দেবদ্যুতি রায়ের বই নক্ষত্রবেলা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া: স্মৃতি ভদ্র

‘একটা নিঃসঙ্গ ঘাসফুল বা একজোড়া প্রেমিক শালিকের গায়ে পড়ুক চনমনে দু’ফোটা বৃষ্টিজল। দূরের নক্ষত্রের মতো বেঁচে থাকা মানুষগুলো কাছাকাছি আসুক, ভালবাসায় বাঁচুক।’
বইয়ের ভূমিকার এই কথাগুলোই প্রতিফলিত হয়েছে বইটির প্রতিটি গল্পে। লেখক দেবদ্যুতি রায়ের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘নক্ষত্রবেলা’র কথা বলছি। আমাদের চারপাশের বহমান জীবন প্রতিনিয়ত ইঙ্গিত রেখে যায় গল্পের, অনুসঙ্গ রেখে যায় আখ্যানের। সেসব ইঙ্গিত বা অনুসঙ্গ কারো কারো মনগহনে জলছাপ ফেলে গভীর অনুভবের। আর সেইসব গভীর অনুভবই গল্প হয়ে উঠেছে লেখক দেবদ্যুতি রায়ের বয়ানে।
‘নক্ষত্রবেলা’ বইটিতে রয়েছে বারোটি ছোটগল্প। প্রতিটি গল্পই আমাদের চেনা পরিচিত জীবনের গল্প। কোনো গল্পে উঠে এসেছে বাসন্তীরঙা বিকেলের গল্প। আবার কোনো গল্পে লেখক সযত্নে বুনে গেছেন ছন্নছাড়া এক বাড়ির গল্প। সেসব গল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মানবিক বোধের এক অপূর্ব চিত্র। জীবনবোধের অনন্য বয়ানে সেসব গল্প পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে ‘ এই গল্প তো আমার গল্প!’
তাই ‘নক্ষত্রবেলা’র প্রতিটি গল্পকেই মানব জীবনের অসম্পাদিত চিত্র বলা যায় অকপটে।
‘নয়নতারাকে আমার চোখ ভরে দেখতে ইচ্ছে করে। সব সময়ের মতো। সেই যে যেদিন প্রথম আমাদের পরিচয় হলো এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে, সেদিনকার মতো বিস্ময় নিয়ে আজও ওকে দেখার প্রবল বাসনা কাজ করে আমার।’ বইয়ের প্রথম গল্প ‘একটি প্রেম কিংবা অপ্রেমের গল্প’ এ আমরা ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুর থেকে লেখকের গল্প বলার মুন্সিয়ানায় অবলীলায় পৌঁছে যায় একটি বাসন্তীরঙা বিকেলে। যে বিকেলে কিছু জটিল মানবিক সম্পর্ক ছড়িয়ে দেয় অপরাজিতার স্নিগ্ধতা। পড়তে পড়তে পাঠক সকল জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে খুঁজে পায় এক সরল আপত্য জীবনের গল্প। 
উত্তরপুরুষ, কলকেফুলি মেয়ে, যে জীবন অন্ধকারের, অচেনা মুখ, এইসব ছাইগন্ধী দিন, বেসাতি, স্নেহ, দেখা, শারদীয়া, কোথাও একটা ফুল থেকে যায়, এলিজি-১৯৭১ এই বইয়ের বাকী গল্পগুলোও আমাদের জীবনের গল্প।
এই বইয়ের দু’টি গল্পের কথা আলাদা করে বলতে চাই। ‘কোথাও একটা ফুল থেকে যায়’ আর ‘ এলিজি-৭১’। একটি গল্পে এসেছে মানব সম্পর্কের টানাপোড়ন। আরেকটি গল্প আমাদের গর্বের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। 
‘তার বুকের ভেতর এই অভিমানী মেয়েটার জন্য ভুলে যাওয়া ভালবাসার বাস্পটুকু কোত্থেকে যেন আবার বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে। মনে হয় যেন ও নিজের চরমতম অপ্রাপ্তিকে পূর্ণ হতে দেখছে নিজের পরম প্রিয়জনের মধ্যে। এক অসীম মমতায় সাহেদা রোজিনার অভিমানী মুখটাকে বুকে টেনে নেয়। আর নিজের বুকের মধ্যে পুষে রাখা এক আকাশ অভিমানকে সেই জলে ধুয়ে রোজিনা একটা জলধোয়া ফুল হয়ে ওঠে।’ গল্পটি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে মানব মনের অন্তর্গত নিষাদের কথা। আমাদের সকলের ভেতরেই অচেতনভাবে বাস করে এক একটি অসুর। যাপিত জীবনে পুড়ে যাওয়া ধূপের মতো এক একটি ঘটনা সেই অসুরকে ম্যাজিক স্টিক দিয়ে করে তোলে সুর। আমাদের মন হয়ে ওঠে জলধোয়া এক একটি ফুল।
‘ কফিমগে একেকটা আয়েশি চুমুক দিয়ে প্রচেতা ডায়েরিটায় অভ্যস্ত চোখ বোলায়। এই ডায়েরি ওর আবাল্য পরিচিত, সেই কোন ছোটবেলায় ডায়েরিটা হাতে আসার পর থেকে সেটা বলতে গেলে ওর সাথেই থাকে।’ একটি ডায়েরি সময়ের এক শক্তিশালী দলিল। সেই দলিলে সময়গুলো হয়ে ওঠে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গল্পে ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধের, ইতিহাস বাংলাদেশের। আমার কাছেগল্পটি এই বইয়ের অন্যতম শক্তিশালী গল্প।
লেখক দেবদ্যুতি রায়ের লেখার ধরন ঝরঝরে, সাবলীল। তার ব্যক্তিগত সরলতা উঠে আসে তার লেখাতেও। এই জন্যই লেখক দেবদ্যুতি রায়ের লেখা সকল ধরণের পাঠকের কাছেই সমাদৃত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *