রমাপদ চৌধুরীর গল্প : এক সের বেগুন

বীরভূম জেলার রায়মঙ্গল কেন্দ্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী জননেতা আবুল হোসেন হায়াত সাহেব কেন মাত্র সতেরোটি ভোট পেয়ে নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন এবং তাঁর ভোট-বাক্সের উপর কেন একটি হাস্যকর উপহার পাওয়া যায়, সে রহস্য সম্প্রতি উঘাটিত হয়েছে।

প্রকৃত পক্ষে ওই উপহার-সামগ্রীটির মধ্যেই তাঁর পরাজয়ের কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে।

হায়াত সাহেব সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন এ সংবাদ পাঠ করে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরাই স্তম্ভিত হয়েছেন, যদিও রাজনৈতিক দলবিশেষ ইতিমধ্যে প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে হায়াত সাহেবের পরাজয় ও তাঁদের প্রার্থীর আশাতীত জয়লাভকে তাঁদের দলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার নিদর্শন বলে প্রচার করতে শুরু করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে অবশ্য এ ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে, নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর জয়লাভের পিছনে রাজনৈতিক দলের কিংবা দলীয় প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই কার্যকরী হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জয়ী প্রার্থী আব্দুল করিম সাহেবের জনপ্রিয়তাকে ইতিপূর্বে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়েছিলো এবং ঘোড়দৌঁড়ের ভাষায় যাকে আপসেট বলা চলে, তেমনই একটি নির্বাচনের প্রকৃত ঘটনা জানবার জন্য এবং এই নির্বাচনী ফলাফলকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য এই নির্বাচন-কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আমি যখন স্বয়ং করিম সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, তখন তিনি কোনো উল্লাস প্রকাশ করা দুরের কথা, স্পষ্ট স্বীকার করেন যে, এই ফলাফলকে তিনি এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না।

স্মরণ থাকতে পারে, হায়াত সাহেব এ অঞ্চলের অক্লান্ত কর্মী এবং একনিষ্ঠ সমাজসেবী হিসেবে দীর্ঘ বাইশ বছর যাবৎ অপ্রতিদ্বন্দ্বী জননেতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এবং গত দুটি নির্বাচনেই তিনি বিপুল ভোটাধিক্যে বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপে বিন্দুমাত্র ভ্রান্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি, বা তাঁর নির্বাচনকেন্দ্রের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখতে পারেননি এমন সন্দেহও করা সম্ভব নয়। কারণ বিধানসভার অধিবেশন-কালীন সময়টুকু ব্যতীত সারা বৎসরই তিনি স্বগ্রামে বসবাস করেন এবং আপন চেষ্টায় তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় ও একটি মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তা ছাড়া বিধানসভাতেও তাঁর নির্ভীক ও যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতায় গ্রামবাসীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। স্থানীয় ইস্কুলের জনৈক শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই বিষয়ে আলোচনা করে জানতে পেরেছি যে, হায়াত সাহেব যে মাঝে মাঝেই স্বদলের গ্রামবিরোধী ভূমিকাকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে দলীয় প্রধানদের বিরাগভাজন হয়েছেন। তাও এ অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে অজ্ঞাত নেই। তৎসত্ত্বেও কেন যে হায়াত সাহেব এভাবে পরাজিত হলেন তার কার্যকারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহীত হয়েছে। | অপ্রতিদ্বন্দ্বী কোনো কোনো জননেতা এই সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, এমন কি দুই-একজনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে এ খবরও জানা গেছে। কিন্তু হায়াত সাহেবের মতো জনপ্রিয় প্রার্থীর মাত্র সতেরোটি ভোট পাওয়ার সংবাদ বোধ করি সমগ্র নির্বাচনের ইতিহাসেই একটি দুর্বোধ্য রহস্য।

গত পরশুর সংবাদপত্রে রায়মঙ্গল কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এবং সে ফলাফলের তালিকায় দেখা গেছে, করিম সাহেব সতেরো হাজার তিন শো বাষট্টিটি ভোট পেয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীধর বসু পেয়েছেন দু হাজার একশো একান্নটি ভোট, এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও হায়াত সাহেবের বাক্সে মোট সতেরোটি ভোট পড়েছে। গত কালের বিভিন্ন সংবাদপত্রেও এ বিষয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা প্রকাশিত হয়েছে, এবং হায়াত সাহেবের পরাজয়কে অনেকে দলীয় জনপ্রিয়তা হ্রাসের সুপষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করেছেন।

কিন্তু এ রহস্যের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে এসে জানা গেল যে, হায়াত সাহেবের বাক্সে কেবলমাত্র সতেরোটি ভোটপত্রই পাওয়া যায়নি, এ ছাড়াও আরেকটি দ্রব্য পাওয়া যায়। অফিসার নাকি স্থানীয় এক ভদ্রলোকের কাছে গল্পচ্ছলে জানান যে, হায়াত সাহেবের বাক্সের উপরে কোনো ভোটদাতা একটি বেগুন রেখে যান। উক্ত ভোটকেন্দ্রের উভয় রাজনৈতিক দলের এজেন্টরাই এ কাহিনী সমর্থন করেন, এবং পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে যে, কয়েক দিন পূর্বে কোনো একটি পোলিং বুথে ভোট-বাক্সের উপরে কেউ একটি বেগুন রেখে যায়, এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। অবশ্য সে সংবাদে কোন প্রার্থীর বাক্সের উপরে বেগুনটি পাওয়া যায় উল্লেখ করা হয়নি। এবং বলা বাহুল্য, সে সময়ে খবরটি পাঠ করে সকলেই কৌতুকবোধ করেছিলেন।

আপাতদৃষ্টিতে উক্ত সংবাদটি কৌতুককর মনে হলেও ঘটনাটির পিছনে কি গভীর তাৎপর্য ও করুণ কাহিনী লুকিয়ে আছে তার কিছুটা হদিস বোধ হয় পাওয়া গেছে।

রায়মঙ্গল কেন্দ্রের ভোটার-সংখ্যা কিঞ্চিদধিক ষাট হাজার। তন্মধ্যে তেরো হাজার মুসলমান ও সাতচল্লিশ হাজার হিন্দু। সুতরাং কোনো কোনো মহলে যে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে, রায়মঙ্গল কেন্দ্রের নির্বাচনে এবার সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকট হয়েছে তা সত্য নয়। কারণ সাম্প্রদায়িক কারণে করিম সাহেব তেরো হাজার ভোট পেয়ে থাকলেও স্বীকার করতে হবে, অন্তত চার হাজার হিন্দুর ভোটও তিনি পেয়েছেন। অথচ সাম্প্রদায়িক মনোভাব থাকলে স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীধর বসু হিন্দুদের ভোট অধিক সংখ্যায় পেতেন, এবং মুসলমানদের ভোট পেতেন হায়াত সাহেব। কারণ হায়াত সাহেবের পিতা এতদঞ্চলের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মৌলবী ছিলেন এবং দরিদ্র মুসলমান চাষীদের উন্নতির জন্য হায়াত সাহেব প্রাণপাত করেছেন বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। অন্য পক্ষে করিম সাহেব কিঞ্চিৎ সাহেবী ভাবাপন্ন, দরিদ্র মুসলমান চাষীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই তিনি রাখতে পারেননি, কারণ ব্যারিস্টারী পেশায় নিযুক্ত থাকার ফলে তাঁকে অধিকাংশ সময় কলকাতায় থাকতে হয়। সুতরাং এই বিস্ময়কর ঘটনাটির জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে অকারণে দায়ী করা চলে না।

আরেকটি মহলের গবেষণায় প্রকাশ, জমিদারি উচ্ছেদের পক্ষে হায়াত সাহেব যে ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতাদি দিয়েছিলেন, তার ফলেই নাকি তিনি সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারগুলির ভোট থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং করিম সাহেব প্রাক-নির্বাচন সফরে ক্যানাল ট্যাক্সের বিরোধিতা করে যেসব বক্তৃতা দেন, তা গ্রামবাসীদের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু সংবাদটি নিয়ে এবং সেটেলমেন্ট আপিসের নথিপত্র ঘেটে দেখা গেছে যে, রায়মঙ্গল কেন্দ্রের মাত্র সাত শো পরিবার জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় পড়েন এবং আইন-অন্তর্ভূক্ত একুশ হাজার বিঘা জমির মালিক পাঁচ-ছয় শো জনের অধিক নয়। সুতরাং নীতিগত কারণে হায়াত সাহেব সাত শো পরিবারের পরিবার-পিছু পাঁচজন করে ধরলে সাড়ে তিন হাজার ভোট হারাতে পারেন, এবং করিম সাহেবও পাঁচ-ছয় শো পরিবার থেকে ক্যানাল ট্যাক্স-বিরোধী বক্তৃতার দৌলতে বড় জোর আড়াই হাজার বা তিন হাজার ভোট পেতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত ক্ষেত্রে করিম সাহেব পেয়েছেন সতেরো হাজারেরও বেশী ভোট, এবং হায়াত সাহেব পেয়েছেন মাত্র সতেরোটি। অথচ গত নির্বাচনে হায়াত সাহেব তেইশ হাজার ভোট পেয়েছিলেন।

 অবশ্য হায়াত সাহেব মাত্র সতেরোটি ভোটই পাননি, উপরন্তু তার বাক্সের উপরে পাওয়া গেছে একটি বেগুন। এই বেগুনটি অনেকের কাছে কৌতুককর মনে হলেও আমার মনে হয়, হায়াত সাহেবের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ পাওয়া যাবে এই রহস্যের সমাধান করতে পারলেই।

কলকাতা শহরে বসে এই ঘটনাটির তাৎপর্য অনুধাবন করা অবশ্য আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এবং পরীক্ষার্থী ছেলেমেয়েরা শূন্যের পরিবর্তে যেমন ‘রসগোল্লা’ শব্দটি ব্যবহার করে, তেমনই একটি বেগুন দান করে কোনো ভোটার হায়াত সাহেবের বাক্সকে শূন্য করবার পক্ষপাতী ছিলো বা প্রতিপক্ষেরই কেউ বেগুন দিয়ে কোনো তুকতাক করতে চেয়েছিলো এমন মনে করা যেতে পারতো। এমন কি হায়াত সাহেব নিজেও এই রহস্যটির এই ধরনের ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। তিনি আমাকে জানান যে, রায়মঙ্গলের গ্রামবাসীরা অত্যন্ত দরিদ্র এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন; তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও উন্নতির জন্য সরকার কোনো চেষ্টাই করেননি, সুতরাং তাদের মধ্যে কারও কারও তুকতাকে বিশ্বাস থাকা অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য ব্যাপারটার অন্য ব্যাখ্যাটাও তিনি আমাকে জানান। এ-হেন পরাজয় সত্ত্বেও সহাস কৌতুকে বলেন যে, কোনো চাষী ভোটার হয়তো বেগুনটি তাঁকে খাবার জন্যে দান করে গেছে, বা ভোট দিতে এসে ভুলক্রমে বাক্সের উপর নামিয়ে রেখে গেছে।

এই সূত্রে কথোপকথন করতে করতে তিনি নির্বাচনের কথা ভুলে বেগুন সম্পর্কে আলোচনা শুরু করে দেন, এবং জানান যে, তাঁর বাড়ির উঠনেও কয়েকটি বেগুনেচারা ছিলো এবং তাতে এক সের ওজনের বেগুনও ধরতো। হায়াত সাহেব দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিধানসভায় যেতে হতো এবং দীর্ঘদিন কলুটোলার একটি হোটেলে বাস করতে হতো। সে কারণে বেগুনের চারাগলি নষ্ট হয়ে যায় এবং ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি সেগুলির পরিচর্যা করতে পারতেন না।

এ কথা জানিয়ে তিনি মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

| বলেন যে, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তাঁর উপকারই হয়েছে, কারণ এখন আর তাঁকে কলুটোলার নোংরা হোটেলে বাস করতে হবে না, পরম আনন্দে তিনি তাঁর ক্ষুদ্র ভিটাবাড়ির সামনের বাগানে বেগুনের পরিচর্যা করতে পারবেন।

হায়াত সাহেবের এই বেগুনপ্রীতির বর্ণনা শুনতে শুনতে আমি যখন সন্দিহান হয়ে উঠছিলাম, এবং এর সঙ্গে ভোট-বাক্সের কোনো সম্পর্ক আছে কি না মনে মনে অনুসন্ধান করছিলাম, তখন তিনি একটি বিস্ময়কর খবর প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, প্রায় চার বৎসর পূর্বে তিনি একবার বিধানসভার অধিবেশন সমাপ্তির পর গ্রামে ফিরছিলেন, এমন সময় গ্রামের হাটে একজনকে ঝুড়ি-ভরতি বড় বড় বেগুন বেচতে দেখে এত দূর প্রলুব্ধ হন যে, সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং কিছু বেগুন কিনতে তাঁর ইচ্ছে হওয়ায়, বেগুনওয়ালা এক সের বেগুনের জন্যে তিন আনা পয়সা চায় এবং হায়াত সাহেব কোনো দরদস্তুর না করে তিন আনা পয়সা দিয়েই বেগুনগুলি নিয়ে চলে আসেন। ঘটনাটির উল্লেখ করে হায়াত সাহেব হাসতে হাসতে আমাকে জানান যে, সে রাত্রে পেঁয়াজ সহযোগে তিনি শুধু বেগুনপোড়া দিয়েই ভাত খেয়েছিলেন।

এই সূত্রেই তাঁর হঠাৎ স্মরণ হয় যে, তিনি যখন বেগুন কিনছিলেন, তখন পিছন থেকে কে যেন মন্তব্য করে, হায়াত সাহেবের দেখি আজকাল এক সের বেগুন না হলে চলে না।।

এই স্থানীয় অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে রায়মঙ্গল কেন্দ্রের নির্বাচনী সাফল্যের বিশ্লেষণের মধ্যেই হায়াত সাহেবের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ এবং ভোট-বাক্সে রাখা বেগুনটির সব রহস্য, আমার ধারণা, সম্পূর্ণ উঘাটিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা, জমিদারি উচ্ছেদ, ক্যানাল ট্যাক্স বহুজনে বহু মতামত হয়তো প্রচার করবেন, রাজনৈতিক দলগুলি হয়তো এই নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে কোনো দলবিশেষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি বা হ্রাসের হদিস পাবেন, কিন্তু দর দস্তুর না করে তিন আনা পয়সায় এক সের বেগুন কেনার ফলে যে একজন জনপ্রিয় জননেতা গদিচ্যূত হতে পারেন, এ খবর অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য।

এই তুচ্ছ ঘটনাটিকে আমি ইতিপর্বে বিস্ময়কর বলেছি। তার কারণ হায়াত সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ফেরার পথে সেই গ্রামেরই এক দরিদ্র মুসলমান চাষীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তাকে আমি স্টেশনের পথটা দেখিয়ে দেবার জন্যে অনুরোধ করি। পরিবর্তে সে প্রশ্ন করে জানতে চায়, আমি গ্রামে কার বাড়ি গিয়েছিলাম। উত্তর শুনে চাষীটি উপহাসের হাসি হাসে এবং বলে যে, সে আমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলো যে, আমি নবাবজাদার বাড়ি গিয়েছিলাম। ‘নবাবজাদা’ বলতে সে কাকে বোঝাতে চায় জিজ্ঞাসা করায় লোকটি হেসে বলে যে, গ্রামে নবাবজাদা তো একজনই আছেন। ইতিমধ্যে আরো দু-চারজন লোক এসে জড় হয় এবং হাসতে হাসতে বলে যে, এখন তারা হায়াত সাহেবকেই নবাবজাদা সম্বোধন করে। এবং তাঁর পরাজয়ে যে তারা খুশী হয়েছে তাও প্রকাশ করে।

আমি বিস্মিত হয়ে তাদের উল্লাসের কারণ জানতে চাই। তখন একজন সহাস্যে বলে যে, হায়াত সাহেব মানুষটি ভালো ছিলেন বলেই তারা তাঁকে মাথায় করে রেখেছিলো। কিন্তু বিধানসভার সদস্য হয়েই তিনি নাকি ধরাকে সরা ভাবতে শুরু করেন! আমি ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে বলি যে, তাদের ধারণা ভুল, হায়াত সাহেব যেমন ছিলেন তেমনই আছেন। বলা বাহুল্য, তাদের প্রকৃত মনোভাব জানার জন্যই আমি হায়াত সাহেবের পক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করি। কিন্তু এর ফলে লোকগুলি রুষ্ট হয়ে ওঠে এবং জানায় যে, হায়াত সাহেবের কথা বলতেও তাদের লজ্জা হয়। তিনি নাকি হাটে বেগুন কিনতে গিয়ে দরদস্তুর করেন না। তিন আনাই দিয়ে দেন। এবং যিনি বাড়ির গাছের বেগুন খেতেন তাঁর নাকি বর্তমানে এক সের বেগুন না নিলে চলে না।

এর পর আমি সমগ্র অঞ্চল সফর করে হায়াত সাহেব সম্পর্কে জনসাধারণের প্রকৃত অভিমত জানবার চেষ্টা করি, এবং জানতে পারি যে শুধুমাত্র এক সের বেগুনের দরদস্তুর না করে কেনার সময় যারা তাঁর আশেপাশে ছিলো তারা ক্রমে ক্রমে হায়াত সাহেবের পরিষ্কার জামাকাপড়ের দিকেও দৃষ্টি দিতে শুরু করে। এইভাবে নানান গুজব চতুর্দিকের গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে দিতে আরম্ভ করে। এবং অনেকের এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তাঁর সম্পর্কে ধারণা হয় যে বিধানসভার সদস্য হওয়ার ফলে তিনি নিশ্চয় খুব বড়লোক হয়ে গেছেন। অন্যথায় হায়াত সাহেবের মতো একজন দরিদ্র জননেতা এক সের বেগুন কিনবেন কেন, এবং নিলেও দরদস্তুর না করে তিন আনা দাম কেন দেবেন?

কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো গুজব রটনা শুরু হলে শেষ পর্যন্ত তা কত সুদরপ্রসারী ক্ষতিকর হতে পারে পরবর্তী ঘটনাটি থেকেই তা প্রমাণ হবে। হায়াত সাহেব যখন বৎসর দুই আগে প্রাণপণ চেষ্টায় একটি মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা করেন সরকার ও সাধারণের সাহায্য নিয়ে, তখন সকলেই বলতে শুরু করে যে তিনি এখান থেকেই দু-পয়সা রোজগার করেছেন। কিন্তু তাঁর জনকল্যাণ প্রচেষ্টার সম্পূর্ণ কদর্থ করা হয় বৎসরখানেক পূর্বে তিনি যখন রায়মঙ্গলে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে অগ্রণী হন। কারণ, এ অঞ্চলের অধিবাসীরা আরেকটি বিদ্যালয়ের পক্ষপাতী ছিলো বটে, কিন্তু বালিকাদের জন্য নয়।

এ পর্যন্ত হায়াত সাহেবের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের নানা কাল্পনিক অভিযোগ থাকলেও তাঁর চরিত্রের উপর কেউ কোনো কটাক্ষ করেনি। কিন্তু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা শুনে সকলেই রুষ্ট হয় এবং প্রশ্ন করে যে হায়াত সাহেবের দৃষ্টি হঠাৎ বালিকাদের উপর পড়েছে কেন! ফলে তাদের সুপ্ত আক্রোশ পত্রে-পুষ্পে পল্লবিত হতে শুরু করে এবং হায়াত সাহেবের মতো জননেতাও অল্প দিনের মধ্যেই লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন হন। এ কারণেই সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ যদিও তাঁর মতো অক্লান্ত কর্মী ও একনিষ্ঠ দেশসেবকের শোচনীয় পরাজয়ে স্তম্ভিত ও বিস্মিত হয়েছে তথাপি রায়মঙ্গল কেন্দ্রের জনসাধারণ এই পরাজয়ের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে সমর্থ হয়নি।

১৩৬৯

6 thoughts on “রমাপদ চৌধুরীর গল্প : এক সের বেগুন

  • August 17, 2018 at 4:19 am
    Permalink

    প্রতিবেদনধর্মী গল্প। রমাপদ চৌধুরীর এই ধরনের শৈলীর গল্প আগে পড়িনি।

    Reply
  • August 17, 2018 at 1:06 pm
    Permalink

    ভালো লাগেনি।

    Reply
  • August 17, 2018 at 5:10 pm
    Permalink

    বেশ সরস গল্প।এর পেছনের কৌতুকটা আসল ও সময় উপযো। ভালো লাগলো।

    Reply
  • August 19, 2018 at 5:04 pm
    Permalink

    ভাল লাগল গল্পটি খুব।

    Reply
  • August 21, 2018 at 11:11 am
    Permalink

    চমৎকার

    Reply
  • January 23, 2019 at 2:48 am
    Permalink

    রমাপদ চৌধুরীর গল্পগুলো বেশ ভাল লাগে। কিন্তু এটা ঠিক গল্প মনে হলোনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *