মার্গারেট মিচেল’এর ধারাবাহিক উপন্যাস : যেদিন গেছে ভেসে –ষোড়শ অধ্যায়

অবিরাম বর্ষণের শীতলতা আর ঝঞ্ঝার উন্মত্ততার সাথে সাথে সর্বব্যাপি হতাশা আর বিষণ্ণতার মধ্যে ১৮৬৪ সালের জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাস কেটে গেল। তার ওপর গেটিসবার্গ আর ভিক্সবার্গের পতন দক্ষিণের প্রতিরোধ করার ভিতকে নড়বড়ে করে দিল। জোরদার লড়াইয়ের পর টেনেসি উপত্যকার বিশিরভাগ অংশই এখন ইউনিয়নদের দখলে। পরপর এতগুলো হতাশার পরও দক্ষিণের অদম্য জেদে কোনও ঘাটতি দেখা গেল না।
এ কথা সত্যি যে আগেকার সেই অপরাজেয় উদ্দীপনার জায়গায় হেরে না যাবার এক বজ্রকঠিন সঙ্কল্প নিয়ে ওরা লড়াই চালিয়ে যেতে লাগল। তবু মাঝে মাঝে আশার আলোর ঝলক যে একেবারে দেখা দিল না তা নয়। যেমন টেনেসির দখল নেবার পরে যখন ইয়াঙ্কিরা জর্জিয়া দখল করবার জন্য এগোতে লাগল, তখন ওদের সফল ভাবে হঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হল। 
রাজ্যের একদম উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে – চিকামাওগায় – জোরদার লড়াই হল। যুদ্ধ শুরু হবার পর জর্জিয়ার মাটিতে এই প্রথম। ইয়াঙ্কিরা চাটমানুগার দখল নেবার পর গিরিবর্ত্মের মধ্যে দিয়ে জর্জিয়া প্রবেশ করল। কিন্তু অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে শেষ পর্যন্ত ওরা পিছু হাঁটতে বাধ্য হল। 
চিকমাওগায় দক্ষিণের এই বিজয়ের পেছনে অ্যাটলান্টার রেলপথের অনেক অবদান ছিল। ভার্জিনিয়া থেকে অ্যাটলান্টা হয়ে উত্তরদিকে টেনেসির রেলপথ ধরে জেনারাল লঙস্ট্রীটের বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে যান। শত শত মাইল বিস্তৃত সেই পথ উন্মুক্ত করে দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল থেকে সমস্ত ঞ্চলন্ত ট্রেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। 
অ্যাটলান্টা শহরের মধ্য দিয়ে একটার পর একটা ট্রেন, গাড়ি ভর্তি রণহুঙ্কার দিতে থাকা মানুষ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। যে যেরকম অবস্থায় ছিল সেই ট্রেনে উঠে রওয়ানা দিয়েছিল – ঘুম নেই, খাবার নেই, ঘোড়া নেই, অ্যাম্বুলেন্স নেই – কিন্তু সেটার পরোয়াও কেউ করেনি। ওরা লাফ দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছানোর আগ্রহে। ইয়াঙ্কিরা জর্জিয়া থেকে পিছু হটে আবার টেনেসিতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। 
এটা ছিল এক চমকপ্রদ জয় আর অ্যাটলান্টার মানুষরা গর্বের আর সন্তুষ্টির সঙ্গে এই রেলপথের অবদানের কথা বলাবলি করত। 
চিকমাওগার জয় সেই শীতে দক্ষিণের মনোবল বাড়ানোর জন্য খুব জরুরি ছিল। কিন্তু এখন ওরা স্বীকার করতে বাধ্য হল ইয়াঙ্কিরাও যথেষ্ট লড়াকু আর অন্ততপক্ষে ওদের জেনারালরা যথেষ্ট দক্ষ। গ্র্যান্টকে কসাই বলা যেতে পারে, লড়াইতে জেতার জন্য কত প্রাণ চলে গেল সেটা তিনি গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেন না – সুদ্ধে তাঁকে জিততেই হবে। শেরিডানের নামে দক্ষিণের লোকদের মনে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর আজকাল শেরম্যান বলেও একজনের কথা খুব ঘন ঘন শোনা যাচ্ছে। তাঁর নাম প্রথম উঠে আসে টেনেসি আর পশ্চিম প্রান্তে যুদ্ধের সময়। একজন নির্মম এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে ক্রমাগতই এঁর পরিচিতি বাড়ছে। 
অবশ্য জেনারাল লীর সঙ্গে কারোই তুলনা হয়না। এখনও জেনারাল এবং তাঁর বাহিনীর প্রতি সবার বিশ্বাস অটুট রয়েছে। শেষমেশ জয় যে তাদেরই হবে এ ব্যাপারেও দক্ষিণের লোকের মনে কোন সন্দেহ নেই। তবে যুদ্ধটা শেষ হবার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কত লোকের মৃত্যু হল, কত লোক সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে গেল, কত মেয়ে বিধবা হয়ে গেল, কত শিশু অনাথ হয়ে গেল! তবুও এখনও অনেক লড়াই বাকি! তার মানে আরও মৃত্যু, আরও পঙ্গু মানুষ, আরও বিধবা, আরও অনাথ শিশু। 
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেল – ওপরতলার মানুষদের পারষ্পরিক বিশ্বাসের অভাব ধীরে ধীরে জনতার মধ্যেও সংক্রমিত হওয়ায়। অনেক সংবাদ মাধ্যমই প্রেসিডেন্ট ডেভিসের তীব্র সমালোচনা করতে লাগল, বিশেষ করে তাঁর যুদ্ধ পরিচালনা করবার কৌশলকে। কনফেডারেট মন্ত্রীসভায় মতভেদ। প্রেসিডেন্ট ডেভিসের সঙ্গে তাঁর জেনারালদের মতবিরোধ। কনফেডারেট মুদ্রার মূল্যের ব্যাপক পতন। সেনাবাহিনীর জুতো আর পোশাকের যোগানে স্বল্পতা, সামরিক সামগ্রী আর ওষুধপত্রের যোগানের ততোধিক স্বল্পতা। রেলের পুরোনো রেকের বদলে নতুন রেকের উৎপাদন; ইয়াঙ্কিদের উপড়ে দেওয়া রেল লাইন সরিয়ে নতুন করে লাইন পাতার প্রয়োজনীয়তা। লড়াইয়ের ময়দানে জেনারালরা নতু সোইন্যের জন্য হা-হুতাশ করছেন – অথচ নতুন লোক পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসছে। তার ওপর অনেক রাজ্যের গভর্নররাও – তাদের মধ্যে জর্জিয়ার গভর্নর ব্রাউনও একজন – সীমান্তে স্থানীয় সেনাবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করে দিয়েছেন। এই সব স্থানীয় সেনাবাহিনীতে অনেক সক্ষম লোকেরা আছে যাঁদের পাওয়ার জন্য সীমান্তের সেনাবাহিনীরা ক্ষিপ্ত হয়ে আছে, কিন্তু সরকারের সব রকম আবেদনই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। 
মুদ্রার বাজার দর পড়ে যাওয়ার ফলে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে চলেছে। এক পাউণ্ড বীফ, পোর্ক কিংবা মাখনের দাম পঁয়তিরিশ ডলারে উঠে গেছে, এক ব্যারেল ময়দার দাম চোদ্দ ডলার, এক পাউণ্ড সোডার দাম একশ ডলার, আর এক পাউণ্ড চায়ের দাম পাঁচশ ডলার। গরম পোশাক, পাওয়া গেলেও এত দুর্মূল্য হয়ে গেছে যে মহিলারা পুরোনো পোশাকের তলায় বস্তার লাইনিং লাগিয়ে তারপর খবরের কাগজ জড়িয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া আটকানোর জন্য ব্যবহার করছেন। এক জোড়া জুতোর দাম দুশ থেকে আটশ ডলার। সেটা নির্ভর করছে জুতোজোড়া কার্ডবোর্ড না সত্যিকারের চামড়ার তৈরি তার ওপর। মহিলারা পুরোনো উলের শাল কেটে পট্টি দিয়ে জুতো বানিয়ে পরছেন। সেই জুতোর সোল কাঠ দিয়ে বানানো। 
সত্যি কথা বলতে কি, উত্তর পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অনেকেই ব্যাপারটা এখনও সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ইয়াঙ্কিদের যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণের বন্দরগুলোকে এমন নিশ্ছিদ্রভাবে ঘিরে ফেলেছে যে তার ফাঁক দিয়ে কোন পণ্যতরী উপকুলে ভিড়তে পারছে না। 
এতদিন দক্ষিণের লোকেরা তুলো বিক্রি করে যে সমস্ত পণ্য ওরা উৎপাদন করত না সেগুলো কিনে থাকত। কিন্তু এখন ওরা না পারছে বিক্রি করতে না পারছে কিনতে। জেরাল্ড ও’হারার টারার গুদামে তিনবছরের উৎপাদিত তুলো মজুদ হয়ে পড়ে আছে। কোন কাজেই লাগছে না। লিভারপুলে এই তুলো বিক্রি করতে পারলে এক লক্ষ পঞ্ছাশ হাজার ডলার আসতে পারত। কিন্তু এখন লিভারপুলে এই মাল বিক্রি করার কোন সম্ভাবনাই নেই। এক সময়ের সমৃদ্ধ ব্যক্তি জেরাল্ড ও’হারা এখন চিন্তায় পড়েছেন এই শীতে তাঁর পরিবার আর নীগ্রোদের মুখে কিভাবে অন্নের যোগান দেবেন। 
সমস্ত দক্ষিণ জুড়ে সব তুলোর চাষীরা একই সমস্যায় ভুগছেন। অবরোধ যত ঘনীভুত হচ্ছে, ইংল্যাণ্ডের বাজারে তুলো বিক্রি করে সেই টাকার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কেনা সম্ভব হচ্ছে না – আগে যেমন করা হত। কৃষিভিত্তিক দক্ষিণ এখন শিল্পভিত্তিক উত্তরের সঙ্গে যুধে লেগে থাকায় আরও অনেক জিনিষের দরকার পড়ছে – যে সব জিনিষ শান্তির সময়ে কেনা কথা ভাবাই যায়নি। 
পুরো পরিস্থিতি যেন চোরাকারবারি আর কালোবাজারিদের ইচ্ছে অনুযায়ী চলছে – আর ওরা এই সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যাবহার করছে। খাবার আর পোশাকের যোগান যত কমতে থাকল, দাম ততই আকাশছোঁয়া হতে থাকল, আর ততই সাধারণ মানুষের কালোবাজারি আর চোরাচালানকারীদের প্রতি আক্রোশ তীব্রতর হতে লাগল। ১৮৬৪ সালের গোড়ার দিকে, এমন একটা দিনও যেত না যেদিন খবরের কাগজে এইসব চোরাকারবারিদের রক্তচোষা জোঁক, শকুন এই ধরনের গালাগালি দিয়ে কিছু না কিছু লেখা না থাকত, আর সরকারকে এদের কড়া হাতে দমন করার আহ্বান না থাকত। সরকারও এদের দমন করার চেষ্টা করত না তা নয়, কিন্তু সরকার নিজেই নানাভাবে এতটা নিগৃহিত অবস্থায় ছিল, যে এই ব্যাপারে তাদের প্রচেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। 
জনতার এই আক্রোশ সব থেকে বেশি পড়েছিল রেট বাটলারের ওপর। যখন অবরোধ ভয়ঙ্কর রকম ঘনীভুত আর বিপজ্জনক হয়ে উঠল, তখন উনি ওঁর সব জাহাজ বিক্রি করে দিয়ে খোলাখুলি খাদ্যদ্রব্যের ফাটকাবাজিতে মন দিলেন। রিচমণ্ড আর উইলমিংটন থেকে তাঁর নামে যে সব কেচ্ছা অ্যাটলান্টাতে ভেসে আসত, সেসব শুনে যাঁরা আগে ওঁকে নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তাঁদের মাথা লজ্জায় আর রাগে হেঁট হয়ে গেছিল। 
এত দুঃখ আর দুর্দশা সত্ত্বেও, যুদ্ধ চলাকালীন, অ্যাটলান্টার জনসংখ্যা দশ হাজার থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছিল। অবরোধ অ্যাটলান্টার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছিল। চিরকালই দক্ষিণের বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব এবং অন্যান্য বিষয়েও উপকুলবর্তি শহরগুলোর হাতেই ছিল। কিন্তু এখন বেশিরভাগ বন্দর শহরগুলো হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় বা অবরুদ্ধ হওয়ায় এই শহরই দক্ষিণের পরিত্রাতার ভূমিকা পালন করছে। যদি শেষমেশ দক্ষিণ যুদ্ধে জয়লাভ করে, তাহলে এই মধ্যাঞ্চলই হল ভরসা – তখন অ্যাটলান্টাই হয়ে উঠবে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। কনফেডারেসির অন্যান্য জায়গার মত, এই শহরের লোকেরাও অনেক দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ, ব্যাধি আর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে চলেছে। তবু এই যুদ্ধের ফলে অ্যাটলান্টার লাভই বেশি হয়েছে, লোকশানের তুলনায়। রেলপথ দিয়ে জোড়া থাকায় অ্যাটলান্টা এখন কনফেডারেসির সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের আনাগোনা, অস্ত্রশস্ত্রের আর অন্যান্য সামগ্রীর যোগান চলছে অবিরত ভাবে। 
অন্য সময় হলে, এইরকম ময়লা পোশাক আর তালিমারা জুতো পরতে হলে স্কারলেট দুঃখিতই হত, কিন্তু এখন ও ব্যাপারটাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনছে না। যে দেখতে পেলে ওর কিছ এসে যেত সে তো দেখার জন্য ওখানে নেই। অনেক বছরের মধ্যে গত দু’মাস ও খুব আনন্দে কাটিয়েছে। ও কি অ্যাশলের হৃৎস্পন্দন দ্রুৎ হওয়া অনুভব করেনি? ওর চোখের সেই হতাশ দৃষ্টি দেখেনি? ভাষায় প্রকাশিত না হলেও তার থেকে কি ওর মনের কথাটা আন্দাজ করা যায় না? অ্যাশলে ওকে ভালবাসে। এখন আর ওর মনে কোন সংশয় নেই। এই বিশ্বাস এতই আনন্দদায়ক, যে ও মেলানিকে খানিকটা করুণা করতেও ওর বাধবে না। মেলানির জন্য ওর একটু দুঃখই হচ্ছে – ওর অন্ধবিশ্বাস আর বোকামির জন্য। 
“যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে!” মনে মনে ভাবল। “যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে – তখন ____” 
কথাটা ভাবলেই সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ও মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকেঃ “বেশ তো। তখন কি হবে?” ও সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাটা বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে সব ঠিকঠাক ফয়সালা হয়ে যাবে। যদি অ্যাশলে ওকে ভালবাসে, তাহলে ও কিছুতেই মেলানির সাথে থাকতে পারবে না। 
কিন্তু বিবাহ-বিচ্ছেদ ব্যাপারটাও তো কল্পনা করা যায় না। এলেন আর জেরাল্ড – ওঁরা যেরকম গোঁড়া ক্যাথলিক – ওঁরা কিছুতেই বিবাহ-বিচ্ছিন্ন কোন ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। তার মানে হল ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগ করা! স্কারলেট অনেক ক্ষণ এটা নিয়ে ভেবে দেখল। শেষ পর্যন্ত ঠিক করল ধর্মবিশ্বাস আর অ্যাশলের মধ্যে অ্যাশলেকে গ্রহণ করাই অনেক বেশি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ব্যাপারটা কতটা কলঙ্কজনক হবে! শুধু চার্চ নয় সমাজও বিবাহবিচ্ছিন্ন মানুষকে গ্রহণ করে না! বিবাহবিচ্ছিন্ন লোককে কেউ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় না। কিন্তু অ্যাশলের জন্য ওর সেটা মেনে নেবার সাহস আছে। অ্যাশলের জন্য ও সব কিছুই করতে পারে। 
একবার যুদ্ধটা শেষ হয়ে যাক, তারপর মনে হয় ব্যাপারটার একটা ফয়সলা করে নেওয়া যাবে। অ্যাশলে যদি ওকে এতটাই ভালবাসে, ও নিশ্চয়ই একটা কিছু উপায় বের করবে। দরকার হলে স্কারলেট ওকে পরামর্শ দেবে। যত দিন যায়, স্কারলেটের মনে ওর প্রতি অ্যাশলের ভালবাসা নিয়ে আরও দৃঢ় নিশ্চয় হয়। একবার ইয়াঙ্কিদের হঠিয়ে দেওয়ার পরে অ্যাশলে নিশ্চয়ই সন্তোষজনক কোন না কোন একটা উপায় ঠিক খুঁজে বের করবে। অবশ্য ওর বক্তব্য ইয়াঙ্কিরাই ওদের ‘হঠিয়ে দেবে’। কিন্তু স্কারলেটের মনে হয় এরকম ভাবাটা নিছক বোকামি। আসলে ও এত ক্লান্ত আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত যে ওর মাথায় এই সব ভাবনা গুলো আসছে। তবে যুদ্ধে হারল কি জিতল তাতে কিছুই এসে যায় না। এখন যেটা দরকার সেটা হল যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাক আর অ্যাশলে বাড়ি ফিরে আসুক। 
তারপর মার্চ মাসে যখন প্রবল তুষারপাতে সবাই যখন মোটামুটি ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে বসে আছে তখন সেই বজ্রাঘাত হল। মেলানির চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করছে – মুখে গর্ব আর লজ্জা মাখানো হাসি – এসে ওকে বলল যে ও মা হতে চলেছে। 
“ডঃ মীড বললেন, অগাস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ও আসবে,” মেলানি বলল। “আন্দাজ করেছিলাম – কিন্তু আজ পর্যন্ত নিশ্চিত ছিলাম না। ওহ স্কারলেট, কি ভাল খবর না? ওয়েডের জন্য আমি তোমাকে কত হিংসে করেছে – তাই একটা বাচ্চা চেয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যে আমি হয়ত মা হতে পারবই না। আমি এক ডজন বাচ্চা চাই!” 
যখন মেলানি এতগুলো কথা বলল, তখন স্কারলেট চুল আঁচড়াচ্ছিল – ঘুমোতে যাবার আগে। চিরুনি চালানো মাঝপথেই থেমে গেল। 
“হে ভগবান,” ও বলে উঠল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে। তারপর ওর চোখে মেলানির শোবার ঘরের বন্ধ দরজা ভেসে উঠল। ওর বুকের মধ্যে ছুরি বসিয়ে দিল যেরকম ব্যথা হয় সেরকম একটা বেদনা অনুভব করল। যেন অ্যাশলে ওরঈ বর – আর ওর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বাচ্চা হবে – অ্যাশলের বাচ্চা! কি করে এটা হল – যখন ও ওকেই ভালবাসে – মেলানিকে নয়? 
“জানি তুমি খুব অবাক হয়ে গেছে,” মেলানি এক নিঃশ্বাসে বলে চলল, “কিন্তু কি ভাল খবর না? আমি জানিনা, স্কারলেট, অ্যাশলেকে কি ভাবে লিখব … এত লজ্জা করবে – তার চেয়ে কিছুই বলব না – ও ঠিক নজর করবে – তুমি তো জান ___” 
“হে ভগবান,” স্কারলেট ফোঁপাতে শুরু করল। ওর হাত থেকে চিরুনিটা পড়ে গেল। কোনক্রমে ড্রেসিং টেবিলের শ্বেতপাথরের হাতলটা ধরে নিজেকে সামলালো। 
“এ কি সোনা, তুমি এরকম করে তাকাচ্ছ কেন? তুমি তো জান, মা হওয়া তেমন ভয়ের ব্যাপার নয়। তুমি তো নিজেই বলেছ। আমার জন্য একটুও চিন্তা কোরো না। এত ঘাবড়ে যেও না সোনা। ডঃ মীড অবশ্য বলেছেন,” বলে লজ্জায় মুখটা লাল হয়ে গেল, “আমি তো খুবই রোগা – তবে বোধহয় সমস্যা হবে না – আচ্ছা স্কারলেট তুমি কি চার্লিকে তোমার সময় লিখেছিলে – যখন তুমি ওয়েডের আসার ব্যাপারটা বুঝতে পারলে – না তোমার মা – না না বোধহয় মিস্টার ও’হারা? হায় আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন – আমি বুঝতেই পারছি না কি করে ___” 
“চুপ কর!” স্কারলেট জোরে চেঁচিয়ে উঠল। “এক দম চুপ কর!” 
“ওহ স্কারলেট, আমি কি বোকা! দুঃখ পেওনা সোনা। হয়ত আনন্দে মানুষ সব কিছু ভুলে যায়। আমি এক মুহুর্তের জন্য যেমন চার্লসের কথাটা ভুলে গেছিলাম ____” 
“একটু চুপ করবে দয়া করে,” স্কারলেট আবার বলল। নিজেকে প্রাণপণে সামলে নেবার চেষ্টা করল। মেলানিকে ওর মনের মধ্যে কি চলছে, কিছুতেই তার আঁচ দেওয়া চলবে না। 
মেলানি, যে সবার সঙ্গে মানিয়ে চলতে ভালবাসে, নিজের নিষ্ঠুরতায় কেঁদেই ফেলল। কি করে ও স্কারলেটকে ওয়েডের কথা বলে স্কারলেটকে দুঃখ দিতে পারল – যখন চার্লির মারা যাবার কত পরে ওর জন্ম হয়েছিল! কেমন করে ও এরকম বেখেয়াল হতে পারল! 
“এসো সোনা, আমি তোমাকে রাতের পোশাক পরতে সাহায্য করি,” ও বলল। “তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিই?” 
“আমাকে একটু একা থাকতে দাও,” পাথরের মত মুখ করে স্কারলেট বলল। মেলানি কাঁদতে কাঁদতে, নিজেকে গালমন্দ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। স্কারলেট চোখ থেকে এক ফোঁটাও জল পড়ল না। কিন্তু মনে মনে একটা প্রবল হতাশা ঈর্ষা আর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা নিয়ে শুয়ে পড়ল। 
ও কিছুতেই মেলানির সঙ্গে এক ছাতের তলায় থাকতে পারবে না – যে কি না অ্যাশলের বাচ্চার মা হতে চলেছে! কাল সকালেই ও টারায় নিজের বাড়িতে চলে যাবে। মেলানির দিকে কি করে ও তাকাবে বুঝে উঠতে পারছে না। তাকালেই ও ধরা পড়ে যাবে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠল দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যে বেকফাস্ট করেই ট্রাঙ্ক গুছিয়ে নিয়ে টারার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। টেবিলে তিনজন বসে আছে – স্কারলেট চুপচাপ আর মনমরা, পিটি বিহ্বল আর মেলানি করুণ চোখে – এমন সময় একটা টেলিগ্রাম এল। 
মেলানির কাছে – অ্যাশলের চাকর মোজ় পাঠিয়েছে। 
‘আমি তো ওঁকে সব জায়গায় খুঁজেও পেলাম না। আমি কি বাড়ি ফিরে আসব?’ 
কেউ এই খবরের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারল না। তিনজন মহিলা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। সবার চোখে ভয়। স্কারলেট বাড়ি যাবার কথা ভুলে গেল। ব্রেকফাস্ট ছেড়ে ওর আচলল অ্যাশলের কর্নেলকে টেলিগ্রাম করতে চলল। কিন্তু সেখানেও একটা টেলিগ্রাম ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। 
‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, তিনদিন আগের স্কাউটিং অভিযানের সময় থেকে মেজর উইলক্সের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন কোন খবর এলে আপনাদের জানানো হবে।’ 
ভয়ানক উদ্বেগ বুকে নিয়ে বাড়ি ফেরা – আন্ট পিটি কেঁদে কেঁদে রুমাল ভিজিয়ে ফেলছেন – মেলানি সোজা হয়ে বসে, মুখ সাদা হয়ে গেছে – স্কারলেট গাড়ির এক কোনে ঘাড় ঝুঁকিয়ে পাথর হয়ে বসে। বাড়ি ফিরেই স্কারলেট কোনক্রমে দোতলায় নিজের শোবার ঘরে উঠে এসে টেবিল থেকে জপের মালা তুলে নিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে প্রার্থনা করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই মন লাগাতে পারছে না। ভয়ে মন বিবশ হয়ে গেল – ওর পাপের জন্য ঈশ্বর ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন! একজন বিবাহিত পুরুষকে ও ওর স্ত্রীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নেবার চেষ্টা করছে – তাই ঈশ্বর অ্যাশলের প্রাণ নিয়ে ওকে শাস্তি দিলেন! ও প্রার্থনা করতে চাইল, কিন্তু স্বর্গের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। চোখ থেকে জলও বেরোচ্ছে না। মনে হচ্ছে সব কান্না বুকে গিয়ে জমা হয়েছে – গরম হয়ে গেছে – কিছুতেই গলে পড়তে চাইছে না। 
ঘরের দরজা খুলে মেলানি ঢুকল। ওর পানপাতার মত মুখটা সাদা। মাথায় কালো চুলের ঢাল। শিশু অন্ধকারে হারিয়ে গেলে যেমন হয়, ওর দু’চোখ ভয়ে বিষ্ফারিত। 
“স্কারলেট,” ও দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কাল তোমাকে যা বলে ফেলেছি তার জন্য আমাকে মাফ করে দাও – এখন তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমি জানি প্রিয়তম অ্যাশলে আর বেঁচে নেই!” 
একটু পরেই ও অনুভব করল ও স্কারলেটের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ। ওর বুক বড় বড় শ্বাস নিতে গিয়ে গিয়ে ওঠা নামা করছে। দুজনেই বিছানায় শুয়ে পড়েছে আর খুব কাছাকাছি। দুজনেই কাঁদছে – স্কারলেটের গাল মেলানির গালে চাপ দিয়ে রেখেছে। এক জনের চোখের জল অন্য জনের গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে। কাঁদতে স্কারলেটের কষ্ট হচ্ছে – কিন্তু না কাঁদতে পারার থেকে কম। অ্যাশলে মরে গেছে = মরে গেছে – ও ভাবল – আমি ওকে ভালবেসে মেরে ফেলেছি! ও আবার ফুঁপিয়ে উঠল। মেলানি ওর চোখের জল থেকে কিছু একটা সান্ত্বনা পেয়ে ওকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল। 
“এইটুকুই সান্ত্বনা,” ফিসফিস করে বলল, “আমি ওর বাচ্চার মা হতে চলেছি!” 
“আর আমি!” মনে মনে ভাবল স্কারলেট কিন্তু কোন রকম ঈর্ষার ভাবনাকে মনে আসতে দিতে ভয় পেল। “আমার তো কিছুই রইল না – কিছুই না – কেবল আমার কাছে বিদায় নেবার সময় ওর চোখের অভিব্যক্তিটুকে ছাড়া!” 
প্রথম রিপোর্ট যেটা এল তাতে লেখা ছিল, “নিরুদ্দিষ্ট – সম্ভবত মৃত।” তাই ওর নাম হতাহতের তালিকায় থাকল। মেলানি কর্নেল স্লোনকে অন্তত এক ডজন টেলিগ্রাম করল। অবশেষে ওঁর কাছ থেকে একটা সহানুভূতি আর দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি এল। অ্যাশলে ওর দলবল নিয়ে স্কাউটিং অভিযানে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ইয়াঙ্কিদের এলাকায় একটা ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছিল। মোজ় ভারাক্রান্ত মনে, জীবনের পরোয়া না করে তন্নতন্ন করে অ্যাশলের দেহ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পায়নি। মেলানি খবরটা পেয়ে অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে গেল। টেলিগ্রাম করে মোজ়কে টাকা পাঠিয়ে ফিরে আসবার নির্দেশ দিল। 
যেদিন হতাহতের তালিকায় “নিরুদ্দিষ্ট – সম্ভবত বন্দী’ বলে ওর নাম বের হল, সেদিন এই শোকতপ্ত বাড়িতে আবার খানিক আশার আলো জ্বলে উঠতে দেখা গেল। মেলানি টেলিগ্রাফ অফিসে ধর্ণা দিয়ে বসে রইল – নড়ানো গেল না। প্রত্যেকটা ট্রেন থেকেই কোন খবরের আশায় বসে থাকল। ওর শরীরও ভাল নেই। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার জন্য নানারকম অপ্রীতিকর উপসর্গও দেখা দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও ডঃ মীডের বিছানা ছেড়ে ওঠার নিষেধ অমান্য করে চলে এসেছে। একটা অস্থিরতা ওকে চুপচাপ থাকতে দিচ্ছে না। রাত্রে যখন স্কারলেট শুয়ে পড়ে, তখনও মেলানিকে পাশের ঘরে হাঁটাচলা করতে শুনতে পায়। 
একদিন বিকেলে সন্ত্রস্ত আঙ্কল পিটার ওকে গাড়িতে করে শহর থেকে বাড়ি নিয়ে এল। রেট বাটলার সাথে ছিলেন। টেলিগ্রাফ অফিসে ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে। রেট বাটলার কাছেই ছিলেন। উনি উত্তেজনা দেখে সেখানে গিয়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে চলে এসেছেন। উনি ওকে পাঁজাকোলা করে ওপরে ওর শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। সবাই যখন ওর জ্ঞান ফেরানোর জন্য গরম জল, কম্বল, হুইস্কি এসব জিনিষের জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে তখন উনি শান্ত ভাবে ওকে বালিসের ওপর শুইয়ে দিলেন। 
“মিসেজ় উইল্কস,” উনি আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি মা হতে চলেছেন, তাই না?” 
যদি মেলানি সজ্ঞানে থাকত, এত অসুস্থ না হত আর মনে দুশ্চিন্তা না থাকত, তাহলে হয়ত ওঁর এই প্রশ্নে ও লজ্জায় মরেই যেত। এমনকি মেয়েদের সামনেও ওর নিজের অবস্থার কথা বলতে ও লজ্জা পেত। আর ডঃ মীডের কাছে দেখাতে যাওয়া ওর কাছে মর্মান্তিকভাবে লজ্জা্র ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে তো রেট বাটলারের মত পুরুষ মানুষের কাছ থেকে এরকম প্রশ্ন তো ওর চিন্তার বাইরে। কিন্তু এখন দুর্বল শরীরে ও শুধু মাথা নেড়ে হ্যা বলল। কিন্তু মাথা নাড়ার পরে ওর লজ্জা কেটে গেল। ওঁকে অত্যন্ত সংবেদনশীল আর চিন্তিত দেখাচ্ছিল। 
“তাহলে আপনার আরও যত্ন নেওয়া উচিত। এই ছোটাছুটি আর দুশ্চিন্তা করে কোন লাভ হবে না বরং আপনার বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। যদি অনুমতি দেন, তাহলে ওয়াশিংটনে আমার যেটুকু প্রভাব আছে সেটা খাটিয়ে মিস্টার উইলক্সের ঠিক কি হয়েছে জানার চেষ্টা করতে পারি। যদি উনি বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে ওঁর নাম ফেডারাল লিস্টে নিশ্চয়ই থাকবে। যদি না থাকে – যি হোক – অনিশ্চয়তার থেকে খারাপ আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু আপনাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আপনি নিজের যত্ন নেবেন – নাহলে আমি কিন্তু কিছু করতে পারব না।” 
“ওহ, আপনি কত দয়ালু,” মেলানি কেঁদে ফেলল। “জানিনা সবাই আপনার সম্বন্ধে এত খারাপ কথা কেন বলে?” তারপর নিজের কৌশলহীন্তা আর একজন পুরুষ মানুষের কাছের নিজের অবস্থা জানানোর জন্য ও খুব দুর্বলভাবে কাঁদতে লাগল। স্কারলেট ফ্ল্যানেলে জড়িয়ে গরমজলের বোতল ওপরে নিয়ে এসে দেখল উনি মেলানির হাতে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। 
উনি কথা রেখেছিলেন। কিভাবে উনি করতে পারলেন কেউ জানতে পারল না। জিজ্ঞেস করতেও সঙ্কোচবোধ করল। হয়ত তাহলে ওঁকে স্বীকার করে নিতে হবে যে ইয়াঙ্কিদের সাথে ওঁর যথেষ্ট দহরম মহরম আছে। এক মাসও কাটেনি, উনি যে খবর নিয়ে এলেন, তাতে সকলে প্রথমে খুব উৎফুল্লবোধ করল, কিন্তু তারপরেই আবার দুশ্চিন্তার মেঘ ওদের ঘিরে ধরল। 
অ্যাশলে মারা যায়নি! ও আহত হওয়ার পর ওকে বন্দি করে নেওয়া হয়। রেকর্ড থেকে জানা গেছে যে ওকে ইলিনয়ের রক আইল্যাণ্ডের এক বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবরটা পেয়ে প্রথমটা ওদের আনন্দ হয়েছিল যে যাক অ্যাশলে বেঁচে আছে। কিন্তু সেই প্রথম আনন্দের রেশ মিলিয়ে যাবার পরেই সবার মনে হল “রক আইল্যাণ্ড!” – সেটা তো মূর্তিমান “নরক!”উত্তরের লোকেরা যেমন অ্যাণ্ডার্সনভিলের নাম শুনে কেঁপে উঠত, তেমনি দক্ষিণের লোকদের কাছে রক আইল্যাণ্ডও সেই রকমই ভয়াবহ নাম। ওদের অনেকেই এখানে বন্দি হয়ে আছে। 
যে সময় লিঙ্কন বন্দি বিনিময়ে রাজী হচ্ছিলেন না – সেই সময় জর্জিয়ার অ্যাণ্ডার্সনভিলে ইউনিয়নের হাজার হাজার সৈন্য বন্দি ছিল। উনি ভেবেছিলেন এর ফলে এত লোকের পাহারা আর ভরনপোষণের বোঝা সামলাতে না পেরে কনফেডারেসি তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করে দিতে চাইবে। সেই সময় কনফেডারেটদের নিজেদেরই খাদ্যদ্রব্যের আর ওষুধপত্রের অপ্রতুলতার মাঝে কাটাতে হচ্ছিল। বন্দিদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার মত ওদের কিছুই ছিল না। বন্দিদেরও ওরা শুয়োরের মাংস আর শুকনো মটরশুটিই খাওয়াতে পারছিল, যেটা ওদের সৈন্যরাও খাওয়াচ্ছিল। এর ফলে বন্দিরা মশা মাধির মত মারা যাচ্ছিল – একেকদিনে প্রায় শতখানেক করে। এই খবর পেয়ে উত্তরেও কনফেডারেট বন্দিদের সাথে কঠোর আচরণ করা শুরু করা হল। সব থেকে খারাপ অবস্থা হল রক আইল্যাণ্ডের বন্দিদের। খাবারের পরিমাণ খুব অল্প। তিনজন বন্দিকে একটাই মাত্র কম্বল। এছাড়া গুঁটি বসন্ত, নিউমোনিয়া আর টাইফয়েড রোগ মহামারির আকারে দেখা দিল। জায়গাটাকে বলা হতে লাগল মড়কের জায়গা। বন্দিদের পঁচাত্তর ভাগই আর বেচে ফিরতে পারল না। 
আর অ্যাশলে কিনা এরকম একটা জঘন্ন জায়গায়! অ্যাশলে বেঁচে আছে – কিন্তু ও তো আহত আর রক আইল্যাণ্ডে – যেখানে ইলিনয়ে এই সময় প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে – সেখানে ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? রেট যখন খবর পেয়েছিলেন – তারপরে ও ক্ষতের জন্য মারা যায়নি তো? গুঁটি বসন্তে মারা যায়নি তো? না কি নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে ও এখন ভুল বকতে শুরু করেছে? হয়ত ওর গায়ে দেবার মত কম্বলও নেই! 
“ক্যাপটেন বাটলার, কোনও উপায় কি নেই – আপনার প্রভাব খাটিয়ে – অ্যাশলেকে আমাদের কোন বন্দির সাথে বিনিময় করে আনা যায় না?” মেলানি বলে উঠল। 
“মিস্টার লিঙ্কন – যিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ আর দয়ালু বলে পরিচিত – মিসেজ় বিক্সবির পাঁচ ছেলের জন্য যাঁর চোখের জল বাঁধ মানছে না – অ্যাণ্ডার্সনভিলের যে হাজার হাজার বন্দি ইয়াঙ্কিরা পচে মরছে, তাদের জন্য তাঁর অশ্রু ফুরিয়ে গেছে,” রেট বললেন। বলতে বলতে ওঁর চোখেমুখে ঘৃণার ভাব ফুটে উঠল। “সবাই যদি মরেও যায়, তাতেও ওঁর কিছু এসে যায় না। ওঁর আদেশ জারি হয়ে গেছে – কোনরকম প্রত্যর্পণ সম্ভব নয়। আমি – আমি আপনাকে আগে বলিনি, মিসেজ় উইল্কস – আপনার স্বামীর একটা মুক্তি পাবার সুযোগ হয়েছিল – কিন্তু সে সু্যোগ নিতে অস্বীকার করেছেন।” 
“না – হতে পারে না!” মেলানি আর্তনাদ করে উঠল। 
“বাস্তবিকই তাই। ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে সীমান্তে লড়াই করার জন্য কনফেডারেটের বন্দীদের মধ্যে থেকে বাছাই করা হচ্ছিল। যে সব বন্দী আনুগত্যের শপথ নিয়ে দু’বছরের জন্য ইণ্ডিয়ানদের সাথে লড়াই করতে রাজী থাকবে তাদের মুক্তি দিয়ে পশ্চিমে পাঠানো হবে। মিস্টার উইল্কস রাজী হন নি।” 
“কি করে ও এটা করতে পারল?” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “শপথ নিয়ে যখন মুক্তি পেয়ে যেত, তখন ও সেনাবাহিনী পরিত্যাগ করে অনায়াসে বাড়ি ফিরে আসতে পারত!” 
মেলানি ওর দিকে রোষকষায়িত চোখে তাকাল। 
“এ কথা তুমি কেমন করে বলতে পারলে? ওই অশুভ শপথ নিয়ে কনফেডারেসির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা আবার তারপর ইয়াঙ্কিদের কাছে দেওয়া কথার খেলাপ করা! ও কখনো করতে পারবে না! এরকম কিছু করার থেকে রক আইল্যাণ্ডে বন্দী অবস্থায় ওর যদি মৃত্যুও হয় সেটাই শ্রেয়। বন্দী অবস্থায় ওর মৃত্যু হয়েছে জানতে পারলে আমার গর্ব হবে! ওই ঘৃণ্য কাজ করলে আমি জীবনে ওর মুখ দেখতাম না। কক্ষনো না! রাজী না হয়ে ও ঠিকই করেছে!” 
স্কারলেট যখন রেটকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছিল, তখন ও খানিকটা ক্রুদ্ধভাবে বলল, “যদি আপনি ওই জায়গায় থাকতেন, তাহলে কি আপনি প্রাণে বাঁচবার জন্য ইয়াঙ্কিদের দলে নাম লিখিয়ে পরে পালিয়ে আসতেন না?” 
“নিশ্চয়ই!” রেট বললেন। ওঁর গোঁপের তলা থেকে সাদা দাঁত দেখা গেল। 
“তাহলে অ্যাশলে কেন সেটা করল না?” 
“কারণ ও একজন ভদ্রলোক,” রেট বললেন। স্কারলেটের মনে হল ওই সম্ভ্রমসূচক কথাটা দিয়ে কি করে এতটা ঘৃণা আর অবজ্ঞা ব্যক্ত করা যায়! 
(দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত) 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *