স্মৃতি ভদ্র’র গল্প : স্বাধীন বাংলা বেতার

ই বাড়ি আসার আগে অবধি পুস্পিতার জানা ছিলো না একটি বাড়ির প্রায় সব জিনিষের একটা নিজস্ব গল্প থাকে। প্রথম প্রথম পুস্পিতার বেশ ভালোই লাগতো। বাড়িটির সিঁড়ি থেকে ঘরের কড়িবর্গা, এমন কোনো বস্তু নেই যার পেছনে লম্বা চওড়া গল্প নেই। আর সেসব গল্প শুনতে শুনতে এ বাড়ির পুরাতন সময় থেকে ঘুরে আসতে বেশ লাগতো পুস্পিতার।
কিন্তু বিপত্তিটা তখন ঘটলো যখন সে সব গল্পের বারবার পুনরাবৃত্তি পুস্পিতার স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটাতে লাগলো।
হয়তো ছাদঘরের নিরিবিলি জায়গাতে ইমেইলের এটাচম্যান্টগুলো ডাউনলোড করতে তাড়াহুড়ো করে পুস্পিতা সিঁড়ি ভাঙছে, ওমনি ছুটে এলো সিঁড়ির রেলিং-এর গল্প।
পুস্পিতা, সিঁড়িতে এমন দুম দাম করে উঠতে আছে নাকী? জানো তো ষাট বছরের এই সিঁড়িতে কোনো মিস্ত্রির পা পড়েনি সারাই করতে। কেন পড়েনি জানো? এই যে সিঁড়ির রেলিং দেখছো তাঁর কাঠ এসেছিলো সাতকানিয়ার হলুদিয়া থেকে……
গল্পটির মাঝপথে বাগড়া দিয়ে পুস্পিতার বলতে ইচ্ছে হয়,
বড় ফুপু ছ’মাসে এই সিঁড়ির গল্প এতবার শুনেছি যে আমার মুখস্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু সেসব শব্দ গিলে ফেলে পুস্পিতা চেহারায় হঠাৎ চিন্তার রেখা ফেলে বলে, বড় ফুপু আমার মোবাইলটা ঘরে ফেলে এসেছি, রিশাদের কল মিসড হয়ে গেলে ও খুব বিরক্ত হয়।
ছাদঘরে যাবার বদলে পুস্পিতা তখন লম্বা পা ফেলে নিজের ঘরে চলে আসে।
 
আজও ঠিক এমনই হলো। ফোনের অজুহাত দেখিয়ে বড় ফুপুর সামনে থেকে পালিয়ে আসতে হলো।
এমনিতে হাতে আর খুব বেশী সময় নেই। দু’তিন সপ্তাহের মধ্যে কাগজপত্র সব গুছিয়ে এ্যাম্বাসিতে ভিসার জন্য দাঁড়াতে হবে। আর বড় ফুপুর গল্পের পাল্লায় পড়লে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছে দেবেন উনি। আর এরসাথে এক গল্পের লেজ ধরে আরেকগল্প দিয়ে এমনভাবে পুস্পিতাকে জেঁকে ধরবে যে মাথা থেকে জরুরী সব কাজের লিস্ট হারিয়ে যাবে।
 
তারচেয়ে এই বরং ভালো, একটু না হয় মিথ্যা বলতে হলো, তবুও সময়ের অপচয় কিছু তো কমানো গেলো।
ট্রাউজারের পকেট থেকে থেকে মোবাইলটা বের করে পুস্পিতা সবার আগে রিংটোন বন্ধ করে দিলো। এ সময় কোনো জরুরী ফোন আসবে না।যা আসে ফেসবুকের নোটিফিকেশন কিংবা ম্যাসেঞ্জারের টুংটাং। আর রিশাদের ফোন দেবার প্রশ্নই নেই এখন। রিশাদের দেশে তো এখন মধ্যরাত।
সেদিনও কিন্তু মধ্যরাতই ছিলো। প্রকান্ড এ বাড়ির হাতে গোণা কয়েকজন মানুষের কাছে পুস্পিতাকে রেখে রিশাদ দেশ ছেড়েছিলো। যাবার আগে শুধু বলে গিয়েছিলো, বড় ফুপুর একটু খেয়াল রেখো।
খুব অবাক হয়েছিলো পুস্পিতা সেদিন, বাবা-মা নয়, রিশাদের সব চিন্তা শুধু ওই বড় ফুপুকে নিয়ে।
ষাটোর্ধ এই মানুষ বড় ফুপু। বাড়ির সবাই সামনাসামনি খুব মান্য করে তাঁকে। তবে আড়ালে গিয়েই মানুষটিকে অগ্রাহ্য করতে এক মুহূর্ত সময় নেয় না। অদ্ভুত এই ঘটনার কারণ উদ্ধার করতে পুস্পিতার খুব বেশিদিন সময় লাগেনি অবশ্য।
 
বড় ফুপু মানুষটি আগাগোড়া ব্যতিক্রম। যেমন ধরা যাক তাঁর বয়সের কথা। ষাটোর্ধ মানুষটির শারীরিক গড়ন আর পরিপাটি পরিধানেরকারণে তাঁকে দিব্যি পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন বলে চালিয়ে দেওয়া যায় এখনো। আবার মেয়ে মানেই সাধারণত তারা বাবা অন্ত প্রাণ হয়। কিন্তু বড় ফুপু অন্যরকম। নির্ঝঞ্জাট বড় ফুপুর যত বিরক্তি কিন্তু দেয়ালে ঝোলানো নিজের বাবার ছবিটিই নিয়ে। বাড়িতে কোনো ব্যত্যয় ঘটলেই বড় ফুপুর সব বিরক্তি গিয়ে পড়ে নিস্প্রাণ ওই ছবিটির ওপর,
কতবার বলেছি ওই লোকটির কুদৃষ্টির জন্যই এসব হয়, ছবিটা সরাও তো। দেখো না কীভাবে তাকিয়ে আছে!
এরসাথে যুক্ত হয় চিৎকার চেঁচামিচি।
পুস্পিতা শুরুতে খুব অবাক হতো, দেয়ালে ছবি হয়ে ঝুলে থাকা মানুষটি শুধু এ বাড়ির নয় এই এলাকারও খুব গণ্যমান্য ব্যক্তি।শুধু তাই নয়, ছবিটাও তো খুব সৌম্যকান্তি। দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে। কিন্তু বড় ফুপুর ক্ষেত্রে তা ব্যত্যয়।
 
বড় ফুপুর নিজের বাবার প্রতি এই অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ অবশ্য একে ওকে জিজ্ঞাসা করেও উদ্ধার করতে পারেনি পুস্পিতা।
তবে বাড়ির মানুষগুলো শুধু এই চিৎকারের জন্য শুধু দেয়ালের ছবিটি কিছুদিনের জন্য নামিয়ে ফেলে তা নয়, বড় ফুপুর সামনে সবার বাধ্য থাকার কারণও কিন্তু এই চিৎকার। আর এই কারণ উদ্ধার করতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি পুস্পিতার।
সত্যি বলতে বড় ফুপুর চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ির মানুষগুলোর জুবুথুবু অবস্হা বারবার পুস্পিতাকে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়। একজন মেজাজ হারিয়ে ফেলা মানুষ একটু আধটু চিৎকার করতেই পারেন, তা বলে কী বাড়ির মানুষগুলোকে এভাবে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যেতে হবে? নাকী মানুষটি রেগে গিয়ে যা কিছু অন্যায় আবদার করবেন, তা মেনে নিতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুস্পিতা বেশ কয়েকবার রিশাদের মুখাপেক্ষী হয়েছিলো। কিন্তু কোনো উপায় মেলেনি। বরং রিশাদের যুক্তিহীন ছাড়াছাড়া কিছু কথায় প্রশ্নগুলোতে সম্পূরক যুক্ত হয়েছে বারবার।
বড় ফুপু তো এমনই, দাদুও ভয় পেতেন বড় ফুপুকে—-বড় ফুপুকে নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তরে শেষে এই এক লাইন যুক্ত করে দেয় রিশাদ। আর তাতে পুস্পিতার মনে বারবার একই প্রশ্ন আসে, একজন মানুষ শুধুমাত্র হুটহাট রেগে যান বলেই কী তাকে সবাই এত ভয় পাবে?
না, ‘হুটহাট রেগে যান’ এই কথাটা বলা মনে হয় ঠিক হলো না।
 
কই এই ছ’মাসে পুস্পিতার সাথে কোনো ব্যাপার নিয়ে তো বড় ফুপু রাগ করেননি। এমনকি পুস্পিতা গল্পের পুনরাবৃত্তি এড়াতে গিয়ে কখনো কখনো তো তাঁকেও এড়িয়ে যায় , তবুও বড় ফুপু রাগ করেন না।
এই তো ক’দিন আগের ঘটনা, এ বাড়ির সীমানায় দাঁড়ানো আকাশনিম গাছটা ইশারায় দেখিয়ে পুস্পিতা নাম জানতে চেয়েছিলো।
ব্যস্, বড়ফুপু বলা শুরু করে দিলো গাছটির গল্প….
সেবার খুব বর্ষা হয়েছিলো জানো পুস্প, একটানা অনেকদিন বৃষ্টিতে আশেপাশের মাঠ-পুকুর পানিতে ভরে গিয়েছিলো। এখানে থাকা শ্বেতটগর গাছের গোঁড়ায়ও পানি জমে গেলো…….
এটুকু শুনেই পুস্পিতার উসখুশ শুরু হয়ে যায়। সে শুধু গাছটির নামই জানতে চেয়েছিলো—- বড় ফুপু তো শুধু গাছ নয়, আদ্যিকালের গল্প ফেঁদে বসলো।
 
আসলে এ বাড়িতে যত দিন যাচ্ছে পুস্পিতার এসব গল্পের প্রতি আগ্রহ তত কমতে শুরু করেছে।তাছাড়া এই ধরণের ভরা বর্ষার গল্প এরইমধ্যে কয়েকটা শোনা হয়ে গেছে ওর। হোক তা ছাদের তেল-আচারের বয়াম সংক্রান্ত অথবা পুরাতন পেতলের বালতি সংক্রান্ত।
এসব গল্পে সময় অপচয় ছাড়া আর কিছু হয় না।
পুস্পিতা এজন্যই বর্ষার গল্প থেকে মাঝপথেই নিস্তারের জন্য অস্হির হয়ে উঠেছিলো।
বড় ফুপু তখনও একমনে গল্প বলে যাচ্ছে,
শ্বেতটগর ছাড়া বাড়িটার তখন পর্যন্ত কোনো স্মৃতি আমার ছিলো না জানো। ন্যাড়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আব্বা ঘোষণা দিলো নিমগাছ লাগানো হবে, তাহলে মেসওয়াকের আর কোনো সমস্যা হবে না।কিন্তু তরু ভাইয়ের মুখে আকাশনিম গাছের নাম ততদিনে অনেকবার শোনা হয়ে গেছে আমার।ইচ্ছে হলো বাড়ির ফটকে আকাশনিম গাছ লাগাবো…….
‘আকাশনিম’ গাছটার নাম জানা হয়ে যেতেই পুস্পিতা বড় ফুপুর গল্পের মাঝে সুর কেটে দিয়ে বলেছিলো,
আম্মা অনেক আগে ওনার ঘরে আমাকে ডেকেছিলো, ভুলে গিয়েছিলাম।
এটুকু বলেই পুস্পিতা প্রায় বড় ফুপুর যত্নে গড়া গল্পের আসর ভেঙে দিয়েছিলো নির্দ্ধিধায়।
গল্পে বাঁধা পেয়েও বড় ফুপু একদম নির্লিপ্ত, এমনকি চেহারাতে বিরক্তিটুকুও পর্যন্ত ফুটে ওঠেনি—-তা খুব ভালো করে লক্ষ্য করতে ভুল হয়নি সেদিন পুস্পিতার।
কিন্তু এতসব কান্ড-কারখানার মাঝে ‘তরু ভাই’ শব্দ দুটো উচ্চারণের সময় বড় ফুপুর গলা যে একটু কেঁপে উঠেছিলো, তা কিন্তু পুস্পিতার অলক্ষ্যেই থেকে গিয়েছিলো।
এজন্যই তো বড় ফুপু মানুষটির খেই পায় না পুস্পিতা। কখন যে মানুষটি মেজাজ হারাবে তা যেন কারো আগাম অনুমানের সাধ্য নেই।
তবে এ বাড়ির সবাই বলে, বড় ফুপুর রুদ্রমূর্তি পুস্পিতার এখনো দেখে ওঠার সুযোগ হয়নি।
সবাই যতই বলুক না কেনো; এতদিনে পুস্পিতা বুঝে গেছে বড় ফুপুকে নিয়ে এবাড়ির সবাই একটু বেশীই ভয়ে থাকে, আদতে যার কোনো কারণই নেই।
আর সেটা বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে রিশাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার পর।
রিশাদ ফোন দিলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বড় ফুপুর খোঁজ নেয়,
বড় ফুপু কি এখনো হুটহাট রেগে যায়?
কিংবা
বড় ফুপু কি দাদুর ছবিটা দেয়ালে আবার ঝুলাতে দিলো?
 
অদ্ভুত কথা তো, ওমন একটু আধটু রাগ করলেই কী তাঁর অন্যায় আবদার প্রাধান্য দিতে হবে? বড় ফুপুকে নিয়ে ওদের এই অকারণ উদ্বেগ সত্যিই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুস্পিতার জন্য দিন দিন।
তবে এই বিরক্তি খুব বেশীদিন স্হায়ী হলো না পুস্পিতার। সেখানে জায়গা করে নিলো অদ্ভুত এক আতংক। অদ্ভুত এক ঘটনা টেনে আনলো এই আতংক।
সেদিন দুপুরে বাড়িটি অন্য দিনগুলোর মতোই স্তব্ধ হয়েছিলো। এমনিতেই বিশাল এই বাড়িতে হাতে গোনা চার পাঁচজন মানুষ। তারা আর কতইবা হৈ হুল্লোড় তুলতে পারে। তবুও সকাল থেকে দুপুর অব্দি দৈনন্দিন কাজের জেরে বাড়িটি যেটুকু জমজমাট থাকে, দুপুরের পর থেকে তা ফুরিয়ে আসে। সারা বাড়ি ঝিমায় সে সময়। দুপুরের খাবারের ঠিক পর পরই বাড়ির সব ব্যবহারিক ঘরগুলোতে খিল পড়ে যায় বেশ লম্বা সময়ের জন্য।এসময় বাড়ির কাজে সাহায্যকারী মানুষগুলোও জিরিয়ে নেয় লম্বা সময়ের জন্য।
এগুলোর সাথে বাড়িটিও জিরোয় মনে হয়।
পুরো বাড়িটা এতই নিস্তব্ধ হয়ে যায় যে, ঘরের ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা চড়ুইয়ের ডাকেও চমকে উঠতে হয় সেসব সময় হঠাৎ হঠাৎ।
 
শহরে বড় হওয়া পুস্পিতার এমন মফস্বলী জীবনের সাথে আগে কোনো যোগসূত্রই ছিল না। তাই নিরিবিলি সময়গুলো প্রথম প্রথম বেশ উপভোগ্য মনে হলেও সময় গড়াতেই তা একঘেয়ে মনে হতে শুরু হলো পুস্পিতার।
এই একঘেয়েমি কাটানোর উপায় কখনও ল্যাপটপে ম্যূভি দেখা, আবার কখনও বিশাল এ বাড়ির আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ানো। দ্বিতীয় উপায়টি পুস্পিতার বেশী পছন্দের।তবে এটা করতে হয় খুব সাবধানে। কারণ খুঁট করে একটু আওয়াজেই এ বাড়ির নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যায়।
 
কিন্তু অতি সাবধানেই যে বড় অনিষ্ট ঘটে যায়, সেদিনের আগে পুস্পিতার জানা ছিল না।
সেদিন ঝিমানো বাড়ির উঠোনে আলগোছে নেমে এসেছিলো পুস্পিতা। পায়ে পায়ে এদিকওদিক ঘুরছিলো উদ্দেশ্যহীন।
দোতলা এ বাড়ির উপর নিচ মিলে অনেকগুলো ঘর। হাতে গুনলে দশখানা। এজন্যই তো এ বাড়ির নাম দশমহলা। তবে বাড়ির নাম যতই গালভরা হোক না কেনো মানুষ তো গুনে ওই চার থেকে পাঁচজন। তবে আগে কিন্তু এমন ছিল না।রিশাদের দাদু মানে সৈয়দ আজমল আলী যতদিন বেঁচে ছিলেন এ বাড়ির ঘরে নাকী টান পড়ে যেতো।
এ বাড়ির নিজস্ব মানুষ বাদেও আত্মীয়-স্বজন, জায়গীর সব মিলিয়ে এতজন ছিলো যে ছাদঘরেও তখন তক্তপোশ পড়তো। আর তা হবেই বা না কেন। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে এ বাড়ির পরিবার তো কম বড় ছিল না।
 
বড় চাচা, মেজো ফুফু আর ছোট ফুফু দেশের বাইরে চলে না গেলে আজও এ বাড়ি আর যাই হোক অন্তত উৎসব পার্বণে গমগম করতো। তবে তারা যতই এ বাড়ির প্রতি আগ্রহ হারাক, এ বাড়ি কিন্তু তাদের সব স্মৃতি থেকে বিতাড়িত করতে পারেনি। এজন্যই তো এদের ঘরগুলোর তালায় এখনো চাবি করে যে কোনো উৎসবের আগে। ধুলো ঝেরে লেপেমুছে এখনো চকচকে করে রাখা হয়, তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায়। আর এই রীতি চালু করেছে বড় ফুপু,
‘ কতদিন আসে না ওরা, এবারের ঈদে ঠিক আসবে দেখো।’
অথবা,
‘ রাশুর বিছানায় এই চাদরটা পেতে রাখো, গরমের ছুটিতে বিদেশ থেকে দেশে আসে তো সবাই।’
বিছানায় রাজস্হানী চাদরের কোণা টেনে টেনে যতই নিভাঁজ করুক না কেনো বড় ফুপু, বাড়ি বিমুখ ভাই বোনদের ফিরিয়ে আনতে পারেন কই তিনি?
পুস্পিতাকে বলা হয়েছে, বিদেশী সভ্যতায় অভ্যস্ত মানুষগুলো এই মফস্বলে এসে মানিয়ে নিতে পারে না বলে তারা বাড়ি বিমুখ।
পুস্পিতা মনে মনে ভাবে রিশাদও কী এরপর একদিন এই মফস্বলী বাড়িতে আসা ভুলে যাবে? আর সে নিজে? সেও তো আর মাস দুয়েকের মধ্যেই এদেশ ছেড়ে যাবে।
 
প্রশ্নগুলো পুস্পিতাকে রুবিক’স কিউবের মতো এলোমেলো করে দেয় নিস্তব্ধ সে দুপুর। আর তখনই ওর চোখ পড়ে এ বাড়ির স্টোর রুমের দিকে।সাধারণত বাড়ির অতিরিক্ত জিনিষের জায়গা হবার কথা সে ঘরে। কিন্তু ব্যতিক্রম এই বাড়ি সব কিছুতেই ব্যতিক্রম। তাই তো ফেলে দেবার মতো পুরোনো জিনিসও খুঁজে পাওয়া যায় সে ঘরে।
আর তার কারণ হলো সৈয়দ আজমল আলী যক্ষের ধনের মতো সবকিছু আগলে রাখার অভ্যাস। জীবনের যে কোনো গুরুত্বপূ্র্ণ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত জিনিস সংগ্রহে রাখার নেশা ছিল তাঁর।
সৈয়দ আজমল আলীর পেশোয়ার ভ্রমণের খাইবার গেটের কাঠের রেপ্লিকা হোক অথবা পঁচাশিতে প্রথম সম্বর্ধনায় পাওয়া একটা পেতলের ম্যাপ, সবকিছু কিন্তু একটু খুঁজলেই স্টোর রুমে এখনো পাওয়া যায়। দীর্ঘদিনের পরিচর্যার অভাবে এই ঘরের প্রতিটি বস্তুই জৌলুস হারিয়ে বাতিলের খাতায় নাম তুলেছে অনেক আগেই। তবুও বাড়ির কেউ জিনিষগুলো ফেলে দেয় না, আবার ঝেড়েমুছে যত্নও নেয় না।
অদ্ভুতভাবে ঘরটির প্রতি নিদারুণ উদাসিনতা বাড়ির সকলের। এমনকি বড় ফুপুর ভান্ডারেও সে ঘর বা বস্তুগুলো নিয়ে কোনো গল্প নেই। থাকলে নিশ্চয় অন্তত একবার হলেও পুস্পিতা তা শুনতে পেতো।
কোনোকিছু না ভেবেই পুস্পিতা স্টোর রুমের শেকল নামালো সেদিন।ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তুলে দরজা দুটো খুলে যেতেই পুস্পিতা নিজেকে আবিষ্কার করলো ধুলো আর অন্ধকারের স্তুপের মধ্যে। ঘরটিতে আগে কখনো আসেনি পুস্পিতা। তাই অন্ধকার সামলে সামনে এগোনোর পথের আন্দাজ নেই তার।
বেশ কিছুটা সময় নিলো। এরপর দরজা দিয়ে আসা আলোটুকুর ভরসায় খুঁজতে লাগলো ঘরের জানালা। না নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও একটি জানালা পেলো না পুস্পিতা। তবে ততক্ষণে গুমোট অন্ধকারে দরজার ওপাশ থেকে আলো একটু একটু করে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। সেই আলোতেই পুস্পিতা বুঝতে পেরেছিলো সে ঘরটি আসলে অকেজো জিনিষের। হাতল ভাঙা চেয়ার, ঘুণে ধরা কাঠের বাক্স, ছেড়া চটি, পুরাতন বই, রঙ খোঁয়া পিকদানির মতো মূল্যহীন জিনিষে ঠাঁসা সে ঘর।
শুরুতেই পুস্পিতা ধুলো সরিয়ে দু’একটি বই হাতে তুলে নিয়েছিলো যার সবই উর্দূ ভাষায় লেখা। তবে একটা দুটো ইংরেজী বইও ছিল কিন্তু সেগুলোর পাতা পোকায় কাটা। পুস্পিতা আগ্রহ হারালো। ততক্ষণে দুপুরের অনেকটা গড়িয়ে গেছে। হাতের ধুলো ঝেরে অকেজো জিনিষের ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলো পুস্পিতা। ঠিক তখনি তার চোখ গিয়ে আটকালো ভাঙা কাঠবাক্সের পেছনটায়। সঙ্গে সঙ্গেই পুস্পিতার চোখগুলোয় সুক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠলো। ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো ‘ইট’স মেইক মাই ডে।’
এরপরেই অকেজো জিনিষের স্তুপ পেরোলে পুস্পিতা কাঠবাক্সের পেছনে পৌঁছাবার জন্য। তবে তা কিন্তু খুব নির্বিঘ্নে হলো না।এরমধ্যে কাঠের বাক্সের ভাঙা কোণায় পুস্পিতার হাত কেটে গেলো, কামিজের কোণাটাও ছিঁড়ে গেলো।তবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই পুস্পিতার। ওর সব আগ্রহ তখন রূপালী রঙের জিনিষটার প্রতি।
সাধারণত সেই জিনিষগুলো মিউজিয়ামে দেখতে পাওয়া। তবে তখন জিনিষটা অবহেলায় ভাঙারির স্তুপের ভেতর পড়ে আছে।
সব বাঁধা এড়িয়ে জিনিষটা হাতে ধরতেই ভাঙা হ্যান্ডেলটা পুস্পিতাকে বুঝিয়ে দিলো অকেজোর দলে সেও নাম লিখিয়েছে। তা বলে কী হবে? প্রাগৈতিহাসিক মূল্য সেটাকে কখনই মূল্যহীন হতে দেবে না। ধুলো ঝেরে একটু পরিষ্কার করতেই পুস্পিতা বুঝতে পারে রঙটিও ছেড়ে পালিয়েছে জিনিষটির ।
জৌলুসপূর্ণ দিন তো এদের কবেই ফুরিয়েছে, পুস্পিতা মনে মনে ভাবে। উল্টেপালটে ভালো করে দেখতে থাকে পুস্পিতা। হ্যাঁ, হুবহু এমন আরেকটা ও দেখেছিলো কলকাতার কোনো এক মিউজিয়ামে, রিশাদের সাথে ঘুরতে গিয়ে। রিশাদ অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিলো সেদিন ‘একাত্তর’ লেখা সেলফের সামনে।
 খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো সব।
রিশাদের সেদিনের সেই আগ্রহটা মনে পড়তেই পুস্পিতা ঠিক করে ফেললো যাবার সময় এটা সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।রিশাদ কতটা খুশী হবে, তা অনুমান করে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো পুস্পিতা।
একঘেয়ে দুপুরে একটু আনন্দ আবিষ্কার করে পুস্পিতা আহ্লাদিত হয়ে উঠছিলো একটু একটু করে, আর অন্যদিকে আধখোলা দরজায় পুস্পিতার জন্য জমা হচ্ছিলো তীব্র আতঙ্ক।
অনেকদিন পর স্টোর রুমের দরজা আধাখোলা দেখে বড় ফুপু খুব অবাক হয়েছিলো। কে খুলেছে এ ঘরের তালা এতদিন পর, তা দেখতে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো সেখানে।ধুলো আর ভাঙাচুরা জিনিষের মধ্যে পুস্পিতার পেছোনটা দেখে বড় ফুপু কিন্তু শুরুতে অবাক হয়নি মোটেও। বরং ভেবেছিলো অলস সময়গুলো পার করা মেয়েটার জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাড়াতাড়ি রিশাদের কাছে পাঠিয়ে দেবার একটা তাড়াও বোধ করতে শুরু করে তখন।তবে সে ভাবনায় ছেদ পড়ে আচমকা।এরপরে যা ঘটে তাতে বড় ফুপু মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।
 
পুস্পিতা ঘুরে দাঁড়াতেই ওর হাতের দিকে চোখ স্হির হয়ে যায় বড় ফুপুর। সঙ্গে সঙ্গে কিছু হাতে থাকা পানির গ্লাসটা ছুঁড়ে মাড়ে পুস্পিতার দিকে। কাঁচের গ্লাসটা লক্ষ্যচ্যূত হয়ে ঝনঝন শব্দ তুলে পুস্পিতার আহ্লাদিত সময় খানখান করে দিলো।
 
গ্লাসটা পুস্পিতার গা ছুঁইয়ে গেলে কতটা রক্তারক্তি হতে পারতো,তা ভেবে বাড়ির মানুষগুলোর গায়ে এখনো কাঁটা দেয়।
তবে ঘটনার পরপরেই বড় ফুপুকে সেখান থেকে জোর করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
আর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুস্পিতাও আগপাছ না বুঝে গিয়ে উঠেছিলো নিজের ঘরে । কিন্তু বিনাকারণে বড়ফুপুর অতর্কিত সেই আক্রমণ পুস্পিতাকে আতঙ্কিত করে তুলতে সময় নিলো না মোটেও।
তবে সেদিনের হৈ হট্টগোলের ভেতর থেকে দুটো শব্দ পুস্পিতা আলাদা করতে পেরেছিলো।
 
তারমধ্যে ‘তরু ভাই’ নামটা একমাত্র আকাশনিম গাছের গল্পে শুনেছিলো পুস্পিতা, এর আগে বা পরে আর কখনই শোনেনি। আর অন্য শব্দটি ‘সন্তান’।
কোন সন্তান, কার সন্তান——-বড় ফুপু কার কথা ওমন চিৎকার করে বলছিলো, কেনোইবা সেদিন বড় ফুপু ওমন হিংস্র হয়ে উঠলো, কোনোকিছুরই উত্তর নেই পুস্পিতার কাছে।
কীভাবে থাকবে উত্তর সে ঘটনার পর বড় ফুপু নিজের ঘর থেকে বেরই হন না। আর পুস্পিতার সাথে হয়ে যাওয়া অন্যায়ে ওর শ্বশুর শাশুড়ি এতই লজ্জিত যে , সে ঘটনা নিয়ে কিছু বলা তো দূরে থাক পারলে পরদিনই পুস্পিতাকে ওর বাবা-মার কাছে পাঠিয়ে দেয়।
তবে নিজের দায়িত্বের দোহাই দিয়ে পুস্পিতা এ বাড়িতেই থেকে গেছে। এর পেছনে যে বড় ফুপুর এই আক্রমণের কারণ জানার শতভাগ ইচ্ছা তা কিন্তু পুস্পিতা বেশ কষ্ট করেই লুকিয়ে রেখেছে।
আসলে লুকিয়ে না রেখে উপায় নেই। রিশাদকে জিজ্ঞাসা করে লাভ হয়নি। ও যেটুকু জানে তা হলো, বড় ফুপু নাকী একটা সময় শুধুই চিৎকার চেঁচামেচি করতো; বাড়ির সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতো। তবে সেসব রিশাদের শুধুই শোনা কথা। কারণ রিশাদের জন্মের পর থেকেই নাকী বড়ফুপু অনেকটা ধাতস্থ হতে শুরু করে।তবে এরজন্য অবশ্য রিশাদের মাকে বেশ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। সন্তান জ্ঞানে রিশাদকে যতবার বড় ফুপু বুকে জড়িয়ে নিয়েছে, রিশাদের মা ততবার মাতৃস্নেহ উপেক্ষা করে দূরে দূরে থেকেছে।
এজন্যই তো ছোটবেলায় রিশাদ বড় ফুপুকে অনেকবার মা ভেবে ভুল করতো।
কিন্তু রিশাদের এ গল্পে তো গ্লাস ছুঁড়ে মারার কারণ খুঁজে বের করা যায় না।
 
আর এ বাড়ির অন্যকেউ কিছুই জানে না।
অদ্ভুত যে বাড়ির সবকিছুতে গল্প সে বাড়ির গল্পের ভাড়ারে এমন টান পড়ে গেলো? পুস্পিতার মনটা বেশ দমে গেলো এতে।
এরমধ্যে পুস্পিতার এম্ব্যাসিতে যাওয়ার ডেট চলে এলো। মফস্বলী জীবনের অদ্ভুত সময়গুলোও ফুরিয়ে এলো এরইসাথে। বলে দেওয়া হলো, পুস্পিতা ভিসা পেলে এ বাড়ির সবাই গিয়ে ওকে বিদায় দিয়ে আসবে।
 
আসলে খুব সুক্ষ্মভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো আপাতত পুস্পিতার এ বাড়িতে ফিরে আসার দরকার নেই।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিকই হলো। পুস্পিতার ভিসা পেয়ে যাবার খবরটা এ বাড়িতে আসতেই সবাই চঞ্চল হয়ে উঠলো। পুস্পিতাকে বিদায় জানাতে কে কে যাবে, কবে যাবে, রিশাদের জন্য কী কী পাঠানো হবে তা নিয়ে সবাই এমনকি বড় ফুপুও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো।
ও হ্যাঁ, বড় ফুপু কিন্তু এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক। রাগ, ক্ষোভ সব ভুলে আবার গল্প বলায় মেতে উঠেছে। তবে মুশকিল হলো, সে গল্প শোনার মানুষের অভাব হয়ে গেছে এ বাড়িতে।
তা বলে কিন্তু বড় ফুপুর গল্প বলা বন্ধ নেই। একে তাকে শেষমেষ কাউকে না পেলে নিজে নিজেই গল্প আওড়াতে থাকে। তবে তা কিন্তু মোটেও অসংলগ্ন নয়, কারণ বড় ফুপু জানে সামনে না থাকলেও আড়াল থেকে এ বাড়ির মানুষগুলো ঠিকই কান খাড়া করে রেখেছে।
আর তা না করে উপায় আছে এ বাড়ির মানুষগুলোর? বড় ফুপু কখন কী বলা শুরু করে তার ঠিক আছে নাকি।
আর ঠিক নেই বলেই সিদ্ধান্ত হয়েছে পুস্পিতাকে বিদায় জানাতে বড় ফুপুকে সঙ্গে নেওয়া হবে না। এমনকি তাঁকে লুকিয়েই যাবে সবাই।
কিন্তু এই লুকোচুরি খেলায় সবাইকে হার মানিয়ে দিলো পুস্পিতা। দেশ ছাড়ার দিন দুয়েক আগে ভর দুপুরে হুট করে এসে হাজির হলো মফস্বলের এ বাড়িতে। কী এক জরুরী জিনিষ নাকী ভুল করে রেখে গেছে। এমনকি তা কোথায় রেখে গেছে তাও ভুলে গেছে। তাই নিজেই খুঁজতে এসেছে সেটা।
বাড়ির সবাই অসন্তুষ্ট হলেও মনে মনে হাসে বড় ফুপু। যাক, গল্প শোনার একজন মনযোগী শ্রোতা পাওয়া গেলো, হোক তা অল্প সময়ের জন্য।
এজন্য অবশ্য বড় ফুপু খুব বেশী ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিলো না, সন্ধ্যা রাতেই হাজির হলো পুস্পিতার ঘরে।স্বভাবসুলভ শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ পুস্প, আমি জানি তুমি কি খুঁজতে এসেছো এ বাড়িতে।’
পুস্পিতা চমকে উঠলো না, অবাক হলো না। শুধু নির্বিকারভাবে বললো,
‘ গল্পটা শুরু করো বড় ফুপু।’
গল্প শুরু হলো…….
এ গ্রাম কেনো আশেপাশের কোনো গ্রামেই তখন রেডিও কী জিনিষ সেভাবে জানতো না। তবে গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়ির আভিজাত্যে আরেকটু রঙ চড়াতে সুদূর জাপান থেকে হঠাৎ একদিন কিনে আনা হলো ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিও।
 
ব্যস্, গ্রামের সবার মধ্যে হুলস্হুল পড়ে গেলো। এ দেখতে আসে ও দেখতে আসে। সবার একই কথা,
অদ্ভুত বাক্স, মানুষের মতো কথা কয়!
যতই বলা হয়—মানুষই কথা বলছে তো, বাক্সটি কথাগুলো আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে শুধু।
সে কথায় উল্টো চোখ বড় করে সবার প্রশ্ন,
এইটুকুন বাক্সের মধ্যে কীভাবে এতগুলান মানুষ ঢুকলো?
গ্রামের অশিক্ষিত মানুষগুলোকে বোঝানোর আশা বাদ দিয়ে তাদের অবাক হওয়াটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে লাগলো বিশাল বাড়ির মানুষগুলো।
তবে বাড়ির বড় মেয়ে ষোড়শী রাবেয়ের সুখ কিন্তু ছিলো অন্য জায়গাতে।
রবিবার দুপুরবেলা রেডিওর নব ঘুরিয়ে আকাশবাণীতে ‘ ওয়েসিস মনের মতো গান, মনে রাখার কথা’ ধরতেই বাড়ির প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়াতো বিশ বছরের এক যুবক। এক একটি গান যেনো রাবেয়া আর সেই যুবককে তাঁদের না বলা কথা একে বলে দিতো।
 
ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওটির তাৎপর্য এতটুকুই ছিলো তখন পর্যন্ত রাবেয়ার জীবনে।
কিন্তু দিন হঠাৎ পাল্টে গেলো…..
এটুকু বলে বড় ফুপু থেমে গেলো। ‘ এরপর কী হলো?’ পুস্পিতার প্রশ্ন উপেক্ষা করে বেশ কিছু সময় মাথা নিচু করে বসে রইলো বড় ফুপু।যেনো গল্পের বাকী অংশ আর জানা নেই তাঁর।
 
আনকোরা এ গল্প পুরোটা শোনার জন্য অধির হয়ে আছে পুস্পিতা। ‘বড় ফুপু…’ পুস্পিতার কথা শেষ হবার আগেই বড় ফুপু গল্পে ফিরলেন,
…..একাত্তরের মে মাস আসতে না আসতেই গ্রামের মানুষগুলোর জীবনটা আর অতটা সরল রইলো না। শহর থেকে পালিয়ে আসা আত্মীয়দের মুখে ভয়াবহ সব ঘটনা শুনে আতঙ্ক যোগ হলো সেখানে।
মানুষগুলোর আশংকা খুব তাড়াতাড়ি সত্যি হয়ে উঠলো। যুদ্ধ শহরের গন্ডি পেরিয়ে গ্রামের দিকেই আসছে তখন। এসময়ই একদিন বাড়ির পাশের আমবাগানে রাবেয়াকে ডেকে পাঠালো যুবকটি,
‘ ওপাড়ে যাচ্ছি ট্রেনিং নিতে।’
রাবেয়ার বুক কেঁপে উঠলো। ওপাড় আর ট্রেনিং শব্দ দুটোর আড়ালে অনিশ্চিত ভয়াবহ সময় আঁচ করতে ভুল করলো না সে। চোখের জল লুকিয়ে রাবেয়া প্রশ্ন করলো,
‘ কবে ফিরবে?’
উত্তর জানা ছিলো না যুবকের । শুধু কেঁপে ওঠা কন্ঠ নিজের বশে এনে বললো,
‘ স্বাধীন বাংলা বেতার শুনিস, ওখানে আমাদের খবর পাবি।’
সেদিনের পর থেকেই ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওর ভূমিকা বদলে গেলো রাবেয়ার জীবনে।সারাদিন অপেক্ষা করা রাতের জন্য।আর রাত এলেই রেডিও নিয়ে বসে পড়া।এরপর নব ঘুরিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার খুঁজে বের করা। এই সময়টা ছিল সবচেয়ে উত্তেজনার…..
উজ্জল হয়ে ওঠা বড় ফুপুর মুখটায় পুস্পিতার নিস্পলক চোখ আটকে যায়। বড় ফুপু খুব দ্রুত বলে চলেছে,
মেগাহার্ৎজের লাল কাঁটা তিরতির করে কেঁপে স্টেশনটা ধরে। আর তা ধরলেই মনে হয়, সেই মানুষটার খুব কাছে পৌঁছে গেছে রাবেয়া।একের পর এক অনুষ্ঠান হয়। ‘রণাঙ্গনের সাফল্যকাহিনী’ শুনলেই রাবেয়ার মনে হয় সফল সে দলে নিশ্চয় সে আছে। আনন্দ বা গর্ব কোন অনুভূতি রাবেয়াকে ভাসিয়ে নেয়, তার ফারাক করতে পারে না। তবে সব সময় যে এমন হতো তা নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের খবরাখবর-এ শত্রুবাহিনীর হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যূর খবরে রাবেয়ার বুক যে কেঁপে উঠতো না, তা কিন্তু নয়।
তবে এই আশংকা আচমকা একদিন ফুরিয়ে গেলো…..
বড় ফুপুর চেহারায় এখন অদ্ভুত একটা স্বস্তিবোধ।গলার স্বরে স্পস্ট উচ্ছ্বাস,
খুব গোপনে খবর এলো যুবকটি আসছে। একরাতের জন্য গ্রামে আসছে। বড় একটা অপারেশনের আগে নিজের আপন মানুষগুলোকে দেখতে চায় সে।
সুতরাং, রাবেয়ার সাথেও দেখা হবে তার।
সবাইকে লুকিয়ে রাবেয়ার কাছে খবর এলো।
 
গ্রামের পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির আমবাগানে সন্ধ্যার ঠিক আগে রাবেয়ার সাথে দেখা করবে সেই যুবক।
সবাইকে লুকিয়ে দেখা করতে গেলো রাবেয়া। বাড়ি কেনো, গ্রামের কোনো কাকপক্ষীও জানতে পারলো না এ কথা।
কতদিন পর দেখা হলো দু’জনের। বড় চুল, অপরিচ্ছন্ন জামাকাপড় আর শীর্ণ দেহের যুবকটির শুধু উজ্বল চোখদুটোই রাবেয়াকে অদ্ভুত প্রশান্তি দিলো।
কতদিনের কথা জমা হয়েছে তাদের!
 
কিন্তু ওদিকে খুব অদ্ভুতভাবে গ্রামে মুক্তি আসার খবর পৌঁছে গেলো শত্রুবাহিনীর কাছে।এতদিনের জমানো কথা ভাগ করে নেবার আগেই শত্রুবাহিনী চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো যুবকটিকে।
‘ আর রাবেয়া?’ পুস্পিতার প্রশ্ন বড় ফুপুকে থামতে দিলো না।
ষোড়শী রাবেয়াকেও মুক্তিযোদ্ধার চর বলে রেহাই দেওয়া হলো না।
‘এরপর……….’
 
‘এরপর আর কী!’ বড় ফুপু থেমে গেলো।
‘রাবেয়ার কী হলো?’ পুস্পিতার নিজের মনে বলে ওঠা প্রশ্নের উত্তর এলো,
ষোড়শী রাবেয়া সতেরোয় পড়ার আগেই যখন ক্যাম্প থেকে মুক্ত হলো তখন সে চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা।
বড় ফুপু কী একটু কেঁপে উঠলেন এটা বলার সময়? পুস্পিতা বুঝে উঠতে পারলো না। তবে বড় ফুপুর দৃঢ় চোয়াল আরেকটু শক্ত হলো,
না, গ্রামের সেই বিশাল বাড়ি অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়াকে বিতাড়িত করেনি। বরং যতটা সম্ভব গোপনে রাবেয়াকে রেখে পরিচর্যা করা হয়েছে।
রাবেয়া তখনো স্বাভাবিক। পরিবর্তনের মধ্যে শুধু মুখে কথার যোগান কমে গেছে।
সেই সময়েই কোনো একদিন সেই যুবকের মা রাবেয়ার কাছে এলো। উদ্ভান্ত্র সে মায়ের প্রশ্ন ছিলো, ক্যাম্প থিইক্যা আমার বাজান কবে ছাড়া পাইবো রাবেয়া?
 
সেদিনই প্রথম ডুকরে ডুকরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলো রাবেয়া।
তবে সেদিনই কিন্তু শেষ।
এরপর কী যে হলো? রাবেয়ার কান্না একদম থেমে গেলো।
বড় ফুপুও গল্পের এই জায়গাতে একটু পর পর থামতে লাগলো।যেনো ভুলে যাওয়া গল্প মনে করতে হচ্ছে তাঁকে। থেমে থেমে বলে চলেছে বড় ফুপু,
সে সময় সুযোগ পেলেই ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিও নিয়ে বসে পড়তো রাবেয়া। মেগাহার্ৎযের লাল কাঁটাটা এদিক ওদিক করে খুঁজতো স্বাধীন বাংলা বেতার, ওখানেই তো যুবকটির খবর পাওয়া যাবে।
কিন্তু রেডিওর লাল কাঁটাটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আর ধরতে পারতো না স্বাধীন বাংলা বেতার স্টেশন।
কিন্তু রাবেয়া দমে যায় না। দিনরাত সারাক্ষণ ওই রেডিও নিয়েই পড়ে থাকে। নব ঘুড়িয়ে শুধুই খোঁজে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
বাড়ির সবাই বুকে পাথর বেঁধে সব দেখতে থাকে।অপেক্ষা শুধু রাবেয়ার সন্তান প্রসবের ক্ষণ।
 
হিসেবমতো মতো আষাঢ়ের ভরা বর্ষায় রাবেয়ার সন্তানের কান্নায় সে বাড়ি কেঁপে ওঠার কথা ছিলো। কিন্তু তা হলো কই? মৃত বাচ্চা বিশাল বাড়িতে কবরের নিস্তব্ধতা এনে দিলো।
 
বড় ফুপুর কন্ঠেও এখন কবরের নিস্তব্ধতা।তবে তা বেশী সময় স্হায়ী হলো না। ‘তারপর’ পুস্পিতার এই শব্দটি চাপা পড়ে গেলো বড় ফুপুর শব্দের তলে,
এ বাড়ির নিস্তব্ধতা মেনে নিতে পারলেও রাবেয়ার পাথর হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারলেন না রাবেয়ার বাবা।তাই নিজের পাপের ফিরিস্তির বিনিময়ে মেয়েকে শাপমুক্ত করতে চাইলেন।
হ্যাঁ, সেদিন গ্রামে মুক্তি আসার খবরটা তিনিই নিজে ক্যাম্পে গিয়ে জানিয়ে এসেছিলেন।
এটা জানার পরেও রাবেয়া ভাবলেশহীন।কান্নাকাটি নেই, অভিযোগ অনুযোগ নেই, কারোও প্রতি ক্ষোভ নেই, শুধুই নি:শব্দ চাহনীতে চারপাশ দেখতো।
 
তবে সমস্যা হতো তখনই যখন যুদ্ধের বছরের কোনো কথা বা কোনো জিনিষ তাঁর সামনে আসতো। কী হতো কে জানে, খুব উত্তেজিত হয়ে পড়তো তখন। চিৎকার করে বলতে থাকতো ক্যাম্পের নির্যাতনের কথা।
যা আস্তে আস্তে এতই বিব্রতকর হয়ে উঠলো যে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতিকে রাবেয়াদের বাড়ি থেকে নির্বাসন দেওয়া হলো।যথারীতি একই ভাগ্য বরণ করলো ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওটি।
তবে রাবেয়ার বড় ভাই, মেজ বোন বা ছোট বোন কিন্তু স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলো সে বাড়ি থেকে। আর কারণ সেই এক । উত্তেজিত রাবেয়ার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা বিব্রতকর কথাগুলো। হয়তো এদের কারো সন্তানের নাম স্বাধীন বা কারোও শ্বশুরবাড়ির প্রায় সবগুলো পুরুষমানুষই রণাঙ্গনে না গিয়েই মুক্তিযোদ্ধার হালনাগাদ তালিকায় নাম তুলেছেন।
 
ব্যস্, এগুলো জানামাত্রই রাবেয়ার শুরু হতো বিব্রতকর আচরণ। এই আচরণই একে একে তাদেরকে এ বাড়ি বিমুখ করেছে।
 
আর এজন্যই মফস্বলী সেই বিশাল বাড়িটা এমন বিরান।
তবে রাবেয়ার স্বাভাবিক হয়ে ওঠার গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। বিশাল সেই বাড়িতে তখন মানুষ মোটে চারজন। রাবেয়ার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী তখন অন্ত:সত্বা।কোনো এক আষাঢ়ে সদ্যজাত শিশুটির কান্নায় সে বাড়ি কেঁপে উঠতেই রাবেয়া দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,
কাঁদে না সোনা, কাঁদতে হয়না, এই তো মা এখানে।
রাবেয়া সত্যিই সেদিনের পর থেকে বাচ্চাটির মা হয়ে উঠেছিলো। সেই মাতৃত্ববোধই রাবেয়াকে আস্তে আস্তে ফিরিয়ে এনেছিলো স্বাভাবিক জীবনে।
তবে হুটহাট চিৎকার চেঁচামেচি করা, ক্যাম্পের নির্যাতনের বিব্রতকর কথাগুলো বলে ফেলার অভ্যাসটা কিন্তু থেকেই গেলো।
গল্পটা শেষ হয়েছে ভেবে পুস্পিতা বড় ফুপুর খুব কাছে এসে বসলো। বড় ফুপুর হাত দু’টো ধরে বললো,
‘একাত্তর নিয়ে আমার কোনো গল্প জানা ছিল না বড় ফুপু। তুমি আর ওই রেডিওটা আমার কাছে একাত্তর।’
সেদিন দুপুরে স্টোর রুম থেকে পাওয়া ন্যাশনাল প্যানাসনিক রেডিওটা লাগেজে ধরাতে খুব একটা কসরত করতে হয় না পুস্পিতাকে।
একাত্তরের গল্পটা লাগেজে পুরে পুস্পিতা যখন দেশ ছাড়ছে, তখন বড় ফুপু না বলা আরেকটি গল্পের উৎস সৈয়দ আজমল আলীর মিথ্যে মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রটা খুঁজে বেড়াচ্ছে মফস্বলী বাড়িটার আনাচকানাচ।
 

লেখক পরিচিতি:

স্মৃতি ভদ্র
কথাসাহিত্যিক।
নিউইর্য়কের থাকেন।
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *