আনিসুজ্জামান’এর গল্প : দৃষ্টি

পঁচিশ বছর কেরাণীগিরি করলে চোখের আর কি শক্তি থাকে। তাছাড়া, চোখ খারাপ অনেক দিনের। চশমা নিয়েছিলেন সেই যখন ক্লাস সেভেনে পড়তেন। সেদিন রাত্রে ঝড়ের সময় জানালার ছিটকিনি খুলে কপাটটা ধাক্কা দিল টেবিলটায় । টেবিলের ওপরে রাখা মোটা লেন্‌সের চশমাটা টেবিল থেকে পড়ে গেল নীচে। খান দুই ইট দিয়ে তক্তপোষটা উঁচু করা ছিল । চশমাটা সূতা দিয়ে বেঁধে পরা চলত : কিন্তু দৌড়ে আসতে গিয়ে সালেহা পা চাপিয়ে দিল তার ওপর।
আরেকটা যে কিনবেন, সে ভরসা সাদত সাহেবের আছে। তবে কবে, সে প্রশ্ন অবান্তর। কারণ, পেনসনের টাকা ঠিকমত পাচ্ছেন না। আসাদ যা মাইনে পায় তাতে সংসার কোনমতে চলে। সালেহার বিয়ে দেওয়া দরকার : কিন্তু এ অবস্থায় সম্ভব হচ্ছে না। আসাদের বিয়ে হয়েছে অবশ্য : আল্লায় দিলে একটা বাচ্চাও হবে এবার। | চশমাটা ভেঙ্গে যাওয়ায় বড় অসুবিধায় পড়েছেন সাদত সাহেব। চোখ না থাকলে মানুষের আর যেন কিছুই থাকে না। ঘর ছাড়া কোথাও বেরোন না। — তাও ঘরের জিনিষগুলো যদি অস্পষ্ট হয়ে যায় তাহলে মানুষ বাঁচে কি করে! বোবা কথা না বলতে পারলেও দেখতে তো পায় তিনি ভাবেন— আবার ভাবেন, চোখে দেখেই বা কি হয়, যদি কথা না বলতে পারা যায়! চিন্তাগুলোকে ঠেলে দিয়ে সাদত সাহেব হাঁকেন, সালেহা, একটা পান দিয়ে যা তো মা। 
পান নিয়ে আসেন হাসিনা–আসাদের বৌ। পান নেন’ শুনেই বুঝতে পারেন সাদত সাহেব। বলেন, সালেহা কোথায়? 
‘আছে ঘরে। 
‘তাকে দিয়ে পাঠালেই পারতে। তুমি এ সময়ে কম নড়াচড়া করো মা। 
স্নেহের এ অভিযোগ শুনে হাসিনা হাসে। ভারী ভাল মানুষ তার শ্বশুরটি , সে জানে কি আশায় উজ্জীবিত হয়ে ও কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে বা শ্বশুরের মুখ থেকে। অন্য কথায় আসে হাসিনা। বলে, ‘চশমাটা আপনি কিনে নিলেই পারতেন। কিছু টাকা ঘরে ছিল— আর কিছু ধার করে সামনে মাসে তো শোধ দেওয়া যেত।’ 
সাদত সাহেব হেসে উত্তর দেন— ‘ এ সময়ে ঘরে টাকা পয়সা কিছু রাখা দরকার । পুরোনো লোকের অনেক সেবা করলে। মা— এবার নতুন লোকটির যত্ন নিতে হবে।’ হাসিনা চলে যায়। 
সালেহা এল এবার দৌড়ে। বললে, ‘আব্বা, কি হয়েছে জান?” 
“কি মা?’ 
‘মেডিক্যাল হোষ্টেলে রাষ্ট্রভাষার দাবীতে ছাত্রেরা বিক্ষোভ করছিল । পুলিশ গুলি চালিয়েছে। 
‘গুলি!’ সাদত সাহেবের কণ্ঠে অবিশ্বাসের সুর। 
‘হ্যাঁ। কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে, লাঠি চালিয়ে গ্রেপ্তার করেও কিছু হয় নি। শেষে গুলি চালিয়েছে। ছ জন মারা গেছে। 
‘ছ জন!’ 
‘ছ জন মারা গেছে, আরো আহত হয়েছে।’ 
‘তোকে কে বললে?’ 
‘বাচ্চু। ও এতক্ষণ ছিল সেখানে। গুলি চালাবার পর চলে এসেছে।’ 
“কি আশ্চর্য্য!” সাদত সাহেব এতক্ষণে তার চেতনায় ফিরে আসেন। বৃটিশ আমল এর চেয়ে খারাপ কি ছিল! এ কয় বছরে কম জায়গায় তো আর গুলি চলল না। 
‘আমাদের কি বোবা হয়ে থাকতে হবে নাকি!’ সালেহার গলার স্বর ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে। সে ঘর ছেড়ে চলে যায়। 
রুদ্ধ ঘরে সাদত সাহেব ভাবতে থাকেন, মানুষ থাকার অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে যেন দুনিয়াটা, আরো নানান কথা। 
ভাবনার মাঝে আসাদ এসে পড়ে। আবার তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘সত্যিই ছ জন মারা গেছে?’ 
‘হ্যাঁ।’ আসাদ অবসন্নভাবে বলে । বৃদ্ধ আবার চিন্তায় ডুবে যান। 
ঘুম থেকে উঠেই সাদত সাহেব খোঁজ নেন আসাদের। হাসিনা বলে, ‘অফিসে চলে গেছেন।’ 
‘এত সকালে!’ 
‘সকাল আর কোথায়! আজ শুক্রবার, সকালে অফিস।’ 
সত্যিই, সকাল আর কোথায়! উঠতে দেরী হয়ে গেছে তার। রাইফেলধারী সৈন্যদের ঘন ঘন পদশব্দ কাল অনেক রাত জেগে শুনেছেন তিনি। চা নিয়ে এসে সালেহা বলে, “ভাইয়াদের অফিসে আজ ধর্মঘট হতে পারে। ভাইয়া বললে যদ্দুর সম্ভব চেষ্টা করবে। কিন্তু ভাইয়ার যদি চাকরী চলে যায়, আব্বা।” গভীর আশায় ভর করে কথা বলতে গিয়েও সালেহার মনে আসে প্রচ্ছন্ন হতাশা। 
সাদত সাহেব অন্যমনস্কভাবে বলেন, ‘না চাকরী যাবে না।’ তবু কথাটা তাকে ভাবিত করে তোলে। ভাবনার কি আর শেষ আছে মানুষের!  
পথ ঘাট নিস্তব্ধ। গাড়ী ঘোড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না—আজ সব বন্ধ । চারজনের বেশী লোক এক সাথে চলছে না। সব তাই কেমন মৃত্যুর মত স্তব্ধ। কিন্তু মৃত্যুর মত শান্ত নয়; একটা চাপা উত্তেজনায় কাঁপছে সারাটা শহর। 
মৃত্যুর কথায় নিজের মৃত্যুকে মনে পড়ে যায় বৃদ্ধের । তিনি মরে যাবেন, তারপর কে থাকবে? হয়ত আসাদও যাবে। কে রইবে তখন? আসাদের ছেলে মেয়েরা? নিজেকেই উত্তর দেন। নিশ্চিন্তও হন কিছুটা, খানিকটা ভরসাও খুঁজে পান সে অনাগত উত্তরাধিকারের চিন্তায় যেন। তার সজীব রক্তের উষ্ণতায় বৃদ্ধের হিম হয়ে আসা বুকটাও উষ্ণ হয়ে উঠে। 
কে যেন কড়া নাড়ে। সালেহাকে ডেকে দেখতে বলেন তিনি। দরজা খোলার আওয়াজ পান। সালেহা বলছে, “কি খবর হালিম ভাই?’ 
উত্তরটা আর শুনতে পান না তিনি। হালিম ছেলেটা আসাদের সাথে চাকরী করে, কাছেই থাকে। কি ব্যাপার! 
কয়েকজনের পদশব্দ শুনতে পাওয়া যায় পাশের ঘরে। হাসিনা আর সালেহা ডুকরে কেঁদে ওঠে। সাদত সাহেব বলেন, “কি হল সালেহা– হাসিনা।’ 
তক্তপোষ থেকে পা নামিয়ে চটি পায়ে দেন। চশমা নেই, এগুতে পারছেন না। 
সালেহা এ ঘরে আসে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ভাইয়ার গুলি লেগেছে– মারা গেছে।’ এবার থেমে থেমে হালিমের গলা শোনা যায় : ‘অফিস স্ট্রাইক হয়ে প্রোসসেশন বেরিয়েছিল। পুলিশ গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় ও । হাসপাতালে দিলে লাশ যদি না পাওয়া যায়, সেই ভেবে ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে নিয়ে এসেছি।’ 
সালেহা সাদত সাহেবকে ধরে এ ঘরে নিয়ে আসে। সে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে । হাসিনা আছড়ে পড়েছে মৃতদেহের ওপর। কাঁদছে। 
তার পেটের বাচ্চাটা বুঝি হঠাৎ নড়ে উঠল ।… 
সাদত সাহেব এতক্ষণে কাঁদতে থাকেন। মৃতদেহের ওপর হাত বুলাতে থাকেন তিনি। দেখবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন। ‘আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি নে। আসাদ কোথায় রে। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি নে।’ কিন্তু দৃষ্টি কেবল ঝাঁপসাই হয়ে যাচ্ছে তার—অস্পষ্টতা বেড়েই চলেছে। মনে হচ্ছে এ অস্পষ্টতা আর কোন দিন দূর হবে না, আর কোনদিন দেখতে পাবেন না। কোনদিন না? হাসিনার বাচ্চাটাকেও কি দেখতে পাবেন না? 
হাসিনার না হওয়া বাচ্চার চেহারাটা মনের ভেতর আঁকতে থাকেন, দেখতে চান প্রাণপণে । কান্নাটা থেমে আসে আস্তে আস্তে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *