, আর এর পেছনের মহিলা – যতটা সহজ হতে পারে আর কি৷ 
আমি অনেকক্ষণ বুঝতে পারিনি, পেছনে যেটা দেখাচ্ছে, বস্তুটি কি – ওই ফিকে উপ – নকশাটি, – কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত, ওটা একজন মহিলা৷ 
দিনের আলোয় সে চাপা পড়ে থাকে, শান্ত, সমাহিত৷ আমার কল্পনায় এটাই ওই নকশা যা তাকে স্থির রেখেছে৷ একটা ধাঁধা ধরিয়ে দেয়৷ ঘন্টাখানেক আমাকে চুপ করিয়ে রাখে৷ 
এখন অনেকটা সময় শুয়ে থাকি৷ জন বলে এটা আমার পক্ষে ভালো, আর যতটা পারি ঘুমোই৷ 
বাস্তবিকই প্রত্যেকবার খাওয়াদাওয়ার পর ও আমাকে এক ঘন্টা শুয়ে থাকার অভ্যাস শুরু করিয়েছিল৷ 
এটা খুব খারাপ অভ্যাস, আমার বিশ্বাস, কেননা, দেখো, আমি তো ঘুমোই না৷ 
আর তা থেকেই প্রবঞ্চনার অভ্যাস শুরু হয়, কেননা আমি তাদের বলি না যে আমি জেগে আছি – না, একদমই না৷ 
ঘটনা হল, জনকে নিয়ে আমি খানিক ভীত হয়ে পড়ছি৷ 
কখনও কখনও ওকে খুব অদ্ভুত লাগে আর এমনকি জেনির দৃষ্টিতেও একটা ব্যাখ্যাতীত ভাব৷ 
মধ্যেমাঝে এটা আমাকে ধাক্কা দেয়, ঠিক কোনও বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের মতো, ওটা হয়তো ওই কাগজটা! 
জন যখন জানতে পারে না যে আমি তাকিয়ে আছি তখন আমি ওকে লক্ষ করেছি৷ সহজ সরল অজুহাতে ও হঠাৎ করেই ঘরে ঢুকেছে আর আমি দেখে ফেলেছি, ও কাগজটির দিকে তাকিয়ে আছে! আবার জেনিও৷ একবার কাগজটির ওপর হাত রাখা অবস্থায় জেনিকে ধরে ফেলেছিলাম৷ 
সে জানত না আমি ঘরে আছি আর আমি যখন শান্ত স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যতটা সম্ভব সংযত ভঙ্গিতে, সে কাগজটা নিয়ে কী করছিল, সে এমনভাবে ঘুরে দাঁড়াল যেন চুরির অপরাধে ধরা পড়েছে, আর গাঁড়াগাঁড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, কেন আমি তাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিয়েছি! 
 তারপর সে বলল, কাগজটা যেখানে ঠেকছে সেখানটায় নোংরা দাগ ফেলে দিচ্ছে আর সে দেখেছে ওটা আমার ও জনের পোশাকেও হলদে চুম্বনের চিহ্ন রেখে গেছে৷ সে চাইল আমরা যেন আরও সতর্ক থাকি৷ 
এটা শুনে নিরীহ গোবেচারার মতো লাগে না? কিন্তু আমি জানি সে ওই নকশাকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করছিল এবং আমার দৃঢ় ধারণা, এটা আমি ছাড়া আর কেউ ধরতে পারবে না৷ 
জীবন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনাময়৷ দেখো, আমার কিছু বেশি আশা করার আছে, সামনের দিকে তাকিয়ে দেখার আছে, লক্ষ করার আছে৷ আমি সত্যিসত্যিই এখন আগের চেয়ে বেশি খাই আর আগের চেয়ে অনেকটা শান্ত হয়ে গেছি৷ 
আমার উন্নতি হচ্ছে দেখে জন কতই না খুশি! সেদিন সে খানিক হেসে বলেছিল আমার ওয়ালপেপার – আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আমি বেশ বাড়ছি মনে হয়৷ 
প্রতি-হাসি হেসে তার এ কথাকে বরখাস্ত করলাম৷ তাকে বলার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না যে ওয়ালপেপারের জন্যই আমার এ বাড়বাড়ন্ত – তাহলে সে আমাকে নিয়ে মজা করত৷ এমনকি আমাকে সরিয়ে নিয়ে যেতেও চাইত৷ 
একে ঠিকঠাক খুঁজে বের না করা পর্যন্ত আমি চলে যেতে চাই না৷ আরও এক সপ্তাহ আছে, মনে হয় সেটাই যথেষ্ট সময়৷ 
আমার অনেকটাই ভালো বোধ হচ্ছে৷ রাতে খুব একটা ঘুমোই না, কেননা একটু একটু করে উন্নতি দেখাটা বেশ মজার ; কিন্তু দিনের ভাগে আমি যথেষ্ট ঘুমোই৷ 
দিনের ভাগে, এটা অত্যন্ত ক্লান্তিকর আর হতবাক করা৷ 
রোজই নতুন নতুন ব্যাঙের ছাতা গজাচ্ছে আর তাদের ওপরে হলদে ছায়া ছড়াচ্ছে৷ আমি সে সব গুণে রাখি না যদিও বিবেকবানের মতো আমি চেষ্টা করেছি৷
এটা অদ্ভুততম হলুদ, ওই ওয়ালপেপার! আমি যত হলদে জিনিস দেখেছি তাদের মধ্যে এটাই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে – সোনারঙের ঝুমকোফুলের মতো সুন্দর নয়, বরং পুরনো, নোংরা, খারাপ হলুদ বস্তুসামগ্রী৷ 
কিন্তু কাগজটির বিষয়ে আরও কিছু আছে – ওর গন্ধ! যে মুহূর্তে এই ঘরে ঢুকেছিলাম তখন খেয়াল করেছিলাম, কিন্তু প্রচুর রোদ-বাতাস থাকলেও তা খারাপ লাগেনি৷ এরপর সপ্তাহখানিক জুড়ে কুয়াশা আর বৃষ্টি আর জানলাগুলো খোলা থাক বা বন্ধ, গন্ধটি কিন্তু আছেই৷ 
বাড়িময় সে গুড়ি মেরে চলে৷ 
খাবার ঘরের মাথা জুড়ে তাকে দেখতে পাই, গোপন খবর নেবার ঢঙে বৈঠকখানায় ঘুরঘুর করছে, হলঘরে ঘাপটি মেরে থাকছে, সিঁড়ির ধাপে শুয়ে আমার অপেক্ষায় আছে৷ 
এটা আমার মাথার চুলে ঢুকে যায়৷ 
এমনকি যখন গাড়ি করে ঘুরতে বেরোই আর যদি হঠাৎ পেছনপানে মাথা ঘুরিয়ে একে চমকে দিই – বুঝি সেখানেও সেই গন্ধটি আছে৷ 
এমনই অদ্ভুত গন্ধ! একে বিশ্লেষণ করতে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছি, গন্ধটা কীসের মতো! 
প্রথমত এটা খুব খারাপ নয় আর খুব হালকা কিন্তু খুবই জটিল, খুবই টেকসই যা আগে আর কোথাও পাইনি৷ 
এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এটা দারুণ৷ রাতে ঘুম ভেঙে দেখি গন্ধটা আমার ওপর ঝুঁকে আছে৷
প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হতাম৷ বাড়িটাকে পুড়িয়ে ফেলার কথা গভীরভাবে ভেবেছি – শুধু গন্ধটার কাছে পৌঁছোনোর জন্য৷ 
কিন্তু এখন আমার সয়ে গেছে৷ এর সম্পর্কে যেটা শুধু ভাবি তা হল কাগজের রংটা – একটা হলুদ গন্ধ৷ 
এই দেওয়ালে একটা মজার দাগ আছে, নিচের দিকে, মপবোর্ডের ( ঝাড়ু রাখার জায়গা) কাছে৷ ঘরময় একটা দাগ৷ এটা দেখছি প্রতিটি আসবাবের পেছনে, বিছানাটি ছাড়া, একটা লম্বা সোজা দাগ, দীর্ঘ চুম্বনের মতো, যেন বারবার এটাকে ঘষা হয়েছে৷ 
এটা কীভাবে হল, কে করল, ভেবে অবাক হই, আর যারা করেছে, কেনই বা করেছে! ক্রমাগত এর পেছনে ঘুরে ঘুরে, ঘুরে ঘুরে, আরও ঘুরে – মাথাটা আমার ঝিমঝিম করছে! 
বাস্তবিকই শেষ অব্দি একটা কিছু আবিষ্কার করলাম৷ 
রাতে এত কিছু লক্ষ করার পর যখন এভাবেই তা পরিবর্তিত হয়, আমি শেষ অব্দি খুঁজে পেয়েছি৷ 
সামনের নকশা নড়াচড়া করে – আর অবাক হবার কিছু নেই! পেছনে থাকা মহিলা এটাকে নাড়ায়৷ 
কখনও কখনও আমার মনে হয় পেছনে অনেক মহিলা আবার কখনও কখনও শুধু একজন, এবং সে চারদিকে হামাগুড়ি দিচ্ছে আর তাতেই সবটা কাঁপতে থাকে৷ 
এরপর খুবই উজ্জ্বল আলগা দাগের জায়গাগুলিতে সেই মহিলা নিশ্চল হয়ে থাকে, আর ছায়াঢাকা জায়গায় সে শুধু ডান্ডাগুলোকে ধরে জোর নাড়াতে থাকে৷ 
এবং সে সব সময় লতিয়ে উঠতে চেষ্টা করে৷ কিন্তু ওই নকশার ওপর দিয়ে কেউই চলাচল করতে পারে না – এভাবেই এ শ্বাস আটকে দেয় -মনে হয় এই কারণেই এর এতগুলি মাথা৷ 
তারা পৌঁছে যায়, তারপর নকশা তাদের ফাঁস লাগিয়ে উলটে ফেলে দেয়, এতে ওদের চোখগুলো সাদা হয়ে যায়! 
যদি ওই মাথাগুলি ঢাকা থাকত বা তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত, তাহলে এর অর্ধেক খারাপও হত না৷
মনে হয় ওই মহিলা দিনের ভাগে বাইরে আসে! 
আর কেন তা গোপনে বলি – আমি তাকে দেখেছি৷ 
আমি তাকে প্রতিটি জানলা গলে দেখতে পাই! 
আমি জানি, ও ওই একই মহিলা কেননা সে সব সময় হামা দিচ্ছে আর অধিকাংশ মহিলাই দিনের বেলায় হামা দেয় না৷ 
ওই লম্বা ছায়াঢাকা গলিপথেও তাকে দেখতে পাই, গুড়ি মেরে উঠছে আর নামছে৷ ওই ঘন আঙুরলতার বাগানেও তাকে দেখতে পাই, বাগানের চারধারে হামা দিয়ে বেড়াচ্ছে৷ 
গাছগুলোর নিচে লম্বা রাস্তাটাতেও তাকে দেখতে পাই, গুড়ি মেরে চলাফেরা করছে, আর যখন কোনও গাড়িটাড়ি আসছে সে কালো আঙুর গাছটার নিচে লুকিয়ে পড়ছে৷ 
তাকে একটুও দোষ দিই না৷ দিনের বেলায় হামাগুড়ি দেওয়ার সময় ধরা পড়লে অবশ্যই লাঞ্ছনার শেষ থাকবে না৷ 
দিনের ভাগে যখন হামা দিয়ে চলি আমি সব সময় দরজা তালাবন্ধ রাখি৷ রাতে তা করতে পারি না, কেননা জানি, তাতে জন তৎক্ষণাৎ কিছু একটা সন্দেহ করে বসবে৷ 
এখন জন এতটাই সন্দেহবাতিক যে আমি তাকে বিরক্ত করতে চাই না৷ আমার ইচ্ছে হয় ও আর একটা ঘর নিক৷ এ ছাড়া রাতের বেলায় আমি বাদে কেউ সেই মহিলাকে বাইরে আসতে দেখুক, তা আমি চাই না৷ 
প্রায়ই অবাক হয়ে ভাবি যদি এক সঙ্গে সব জানলায় তাকে দেখতে পেতাম! 
কিন্তু যত দ্রুতই ঘাড় ঘোরাই না কেন, তাকে একটি জানলাতেই একবারের জন্য দেখতে পাই৷ 
এবং যদিও তাকে সব সময় দেখি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার আগেই খুব দ্রুত সে গুঁড়ি মেরে চলে যায়৷ 
কখনও কখনও তাকে খোলামেলা জায়গায় হামা দিতে দেখেছি – জোর বাতাসে উড়ে চলা মেঘছায়ার মতোই দ্রুততার সঙ্গে৷ 
একটার নিচ থেকে যদি ওপরের নকশাটাকে ছাড়িয়ে নেওয়া যেত! অর্থাৎ একটু একটু করে চেষ্টা করা যেত৷ 
আর একটি মজার বিষয় আমি খুঁজে বের করেছি কিন্তু এখন তা বলতে পারব না৷ মানুষকে খুব বেশি বিশ্বাস করা ঠিক হবে না৷ 
এই কাগজটিকে সরিয়ে নেবার জন্য আর দুটি দিন হাতে আছে, আর আমার বিশ্বাস জন লক্ষ রাখতে শুরু করেছে৷ ওর চোখের দৃষ্টিকে আমার পছন্দ হয় না৷ 
শুনেছি, ও জেনিকে আমার সম্পর্কে অনেক পেশাগত প্রশ্ন করেছে৷ জেনিও রিপোর্ট ভালোই দিয়েছে৷ 
সে বলেছে, দিনের বেলা আমি খুব ঘুমোই৷ 
জন জানে, রাতের বেলা আমি ভাল ঘুমোই না, যে কারণে আমি এত শান্ত৷ 
যেন আমি তার ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি না! 
এখনও এই ওয়ালপেপারের নিচে তিনমাস ধরে তার এই ঘুমিয়ে থাকার বিষয়টিতে আমি অবাক হই না৷ 
এটা শুধু আমার কাছে মজার একটি ব্যাপার, কিন্তু আমার নিশ্চিত বোধ হয় যে জন আর জেনি তলে তলে এর দ্বারা প্রভাবিত, আক্রান্ত৷ 
হুররে! আজকেই শেষ দিন, কিন্তু এটাই যথেষ্ট৷ জনকে সারারাত শহরে থাকতে হবে, আর আজ সন্ধের আগে অব্দি সে বেরোতে পারবে না৷ 
জেনি আমার সঙ্গে শুতে চেয়েছিল – খুব চালাকির ঢঙে! কিন্তু তাকে বলেছি নিঃসন্দেহে রাতভর একা শুলেই আমার অনেক ভালো বিশ্রাম হবে৷ 
এটাও আমার চালাকি, কেননা বাস্তবিকপক্ষে আমি তো একা ছিলাম না! যেইমাত্র চাঁদ জ্যোৎস্না ছড়াতে থাকে, আর ওই বেচারা হানা দিতে শুরু করে, নকশাটিকে ঝাঁকায়, আমি উঠে তাকে সাহায্য করতে ছুটে গেছি৷ 
আমি টেনে ধরি আর সে নাড়াতে থাকে, আবার আমি নাড়াই আর সে টেনে ধরে আর সকাল হবার আগেই আমরা ওই কাগজের কয়েকগজ জায়গা খাবলে ছাড়িয়ে নিই৷ 
আমার মাথা – সমান একটা ফালি যা ঘরের অর্ধেকটা জুড়ে ছিল৷ 
আর তারপর ঘরে রোদ ঢুকলে আর ওই উদ্ভট নকশা আমাকে দেখে উপহাস করলে আমি ঘোষণা করি, আজই একে শেষ করব৷ 
আমরা পরদিন বেরুবো আর ওরা আমার সব আসবাবপত্র আবার নিচে নামিয়ে আগের মতো রেখে এল৷
জেনি অবাক চোখে দেওয়ালপানে তাকাল কিন্তু তাকে আনন্দের সঙ্গে জানালাম যে আমি এই খুঁতওয়ালা বস্তুটাকে বিদ্বেষবশে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছি৷ 
সে হেসে বলল, সে নিজে করলেও কিছু মনে করত না, কিন্তু আমি যেন হাঁপিয়ে না পড়ি৷ 
কীভাবে তখন সে নিজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল! 
কিন্তু আমি এখানে, আমি ছাড়া আর কেউ এই ওয়ালপেপার ছোঁবে না – বেঁচে থাকতে নয়! 
জেনি আমাকে এই ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করল- এটা বেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল৷ কিন্তু আমি বললাম এই ঘরটি শান্ত, ফাঁকাফাঁকা আর পরিষ্কার, আমার বিশ্বাস যে এখানে আবার শুয়ে পড়ে যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমোতে পারি ; এবং আমাকে ডিনারের জন্য যেন জাগানো না হয় – জেগে উঠে নিজেই ডেকে পাঠাব৷ 
এ কথা বলতেই সে চলে গেল, চাকরবাকরেরাও বিদায় হল, সেখানে আর কিছুই রইল না, শুধু স্পষ্ট প্রতিভাত এই বিশাল খাটটি ছাড়া যার ওপরে ক্যাম্বিশ কাপড়ের জাজিমটি পড়ে আছে৷ 
আজ রাতে আমরা নিচের ঘরে শোব আর আগামীকাল নৌকাটি বাড়ি নিয়ে যাব৷ 
এই ঘরটি পুনরায় খালি হওয়ায় আমি বেশ আরাম বোধ করছি৷ 
বাচ্চারা কীভাবে এখানে ছিঁড়েখুঁড়ে অত্যাচার করেছে! 
এই খাটটির ওপরেও অত্যাচার কম হয়নি৷ 
কিন্তু আমি অবশ্যই কাজ শুরু করব৷ 
দরজায় তালা লাগিয়ে আমি চাবিটা সামনের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি৷ 
জন না আসা অব্দি আমি বাইরে যেতে চাই না৷ কেউ ভেতরে আসুক তাও চাই না৷ 
ওকে চমকে দিতে চাই৷ 
এখানে একটা দড়া এনে রেখেছি যা এমনকি জেনিও খুঁজে পায়নি৷ ওই মহিলা যদি বের হয়ে পালাতে যায় ওকে বেঁধে ফেলতে পারব৷ 
কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম কোনও আদবকায়দার প্রতি মনোযোগী না হয়ে আমি খুব বেশিদূর যেতে পারব না৷ 
এই বিছনাটি নড়বে না৷ 
ওটাকে তুলে ঠেলতে চেষ্টা করলাম যতক্ষণ না পায়ে আঘাত পেলাম আর তারপর এতটাই রাগ হল যে দাঁত দিয়ে খাটের একটা কোনা খামচে তুলে নিলাম – তাতে দাঁতে লাগল বেশ৷ 
তারপর মেঝেতে দাঁড়িয়ে যতটা নাগাল পাওয়া যায় আমি ওয়ালপেপার ছিঁড়ে ফেললাম৷ তা প্রচণ্ড সেঁটে আছে আর ওই নকশাটা বেশ উপভোগ করছে৷ ওই সব গলায় ফাঁস লাগা মাথা, ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা চোখ, আর হেলেদুলে বেড়ে ওঠা ব্যাঙের ছাতা উপহাসের ঢঙে চিখড়ে উঠল! 
এসপার – ওসপার ঢঙে কিছু করার জন্য আমি খুবই রেগে যেতে লাগলাম৷ জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বেশ প্রশংসনীয় ব্যায়াম হবে, কিন্তু শিকগুলো এত শক্ত যে চেষ্টা করাই কঠিন৷
তা ছাড়া আমি তা করবই না, একদমই না৷ আমি ভালোই জানি, এমন পদক্ষেপ অন্যায্য এবং এর ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে৷ 
এমনকি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেও চাই না – এখানে এতজন হামা দেওয়া মহিলা আছে আর তারা এতটাই দ্রুত হামা দিতে পারে! 
অবাক লাগে যদি আমার মতো ওরা সব্বাই ওই ওয়ালপেপার থেকে বেরিয়ে আসে? 
আমার লুকনো দড়ি দিয়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছি – কেউ আমাকে এখান থেকে রাস্তায় নিয়ে যেতে পারবে না৷ 
মনে হয়, রাতের দিকে আমাকে ওই নকশার পেছনে লুকোতে হবে, এবং তা বেশ কঠিন ব্যাপার৷ 
এই বিশাল ঘরের চারদিকে ইচ্ছেমতো হামা দিয়ে বেড়ানোয় কতই না আনন্দ! 
আমি বাইরে যেতে চাই না৷ না, এমনকি জেনি বললেও, না৷ 
কেননা বাইরে আমাকে মাঠে হামা দিতে হবে এবং সেখানে হলুদের বদলে সবই সবুজ৷ 
কিন্তু এখানে আমি মেঝেতে স্বচ্ছন্দে হামা দিতে পারি আর আমার কাঁধ চারদিকের দেওয়ালের লম্বা আলিঙ্গনের সঙ্গে এমনই খাপ খেয়ে যায় যাতে করে আমি আমার পথ হারিয়ে ফেলি না৷ 
কেন, দরজায় জন দাঁড়িয়ে৷ 
এর কোনও দরকার নেই, হে যুবা, তুমি দরজা খুলতে পারবে না! 
সে কীভাবেই না ডেকে ডেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে! 
এবার একটা কুড়ুল চাইছে৷ 
অত সুন্দর দরজাটি ভেঙে ফেলা লজ্জাকর হবে৷ 
‘ জন, সোনা’, খুবই মোলায়েম গলায় আমি বললাম, ‘ চাবিটা নিচে সিঁড়ির পাশে কলাগাছের তলায় পড়ে আছে! ‘
এ কথায় সে কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে গেল৷ 
তারপর বলল, – খুবই শান্তভাবে, ‘ সোনামণি, দরজা খোলো৷ ‘
‘ পারব না ‘, আমি বললাম৷ ‘ চাবিটা নিচে সামনের দরজার কাছে কলাগাছের তলায় পড়ে আছে৷ ‘
তারপর আবার বললাম, বারকয়, খুবই নরম গলায়, আস্তে, আর এত ঘনঘন বলতে থাকলাম যাতে সে নিচে গিয়ে দেখে, আর সে চাবিটা খুঁজে পেয়ে অবশ্যই ভেতরে এল৷ দরজায় খানিকক্ষণ থামল৷ 
‘ ব্যাপারখানা কী? ‘, সে চিৎকার করে জানতে চাইল৷ 
‘ ঈশ্বরের দোহাই, তুমি করছটা কী? ‘
আমি একইভাবে হামা দিতে থাকলাম, কিন্তু কাঁধের ওপর দিয়ে তার দিকে তাকালাম৷ 
‘ শেষ অব্দি আমি বেরোতে পেরেছি ‘, আমি বললাম, ‘ তোমার আর জেনির বাধা সত্ত্বেও৷ আর ওয়ালপেপারের বেশিটাই টেনে ছিঁড়েছি, সুতরাং তুমি আর আমাকে এখানে ফেরাতে পারবে না৷ ‘ 
এখন ওই লোকটার কি অজ্ঞান হওয়া উচিত ছিল? কিন্তু সে হয়েছিল আর ঠিক দেওয়াল ঘেঁষে আমার পথের আড়াআড়ি যাতে করে প্রত্যেকবার তার ওপরে আমাকে হামা দিয়ে চলতে হয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *