পলি শাহীনা’র গল্প : বিসর্জন

জীবনে এ প্রথম অজানা দেশ, অচেনা মানুষের উদ্দেশ্যে প্লেনে চড়েছে রেবেকা। সারাক্ষণ ঘাস-মাটি, কাদাজলের সঙ্গে মিশে থাকা ও স্ক্রিনে যখন দেখতে পেলো প্লেন ৩৮০০০ ফিট উপরে আছে, তখন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। প্রথমে বুঝতে না পেরে বার কয়েক প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেও পরে বুঝতে পেরে আর একবারও বাইরে তাকায় নি। রেবেকার অনুভবে তখন মৃত্যু ভয়ের চেয়েও যেন বড় ভয় এ প্লেন জার্নি। ছোটবেলায় বাবার মুখে ও শুনেছে, প্লেন এত দ্রুত গতিতে ছুটে চলে যে, একটি পাখীর পালকের সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও বিপদ হতে পারে। উনিশ, বিশ ঘন্টার গোটা প্লেন ভ্রমণের কথা ভেবে ওর বুক থরথর কাঁপছে। শুধু মনে হচ্ছে, প্লেন বিঃধ্বস্ত হলে তো ওর লাশও খুঁজে পাবে না বাবা -মা। বাবা-মা’র কথা ভাবতেই ওর মন প্রতিধ্বনি করে উঠে। তাঁরাই তো রেবেকার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁদের পছন্দের পাত্রের কাছে পাঠাচ্ছে দূর দেশে। এখন আর কী। ও মরে গেলেও তাঁরা আর দেখবে না। আকাশপথের দীর্ঘ ভ্রমণে রেবেকার মনের অসন্তোষ, দুঃখগুলো মনের আকাশের পরতে পরতে জমতে থাকে। মনের দুঃখে মানুষ সবসময় বিস্ফোরিত হয় না, কখনো কখনো চুপসে যায়। নিজেকে ওর ইউক্যালিপটাস গাছ মনে হয়, যে আপনজন থেকে অনিচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রেবেকা নিভৃতে চোখ বুঁজে বসে থাকে কবুতরের খোপের মত প্লেনের আসনে। ডাঙায় নেমে মাটি ছুঁয়ে দিলেই তবে ওর মুক্তি মিলবে।
বিমানের ঝাঁকুনিতে ঠিক ঘুম নয় ওর তন্দ্রা লাগে। নিদ্রা আর জাগরণের সে অবস্থায় ও স্বপ্ন দেখে, শীতের নীরব রাতে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির একা ঘরে লাল বেনারসি পরে ও বসে আছে। গোটা ঘরময় নৈশব্দের স্তব্ধতায় ঝিম ধরানো অনুভূতি। শীতে নাকি ভয়ে ও ঠুকঠুক কাঁপছে, ঠিক বুঝতে পারে না। যেন গোরস্থানের নীরবতায় ও ডুবে আছে। হঠাৎ কারো পায়ের শব্দে ও চমকে উঠে। মাথার ঘোমটা সরিয়ে ডিম লাইটের মৃদু আলোয় দেখতে পায় ওর সামনে একটি বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। ভুল ভেবে ও চোখ কচলে আবার দেখে, একই দৃশ্য। তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করার শক্তি ও হারিয়ে ফেলে। পাথর চোখে, বিবশ শরীরে বাঘের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই বিমানবালা এসে ওকে জাগিয়ে তোলে খাওয়ার জন্য। ওর ঘুম বা তন্দ্রা কাটার পর বুঝতে পারে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ফিশ, চিকেন না-কি ভেজিটেবলস, কোনটি খাবে বিমানবালা জানতে চাইলে ও বোবার মত তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে, আর স্বপ্নে এতক্ষণ কী দেখেছিল মনে করার চেষ্টা করে। অবশেষে রেবেকা বিমানবালা হতে পানি চেয়ে নেয়। পানি ছাড়া আর কিছুই খায় নি ও। ক্ষুধার্ত রেবেকার তখন ইচ্ছে করছে, মায়ের হাতে কবুতরের সঙ্গে মিহি নারকেল বাটা তরকারির ঝোল দিয়ে গরম ভাত খেতে। বিমানের খাবার খাওয়া তো দূরের কথা ঘ্রাণও ভালো লাগছে না। পেট শুধু গুলিয়ে আসে। বিমানবালা প্রস্থান করার কিছু সময় পর ক্লান্ত শরীরে ও আবার ঘুমিয়ে পড়ে। আবারও রেবেকা একই স্বপ্ন দেখতে পায়। তবে স্বপ্নের বিস্তৃতি বেড়েছে এবার। খোলা আকাশের নিচে বাতাস ডিঙিয়ে ও ঘুড়ি উড়াচ্ছে। বসন্তের শিমুল নিবিড় আলস্যে ডাল থেকে খসে পড়তেই বাতাসে একটা ডাক আসে। ওর আঙুলগুলো বাতাসের গায়ে এমনভাবে কাঁপছে যেন পিয়ানোতে সুর তুলছে। একটু দূরে পাহাড় চূড়া, এত প্রেম, এত মায়া, এর আগে কোন বসন্তে ও দেখে নি বোধ হয়। লাটাইয়ের সুতা ফেলে ও পাহাড়ের দিকে ছুটছে। এখানে ইট-কাঠ, কংক্রিট নেই, নগর নেই। ও আঁকাবাঁকা আলপথ ধরে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের নিচে একটি সবুজ ছোট্ট গ্রামে এসে পৌঁছায়। কী সুন্দর পরিপাটি একটা চৌচালা ঘর। সুন্দর আবহাওয়া। কত কত নাম না জানা ফুলের ঘ্রাণ, পাখী ডাকছে। মোবাইল নেই, টেলিভিশন নেই। কোন শব্দদূষণ নেই। মানুষগুলো একে অন্যের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলছে, গল্প করছে। কেউ কাউকে ঈর্ষা করছে না, অভিমান করছে না। কোন কিছুর প্রতিযোগিতা নেই। সকলে যেন জলের মত সহজ। একে অপরের সুখে – দুঃখে একইভাবে সমান্তরালে মিলেমিশে চলছে। ওরা একসঙ্গে সুর মিলিয়ে গান গায়, কবিতা আবৃত্তি করে, একে অন্যের পিঠে হেলান দিয়ে বই পড়ে। সবুজ পাতার আড়ালে ইষ্টিকুটুম ডাকছে। ডাকের উৎস অনুসরণ করে রেবেকা গলা উঁচিয়ে ইষ্টিকুটুম খুঁজছে। ইষ্টিকুটুম ডাকলে তো মেহমান আসে, কথা সত্য। ঠিক তখনই কালো ধোঁয়া উড়িয়ে দু’চাকার একটি মোটর সাইকেল এসে থামে। যন্ত্র যানের শব্দে পাখীরা এলোমেলো উড়তে থাকে এ ডাল হতে ও ডালে। কিছু না বলে না কয়ে বিনা ভূমিকায় কেউ একজন দক্ষিন মুখী চৌচালা ঘর হতে বেরিয়ে এসে চিরুনি দিয়ে পিছন দিক হতে রেবেকার ঘন কালো লম্বা চুল আঁচড়াতে থাকে। চুল আঁচড়ানো শেষ হতেই চোখে কাজল, কপালে লাল টিপ দিয়ে লাল বেনারসি পরিয়ে দেয়। ওই লাল বেনারসি পরিয়ে দেয়ার পরপরই পাহাড়ের নিচের ছোট্ট গ্রামটির হাওয়া- বাতাস বদলে যায়। রেবেকার বসন্তকালে যেন আচমকা আঁধার নেমে আসে চরাচরজুড়ে।
এরপর আগের স্বপ্নের একইরকম পুনরাবৃত্তি।
দেশের মাটি ফেলে প্লেনে উঠার পর থেকে যখনই রেবেকার ঘুম কিংবা তন্দ্রা লাগে ও এই একই স্বপ্ন বারবার দেখে। প্লেনে জরুরি ভিত্তিতে সিট বেল্ট বাঁধা, কিংবা খাওয়ার জন্য বিমানবালা ওকে ডেকে তুললে ঘুম ভেঙে ও ভয়ে ঠকঠক কাঁপতে থাকে।
একই স্বপ্ন বারবার দেখার অর্থ কী? রেবেকা ভাবতে থাকে। ছোটবেলায় দাদার মুখে ও শুনেছে মানুষ তিন কারণে স্বপ্ন দেখে। প্রথমত, মানুষ দিনভর যা ভাবে ঘুমের ঘোরে অবচেতন মনে মানুষের মস্তিষ্কে বিষয়গুলো ভেসে উঠে। দ্বিতীয়ত, শয়তানের প্ররোচনায় স্বপ্ন দেখে। তৃতীয়ত, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মানুষ স্বপ্নে অনেক সময় তার ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। দাদার বলা স্বপ্নের কারণগুলো মনে পড়ে প্লেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ও ঘামতে থাকে। এমন স্বপ্নের বিষয় তো জীবনে কখনো ও ভাবে নি, কিংবা মাথায়ও আসে নি। তবে কেন সে এমন অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখছে বারবার? প্রশ্নবাণে জর্জরিত রেবেকা কোন উত্তর খুঁজে পায় না। ওর শরীর খুব খারাপ লাগছে। মনে হয় জ্বর এসেছে। ওর চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া, অস্বাভাবিক আচরণ এবং দীর্ঘসময় ধরে পানি ছাড়া কিছুই খায় নি দেখে বিমানবালা ওকে একটি সংরক্ষিত জায়গায় নিয়ে যায়। ওর গায়ে জ্বর দেখে ওষুধ খেতে বললে রেবেকা খেতে অসম্মতি জানায়।
‘আমি আমেরিকায় যেতে চাই না। ঘুমের ঘোরে আমি বারবার একই ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছি। আমি খুব অসহায় বোধ করছি বাবা-মাকে ছাড়া। ওঁদের ছেড়ে আগে কখনো আমি এতদূর যাই নি, থাকিও নি। আমার খুব ভয় করছে আমেরিকায় যেতে। দয়া করে আমাকে প্লেন হতে আমার দেশে নামিয়ে দিন। আমি বাবা-মা’র কাছে ফিরে যাব।’ ওর ইংরেজি উচ্চারণ বিমানবালা ঠিকমতো বুঝতে পারছে না বলে একটি কাগজে ওর মনের কথাগুলো লিখে জানায়। ওর লেখা চিরকুট পড়ে বিমানবালা ওকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মায়ের মত বিমানবালার আচরণ দেখে রেবেকা ছোট শিশুর মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। বিমানবালা ওকে স্নেহ, ভালোবাসার আদরে বুঝিয়ে সুজিয়ে জ্বরনাশক ওষুধ খাইয়ে নির্ধারিত জায়গায় পুনরায় বসিয়ে দেয়। সদ্য ডাঙায় তোলা মাছের মত যন্ত্রণায় রেবেকা ধড়ফড় করছে। ওর পৃথিবীটা বড় শূন্য শূন্য লাগছে।
শূন্যতার তরঙ্গ সাঁতরে প্লেন পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্তে প্রায় চলে এসেছে, অথচ রেবেকার মনে হচ্ছে প্লেন ছাড়ার পর যেখানে ছিল সেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে। তাইতো বিমানবালাকে বলেছে ওকে নামিয়ে দিতে প্লেন হতে। জ্বর নেমে যাওয়ায় এখন ওর কিছুটা ভালো লাগছে। ওর মনে হচ্ছে কামরাঙা গাছের ডালে বাবার বেঁধে দেয়া দোলনায় ও দোল খাচ্ছে, আর ‘ আমারও পরানও যাহা চায় তুমি তাই তুমি তাই গো ‘ প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত গাইছে। খুব তমালের কথা মনে পড়ছে রেবেকার, যার মুহুর্তগুলো ছিল কেবলি জীবনানন্দময়। রেবেকার বাবাকে তমাল যেমন ভয় পেত তেমনি শ্রদ্ধাও করতো। গান পাগল রেবেকা জীবনানন্দের প্রেমে পড়ে তমালের ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি শুনে। শর্ত ছিল রেবেকা রবীন্দ্র সংগীত শোনালে পরে তমাল জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবে। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এলে ওরা উঠোনে আয়োজন করে শীতল পাটি বিছিয়ে বসতো। ওদের সঙ্গে যোগ দিতো লিজা, কণা সহ আরো অনেকে। উঠোনের পূর্ব দিকে কামিনী গাছের যে ঝোপ ছিল জোনাকি এসে আসর বসাতো সেখানে। ওরা তখন দু-একটা ধরে হাতের ভেতরে পুরে নিতো। মুগ্ধ হয়ে হাতের মুঠোয় ওরা জোনাকির আলো দেখতো। আকাশে চাঁদের পাশে জ্বলা তারা আর জমিনে জোনাকির আলো, এরমধ্যে দাদার মুখে ভূত রাক্ষসের গল্প শুনে ভয়ে ওরা চুপসে যেত। দাদার খিলখিল হাসিতে ভয় কিছুটা কমে যেত। পুরো ভয় কেটে যেত সবুজ অন্ধকার ফুঁড়ে তমালের ভরাট স্বরের আবৃত্তি শুনে। তমালের কবিতায় রেবেকার পরানের রক্ত ছলকে উঠলেও কোনদিন বলা হয় নি ওর প্রতি অসীম মুগ্ধতার কথা। রেবেকা আজন্ম অন্তর্মুখী এক নদী, ভেতরে ঝড় বয়ে গেলেও বাইরে স্থির, শান্ত। কখনো নিজের ইচ্ছের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না।
তমালের সঙ্গে কত স্মৃতি, কত আনন্দের কথা যে মনে পড়ছে এ শূন্যে বসে। শীত বিকেলের হিমেল হাওয়ায় গান- কবিতা- আড্ডায়, বিকেল পেরিয়ে ধীর লয়ে সন্ধ্যা কখন যে তার কালো ওড়নাখানি বিছিয়ে দিয়েছে ওদের মাথায়, টের পর্যন্ত পেতো না। তমালের অন্তরের সৌন্দর্য, ব্যবহার ছিল জীবনানন্দের কবিতার মত অনুপম। ওর সঙ্গে কবিতা- গল্পে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যেত। কোন কারণে রেবেকার মন খারাপ হলে, কারো সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে না হলে, তখন ও হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যেত তমালের কাছে। ওর যত অভাব, অভিযোগ, আক্ষেপ, অভিমান, সবকিছু নির্দ্বিধায় ওকে বলা যেত। তমাল ছিল ওর কাছের একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু। ওর জন্য রেবেকার মন কেমন করছে। ওকে বলার জন্য বস্তাভর্তি কথা জমেছে, কিন্তু ও এখন কতদূরে চাইলেই ওর কাছে এক দৌড়ে যাওয়া যাবে না। ঘরের দাওয়ায় বসে রোদ পোহাতে পোহাতে মনের কথাগুলো বলা যাবে না। মানুষ যা চায় সব কী করতে পারে? মানুষের মন আর কপালের সম্পর্ক বড় অদ্ভূত। মন চাইলেও কপালে সয় না। তমালের কাছে রেবেকার ফেলে আসা জীবনের অসীম ঋণ। ওর কাছে জীবনভর রেবেকা বারবার ফিরে আসতে চাইবে। তমালের জন্য রেবেকার চোখজোড়া বেদনায় আদ্র হয়ে উঠে।
‘চল্লিশ মিনিটের মধ্যে আমরা নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে অবতরণ করবো’ – বিমানবালার এমন ঘোষণা কানে আসতেই রেবেকা জামালের মুখটি মনে করার চেষ্টা করে। ঘড়িতে তখন ছয়টা বেজে পাঁচ মিনিট। এখন রাত না দিন ও ঠিক ঠাওর করতে পারছে না। রাত কিংবা দিন সে যা-ই হোক, ওর এখন সকল ভাবনা জামালকে ঘিরে। ওর মুখটি রেবেকার স্মৃতিতে আবছা আবছা ভাসছে। বিয়ের পর যে ক’দিন জামাল দেশে ছিল দিনের আলোতে ওর মুখ দেখার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। সূর্যদয় হতে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জামাল ঘুরেঘুরে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় – স্বজনের বাড়ীতে দাওয়াত খেতো। রেবেকাকে তার মা কিংবা বোনের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়ে ও যেত বন্ধুদের সঙ্গে। এজন্য দিনের আলোতে জামালকে বিয়ের পর কখনো ভালোভাবে দেখেছে বলে ওর মনে পড়ছে না। সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যা হতেই প্রতিদিন জামালের পারিবারিক আলোচনা লেগেই থাকতো। একটা নির্ধারিত কক্ষে জামাল তার বাবা-মা, ভাইবোনদের সঙ্গে এ আলোচনা করতো। সে কক্ষে কোনদিন রেবেকার ডাক পড়ে নি। রেবেকা কী জামালের পরিবারের সদস্য ছিল? কে জানে। মগজের ভেতর লাটিমের মত জামাল নামটা ভো ভো ঘুরছে শুধু, কিন্তু ওর সুস্পষ্ট মুখখানি মনে করতে পারছে না। যা চোখে ভাসছে তা হাল্কা ছায়ার মতন। আসলে বিয়ের পর জামালের সঙ্গে রেবেকার একান্ত সময় কাটানো হয় নি, কিংবা তেমন কোন স্মৃতি রচিত হয় নি, যা মনের আয়নায় ভেসে উঠবে। যদি সামনা-সামনি জামালকে না চেনে? এ ভেবে রেবেকার প্রচন্ড ভয় লাগছে। ওর ইচ্ছে করছে ইসরাফিল (আঃ) কে গিয়ে বলতে যেন এখনই শিঙ্গায় ফুঁ দেয়, পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টির সঙ্গে তুলোর মত উড়তে উড়তে ও যেন নিউইয়র্ক হতে বাংলাদেশে চলে যেতে পারে।
ইসরাফিলের কথা ভাবতে ভাবতে প্লেন ততক্ষণে আকাশের সীমানা ছেড়ে জমিনে অবতরণ করে। বড় বড় আকাশছোঁয়া সব অট্রালিকার ভীড়ে খোলা আকাশের নিচে রেবেকা ওর কাঙ্খিত পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটি আর খুঁজে পায় না। যেদিকে চোখ যায় দেয়াল আর দেয়াল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় মাথার উপরের চেনা আকাশটিকেও হারিয়ে ফেলে। চারপাশে কত মানুষ, এঁদের কাউকেই ও চেনে না। অসহায়ের মত এদিক ওদিক যখন দেখছিল তখন একজন দীর্ঘদেহী শ্বেতাঙ্গ পথ দেখিয়ে ওকে একটা গেটের কাছে নিয়ে আসে। একজন আগন্তুকের এমন আন্তরিকতায় মাথা শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে। ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় সকল কাজ শেষ করে জলের চেয়েও ক্লান্ত দেহখানি টেনে টেনে দুরুদুরু বুকে ও বেরিয়ে আসে। শরীরে পুনরায় তাপ অনুভব করছে। বোধ হয় আবার জ্বর এসেছে, বুঝতে দেরি হলো না। শরীর কাঁপছে, ট্রলি ঠেলার শক্তি পাচ্ছে না রেবেকা। সকলে ওকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে ছুটছে আপন গন্তব্যে। এ জনসমুদ্রে কেউ ওর আপন নয়, যে ওর অসুস্থতার জন্য একটু হাত বাড়িয়ে দিবে, সাহায্য করবে। ওর খুব বাবা-মাকে মনে পড়ছে আর দৃষ্টি প্রসারিত করে জামালকে খুঁজছে। দীর্ঘ সময় পর প্লেন নামক খোপ হতে বেরিয়ে খোলামেলা একটা জায়গায় দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে ও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে জামালের অপেক্ষায়। রেবেকা না চিনলেও জামাল নিশ্চয়ই ওকে চিনবে, এমন ভাবনায় খোলামেলা জায়গাটি বেছে নিয়েছে। অসুস্থতা ওকে আরো অসহায় করে তোলে। ও চোখ বুঁজে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে।
কিছু সময় পর অজানা, অচেনা দেশে নিজের ডাক নাম শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে জামালকে দেখতে পায়। ওকে দেখে রেবেকার অস্থির মন সুস্থির হয়ে উঠে। ভয় কিছুটা কমে আসে।
মাইলের পর মাইল তীব্রবেগে ছুটে চলছে ওদের গাড়ি। গাড়ির ভেতর কলবল কথা বলছে জামাল। রেবেকার মনের মধ্যে এক অদ্ভুৎ দোলাচল, আনন্দ-বেদনার এক মিশ্র মেলবন্ধন। প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যে অজানা এক আনন্দে মন যেমন দোল খাচ্ছে, তেমনি ফেলে আসা দেশ, পরিবারের জন্য মনটা বিষন্ন হয়ে উঠছে। দুঃখ ও আনন্দ যেন সমভাবে বইছে ওর মনের অরণ্যে।
বাইরে হাল্কা তুষারপাত, জীবনে প্রথম বরফ দেখছে রেবেকা। নাতিশীতোষ্ণ দেশের মানুষ রেবেকা শীতে জমে যায়। গাড়ীর কাঁচের জানালা হতে বিঃধ্বস্ত প্রকৃতির দিকে ও অপলক চেয়ে থাকে। দেশ হতে হাজার হাজার মাইল দূরের শহরের এ হাড় কাঁপানো শীতে ওর ইচ্ছে করছে মায়ের সঙ্গে কাঠের পিঁড়িতে বসে মাটির উনুনের আঁচ নিতে। নিউইয়র্ক শহরের পিচঢালা চাইরঙা রাস্তার উপর পড়ে থাকা শুভ্র তুষার ওকে মনে করিয়ে দেয় দেশের শিউলি ঝরা আঙিনার কথা। আকাশ থেকে কিশোরীর মত হেলেদুলে পড়া তুষারকে মনে হয় শিউলি ঝরছে। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে শিউলি তলা হতে আঁজলা ভরে ফুল কুড়িয়ে এনে সুঁই, সুতা দিয়ে মালা গেঁথে রেবেকা দাদার গলায় পরিয়ে দিতো। উদ্দেশ্যে ছিল উপঢৌকন হিসেবে দাদার কাছ হতে টাকা পাওয়া। অতঃপর, সে টাকা দিয়ে চালতার আচার, আইসক্রিম, কটকটি, লজেন্স, চানাচুর খাওয়া। দাদার দেয়া পাঁচ টাকা দিয়ে সকাল হতে বিকেল অবধি খেয়েও সে টাকা শেষ হতো না। দিনশেষে কিছু আধুলি থেকে যেত, যেগুলো গিয়ে জমা হতো মাটির ব্যাংকে।
পাখীর চেয়েও মানুষ বড় পরিযায়ী, স্মৃতি বুকে নিয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায় বিশ্বের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে। ভাবনার কোন স্বরলিপি নেই। রেবেকার মনে হয়, স্মৃতিভর্তি একটা হিলিয়াম বেলুনে ভর করে এ ভিনদেশে ও উড়ছে তো উড়ছে।
পৃথিবীর রাজধানী খ্যাত আমেরিকার নিউইয়র্ক শহর দেখতে বইএর পাতায় দেখা ছবির মত, এমনটাই শুনেছে রেবেকা। গন্তব্যে পৌঁছে আট তলা বিল্ডিং এর এলিভেটরে উঠতেই একটা বিশ্রী গন্ধ লাগে নাকে। গত বছর খানেক ধরে শোনা কিংবা ভাবনার নিউইয়র্কের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছে না। ঘরে ঢুকতেই সাদা দেয়ালের স্যাতস্যেঁতে গাঢ় দাগে চোখ আটকে যায়। পা বাড়াতেই দাগের নিচে রাখা নীল রঙের গামলায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে যেতে উঠে দাঁড়ায়। গতরাতে কী বৃষ্টি হয়েছিল এ শহরে? গামলায় কীসের পানি? বৃষ্টি না-কি তুষারগলা পানি? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মানুষ জামাল তখনো লাগেজ নিয়ে উঠে আসে নি ঘরে। ঘরে ও একাকী হাঁটছে। একাকী ঘরে হাঁটছে আর মনে হচ্ছে ও খেজুর পাতার ঝুপড়ি কিংবা বাঁশের ছাউনি দেয়া কোন একটা ঘরে এসে ঢুকেছে। দেয়ালে, ছাদে পানি পড়ার গাঢ় কালো দাগ দেখে ওর এসবই মনে হচ্ছে। কাঠের ফ্লোরে হাঁটার সময় গটগট শব্দ হচ্ছে দেখে ও পা টিপে টিপে হাঁটছে। দরজা – জানালা বন্ধ ঘরে ওর হাসফাঁস লাগছে। জানালা খুলে দিতেই ঠান্ডা হু হু বাতাসে আবার বন্ধ করে দেয়। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। জগতে সভ্যতার চেয়ে ক্ষুধার বয়স বেশি। ও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। জং ধরা গ্যাসের চুলার উপর দুটো হাঁড়ি। একটার ঢাকনা তুলতেই ইয়া বড় মুরগীর সাদা ঠ্যাং দেখতেই ওর ক্ষুধা উবে যায়। ফ্রিজ খুলতেই কী সব খাবারের ঘ্রাণে মাথা দপদপ করে উঠে। ওর পেট গুলাতে থাকে। ক্ষুধাবোধ ভুলে তখন দু-চোখ বুঁজে ওর ঘুম পায়। লাগেজ নিয়ে ততক্ষণে জামাল বাসায় এসেই তাড়া দিল, পাশের বাসায় দুপুরের খাবার খেতে তৈরি হতে। ওর কথা শুনে রেবেকার চক্ষু চড়ক গাছ। ক্লান্তিতে ওর শরীর অবশ হয়ে আসছে আর জামাল বলছে অন্য বাসায় দাওয়াত খেতে যেতে। কিছু বলতে গিয়েও সংকোচে ও থেমে যায়। হাসিমুখে জামালের পিছে পিছে পাশের বাসায় গিয়ে খেতে বসে। নিচের দিকে তাকিয়ে জামাল পূর্ণ মনোযোগে গোগ্রাসে খাচ্ছে। খাওয়া দেখে বুঝা যায় ওর খুব ক্ষুধা পেয়েছে। সকলে খাচ্ছে আর রেবেকা সকলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে ভাবছে মায়ের কথা। ইচ্ছে করছে মায়ের হাতে মুসুরের ডাল, গরম ভাত সঙ্গে বাতাবি লেবু দিয়ে পেট ভরে খেতে। ইচ্ছেটাকে দূরে তাড়িয়ে সকলের সঙ্গে ও পানি দিয়ে কোনমতে অতি কষ্টে খাবার গিলতে থাকে। অন্যরা কোক খাচ্ছে, কিন্তু কোক তো দূরের কথা পানিটাও ওর কাছে বিস্বাদ লাগছে। সকলের অগোচরে কায়দা করে কিছু অশ্রু ও গিলে ফেলে বাকিটা মুছে নেয়। খাওয়া শেষে কিছু সময় গল্প করে ওরা বাসায় ফিরে আসে।
বাসায় এসে জামাল শরীরে শীতের কাপড় জড়াতে জড়াতে রেবেকাকে বলল, তুমি অনেক ক্লান্ত, বিশ্রাম নাও। আমি একটু জরুরি কাজে বাইরে যাব আর চলে আসব। জামাল চলে যাওয়ার পর ও চোখ বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। নতুন জায়গায় ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুম আসে না। এর আগে কোনদিন ও ঘরে একা থাকে নি, ঘুমায় নি। ওর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ভাবছে, কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে ও কেমন একা হয়ে গেলো, স্বাবলম্বী হয়ে উঠলো। অথচ, কয়েক দিন আগেও একা ঘরে থাকতে ও ভয় পেতো। ঘুমানোর সময় মা কিংবা বোনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো।
খুঁজে খুঁজে নতুন ঘরের সবকটি লাইট জ্বালিয়ে দেয় রেবেকা। ঘরের দেয়ালগুলো শূন্য দেখে মেঝের উপর রাখা সুটকেস খুলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দাদা জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা লালন শাহের ছবিটি দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়। এ ছবিটি ওর বাবার খুব প্রিয়। এ দূর্লভ ছবিটি রেবেকার বাবা আসার সময় মেয়েকে দিয়েছে। মায়ের হাতে বোনা নকশিকাঁথাটি বিছানায় রেখে কিছু সময় মায়ার টানে অপলক তাকিয়ে থাকে। নকশিকাঁথায় মা সুঁই – সুতায় বাংলা অক্ষরে ফুটিয়ে তুলেছেন – আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। পাশে এঁকে দিয়েছেন রেবেকার প্রিয় দোয়েলের ছবি। পরম আদরে ও মায়ের সৃষ্টির উপর হাত বুলিয়ে দেয়। দেশ ছেড়ে ভিনদেশে আসা তাঁর সন্তান যেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি হতে দূরে সরে না যায় সেজন্য মায়ের এ প্রয়াস। গীতবিতান সহ বাবা আর তমালের দেয়া গল্প-কবিতার বইগুলো লাগেজ থেকে নামিয়ে বিছানার পাশে ফ্লোরে রেখে দেয়। গিটারটা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে কিছু সময়। জামাল তখনো ফিরে নি। দিনের আলো অন্ধকারের বুকে হারিয়েছে বেশ আগে।
দেয়ালে ঝুলানো নতুন ছবি, মাথার পাশে নতুন সব বই, বিছানায় নকশিকাঁথা দেখে ওর বর খুব খুশি হবে ভেবে মনে মনে পুলকিত হয়। শীত অনুভূত হওয়ায় বড় বোনের দেয়া উপহার প্রিয় লাল রঙের কাশ্মীরি শালটা গায়ে জড়িয়ে কিছু সময় আয়নায় নিজেকে দেখে।
দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দে রেবেকার অপেক্ষার অবসান ঘটে। ঘরে প্রবেশ করে হাসিমুখে জামাল জ্যাকেট খুলে দরজার পেছনে হুকে ঝুলিয়ে রাখে। দেরি করার জন্য সরি বলে রেবেকাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেয়। জামালের লাভা স্রোতে ও ডানাভাঙা চড়ুইয়ের মত তিরতির কাঁপতে থাকে। মিলন অধ্যায় শেষে জামাল বলল, তুমি খুব ক্লান্ত, অনেক দখল গেছে দীর্ঘ বিমান পথে, ঘুমিয়ে পড়ো।
রেবেকার ঘুম আসে না জ্যাট লেগের কারণে। বিছানায় ও এপাশ ওপাশ করতে থাকে। ইচ্ছে করছে জামালকে ঘুম হতে জাগিয়ে বলতে, এসো তোমাকে গান শোনাই। মাঝরাতে এমন আব্দার অপ্রাসঙ্গিক ভেবে ও চুপচাপ শুয়ে থাকে, ঘুমানোর চেষ্টা করে।
ভোরবেলা জামালের কোলাহলে ওর ঘুম ভাঙে। আচমকা ঘুম ভেঙে বিছানা ছেড়ে ও হাঁফাতে থাকে।
– কী হয়েছে?
– দেয়ালে এটা কী ঝুলিয়েছ?
– ছবি।
– তুমি জানো না ঘরের দেয়ালে প্রাণের ছবি থাকলে নামাজ হয় না, ফেরেশতা আসে না। এখনই এটা নামাও।
রাতে খেয়াল করি নি নকশিকাঁথায় যে দোয়েলের ছবি আছে, ওটাও সরাও বিছানা থেকে।
– ওটা কি?
– গীটার
– ও বাজনা? এসব ফালতু অভ্যাস ছাড়ো। এসব ঘরে থাকলে ইবাদত কবুল হয় না।
ধর্মীয় কোন বই না এনে এসব কী বই এনেছ? এগুলো আমার চোখের সামনে থেকে সরাও।
জামালের কথাগুলো শুনে রেবেকা যেন পাথর হয়ে গেছে। ওর পা চলছে না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু সময় পর দাঁড়ানো হতে ও মেঝেতে বসে পড়ে। কাঁদতে পারাটা একটা আশীর্বাদ। ওর কান্না পাচ্ছে না শুধু চোখ জ্বলছে আর বুকের ভেতর তীব্র একটা চাপ অনুভব করছে, যেন মরেই যাচ্ছে।
জামাল চা খাবে। ও রান্নাঘরে যায়। বুকের আগুন না কি হেঁসেলের আগুন, কোন আগুন ওর সর্বাঙ্গে জ্বলছে? রেবেকা ঠিক বুঝতে পারে না।
নাশতা সেরে জামাল বেরিয়ে গেলে ওর বলা প্রতিটি অক্ষর, শব্দ, বাক্য, রেবেকার বুকের জমিনে আরো তীব্র গতিতে তলোয়ারের ফলার মত বিঁধতে থাকে। ওর মনে দাউদাউ করে জ্বলা আগুন থেমে থেমে আরো বেশি শক্তি নিয়ে জ্বলে উঠে। ওর মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বেঁচে থাকার সকল সৌন্দর্য ফিকে হয়ে এসছে। মন খারাপ হলে ও ডায়েরি লেখে, নয়ত পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকে। এ যন্ত্র শহরে পুকুর নেই। একবুক বেদনা নিয়ে এলোমেলো রেবেকা কাতরাতে কাতরাতে বাবা-মাকে চিঠি লিখতে বসে।
প্রিয় বাবা-মা,
আমি যে জীবনটাতে বাঁচতে চেয়েছি, যে জীবনটা যাপন করতে চেয়েছি, তোমরা তা হতে দাও নি। জীবনের সমস্ত ভালোলাগা, পছন্দ, ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে তোমাদের পছন্দ করা আমেরিকান সিটিজেন স্বামীর জীবনে আমি ঢুকে পড়েছি। নিজেকে আর রক্ত মাংসের মানুষ মনে হয় না, মনে হয় যন্ত্র। অন্য কারো ইচ্ছায় আমি চলছি। তোমাদের স্বপ্ন পূরণে আমি ভুল জীবনে ঢুকে পড়েছি।
আর কোন পাখী ডাকা ভোরে উঠে তোমাদের মেয়ে রেওয়াজ করবে না, গল্প-কবিতা পড়বে না, দেশাত্মবোধক গান শুনবে না, আকাশ দেখবে না, ফুল কুঁড়িয়ে মালা গাঁথবে না, প্রজাপতির মত উড়বে না। তোমরা খুশি তো? নক্ষত্র মরে গেলে কৃষ্ণগহ্বর হয়। কৃষগহ্বরে আলো ঢোকে, কিন্তু বের হতে পারে না।
ভালো থেকো। শরীর, মনের যত্ন নিও। শরীর, মন খারাপ হলে গোটা পৃথিবীটাকে যে ধূসর লাগে। গত কয়েকদিনে এ আমি বুঝে গেছি। তোমরা আনন্দে বেঁচো, এ প্রার্থনা করি। আর হ্যাঁ, কেমন আছি? কখনো জানতে চেও না। মিথ্যা বলা, মুখোশ পরা, কিংবা চালাকি করা তো কখনো শেখাও নি।
ইতি, তোমাদের কৃষ্ণগহ্বর কন্যা।
পোষ্টঅপিস কোথায়? এ শহরে রেবেকা যে কিছুই চেনে না। চিঠিটি শেষ করে ডাকবাক্সে না ফেলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। অসহায় মানুষের বুক ভরে শ্বাস নেয়ার উত্তম স্থান জানালা। রেবেকা জানালার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। জানালার কাঁচের ভেতর হতে বাইরে তাকিয়ে দেখে, আলোকিত সূর্যটাকে মেঘ ঢেকে রেখেছে।
লেখক পরিচিতি
পলি শাহীনা
কবি। গল্পকার।
নিউ ইয়র্কে থাকেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *