ইবরাহীম খাঁর গল্প : নছর প্যায়াদা

ইবরাহীম খাঁর গল্প : নছর প্যায়াদা

কোথায় তার বাপের বাড়ী কেউ তা জানত না। কথার ঢং চমৎকার শুনে লোকে মনে করতো, ওর জন্মস্থান বুঝি শান্তিপুর। কেন সে এই তরুণ বয়সে দেশ ছেড়ে চলে এসেছিল, তাও কেউ বলতে পারত না। অথচ যারা তাকে দেখত, তারাই ভাবত—এই কান্তিময় সুন্দর যুবক-আহা!  না জানি কোন্ মায়ের বুকের খাঁচা খালি করে এ-নিঠুর পাখী পালিয়েছে রে! কিন্তু কেন সে পালায়? পালিয়ে চাকুরি নেয় তো প্যায়াদার চাকুরী কেন? ও কি দেশে খুন করে ভেগেছে ? তাই এই প্যায়াদাগিরীর ছদ্মবেশ ? হবেও বা। কিন্তু নাও তো হতে পারে।

এমনি হাজারো প্রশ্ন তার পরিচিতদের চিত্তে দোলা দিত। কিন্তু কেউ তার জবাব পায়নি : জবাব মিলল না বলে কেউ রাগও করেনি। যে পাঁচ মিনিট তার কথা শুনত কিংবা দশ মিনিট তার সোহবতে বসত, সেই নিজ মনের কোণে তার জন্য একটু ঠাঁই করে দিত। সে আর তাকে প্যায়দা বলে ডাকত না, বলত ‘খা সাহেব’। সে ডাকে নছর এমন সহজ শান্তভাবে সাড়া দিত যেন অমনভাবে সম্বোধিত হওয়া তার সর্বজনস্বীকৃত জন্মগত অধিকার।

অথচ নছর প্যায়াদার উল্লেখযোগ্য কোন গুণই ছিল না। সে নামাজ পড়ত, কিন্তু খুব নিয়মমত নয় ; ফকীর-মিসকিন সামনে গেলে ভিক্ষা দিত । কিন্তু তার আওয়াজের ধমকে কোন জানাশুনা ফকীর তার কাছে ভিড়ত না। তার মোকাবেলা দুর্বলের উপর জুলুম করে, এমন সাধ্য কারও ছিল না। অথচ সে নিজে কোন দিনই বাজারদরে মাছ কিনেনি, অল্প পয়সায় তুষ্ট হয়ে রায়তের বাড়ী হতে ফিরেনি ; দরকার মোতাবেক ফাঁকি-ফুঁকি দিতেও রেয়াত করেনি।

 তবু যে নছর প্যায়াদাকে সবাই কেন ভালবাসত, তা তারা নিজেরাই বুঝতে পারত না। নছর প্যায়াদার চেহারায়, কথায়, ভঙ্গীতে একটা আভিজাত্যের লাবণ্য ছিল ; তার জোর-জবরদস্তীর পেছনে একটা সরল অধিকারবোধ ছিল, বোধহয় তাই তাদেরকে মুগ্ধ করতো।

সে যে অল্প দামে জেলেদের কাছ থেকে মাছ নিত, সে যেন তার সনাতন অধিকার বলে, জালেমের অন্যায় জোরে নয়। সে মহারানী হেমন্ত কুমারীর প্যায়াদা; মহারানী ডালার মাছ পান; ডালার মাছে দেওয়ানের ভাগ মিলে, নায়েব মশাইও বঞ্চিত হন না, একা সে বাদ পড়বে কেন? জমিদারীতে প্যায়াদার জন্য ডালার মাছের দস্তুর নাই; এই জন্য? কিন্তু এ-দস্তুর কর্তারা করলেন না কেন? রানীমার মুখ আছে, তার প্যায়াদার মুখ নাই ? দস্তুর যদি না থাকে না থাক; নছর খাঁও তার দস্তুর নিজেই করে নেবে।

নছর প্যায়াদার ফাঁকিতেও কি যেন একটা ছিল। সে ফাঁকিতে পড়ে যার নোকসান হত, সেও টের পেয়ে মনে মনে হাসত, ভাবত, বাপরে বাপ! ব্যাটা কি ওস্তাদের ওস্তাদ !

জেলেরা গিয়ে একদিন নায়েব মশাইকে সেলাম দিয়ে বলে : কর্তা, রক্ষা করুন, নছর প্যায়াদার জ্বালায় আর বাঁচিনা।

–কেন, মাছের তোলা তোলে বলে ?

–না কর্তা। ঐ ফকীরের ভিক্ষায় উঠবে নছর প্যায়াদার মন ?

–মানে?

–বাজারের সেরা মাছটা তার চাই-ই।

–বেশ তো তোদের একজন বড় খরিদ্দার জুটে গ্যাছে।

–কিন্তু দাম দেওয়ার বেলায় যে অর্ধেকের বেশী দেয় না, কর্তা?

–এই, কে আছিস রে? নছর প্যায়াদাকে ডেকে আন্।

নছর এসে সালাম করে দাড়াল।

–কর্তা, ডেকেছেন ?

–হ্যাঁ। দেখ, তুমি আর হাটে যেতে পারবে না।

–নছর খাঁর অপরাধ?

–তুমি হাটে গেলেই জোর করে মাছ নেও।

–কিন্তু রানীমার নায়েব যদি হাটে যায়, তবে রানীমার প্যায়দা সাথে না গিয়ে পারে ?

–তা বেশ পারে। নায়েব একাই হাটে-বাজারে যেতে পারে।

–হ্যাঁ, নায়েব একা হাটে-বাজারে যেতে পারে, কিন্তু নছর প্যায়াদা। তার রানীমার নায়েবকে একা যেতে দিতে পারে না।

–কি? তুমি জোর করবে?

–আলবৎ জোর করবে নায়েব মশাই।

 –তার মানে ?

—মানে সহজ । রানীমার চাকুরীতে নছর খাঁর চুল পেকে এলো। আপনি তো গতকাল এসেছেন, আসছে কাল চলে যাবেন। কিন্তু আমার রানীমা আছেন, আর তার নছর প্যায়াদা আছে।

–তুমি বলতে চাও কি শুনি?

—বলতে চাই এই যে, রানীমার নায়েবের একা হাটে-বাজারে যাওয়ার মানে রানীমার’ বেইজ্জতী। নছর প্যায়দা বেঁচে থাকতে সে তার রানীমাকে অমন বেইজ্জত হতে দেবে না।

–তা বেশ। কাচারীতে অন্য প্যায়াদা আছে, তারা সাথে যাবে।

–হ্যাঁ, তা যেতে পারে। তবে নছর খাঁ কাচারীতে হাজির থাকতে তাকে বাদ দিয়ে কোন্ ব্যাটা প্যায়দার হাটে যাওয়ার হিম্মৎ হয়, তাও তো বুঝি না।

—বেশ, আমি হাটে যাওয়াই ছেড়ে দিলাম, তবু তোমার হাটে যাওয়া বন্ধ করতেই হবে।

–ভাল, ভাল, তাই হবে। আর নছর প্যায়াদা হাটের চৌহদ্দীতে পা দেবে না।

সাতদিন পর। ফের এক ছেলে এসে নায়েব মশাইর কাছে হাজির। জোড়হাতে বলে

–কর্তা?

—আবার কিরে ?

–আজ্ঞে নছর প্যায়াদা মাছ এনেছে, তার দাম বাকি।

–নছর খাঁ?

—আজ্ঞে ?

–এধার আও।

–আজ্ঞে এই আসছি।

—ফের তুমি হাটে গিয়েছ?

–কখখনো না। নছর খা তার জবানের খেলাফ কাজ করে না।

–ওর মাছ তুমি আননি ?

–আজ্ঞে না।

 –কি বলিস্ রে মাঝি ?

–আজ্ঞে, আমি নিজ হাতে পথে একটা মস্ত চিতল নামিয়ে দিয়ে গেছি।

–নছর, এখন কি বলতে চাও?

—আজ্ঞে কর্তা, শুনলেনই তো সেই মাছটা আমি আনিনি, ঐ-ই দিয়ে গেছে। আর তাও হাটে নয়, পথে।

—তুমি মাছ পথে নামিয়ে দিলে কেন, মাঝির পো?

—আজ্ঞে, খাঁ সাহেব চাইল, কেমন করে ‘না’ বলি ?

–ব্যাটা, আমার হুকুম বড়, না নছর খাঁর চাওয়া বড় ?

—আজ্ঞে, কর্তার হুকুমই বড়।

 —তবে তোরা ওকে মাছ দিস কেন?

–আজ্ঞে, নছর খাঁর হাঁক শুনলে যে কর্তার হুকুম ভুলে যাই।

–নছর খা?

–কর্তা?

–এসব কি হচ্ছে ?

–কৈ, কর্তার কোন হুকুম তো নছর খাঁ অমান্য করেনি।

–কিন্তু পথ থেকেই বা তুমি মাছ নেবে কেন?

–কর্তা, মৈষাল তার বাথান ঘিরে বেড়া দেয় বলে কি বাঘের শিকার কখনো বন্ধ থাকে?

–আচ্ছা বাপু, এখন মাছের দামটা দিয়ে দাও দেখি।

-কর্তার অর্ধেক, জমা-নবীস বাবুর সিকি, শুমার-নবীশ বাবুর দুই আনা,এই দামটা দিলে বাকি দুই আনা আমি দিতে পারি ।

–আঁ! আমার আবার অর্ধেক কিরে?

-আজ্ঞে, ঐ যে বিরাট চিতলটার অর্ধেক অন্দরে দিয়ে এলাম?

–তার আবার দাম দিতে হবে? আমি তো ভেবে রেখেছি, ওটা ডালার মাছ।

-আজ্ঞে, আমিও তো সেই ভেবেই মাছটা এনেছিলাম, তা এতক্ষণে অলক্ষুণে ব্যাটা দামের জন্য ফ্যা ফ্যা শুরু করেছে।

হাঁস-মুরগীর দাম দেওয়া সম্বন্ধে নছর খাঁর নিজস্ব থিওরী ছিল। সে বলত, হাঁস-মুরগী লোকে মেহনত করে পালে ; তাদের খাবার খোরাক জোগায়, তাদের বাসা করে দেয়, তাদের নানা উপদ্রব সহ্য করে। কাজেই ও জীব দুটির ন্যায্য দাম দেওয়া চলে। কিন্তু মাছের কথা তো আলাদা। ওরা আল্লার দরিয়ায় বাস করে; যা পায় নিজেরা কুড়িয়ে খায়, বিনা যত্নে বড় হয়। এক ব্যাটা জেলে কোথা থেকে একদিন ঘুপ করে এসে সুপ করে একটা জাল ফেলে টুপ করে কতকগুলি রুই-কাতলা ধরে নিয়ে বাজারে চুপ করে বসে পড়বে, আর মাছ চাইলে লাখ টাকা দাম হাঁকবে। একী বরদাশত করা চলে? কাজেই কম দামত ওরা পাবেই।

নছর খাঁ নিজের থিওরী মোতাবেক হাঁস-মুরগীর দিত বাজার দাম, মাছের দিত বাজারের আধা দাম। তবে তার হাতে কোন দিন পয়সা না থাকলে মাছমুরগীওয়ালার বিপদ ছিল। সে বলত, পেটে নছর খাঁকে কিছু দিতেই হবে। হাত খালি বলে পেট খালি থাকবে? তবে হাত খালি লোকের পেটে খোদা খিদে দেয় কেন?

শেষোক্ত ঘটনার আরো সাতদিন পরের কথা। হাটবার। জেলে এসে নায়েব মশাইকে সেলাম করে, তারপর জোড়হাতে নালিশ জানায় :

–কর্তা, নছর প্যায়াদাকে ফের হাটে যাওয়ার হুকুমটা দিয়ে দিন।

–তার মানে ?

–কর্তা, হাটে নানান পথে নানান মাঝি মাছ আনে, নছর খাঁ হাটে গেলে আজ এ-দোকান, কাল ও-দোকান হতে মাছ নেয়।

-তারপর ?

—কিন্তু হাটে যাওয়া বন্ধ হওয়ায় কেবল এই এক পথের মাঝিকেই সে পাকড়াও করে।

–বটে! কিন্তু দাম দেয় তো?

–কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ । তাও আবার সব সময় নয়।

–সে কেমন ?

–যেমন আজ মাছের দাম দিল না।

—হাতে বুঝি পয়সা নাই?

—আসল কথা। তাই-ই, কিন্তু অত বড় শরমের কথা সে এই ঝালোর পুতের কাছে স্বীকার করবে?

–তা হলে কি করে?

—সে কয় অন্য কথা।

—যেমন?

–কাচারীর পুকুর হতে মাছ ধরে নিতে কয়।

–অর্থাৎ?

–বলে, ‘মাঝির পো, তোমার মাছ কেটেকুটে ধোয়ার জন্য নিয়ে গেলাম ঐ পুকুরে। কিন্তু কেমন জাতের মাছই তুমি দিয়েছিলে যে পুকুরে নিতেই সে মাছ লাফিয়ে পুকুরে চলে গেল। তা রানীমার বিলের মাছ রানীমার পুকুরেই যদি যায় তবে নছর খাঁ তাতে বাধা দেয় কি করে? তা বাবা মাঝির ব্যাটা, তোর যদি পরানে না সয় তবে ঐ পুকুর থেকে মাছটা টপ করে ধরে নিয়ে যা, আর আমাকে জ্বালাতন করিসনে।’

নায়েব মশাই হেসে বললেন : “শয়তান! আচ্ছা নছর প্যায়াদাকে হাটে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে।”

জেলে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে সেলাম দিয়ে চলে যায়, বলে যায়, ‘কর্তার বড় দয়া।’

আর এক হাটবার। হাটে নছর খাঁর সাথে আক্কেল শেখের দেখা। আক্কেল বলে :

–খাঁ সাহেব, একটা কথা কব ?

—হ্যাঁ, স্বচ্ছন্দে।

–হ্যাঁ হ্যাঁ  বাবা, ভাল কথা মনে করেছ ;আমি তোমাকেই সেজন্য খুঁজছিলাম।

–বড় ভাল হল, খাঁ সাব। তাহলে দামটা দিয়ে দিন, নইলে আজ আমার হাট হবে না।

–বেশ। তা ভাই চট করে হিসাবটা করে ফেল তো?

–নয় আনার মুরগী ছয় আনা দিয়েছেন, তিন আনা বাকী, এই তো সহজ হিসাব।

–আচ্ছা, ও তো হলো তোমার পক্ষের হিসাব, আমার পক্ষের তো একটা হিসাব আছে।

-আবার আপনার পক্ষের হিসাব!

—নিশ্চয়, রানীমার কাচারীতে কাজ করি, বাবা, আমরা হিসাব ছাড়া এক পা চলতে পারি? আমাদের নিকাশী সেরেস্তা বলে একটা আলাদা সেরেস্তাই মোকারার আছে।

–সে তো গেলো বড় বড় হিসাব নিকাশের কথা, আমার একটা তুচ্ছ মুরগী–

–আরে বাবা, হিসাব করে লেনদেন করা যাদের অভ্যাস হয়ে যায়, তারা হাতীর হিসাবও রাখে, চড়ুইর হিসাবও রাখে ।

–আচ্ছা, তা হলে বলুন, কি আপনার হিসাব ?

–তোমার মুরগীটা রান্না করতে আমার খরচ হল–

গরম মসলা—দেড় আনা

লবণ—সোয়া আনা

ঘি—সাড়ে চার আনা

আলু – আধা আনা

লাকড়ী – আড়াই আনা  

–মোট কত হল বল তো আক্কেল মিয়া?

–মোট হল সোয়া নয় আনা।

—বা ঠিক ধরেছ। এই সোয়া নয় আনা আর দিয়েছি ছয় আনা, মোট সোয়া পনর আনা, এ হতে তোমার পাওনা তিন আনা বাদ দিলে কত না থাকে?

–সোয়া বার আনা।

–আচ্ছা বাবা, এই সোয়া বার আনা পয়সা আমাকে দিয়ে খালাস হয়ে যাও।

-আঁ! আমি দিব? কেন?

–বাবা, পচা মুরগী দিয়েছিলে; রান্নার পরেই তো দুর্গন্ধে কাচারী ভরে গেল ;সমস্ত নিয়ে রানীমার ঐ পুকুরে ফেলে দিয়ে তবে রক্ষা, এখন গরীব নছর খাঁর ক্ষতিপূরণটা তো বাবা তোমাকে করতেই হয়।

—আমার কাছে আজ হাট করবার এক গণ্ডা পয়সা নাই ,আর আমি এই গুনগারী দিব?

–তা বাবা, অমন তো তাড়াহুড়া নাই; আজ না দিতে পার থাক্। ফের যখন মুরগী নিয়ে আসবে তখন না হয় একটা ছোট্ট বাচ্চা নছর খাঁর ঘরের মধ্যে ঢিল মেরে ফেলে দিয়ে।

—আঁ! এক মুরগী দিয়েছি আসল, আর এক মুরগী তার ফাও ?

—আচ্ছা, যা বাবা, যা, মাফ দিলাম, আর কিছু দিতে হবে না।

নছর প্যায়াদা  মহলে গেছে। কেমন করে আগেই খবর পেয়েছিল, আসামী পলাতক। ভয়ে আসামীর পাড়ার লোকেরা পর্যন্ত সরে পড়েছে। সুতরাং নছর খাঁর ভাগ্যে সেদিন বিদায়-আদায় ভালমানষী কিছুই জোটেনি। এদিকে তার ঘরে চাল বাড়ন্ত। উপায় কি, ভাবতে ভাবতে নছর খা কাচারীতে ফিরছে ।

আসতে আসতে নছর দেখে, পথের পাশের বিলের পারে মহা ভীড়। নছর এগিয়ে যায়। দেখে বিরাটকায় এক কাছিম বড়শীতে ধরা পড়েছিল, সবাই হল্লা করে সে কাছিম মারছে। নছর খাঁকে দেখে একজন বলল :

—দেখুন—দেখুন, খাঁ সাহেব, কি মস্ত কাছিম।

–বারে বাঃ! একি যার-তার কাছিম যে মস্ত হবে না?

–ও বাবা, কাছিম তা আবার কার গো?

–আরে, এ যে আমার রানীমার কাছিম,।

–আঁ! তিনি আবার কাছিম পোষেণ নাকি?

 —পোষেণ না ?তার পুটিয়ার বাড়ীর পুকুর ভরা যে ইয়া বড় বড় কাছিম।

–কিন্তু এত দুর হতে কাছিম এখানে ?

–চুপ, বেয়াদবের দল কাহাকা।। আমি বলছি রানীমার কাছিম, তার উপর আবার ছওয়াল জওয়াব। এই অপকর্মটি যে করে বসলে, ওর কি করবে, এখন তাই আমাকে বল।

–আমি তো কাছিম মারিনি, মেরেছে ঐ ফজরালী ।

–না, খা সব, ঐ-ই আমাকে একটা বাড়ি দিতে বলেছিল তাই, তাই, আস্তে আমার লাঠিটার আগা কাছিমটার গায় ছুঁইয়েছি মাত্র।

–আরে রানীমার কাছিম– পুত্রহীন বিধবা-মানুষ। কোলের বাচ্চার মত আদর করে ঐ কাছিমগুলি তিনি পোষেণ। তার কাছিমের গায় লাঠি ছোঁয়ানো আর তার নিজের গায় লাঠি ছোঁয়ানো যে একই কথা। বাপু, তোমার কয় বছরের যে ফাঁসি হবে আমি ভেবেই অস্থির।

–কিন্তু নজরালী তার বড়শীতে কাছিম ধরে এ বিপদ ডেকে আনে কেন?

–ও ব্যাটা নজরালীও শূলে চড়বে।

–হায়! হায়! আমাদের কি উপায় খাঁ সাব? কি দিলে রেহাই পাব?

–চুপ! বকরীর দল। তোরা চুনোপুটি ; তোর আবার নছর খাঁকে দিবি কি রে ? তোদের গাঁও-মোড়ল কই ?

–ঐ তিনি আসছেন।

–ওগো মোড়লের পো, বলি, তুমি গাঁয়ে থাকতে এ-সব হচ্ছে কি? রানীমার কাছিমকে এমনি করে যেখানে সেখানে লোকে ধরে মারবে ?

–রানীমার কাছিম?

হ্যাঁ গো হ্যাঁ, একদম গাছ থেকে পড়লে যে ! খবর পাওনি যে, রানীমার একটি আদরের কাছিম পুটিয়া হতে পুখরীয়া পরগণায় চলে এসেছে ?

–না, পাইনি তো!

–না পেয়ে থাক, দুই দশ দিনের মধ্যেই পাবে। এই খবর দেশে দেশে পাঠানোর জন্যে রাজধানীতে পঁচিশ জন খোশনবীশ মকাররর হয়েছে, তা জান?

–কি করে জানব, খাঁ সাব, আপনারা না বললে?

–তা বেশ, আমি বলছি, বিশ্বাস কর। আর এই কচ্ছপ হত্যার কি সুরাহা তা আমাকে ঝটপট বলে দাও, আমি এক্ষুনি চলে যাব। কারণ নায়েব মশাই জিজ্ঞাসা করলে এর একটা কৈফিয়ৎ তো আমি না দিয়ে পারবো না।

গাঁয়ের মোড়ল বুদ্ধিমান মানুষ। সে নছর খাঁকে বাড়ি নিয়ে গেলো। সেখানে মোরগ-খিচুড়ীর ব্যবস্থা হল। বৈকালের দিকে দশটা টাকা ট্যাকে গুঁজে নছর খাঁ কাচারীতে ফিরল।

সেবার বড়শীলার রাখ হতে কাচারীতে ডালার মাছ এল। নায়েৰব মশাই ভাল মানুষ, ডালার মাছ প্যায়াদা-পাইককে না দিয়ে খান না। জমাদার প্যায়াদার ভাগে পড়ল একটা বড় চিতল। জমাদার নছর খাঁকে ডেকে বললে, খাঁ সাব, মাছটা আর ভাগ করে নিয়ে কি হবে, আমার এখানেই আপনার দাওয়াৎ—নিজ হাতে মাছটা রাঁধুন, এক সঙ্গে বসে খাওয়া যাবে।

ভাল মাছের নামে নছর খাঁ বরাবরই পাগল। বাবুর্চীটিও বেশ ভাল। এত বড় একটা মাছ, মনের মত করে পাকাতে আর পাঁচজনে বসে খাবে, একথা ভেবে তার মন প্রসন্ন হয়ে উঠল। পরম আনন্দের সঙ্গে সে রান্নায় লেগে গেল।

রান্নাবান্না শেষ । এমন সময় জমাদার সাহেবের দুইজন মেহমান এসে হাজির। জমাদারের মন খুশী হয়ে উঠল। ভাবল, সুন্দর আয়োজন, বেশ করে মেহমানদারী করা যাবে। ডাকল :

–নছর খাঁ?

–জমাদার সাব ?

—দুই জন মেহমান এলেন। এরা বড় ভালো মানুষ–একজন মুনশী, আর একজন হাজী;দুইজনই নেহায়েত পরহেজগার।

–তবেই তো মুশকিল হল। এখন এদের খাওয়াই কি দিয়ে?

–কেন? এত বড় চিতল মাছটা সবই তো আছে ?

–একটু বিঘ্ন যে ঘটে গেল, জমাদার সাব ?

—আবার কি বিঘ্ন ঘটল ?

— জানেন তো কছইরা ব্যাটা শরাব খায়। ওর শরাবের বোতলে কিছু শরাব ছিল। তারই মধ্যে ভুলে তেল ভরে এসেছে, তার সেই তেল দিয়ে তো মাছ পাক করে ফেলেছি।

–আচ্ছা, জমাদার সাব, থাক—থাক—আমরা যাই ও-পাড়ায় বিয়াই বাড়ী আছে, সেখানে গিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করি গিয়ে। আসসালামু আলাইকুম।

–নছর খাঁ?

–আবার কি হল?

– -কেন এই ভাল মানুষ দুটিকে ফঁফাঁকি দিয়ে বিদায় করা হল, শুনি?

–বা: রে বাঃ, এত মেহনত করে মাছটা রান্না করেছি ;পাঁচটা পেটি পাঁচজনে খাবে, এর মধ্যে আবার হঠাৎ এ সব ভাগী জুটতে চায় কেন?

–কিন্তু এরা যে মেহমান, নছর খাঁ।

— রেখে দিন্ মেহমান, জমাদার সাব। এসব হাজী-গাজী মেহমান যেখানে যায় সেখানেই মোরগের রান পায়। আজ এদেরকে খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ঐ বেচারা ঘোড়ার ঘাসী দুইটিকে বাদ ফেলতে চান তো? তা নছর খা বাবুর্চীখানায় থাকতে অমন হয় না।

একদিন বিকালে নছর প্যায়াদা নায়েব মশাইর কাছে গিয়ে হাজির। সেলাম দিয়ে বলে :

–কর্তা, আমাকে পাঁচটা টাকা দিন।

–হঠাৎ টাকার কি দরকার হল ?

–মহলে গিয়ে পরান মণ্ডলকে ফেরৎ দিব।

–বাবদ ?

—সেদিন সে আমাকে পাঁচ টাকা ভালমানুষী দিয়েছিল।

–তা আবার ফেরৎ কেন ?

–কতা স্বয়ং যদি নজর সেলামী আট আনা নেন, তবে তো নছর প্যায়াদা পাঁচ টাকা নিতে পারে না।

–কে তোমাকে বল্ল যে, আমি আট আনা নজর সেলামী নিয়েছি ?

–কর্তার সামনের ঐ কাঁঠাল গাছে যে ঘুঘু শালিকেরা বসে আছে, ওরা সবাই দেখেছে।

–তা ও ভক্তি করে দিয়েছে, আমিও নিয়েছি, তাতে এমন কি হল?

–আরে ছ্যা-ছ্যা! রানীমার ইজ্জত গেল–ইজ্জত গেল। মহারানী হেমন্ত কুমারীর নায়েব, সে-ই সেলামী নেয় আট গণ্ডা পয়সা। গলায় কলস বেঁধে ডুবে মরতে ইচ্ছা হয় না?

–কিন্তু ও ব্যাটা তো গরীব মানুষ ; ওর কাছ থেকে বেশী নিয়ে ওকে খুন করতে বল?

–যান কেন কর্তা ও সব গরীব মানুষের কাছে? এত বড় জবরদস্ত মনিবের নায়েব, আপনি জগৎ-বেড় জালে দরিয়ার বুকে ধরবেন চিতল, কাতল, শিলিং। তা না করে আপনি গামছা পরে খুইয়া হাতে খলসে-পুঁটি ধরতে পগারে নামেন কেন মশাই ?

–তুমি বড় বাড়াবাড়ি করছ নছর খাঁ।

–আজ্ঞে কর্তা, ঐ তো নছর প্যায়াদার দোষ। আর রানীমায় ইজ্জতের কথা উঠলে সে দুনিয়ার কাউকে রেয়াত করে কথা বলতে জানে না।

নছর প্যায়াদার কঠিন ব্যারাম। বিছানায় পড়ে গেছে। ভাটি বয়েস, আর বুঝি ফিরবে না।

নায়েব মশাই বললেন, ডাক্তার বাবু, টাকা যত লাগে আমি দিব, আপনি নছরকে ফিরিয়ে দিন। নছর গেলে যে আমার কাচারীর আনন্দের আলো নিভে যাবে ।

ডাক্তার বাবু বললেন, নছর খাঁর জীবন-সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে ; ও অস্তাচল-শিরে প্রভাত সঞ্চার করা মানুষের সাধ্যের অতীত।

নায়েব মশাই স্কুল হতে মৌলভী সাবকে ডেকে আনলেন। বললেন, মৌলভী সাব, নছর খাঁকে একটু তওবা পড়িয়ে দিলে হয় না?

–তা তো হয়। কিন্তু ও যে আজ দশদিন যাবৎ গোসল করে না, ওর গায়ে গন্ধ ধরে গেছে;কাপড়েও হয়তো পেশাব লেগে আছে।

–তা হলে কি করা যায় ?

–হতভাগাকে এত বার বলেছি-বাপু বিয়ে কর। তা কিছুতেই ও সে পথে গেল না। আজ ওর বিবি ছেলেপুলে থাকলে কাজে লাগত না?

–সে অন্যায় তো নছর করেছেই। কিন্তু এখন উপায় কি ?

–কেউ ওকে না ধুইয়ে দিলে তো এ-গলীজের মধ্যে তওবার কোন ফায়দা হবেনা, নায়েব মশাই।

–টাকা দেই, কাউকে দিয়ে ওকে ধুইয়ে দিন । –

 -তাতে কেউ রাজী হয় না।

–আচ্ছা মৌলভী সাব, কোন হিন্দু যদি তাকে ধূইয়ে দেয়, তারপর ওকে তওবা পড়ালে শাস্ত্রগত কোন বাধা আছে ?

–না, তা নাই। কিন্তু মুসলমানই কেউ কাছে ঘেঁসে না, হিন্দু কোথায় পাবেন ?

–আমি তবে নছর খাঁকে তার শেষ গোছল করিয়ে দেবো।

তাই হলো। দেখাদেখি মৌলভী সাব এসে নায়েব মশাইর শরীক হলেন। দুইজনে মিলে নছরকে অতি যত্নে গোছল দিয়ে পাক সাফ করলেন। তওবার কথা শুনে নছর খা বললে :

–আপনারা বলছেন, তওবা করবো। জীবনভর লুটপাট করার পর আজ মরণ-সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে এ তওবায় ফায়দা কি দাদা?

–কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে তো আমাদের কারো কোনো নালিশ নাই, নছর খাঁ।

—মানুষ সব সময় নালিশ করতে জানে না বলেই তো আল্লা দুই দুইজন ফেরেস্তাকে তার কাঁধের উপর বসিয়ে রেখেছেন। তারা তো অন্তত আমার সব অপকাজের এত্তেলা সময় মতো দিয়ে রেখেছে।

–কিন্তু কে জানে, কার সম্বন্ধে কি খবর ওখানে গোপনে এত্তেলা হয়ে আছে?

–ওহ! লাখ টাকার পেট দিয়ে আল্লা নছর খাঁকে পাঠালো তোমাদের দরবারে–তোমরা তাকে দিলে কিনা পাঁচ টাকা মাশোয়ারা। আচ্ছা, লুটতরাজ ছাড়া বেচারার সামনে আর কি পথ ছিল খোলা?

–কিন্তু কেন তুমি এসব সাত-পাঁচ ভাবছো, নছর খাঁ?

–আজ যে তার কাছে চলেছি, দাদা, নিকাশ দিতে হবে না?

–কিন্তু দয়াময়ের দয়ার কি সীমা আছে, নছর খাঁ?

–হ্যাঁ, ঐ তো নছরের একমাত্র ভরসা।

–ঐ ভরসাই তো মানুষের শেষ ভরসা, নছর খাঁ।

–আচ্ছা, নায়েব মশাই, হাশরের ময়দানে আল্লার আরশের তলে আমি যখন কেঁদে লুটিয়ে পড়বো, তখন এ-প্রমাণটা দিতে পারবেন না যে, নছরের ঘরে খাবার থাকতে সে কোনদিন কারো কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিয়ে খায়নি?

–তা পারবো, নছর খাঁ, নিশ্চয় পারবো।

-আল্লার অসীম দয়া আর আপনার এই প্রমাণ, বেশ, শেষ পর্যন্ত তাহলে এর উপর নির্ভর করেই নছর খাঁ অকুল দরিয়ায় কিশতী ভাসিয়ে দেবে।

ইবরাহীম খাঁ

ইবরাহীম খাঁ

ইবরাহীম খাঁ (ফেব্রুয়ারি ১৮৯৪ - ২৯ মার্চ ১৯৭৮) উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি টাঙ্গাইল জেলার তৎকালীন ভুঞাপুর থানার অন্তর্গত বিরামদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শাবাজ খাঁ ও মায়ের নাম রতন খানম। ইবরাহীম খাঁ ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

Add Your Heading Text Here

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *