নাইয়ার মাসুদের গল্প : অন্ধকারের নারীটি

নাইয়ার মাসুদের গল্প : অন্ধকারের নারীটি

অনুবাদ : ফারহানা রহমান

সেই খারাপ মহিলাটির গল্প এখন আর আমার মনে নেই, অথচ অতীতের সেই দিনগুলোতে কিন্তু আমি এসব বিষয়ে দারুণ আগ্রহী ছিলাম। আমার মনে আছে, আমি কী ভীষণ খুশি হয়েছিলাম এটা জেনে যে আমাদের বাড়িতেই তার মামলার শুনানি হবে এবং সে নিজেই এখানে আসবে মামলাটির নিষ্পত্তি দেখার জন্য।  এর আগেও আমাদের বাড়িতে আরেকজন সাঙ্ঘাতিক খারাপ মহিলা সম্পর্কেআলোচনার ঝড় উঠেছিলো এবং সেসময় বাড়ির বড়রা সকলে মিলেই একটি সুনির্দিষ্ট  সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।তবে ঘটনাটি যখন ঘটেছিল তখন আমি নিতান্তই অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলাম। আমি তখন কেবল অন্যদেরকে সেইখারাপ মহিলাটিকে নিয়েই কথাবার্তা বলতে শুনতাম।  এবংএই দ্বিতীয় খারাপ মহিলাটির ঘটনাটি যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের সামনে আসলো  এবং তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করলো ততক্ষণ পর্যন্ত তারানিজেদের মধ্যে সেই মহিলাটির কেস নিয়েই কথাবার্তা চালিয়েই যাচ্ছিলেন।যেদিন মহিলাটির আমাদের বাড়িতে আসার কথা ছিল; সেদিন বাড়ির বাইরের রুমটিকে একেবারে সাফসুরত করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হোলো এবং তার জন্য আলাদা করে একটি সুসজ্জিত বসার আসন রাখা হোলো। ঘরটির সাজসজ্জা বৃদ্ধির জন্য আনা হোলো বেশ কিছু প্রাচীন আসবারপত্র যার মধ্যে কয়েক শতাব্দীর পুরনো আসবাবও রয়েছে। ঘরদোর পরিষ্কার করার কাজে সাহায্য করার জন্য বড়রা আমাকে ডেকে পাঠালেন। এবং আমিও মহা উৎসাহ নিয়ে কাজগুলো করেছিলাম। আমিযখন একটি বড় চেয়ার সরিয়ে রাখছিলাম তখন বড়দের মধ্যেকার কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম যে এই চেয়ারটিতেই সেই খারাপ মহিলাটি এসে বসবে। আমার বুকটা গর্বে ভরে গেলো। আমি আমারমনশ্চক্ষু দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে মহিলাটি সেখানে গিয়ে বসেছে। প্রকৃতপক্ষে একটি নষ্ট মহিলাকে চারপাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টিই আসলে আমাকে খুবই উৎসাহিত করে তুলেছিল। এই কার্যক্রমের সাথে শুধু বড়রাই নয় অনেক বাইরের লোকও নিজেদেরকে যুক্ত করার চেষ্টা করছিল। এদের ভেতর বেশ কয়েকজন সম্মানিত অতিথিও ছিলেন যাদেরকে আমরা আগেও অনেক খাতিরযত্ন করতাম। প্রাথমিকভাবে আসলে তাদের উদ্দেশ্যেই আমরা এতসব জমকালো অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করেছিলাম।

সম্মানিত অতিথিদেরকে যেন সঠিকভাবে দেখাশোনা করা হয়। এবং আমি যেন তাদের যত্নআদ্যি করার সেদিকটায় বিশেষভাবে নজর রাখি  সে ব্যাপারে বাড়ির বড়রা আমাকে একের পর এক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আমি মোটেই সেই ব্যাপারটিতে আগ্রহী হলাম না। অতিথিদের প্রত্যেকেরই যখন আসার সময় ঘনিয়ে এলো, বড়দের কার্যকলাপের মধ্যে একধরণের চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। তাদের এধরণের আচরণে উত্তেজিত হয়ে বাড়ির পাশের দরজা থেকে বেশ দূরে অবস্থিত বাড়ির সম্মুখভাগের বাইরের ঘরটি পর্যন্ত বারবার চক্কর দিতে আমি বাধ্য হলাম। বাড়ির পাশের দরজা এবং বাইরের ঘরটির ঠিক মাঝখানে একটি উঠোন ছিল এবং এই জায়গাটির একটি দারুণব্যাপার হোলো সেটি ছোটছোট পাতাওয়ালা একটি বিশাল প্রাচীন গাছের ছায়া দিয়ে ঢাকা ছিল। যেহেতু ক্রমাগত আদেশ-নির্দেশের গোলাবর্ষণ থামার কোনো লক্ষণ তখনো দেখা যায়নি, ফলে আমিও তাদের মতোই স্নায়ুবিক উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে, একবার ভেতরের এবং একবার বাইরের ঘর পর্যন্ত ছুটাছুটি করতে করতে একেবারে দম আটকিয়ে মরতে বসেছিলাম। প্রতিবার যখনই আমি গাছের নীচ দিয়ে যাতায়াত করতাম, আমার হাত উপরে উঠে যেতো এবং আমি গাছের ডালগুলোকে ছুঁয়ে একটু নাড়া দিয়ে যেতাম। তবে এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরেও আমি কিন্তু প্রতিবার এভাবে গাছের পাতাগুলোকে নাড়া দিয়ে  যেতে একবারের জন্যেও ব্যর্থ হতাম না। গাছের ডালপালাগুলোকে স্পর্শ করার এই তাগিত আমি  আমার ভেতর সবসমই বোধ করতাম। এবং সেটা আমিকখনোই প্রতিরোধ করতেও পারিনি। এমনকি এখনও যখনআমার ভেতরের সমস্ত উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে, তখনো আমার দৃষ্টি গিয়ে আঁটকে যায় উঠোনের একেবারে কোণার দিকের ঢালু ছাদওয়ালা সেই ঘরটির দিকে। এই ঘরটিতে একজন বুড়ো সার্জন বাস করতেন। প্রতিবার আমি যখন গাছটির ডালপালা ধরে ঝাঁকি দিতাম, তিনি উচ্চস্বরে বলে উঠতেন,“কেন যে তুমি অকারণেই গাছটিকে নাড়া দাও ?”  কিন্তু আজকে তিনি একবারের জন্যেও ঐ কথাগুলো আর উচ্চারণ করলেন না। কী সব ওষুধপত্র আর মলম ছড়িয়ে ছিটিয়ে সেগুলোর মাঝখানে কেন যে তিনি চুপচাপ বসে রইলেন সেটা শুধু ঈশ্বরই জানেন।তাঁর সামনে ছড়ানো এসব মাল-সরঞ্জামনিয়ে তিনি এতোটাই মগ্ন হয়ে ছিলেন যে গাছ নিয়ে করা আমার সমস্ত অপকর্মগুলো থেকে গাছটিকে রক্ষা করার কথা তিনি বেমালুম ভুলে বসে রইলেন।আমি সেদিনই প্রথমবাররের মতোতাঁকে দেখলামঅপারেশনের সমস্ত যন্ত্রপাতি সাজিয়ে তিনি চুপচাপ সেখানে বসে রয়েছেন।প্রকৃতপক্ষে আমি খুব ছোট থাকতেই তিনি অস্ত্রপ্রচাররের কাজটি ছেঁড়ে দিয়েছিলেন।আমার কাছে তিনি একজন শুধুই বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন। এবং যিনি বাড়ির যে কোনো বিষয়ে বা যা কিছু ঘটে সে সমস্ত বিষয়ে একের পর এক বিরক্তিকর প্রশ্ন করে করে আমাদের সবাইকে অতিষ্ঠ করে  তুলতেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথেই তাঁর সমস্ত বিষয়ে নাক গলানোর অভ্যাসটি ক্রমাগত বাড়তে লাগলো। তবে বেশিরভাগ অনুসন্ধানীই তাঁকে অসন্তুষ্ট করে রাখতো। বড়রাও তাঁকে বিভ্রান্ত করতো এবং আমি আমার দিক থেকেও আমি তাঁকে যথাসাধ্য ভুলভাল ও অসম্পূর্ণ উত্তর দিয়ে দিয়ে আরওবেশি করে সিদ্ধান্তহীনতা এবং চরম বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিতাম। যখন থেকে এই খারাপ মহিলাটির কেসটি উন্মোচিত হয়েছে তখন থেকেই বুড়ো লোকটির কৌতূহলের কোনো সীমা রইলো না। প্রতিদিনতিনি বেশ কয়েকবার তাঁর কোণার ঘরটি থেকে নিজেকে জোর করে বের করে এনেরাগে গজগজ করে পায়চারী করতেন। তবে যাইহোক না কেন আজকের দিনটিতেই কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়ে থাকার কথা ছিল। অথচ তিনি চুপচাপ তাঁর কাজের মধ্যে এতোটাই মগ্ন হয়ে রইলেন যেন তাঁর কিছুতেই কিছু এসে যায় না। তাঁর এই বিচিত্র ব্যবহারের জন্য আমি নিঃসন্দেহে তাঁকে খোঁচাখুঁচি করতে পারতাম। কিন্তু এরিমধ্যে নানাকারণেআমি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। যেহেতু অনেক আগেই অতিথিদের চলে আসার কথা ছিল কিন্তু তারা কেউই তখনো এসে পৌঁছাননি।ফলে বড়দের মধ্যে ক্রমশই অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। আমি এও খেয়াল করলাম যে আমিঅজান্তেই বাইরের ঘরের পাশের দরজাটিকে খামচে ধরছি এবং সবসময়ের মতোই গাছের নীচ দিয়ে যাতায়াতের পথে ডালপালাগুলোকেওঝাঁকি দিচ্ছি। গাছটি প্রতিবারের মতোই আমার উপর তার ছোটছোট হলুদ পাতাগুলোকে ঝরাতে লাগলো। আমার চুল ও কাঁধ থেকে পাতা ঝাড়তে ঝাড়তে আমি বাইরের রুমে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। কিছুক্ষণ বাইরের রুমে বসে রইলাম। একসময় মাত্রাতিরিক্তভাবে সাজানোগছানো এই নিস্তব্ধ ঘরটি দেখে আমি ক্লান্তবিরক্ত হয়ে উঠলাম। এবং খুব ভালো করেই বুঝতে পারলাম যে আমি সেই খারাপ মহিলাটির ব্যাপারে অথবা সম্মানিত অতিথিদের কারও ব্যাপারেই আমার আর কোনো আগ্রহ নেই।  আর তখনই আমারনুসরাতের কথা মনে পড়ে গেলো। তাড়াহুড়ো করে এদিক সেদিক যাতায়াতের পথে আমি ওকে দেখতাম, প্রক্রিতপক্ষে প্রতিবারই আমি ওকে গাছের সাথে হেলান দিয়ে সেটির নীচে বসে থাকতে দেখতাম। মেয়েটি এক দৃষ্টিতে বুড়ো সার্জনের দিকে বা ধুলোবালির ভেতরে আঙ্গুল দিয়ে দাগ কাটতে কাটতে পাশের পথটির নীচের দিকে তাকিয়ে থাকতো। আর এখন আমিও মনে করারচেষ্টা করতে লাগলাম যে আমি আসলে প্রথমবারেরমতো নাকি দ্বিতীয় বারের মতো গাছের নীচ দিয়ে যাতায়াত করেছিলাম? আমাকে দেখার জন্য তাকে ঘুরে বসতে হোলো। সম্ভবত সেও আমাকে অভিবাদন জানিয়েছিল। কিন্তু সেসময়ে আমি তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবো কি না সেটি নিয়েবিভ্রান্তিতে ছিলাম। এমনকি মেয়েটি যে আমাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তার হাত বাড়িয়েছিল সেটাও আমি বুঝতে পারিনি। তার কণ্ঠস্বর বেশ মিষ্টি ছিল এবং সে খুব নম্রভাবে হাঁটাচলা করত। মাঝেমাঝেই সে অপ্রত্যাশিতভাবে তার অসুস্থ আত্মীয়স্বজনকে দেখার  জন্য আমাদের বাড়িতে আসত। প্রায়ই আমি খেয়াল করতাম যে কেউ যখন তাকে ডাকতো, সে তখন এমন সতর্কতার সাথে উঠে বাড়ির এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্ত পর্যন্ত যেতো যেন তার পায়ের তলায় পড়ে কোনো ভঙ্গুর জিনিস হয়তো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। সে যখন আমাদের বাসায় থাকত তখন প্রায়ই দেখা যেতো যে কেউ না কেউ তাকে নাম ধরে ডাকছে।কিন্তু আমি খুব কমই তার সাথে কথাবার্তা বলতাম তার একটি কারণ হোলো মেয়েটি খুবই নিচু গলায় কথা বলতো এবং কথা বলার সময় ও চোখের দিকে না তাকিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু এতকিছুর পরেও ও কখনোই আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলতো না। যাইহোক, আমি বাইরের ঘর থেকে গাছের কাছে এসে থামতাম এবং গাছটির কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। ডালপালাগুলোকে ধরে হাল্কা একটু টানাটানি করতাম।  শরৎকাল শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে গাছটির বেশিরভাগ পাতাগুলোই বিবর্ণ হয়ে ঝোরে পড়ছিল। ডালপালাগুলোর এদিকে সেদিকে মাকড়শার জালে ভড়ে উঠেছিলো এবং সেগুলো সর্পিলভাবে এঁকেবেঁকে নীচে নেমে আসার পথে অনেক পাতা জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। আমি নুসরাতের দিকে তাকালাম। সে তখন তার হাঁটুর উপর মাথা দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছিল। তার আঙ্গুলগুলো তখনো ব্যস্তভাবে দাগ কেটে চলেছে।

কিন্তু তার পরপরই আমি খেয়াল করলাম যে তার হাত ধীরে ধীরে শিথিল ও স্থির হয়ে গেলো। সে একটি শাদা পোশাক পরে ছিল এবং ছোট ছোট হলুদ পাতায় তার মাথার চুল এবং কাঁধ ছেয়ে গিয়েছিল। গাছের নীচটি খুব উজ্জ্বল ও রোদে ঝলমল করছিল কিন্তু সেদিন এতোই গরম পড়েছিল যে বাইরে বসার মতো কোনো অবস্থা ছিল না।  আমি বললাম, “বাইরের পরিবেশ তো ঠাণ্ডা না।“ আমার দিকে তাকানোর জন্য মাথা ওঠাতেই আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, “তোমার কি শীত লাগছে নাকি নুসরাত?” বৃদ্ধ সার্জনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে বসেই রইলো। আমি আবারও জানতে চাইলাম, “তোমার কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে নাকি নুসরাত?” সে ফ্যাকাশেভাবে হেসে বললো,“না, ঠিক সেটি নয়।“  “তাহলে তুমি এই রোদের মধ্যে কেন বসে আছ?” এই প্রশ্নের উত্তরে সে কিছুই বললো না। “কেন তুমি বাড়ির ভেতরে যাচ্ছ না?” “এখানে তো সূর্যের নীচে ভীষণ গরম।“ বলেই আমি পাশের দরজাটি নির্দেশ করে দেখালাম। বৃদ্ধ সার্জনের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি উত্তর দিলো, বাবা আমাকে এখানেই বসে থাকতে বলেছেন। ওর কথার উত্তরে আমি বললাম “ ওহ! তাহলে চল আমরা তাঁর কাছে গিয়েই বসি।“ যদিও তাকে দেখে বোঝা গেলো যে আমার উপদেশ শুনে চলার ব্যাপারে সে খুবই আগ্রহী কিন্তু সেখানে বসে ছিল সেখান থেকে ওঠার কোনো আগ্রহ ওর মধ্যে দেখতে পাওয়া গেলো না। আমি আবারও তাকে তাড়া দিয়ে ওর ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মেয়েটি খুব ধীরে ধীরে নম্রভাবে তার মাথাটা পায়ের দিকে ঝকালো এবং সেদিকে দেখিয়ে বললো, “ আমার তো হাঁটার মতো অবস্থা নেই।“ আর ঠিক তখনই আমি খেয়াল করলাম যে তার পাগুলো এমনভাবে দুমড়েমুচড়ে কালচেসবুজ হয়ে ফুলে উঠেছে যে, সেটি যে একজন মানুষের পা সেটাই আর বোঝার কোনো উপায় নেই। জায়গায় জায়গায় চামড়া ফেটে শরীরের লাল মাংস বেরিয়ে পড়েছে। ডানপা’টি সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে মুচরে গিয়েছিল। এবং ডান পায়ের তলা দিয়ে সে বাম পায়ের ফুলে ঢোল হয়ে কুঁচকে যাওয়া আঙুলগুলো ঢেকে রেখেছিল। দেখে মনে হচ্ছিলো বাঁ পায়ের আঙুলগুলো ভেঙে যাওয়ার অনেক আগেই ডান পায়ের তলাটি ওগুলোকে জোর করে নিজের দিকে টেনে শুষে নিয়ে নিজের ভেতরে একেবারে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে সেগুলোকে অদৃশ্য করে ফেলতে চাইছিল। পুরো ব্যাপারটি দেখে মনে হচ্ছিলো পায়ের পিছনের পেশিতে নীল শিরাগুলো এমন ভয়াবহভাবে বিস্ফারিত হয়ে ফুলে উঠেছে যেন এরা জীবনমরণ যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে।  আমি ওকে বারবার করে জিগ্যেস করতে লাগলাম, “কী হয়েছে তোমার নুসরাত?” আমার প্রশ্নের উত্তরে ও বলল, “সবাই বলছে যে আমার পা দুটোকেই কেটে ফেলে দিতে হবে। কিন্তু বাবা চায় যেন আমি একবার তাঁকে পাগুলো দেখাই…।“  কথাগুলো বলার সময় ওর কণ্ঠস্বর এতোই অস্পষ্ট হয়ে গেলো যে আমি ওর পরের কথাগুলো আর শুনতেই পারলাম না। আমি বৃদ্ধ সার্জনের দিকে তাকালাম। তিনি তখন একের পর এক তাঁর অস্ত্রপ্রচারের লোহার যন্ত্রপাতিগুলো তুলে তুলে চোখের সামনে রেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন। কাছেই একটি মাটির পাত্রে কিছু একটা টগবগ করে ফুটছিল এবং সেটির ধোঁয়ায় পোর্টিকো একেবারে ছেয়ে গিয়েছিল। আমি শুনতে পেলাম নুসরাত বলছে, “বাবা বলেছেন আমি কাউকেই কিছু জানতে দেবো না। তিনি আরও বলেছে যে তিনি আজকেই কাজটি করবেন কারণ আজকে প্রত্যেকেই অন্যকোথও নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমি জানতে চাইলাম “কিন্তু এসব কীভাবে ঘটলো নুসরাত?”আর তারপরেই সে পুরো ঘটনাটি সবিস্তারে আমাকে জানালো। আমি এখন ওর বর্ণনাকৃত অনেক কথাই ভুলে গেছি। যতটুকু মনে আছে সেগুলোও ওর সেই কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি হয়ে না উঠে হরদম সেগুলো ফিসফিসানির মতো শোনায়। সম্ভবত সে অবর্ণনীয় ব্যথার মধ্যে ডুবে ছিল। সে কয়েকজনের কথা উল্লেখ করেছিল যারা একটি গাড়ি চালিয়ে খুব তাড়াহুড়ো করে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সম্ভবত সেখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু কোনো একটা কিছু সেই গাড়িটির পথ রোধ করে ছিল। আর সেখানেই নুসরাত ছিল এবং সেই গাড়িটি সেখান থেকে বের হয়ে আসতে চাইছিল। গাড়িটি খুব কাছে চলে এসে সেটিকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় যতটুকু জায়গা ছিল নুসরাত দ্রুত সেখান থেকে সড়ে যেতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে রাস্তাটি থেকে বের হয়ে আসার আগেই গাড়িটি ঝাঁকি দিয়ে সামনে এসে পড়লো। এবং তার পা’দুটোকে চুরমার করে ভেঙে দিয়ে চলে গেলো। কোনওদিকে এতোটুকু খেয়াল না করেই গাড়িটি নির্বিঘ্নে সামনের দিকে এগিয়ে চলে গেলো। এদিকে নুসরাত দীর্ঘসময় ধরে কারও কোনো সহযোগিতা ছাড়াই পা ভেঙে রাস্তায় সেভাবেই পরে রইলো। কথাগুলো শুনে আমি রাগে চিৎকার করে উঠে জানতে চাইলাম,”ওরা আসলে ক্যামন মানুষ? তোমার উপর দিয়ে যে ওরা গাড়ি চালিয়ে চলে গেলো সেটা পর্যন্ত কি ওরা খেয়াল করলো না?” নুসরাত বললো, “সত্যি কথা বলতে কী তারা আসলে সেটা লক্ষ্য করেছিল আর তাই শুধুমাত্র সামনের চাকাগুলোই আমার পায়ের উপর উঠিয়েদিয়েছিল। আর তাই খুব শিগ্রিই তারা গাড়িটিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দক্ষতার সাথে একদিকে ঘুরে গিয়ে পিছনের মূল চাকাগুলোর হাত থেকে আমার পা’দুটোকে রক্ষা করেছিল। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “কিন্তু ওরা তো তোমার জন্য থামেনি। এমনকি তুমিও তো ওদেরকে থামাতে পারলে না।“ নুসরাতের কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হয়ে উঠলো। সে বলল, “ আসলে ওদের খুব ব্যস্ততা ছিল। তবুও আমি কিন্তু ওদেরকে আমার অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম…।” আমি জানতে চাইলাম, “তুমি ওদেরকে ঠিক কী বলেছিলে নুসরাত?” “আমি ওদেরকে বলেছিলাম, আমার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো দয়াকরে। দ্যাখো আমি কতটা অসহায় হয়ে পড়েছি।“  নুসরাতের কথা শুনে দুঃখের মধ্যেও আমি না হেসে পারলাম না। আমি বললাম, “হায়রে! কী অর্থহীন এসব কথাবার্তা!” নুসরাত জানতে চাইলো, “এরচেয়ে ভালো কী এমন কথা আমি ওদের বলতে পারতাম? আর ওরা যদি আমার কথা শুনতেও পেতো তবুও ওরা কিছুই করতো না। কিন্তু তুমি কী মনে করো? আমি আসলে ওদেরকে এছাড়া আর বেশি কী এমন বলতে পারতাম?“ নুসরাতের প্রশ্নের উত্তরে আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, আসলে কিছু বলেও লাভ হোতো না। আমি ওকে অনুকরণ করে বললাম, “দ্যাখো আমি কতটা অসহায় হয়ে পড়েছি’  এসব কথাবার্তায় ওদের মতো মানুষদের কখনোই কিছু এসে যায় না। তুমি কি সত্যিই এখনও বুঝতে পারনি যে ঐ লোকগুলো আসলে কোন ধরণের লোক ছিল? ও উত্তর দিলো, “মানুষ তো এমনই হয়!” কথাটি বলে সে আবারও একবার দুই হাঁটুর মধ্যে নিজের মুখটা গুঁজে দিলো।

যখন বুঝতে পারলাম ও আমার কথাগুলো শুনে কেঁদে ফেলবে না, তখন আমিওর সাথে কথাবার্তা চালিয়ে গেলাম। “ আচ্ছা, তাহলে তারপর কি ঘটেছিল?এই অবস্থায় তুমি সেখান থেকে কী করে বেড়িয়ে আসলে?” ঠিক যখনই সে ঘটনাটি সম্পর্কে বলতে শুরু করলো, আমি একটি তীক্ষ্ণ শব্দ শুনতে পেলাম। আমি পিছনে ফিরে বৃদ্ধ সার্জনের দিকে তাকালাম। তিনি তাঁর হাত দিয়ে কোমর চেপে ধরে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। নিশ্চিত হলাম যে সার্জনের কাছ থেকে শব্দটি আসছে না। আমি আবারও নুসরাতের দিকে তাকালাম। ওর ঠোঁটগুলো তখনো নড়ছিল কিন্তু কোলাহলের শব্দে তার নম্র কণ্ঠস্বর ঢেকে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত আমি বুঝতে পারলাম যে শব্দটির উৎস কোথায়। একটু স্পষ্ট করে দেখার জন্য আমি পিছনে কিছুদুর হেঁটে গেলাম।আমি বাইরের ঘরের সামনে গাড়িগুলোকে টেনে আনতে দেখলাম। খারাপ মহিলাটি এসে পৌঁছলো। আমি দৌড়ে গেলাম। বাইরের ঘরের বেশীরভাগ আসনই ততক্ষণে দখল হয়ে গেছে। সম্মানিত অতিথিগণও এসে পৌঁছেছেন। তাঁদেরকে দেখে অস্বাভাবিকরকম গুরুগম্ভীর মনে হচ্ছিলো। বাড়ির বড়রাও তাঁদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অতিথিপরায়ণ হয়ে আরওবেশী গুরুগম্ভীর হয়ে মেহমানদারী করবে কী না সেটি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে রইলো। বেশকিছু সংখ্যক মহিলাও সেখানে উপস্থিত ছিল। একজন শ্রোতা হিসেবে খারাপ মহিলাটিও সেখানে ছিল। আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী মহিলাটি দেখতে আর সবার তুলনায় খুব বেশি অন্যরকম ছিল না।তিনি একের পর এক করে বেশ কয়েকটি শাল দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এতকিছুর পরেও তাঁর চেহারার ক্লান্তির ছাপ লুকানো সম্ভব হয়নি। যদিও প্রকৃতপক্ষেই তিনি অসংখ্য কাপড়ের নীচে চাপা পড়ে ছিলেন তবুও তাঁর পেটের কিছু অংশের নীল শিরাগুলো স্পষ্টত ভেসে ছিল। নিঃশ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে তাঁর ঠোঁটগুলো একটু ফাঁক হয়ে পড়ে। তখন তাঁর সামনের দুইটি দাঁত বের হয়ে যায়। আর তিনি যখন ঘনঘন শ্বাসপ্রশ্বাস নেন তখন দাঁত দুইটি একেবারে বেরিয়ে থাকে। তাঁকে দেখে আমি একবারেই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর পাশের সিটে একটি মেয়ে বসে ছিল। একটু পরপর তিনি মেয়েটির দিকে ঝুঁকে গিয়ে কী কী সব শলাপরামর্শ করছিলেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েটা এদিকওদিক তাকাচ্ছিল এবং একসময় আমার দিকেও তার চোখ পড়লো। মেয়েটি উঠে আমার দিকে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলো, “আচ্ছা এখানে কি এক গ্লাস জল পাওয়া যাবে?” আমি তক্ষুনি দ্রুত রওনা দিলাম। আমি যখন গাছের নীচ দিয়ে পাশের দরজার দিকে যাচ্ছিলাম দেখলাম নুসরাতের ঠিক সামনে বয়স্ক সার্জনটি বসে আছেন এবং খুব কাছ থেকে ওর পাগুলোকে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন। আমার পদশব্দ শুনেই তিনি আমার দিকে মুখ তুলে সুক্ষভাবে তাকালেন এবং বোঝার চেষ্টা করলেন যে আমি আসলে কে হতে পারি? আমি অভ্যাসবশত গাছের  ডালপালাগুলোকে ঝাঁকি দিতেই তিনি তৎক্ষণাৎ আমাকে চিনে ফেললেন। ভেতরের ঘর থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে আমি দ্রুত পায়ে বাইরের ঘরের দিকে আসার পথেও খেয়াল করলাম যে বুড়ো লোকটি তখনো নুসরাতের পা’দুটিকে খুব মনোযোগের সাথে খেয়াল করে চলেছেন। খারাপ নারীটি মুহূর্তের মধ্যেই ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে পুরো এক গ্লাস জল পান করে পাশের মেয়েটির কাছে খালি গ্লাসটি দিলো। এরপর মেয়েটি আমার কাছে গ্লাসটি ফিরিয়ে দিলো। এবং  আমাকে তাঁর জন্য পরপর তিনবার জল নিয়ে আনতে হয়েছিলো।যেহেতু তখনও সম্মানিত অতিথিদের সবাই এসে পৌঁছায়নি ফলে আমার হাতে এসব কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল। ঘরটির ভেতর কিছুক্ষণ পরপর একেবারে নিস্তরঙ্গ নীরবতা নেমে আসছিলো। বড়দের মধ্যে কেউ না কেউ সেই নীরবতা ভাঙ্গার জন্য গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু একটা মজার বিষয় নিয়ে তাঁর পাশের সিটে বসা মানুষটির সাথে কথাবার্তা চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এরপর চতুর্থবারের মতো আমি সেই মেয়েটির জন্য জল নিয়ে আসলাম এবং মেয়েটি ধীরেধীরে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে সেই জল খেলো। গ্লাসের ভেতর রিফ্ল্যাক্ট হয়ে সেই জলকে অনেকবেশি জল মনে হচ্ছিলো এবং সেখান থেকে মেয়েটির দাঁত দুটোকে উদ্ভট দেখাচ্ছিল। জল খেয়ে সে আমাকে গ্লাসটি ফিরিয়ে দিতেই আমি দরজার পাশের মেঝেতে সেটি রেখে দিলাম এবং মেয়েটি খারাপ নারীটির পাশে গিয়ে আবারও বসে পড়লো। এরমধ্যেই ঘরের পরিবেশটি এতোটাই গুরুগম্ভীর হয়ে উঠলো যে আমি কিছুক্ষণের জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে আসলাম। গাছের নীচ থেকে যেতে যেতেই আমি বুড়ো সার্জনের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। “এদিকে একটু এসো”  বলে তিনি আমাকে তাঁর কাছে ডাকলেন। আমি তাঁর দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই তিনি আবারও বললেন, “আরও একটু কাছে আসো।”আমি তাঁর  কাছে যেতেই তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধে রেখে আমাকে তাঁর খুব কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ নুসরাতের পা দুইটি একসাথে জোড়া লেগে গেছে। শোনো, এখন প্রথম কাজ হচ্ছে এগুলোকে আলাদা করতে হবে। আর এই কাজটি ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক। ও হয়তো ভয়ানক  কষ্টে মোচড়ামুচড়ি করে চিৎকার করে কাঁদবে। তখন আমি ওকে একা সামাল দিতে পারবো না। আমার দেহে সেই শক্তিটুকু এখন আর অবশিষ্ট নেই।“ আমি নুসরাতের দিকে তাকালাম, তাঁর চোখে আমি আতঙ্ক দেখতে পেলাম যদিও সেই অবস্থাতেও ও মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। বৃদ্ধ সার্জন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে আবারও বললেন, “হয়তো তুমি ওর সাথে কথাবার্তা বললে ওর মনোযোগ সেদিকে থাকবে। এমনসব কথাবার্তা বলবে যেন আমার দিকে খেয়াল না করে ওর মন একেবারে অন্যদিকে ঘুরে যায়। এজন্যই এমন সব কথা বলে ওকে ভুলিয়ে রাখবে যেন হঠাৎ করে সে এমনভাবে পাগুলোকে ঝাঁকি দিতে না পারে যাতে ওর ভয়াবহ কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি ও যদি এমন করে তাহলে ওর বাঁপা’টি  কেটে ফেলতে হবে। দয়া করে তুমি এমন কিছু হতে দিও না। আমি যখন তোমাকে ইশারা করবো তুমি কিন্তু ওকে আমি কি করছি সেটা থেকে একেবারে ভুলিয়ে রাখবে। এটা নিশ্চিত করবে যেন সে একেবারেই শান্ত হয়ে থাকে। একেবারেই শান্ত থাকতে হবে!“এরপর তিনি নানা হাসির কথাবার্তা বলে ওকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেন কিন্তু তাতে কোনোই কাজ হোলো না। ফলে আমি ওকে আদিম মানুষদের সম্পর্কে নানা উপাখ্যান বলে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম। সার্জারি সম্পর্কে যেসব সাফল্যগাঁথা শুনেছিলাম আমি তাকে সেসব বলে ভুলিয়ে রাখাতে চেষ্টা করলাম। আর সেইসময়টিতেই বৃদ্ধটি নুসরাতের পাগুলো নানা দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং তার পাগুলোকে নানাভাবে মেঝেতে রেখে রেখে কাজের সঠিক উপায়টা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।আমি অনেকক্ষণ ধরে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি আমাদের পরিবার সম্পর্কে নানা মজাদার গল্পগুজব করে ওকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম।  এরপর আমি ওর সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। তবে অনেক কথাবার্তা যে চালাতে পেরেছি বা সেগুলো যে খুব বেশি যৌক্তিক আর সুসংগত ছিল তাও নয়। আমি ওর সম্পর্কে কী বা এমন জানতাম? সবই একই হোতো! আমি শুধুমাত্র চেষ্টা করেছিলাম ও যেন ব্যাপারটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হয়ে না পড়ে। তবে এখন আমি এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি যে নুসরাত তখন বুড়ো সার্জনের কথা নিয়ে একটুও ভাবছিল না। পুরোসময় ধরে আমি তার দিকে বারবার লক্ষ করেছি। আমি যাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে তিনি তেমনই ইঙ্গিত দিলেন। আমি এখন আর মনেই করতে পারি না আমি কীভাবে এমন উদ্ভট কথা বলেছিলাম। তবে সেটিই শেষ ছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, “ তুমি কি জানো নুসরাত? প্রথমদিন তোমাকে দেখে আমার কী মনে হয়েছিলো? জানো তোমাকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিলো যে তুমি একটা অপূর্ব ফুলের বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ!” মুহূর্তের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম যে আমি একটা ভয়ানক ভুল করে ফেলেছি। আমি তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলিয়ে ফেললাম। আমি বললাম, “ আচ্ছা নুসরাত আমি কী এখন তোমাকে তোমার হাতগুলোকে নিয়ে দারুণ কিছু বলতে পারি যা কেউ আগে শুনেনি? আর সেসময়ই আমি দেখলাম বৃদ্ধ লোকটি আমাকে সেই অশনিসংকেতটি দিলেন। আমি সেই মুহূর্তেই ওর হাতদুটি জোড়ে চেপে ধরলাম। এবং ফিসফিস করে বলতে লাগলাম, “বল আমি কি বলবো সেই গল্পগুলো?”সেসময় আমি হঠাৎ করেই বাইরের ঘর থেকে একটি বিকট চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম এবং একটু পরেই সেটা মিলিয়ে গেলো। সেইসাথে ওর হাতদুটো আমার হাতের মুঠোর ভেতর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। ওর মুখটা দেখলাম একেবারে নীল হয়ে স্থবির হয়ে পড়লো এবং তারপর একেবারেই ধূসর হয়ে ফ্যাঁকাসে হয়ে গেলো। ও দাঁত দিয়ে ওর ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল এবং ওর চোখেমুখে এক নিদারুণ যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছিলো। বৃদ্ধ লোকটিকে বলতে শুনলাম, সব ঠিক আছে। সবকিছুই একেবারে ঠিকঠাক আছে। খুব ভালো হয়েছে! এখন আমি ওকে একেবারেই সুস্থ করে তুলবো। শুধু একটু অপেক্ষা করে দ্যাখো আমি কী করি।“  আমি বৃদ্ধ লোকটির দিকে ফিরে তাকালাম। সে তাঁর হাতগুলো দিয়ে নুসরাতের পাদুটোকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দিয়েছিল। নুসরাতের পায়ের অবস্থা ঠিক কী রকম হয়েছে সেটা দেখার ব্যাপারে আমি খুবই উৎসুক ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে তীব্রভাবে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, “ওর পায়ের দিকে একেবারেই তাকাবে না। এবং ওকেও কোনওভাবেই সেটা দেখতে দেবে না।“ আমি আমার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে গাছের ডালপালার ভেতর মাকড়শার জাল বুনা দেখতে লাগলাম। চারদিকে শুধুমাত্র কিছু অস্ত্রপ্রচারের যন্ত্রপাতির টুংটাং শব্ধ ছাড়া পরিবেশটি তখন একেবারেই নিরবিচ্ছিন্ন নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। সেসময় বৃদ্ধ লোকটি কি বলবে সেটি শোনার জন্য আমি একেবারে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এবং তিনি শেষমেশ আমাকে বললেন, “তুমি এখন ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারো এবং তোমার ব্যক্তিগত কোনো কাজ থাকলে সেটাও করতে পারো। এরপর যাকিছু হবে আমি সেটা সামলাতে পারবো।“ আর ঠিক সেই সময়েই আমি বুঝতে পারলাম যে আমি তখনো নুসরাতের হাতগুলো আঁকড়ে  ধরে আছি। নুসরাতের হাতগুলো তখন দরদর করে ঘামছিল এবং সে তার মাথাটিকে দুই হাঁটুর মধ্যে আবারও গুঁজে দিলো। আমি সবকিছু বাদ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। যদিও জানতাম আমি ইতিমধ্যেই অনেক দেরি করে ফেলেছি। তবুও বাইরের রুমের দিকে ধীরেধীরে হেঁটে গেলাম। মৃত্যুর মতো স্তব্ধতা নেমে এসেছিল সেই ঘরটিতে। চেয়ারগুলো সব এলেমেলো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ছিল।এবং কারও কারও পাশে তাড়াহুড়ো করে লেখা কিছু কাগজে লেখা নোটপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল।আমি টুকরো কাগজগুলো উঠিয়ে নিলাম। তাড়াহুড়ো করে লেখা কাগজপত্রগুলো দেখলেই বোঝা যায় যে বড়দের মধ্যে এবং সম্মানিত অতিথিদের মধ্যে এখানে আলাপআলোচনা চলেছে। আমি ছড়ানোছেটানো চেয়ারগুলো আবারও গুছিয়ে রাখালাম।সেই নোটগুলোর মধ্যে লুকানো তথ্যগুলোর পাঠোদ্ধার করেত আমাকে বহু কাঠখড় পুড়াতে হয়েছিলো। তবে যখন আমি সেটা করতে পারলাম আমার অনুপুস্থিতিতে যাকিছু হয়েছে তার সবকিছুই জানতে পেরেছিলাম। আমি টুকরো কাগজগুলোকে বারবার করে এদিকসেদিক লেখাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পুরোপুরিভাবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আর যখনই আমি এগুলোকে অদলবদল করে দেখলাম তখনই বুঝলাম যে আমি যা ভেবেছিলাম সেগুলোর প্রকৃত অর্থ একেবারেই বদলে গেছে। এইসব কাগজপত্র ঘাটাঘাটি করে কিছু একটা তথ্যবহুল ঘটনা খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে আমি অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেললাম এবং সব প্রচেষ্টাই বৃথা গেলো। ওগুলো দেখে আমার চূড়ান্ত কৌতূহল জেগে উঠেছিলো এবং একসময় সেটা মিয়িয়ে গিয়ে একেবারেই উধাও হয়ে গেলো। ঘরটির ভেতরকার অজস্র উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার ঘনঘটায় আমার দম আঁটকে মরার দশা হোলো। বুঝতে পারলাম আর এক মুহূর্তও আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমি রুম থেকে বের হওয়ার সময় লক্ষ করলাম যে দরজার কাছে আমি গ্লাসটিকে যেভাবে রেখেছিলাম সেটি ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। আমি সেটি না উঠিয়েই সোজা গাছের নীচে চলে গেলাম। কিন্তু সেখানে ঝরা হলুদ পাতা বিছানো কার্পেট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমি নিঃশব্দে বৃদ্ধ সার্জনের বারান্দার দিকে তাকালাম। সেখানেও শুধু ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। অল্পকিছুক্ষনের মধ্যেই আমার পুরো বাড়িটিই খালি হয়ে যেতে লাগলো। একের পর এক আমার কাছের সব লোকগুলো একইভাবে মারা যেতে লাগলো। বড়রা এতোই ধ্রুত মারা গেলো যেন ওরা এক দলা ভাতের পিণ্ড আর কোনো একটি স্যাঁতস্যাঁতে হাত তাদেরকে পরিষ্কার করার জন্যমাটির উপর পিশে দিচ্ছে। আমি এগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমি হয়তো একটি দুঃস্বপ্ন দেখছি আর এখনই ঘুম ভেঙে লাফিয়ে জেগে উঠবো। মাঝেমাঝে আমি ভয় পেতাম। তবে যাইহোক না কেন আমি শেষমেশ একটি বিশাল বাড়ির ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করলাম এবং কোনো না কোনোভাবে একাকীত্বের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি সারাক্ষণই বাড়ির প্রতিটি কোণায় কোণায় ভীষণ উদ্বিগ্ন অবস্থায় অস্থির হয়ে খুঁজতে খুঁজতে পায়চারী করতে লাগলাম, এমনকি একটি ক্ষুদ্রতম অংশতেও কিছুক্ষণ না খুঁজে থাকতে পারতাম না। সেই সময়গুলোতে কেউ যদি আমাকে দেখতো তাহলে বুঝতে পারতো যে আমি কোনো হারানো বস্তু খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছি। এবং একদিন আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম যে আমি বাইরের ঘরটিতে একবারও খুঁজতে যাইনি। এরপরই আমি সেখানে গেলাম। সবসময়ের মতোই মূল দরজাটি হাট করে খোলা ছিল। এবং ভারী পর্দাগুলো খুব ধীরে ধীরে দোল খাচ্ছিলো। ঘরের ভেতরের বাতিটা এতোটাই টিমটিম করে জ্বলছিল যে সবচেয়ে দূরের চেয়ারটি ঝাপসা দেখাচ্ছিল। ঘরের ভেতরের মৃদু আলোতেও আমি ধুলোর পুরু স্তর দেখতে পেলাম যা আমাকে তীব্রভাবে কৌতূহলী করে তুললো। দেয়ালগুলোও ধুলোর পুরু স্তরে ঢেকে ছিল। আর দেয়ালে টাঙানো বড়দের তৈলচিত্রগুলোও খুব বিবর্ণ ও নিস্তেজ মনে হচ্ছিলো। একিসাথে আমি সেই অস্বাভাবিক ছবিগুলোর উপর হাত বুলাতে লাগলাম এবং  সেখানে আমার হাতের ছাপ পড়তে লাগলো। বড়দের ছবিগুলোর ওপরে জমা ছোপছোপ ধুলোগুলোকে আমি আমার হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলাম। তারা এতোই জীবন্ত হয়ে উঠলো যে আমার তাঁদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করলো। আর আমি যখন কথা বললাম আমার কণ্ঠস্বর আমি সেই ঘরের ভেতর অনুরণন হতে শুনলাম। আমি অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা বললাম। একটি ছবির কাছে এসে আমি আর না এগিয়ে থেমে গেলাম। একটি দয়ালু মুখ আমার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কোনো একটা কিছু হারানোর অনুভূতি আমাকে অভিভূত করে ফেললো এবং আমি সেই ছবিটার সাথে আমার কপাল ছোঁয়ালাম।

আমি বললাম, “আমার সবকিছু মনে আছে।“ সেই উদ্বিগ্ন চোখগুলো আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল। “কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই। এই মুহূর্তের আগপর্যন্ত আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে কীকরে একটি বাড়িকেই একিসাথে সম্পূর্ণভাবে শূন্য মনে হয়েও আবার জনারণ্য মনে হতে পারে। তাও এই ঘরটিকেই…” আমি সম্পূর্ণ ঘরটির ভেতর চোখ বুলিয়ে নিলাম, “এই রুমটিতে, কোনো একসময়…”

দরজার পাশের মেঝেতে রাখা গ্লাসটির ওপর আমার চোখ পড়লো, “কিন্তু কেন সেই খারাপ মহিলাটিও… “  ঠিক সেইসময় আমি একটি পোশাকের খসখস শব্দ শুনতে পেলাম যা আমাকে সেদিকে ঘুরে তাকাতে বাধ্য করলো। কেউ একজন দূরের অন্ধকারে চেয়ার থেকে আমার দিকেই হেঁটে আসছে। এবং এটি একজন নারী ছিলেন। আচ্ছা তিনি কি সেই খারাপ নারীটি? অবাক হয়ে আমি সেটাই ভাবছিলাম। কিন্তু তারপরেই আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। সে কোমল স্বরে বলল, “ তুমি আমাকে চিনতে পারোনি।“ সে এখন আরও কাছে চলে এসেছে। আমি ঝুঁকে তার পাগুলো স্পর্শ করে দেখার চেষ্টা করলাম সেগুলো একেবারেই সেরে গেছে কিনা। আমি ওকে বললাম, “ এটা সত্যি অভূতপূর্ব! আমি ভীষণ খুশি হয়েছি যে তোমার পাগুলো একেবারে ভালো হয়ে গেছে।“ এরপর সেখানে এক গভীর নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছিল আমাদের দুজনের মধ্যে যেখানে আমাদের কেউ একটি শব্ধও উচ্চারণ করতে পারলাম না। আমি বললাম, “আমি আশা করছি যে তোমার পায়ে কোনো দাগ নেই।“ ভারী পর্দার নীচ থেকে আসা আলোতে সে তার পা দুটো একের পর এক আমার সামনে মেলে ধরল। এবং বলল, “ দ্যাখো, কোনো দাগ পর্যন্ত নেই।“  আমাদের ভেতর আবারও দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসায় আমি বলতে বাধ্য হলাম যে, “ কিছুদিন পর তুমি এমনকি মনে করতেও পারবে না যে কী অসহ্য ব্যথা তুমি তখন সহ্য করেছিলে।“

ওকে দেখে মনে হোলো ও খুব বিরক্ত হয়েছে। এবং কথা বলার সময় এমন দ্বিধান্বিতভাবে কথা বলল যেন ওর খুব বড় কোনো ভুল হয়ে গেছে। ও বলল, “কিন্তু আমার ব্যথার কথা মনে পড়বে। আসলে প্রথমে সবাই তাই ভেবে নিয়েছিল যে, দাগ না থাকলে কেউ কখনো তীব্র ব্যথার কথা এমনকি সেই বৃদ্ধ সার্জনের কথাও মনে করবে না। আসলে সেই ক্ষতের দাগগুলো অবশ্যই রয়ে যেতো কিন্তু বাবা নিজেই… বাবা বলেছিলেন, পায়ে কোনো দাগ থাকা ঠিক নয়।” এরপর ও আরও দু’তিনবার একই কথা বলেছিল, “আমি কিন্তু বাবাকে কিছুই বলিনি।“ আমি আমার হাত উঠিয়ে ওকে থামতে বলে বললাম, “শোনো তোমাকে এ নিয়ে আর কিছু বলতে হবে না। আমি তোমাকে কোনোকিছু নিয়ে দোষারোপ করছি না।তবে এটাই বলতে চাচ্ছি যে আসলেই তোমার পায়ে এখন আর কোনো ক্ষতের চিহ্নই নেই। “আমার দৃঢ় কথাবার্তা আমার কাছেও খুব রুক্ষ মনে হয়েছিল। আমি নিজেকে শান্তনা দিলাম এই বলে যে, এটা আমার জন্য ঠিক না। কিন্তু আসলে আমার কিছুই করার ছিল না। সবাইকে হারিয়ে আমি ভীষণ কষ্টের ভেতর ছিলাম। আমি ওকে বললাম, “তুমি নিশ্চয়ই খুব অবাক হচ্ছো যে আমি এভাবে কেন কথা বলছি। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ যে সেদিন গাছের নীচে তো আমি এভাবে তোমার সাথে কথাবার্তা বলিনি।” নুসরাত নিজের পায়ের দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলো, “আসলে সেটা একটি অন্য দিন ছিল।“

ওর কণ্ঠস্বর আরও কোমল হয়ে উঠলো যখন ও বলল যে, “এবং সেদিন আসলে আমি অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম।“ ও ঘাড় উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে করুণ স্বরে বলল, “সেইদিনটি ছিল আমার প্রতি করুণা ও সমবেদনা দেখানোর দিন।“  আমি জোরে বলে উঠলাম, “আর আজকের দিনটা তাহলে কী? এটাও কি আসলে সহানুভূতি দেখানোর দিন নয়? তুমিও কি এই দিনটির জন্যেই প্রতীক্ষায় ছিলে না?” কথাটি বলেই আমি ওর দিকে খুব তাড়াতাড়ি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বললাম, “কিন্তু শুনে রাখো নুসরাত, আমি এই কথাটি বলতে চাই যে আমার অবস্থা কিন্তু তোমার মতো এতো করুণ নয়। আমি কি কখনো তোমাকে এই কথাটি আগে বলেছি?”

কথাগুলো শুনে ওর চোখের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিলো এবং ওর কণ্ঠস্বর থরথর করে কেঁপে উঠেছিলো। হঠাৎ ও চাঁপা গলায় বলে উঠলো, “আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি যে সবকিছু এভাবে বদলে যাবে।“ ওকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আমি তাড়াতাড়ি ওর হাতটি চেপে ধরে ওকে ঠেকালাম। ওকে স্থির হতে দেখে আমি ওকে ছেঁড়ে দিয়ে পিছনের দিকে ফিরে গেলাম। ওর মুখটা সম্পূর্ণ বিবর্ণ হয়ে পড়লো এবং ও একেবারে হতবাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। ও দীর্ঘ সময় ধরে ও এতোটাই হতবুদ্ধির নিশ্চল হয়ে রইলো যে ওকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন সেও এই ঘরটির ভেতরে রাখা কোনো জড়বস্তু। ওর বাহুতে আমার ময়লা হাতের দাগ লেগে গিয়েছিল। তখন আমি খুব অনুতপ্ত বোধ করতে লাগলাম।

আমি বললাম, “আমি ভীষণ দুঃখিত নুসরাত, এই রুমটি তো একেবারে ধুলোয় ভরে আছে। অথচ তুমি তো শাদা পোশাক খুব ভালোবাসো। আর শাদা তোমাকে খুব মানায়। আমি শুনেছি তোমার শাদা পোশাকের জন্য অনেকেই তোমাকে খুব সমীহ করে চলে। কিন্তু আমার কথা যদি বল তাহলে বলবো আমি আসলে কালো রঙটিকেই বেশি পছন্দ করি। তুমি কি জানতে চাও কেন আমি কালো পছন্দ করি?”ও মাথা উঁচু করে আমার দিকে তাকাল। কোথাও একটা এমন লাইন পড়েছিলাম যে ,”কালো রঙটি শূন্যতার প্রতীক!” এবং এই লাইনটির কথা আমি কখনোই ভুলতে পারিনি ফলে এই লাইনটির কথাই আমি বারবার করে ওকে বলতে লাগলাম। সবকিছু হারিয়ে ফেলার মতো এক অভূতপূর্ব অনুভূতি আমারে আবারও গ্রাস করে নিলো। আমার এখন আর বলতে পারবো না যে নুসরাত আমাকে কিছু একটা বলার জন্য ঠিক কতক্ষণ সেখানে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু একসময় আমি দেখলাম যে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। আমি গ্লাসটি ভাঙার নিঃশব্দ আওয়াজ শুনতে পেলাম এবং দেখলাম দরজার কাছে এসে নুসরাত একটু ইতস্তত করলো। এরপর ও ভারী পর্দাটি তুলল। হঠাৎ করে বাইরের আলো রুমের ভেতর প্রবেশ করেই আবার উধাও হয়ে গেলো। ও ছিল নিঃশব্দে হাঁটাচলা করা একটি মেয়ে। ওর চলাচলের কোনো শব্ধ আমি শুনতে পাইনি।আমার মনে পড়ে গেলো যে এই রুমের ভেতর দীর্ঘক্ষণ থাকার ফলেই আমি বাড়িটির অন্যান্য স্থানের কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আর এই কথা মনে পড়তেই আমি সাথেসাথেই রুমটি থেকে বেরিয়ে গেলাম। দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় আমার চোখ গ্লাসের ওপর পড়লো। এরমধ্যেই এটি ভেঙে গেছে। আমি পা দিয়ে টুকরোগুলো ঠেলে একপাশে সরিয়ে রাখলাম। সেই ভাঙ্গাচুরা টুকরোগুলোর কোণায় আমি কিছু একটা জিনিসের দাগ লেগে থাকতে দেখলাম, একবারে তাজা রক্ত! এমনকি এই বিবর্ণ টিমটিমে আলোতেও সেই তাজা রক্তের দাগ আমি প্রথম দেখাতেই চিনতে পারলাম।পরবর্তীতে সেই গাছের নীচ দিয়ে চলাচল করার মতো সৌভাগ্য আমার অনেকবারই হয়েছিল। সেটি আবারও ঘন পাতায় ভরে উঠেছিলো। ডালপালাগুলো পাতার ভারী বোঝা সামলাতে না পেরে মাটির দিকে এতোটাই ঝুঁকে গিয়েছিল যে সেগুলোর নীচ দিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে হামাগুড়ি দিতে হোতো। এবং যদি দৈবাৎ কখনো আমি বেভুল হয়ে সেদিক দিয়ে হেঁটে যেতাম তাহলেই নরম পাতাগুলো আমার চোখেমুখে এসে একেবারে আঁছড়ে পড়তো। তখন আমি ভাবতে বাধ্য হতাম যে, কেন আমার আসাযাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানো এই ডালপালাগুলোকে আমি ছাঁটাই করছি না? একদিন আমি পাশের দরজার দিকে যাচ্ছিলাম। গাছের কাছে যেতেই আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই একটু নিচু হয়ে গেলাম। কিন্তু তবুও একইভাবেই মুখে পাতাগুলোর খোঁচা খেলাম। খেয়াল করলাম ডালপালাগুলো সেভাবেই নীচের দিকে ঝুঁকে আছে। আমি খুবই বিরক্ত হলাম। আমি হাত বাড়িয়ে সেগুলোকে এমনভাবে ডানেবাঁয়ে ঝাঁকি দিয়ে ঠেলে দিলাম যেন তারা আগের চেয়েও বেশি জোরে আমার চোখেমুখে এসে আঘাত করতে পারে।আমার মুখ ও ঘাড় ভীষণভাবে চুলকাতে শুরু করলো। আমি বেশ কয়েকটি ডালপালা পুরোপুরি ছিঁড়ে ফেললাম এবং সেগুলোকে জোরে জোরে ধাক্কা মারতে লাগলাম। সেই জটগুলো থেকে বাঁচার জন্য আমাকে একেবারেই নিচু হয়ে যেতে হয়েছিলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই আমি আমার গায়ে লেগে থাকা পাতা ও ডালপালাগুলো ঝেড়েঝুরে পরিষ্কার করতে লাগলাম। এবং খেয়াল করলাম কেউ একজন গাছের গুঁড়িটা জড়িয়ে ধরে বসে আছে। সেই ঘনপাতায় আবদ্ধ আবছায়া পরিবেশে কারও মুখ স্পষ্ট করে দেখা সম্ভব নয়। এতকিছুর পরেই আমি কিন্তু ওকে ঠিকই চিনতে পারলাম, “নুসরাত!” ওর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। ওর কাছাকাছি যেতেই দেখলাম ও একটি কালো পোশাক পরে আছে। “নুসরাত!” খুব মৃদুস্বরে ওকে ডাকলাম এবং ওর দিকে আমার চোখ পড়লো। ওর দেহাবয়ব চোখে পড়লো না। কিছুই বুঝতে পারলাম না যে কীভাবে এমন হোলো? আমি ওর দিকে আরও ঝুঁকে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে দেখার চেষ্টা করলাম। হলুদ শুকনো পাতাগুলো ওর মুখটিকে একেবারেই ঢেকে ফেলেছে। আমি ওর মুখ থেকে পাতাগুলো সরানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু দেখতে পেলাম সেগুলো মাকড়শার জালের ভেতরআঁটকে আছে। মাঝপথেই আমার হাতটি আঁটকে গেলো। “নুসরাত!” আমি তাকে আবারও ডাকলাম। আমার কণ্ঠস্বর মিইয়ে যেতে লাগলো। আমি দেখলাম ওর কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত একটি কালো আবরণ দিয়ে ঢাকা। সেই কালো বোরকার ভেতর থেকে তার একটি হাত আলগা হয়ে বেড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিলো যেন সেটি মাটির ওপর বিশ্রাম নিচ্ছে। ওর আঙুলগুলো ধুলোর ঢাকা ছিল এবং ধুলোর ভেতর একটি গোলকধাঁধাঁ আঁকা ছিল। আমি আবারও ওর নাম ধরে ডেকে উঠলাম, “নুসরাত!” কিন্তু মনে হোলো একজন মানুষ যেন শুধু তার নিজের সাথেই কথা বলছে। ওকে জাগানোর জন্য আমি ঝাঁকি দিতে লাগলাম। আমি খুব ধীরেধীরে ওর পাগুলো নাড়ানর চেষ্টা করলাম। কালো আবরণের নীচে আমি লক্ষ করলাম ওর পাগুলোকে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছিল। যেভাবেই হোক আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এই কালো আবরণের নীচে ওর পাগুলো আবারও বিকৃত কাঠামোর হয়ে গেছে। আমি চারদিকে তাকালাম। আমার অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুড়ো সার্জনের বারান্দায় গিয়ে স্থির হোলো। ভাঙ্গাচুরা ছাঁদের গর্ত থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষে মেঝেটা একেবারে বোঝাই হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে শব্দহীন সুনসান নীরবতা। কোথাও কোনো চলাচলের চিহ্ন নেই। গাছের নীচে হঠাৎ করেই ভয়াবহ শীত নেমে এলো এবং আমার শরীরটা প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে লাগলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং এবং পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুঁকে গেলাম। ভেতরে কয়েক পা এগিয়েই ফিরে এসে আমি দরজাটি লাগাতে গেলাম। দরজার দুই পাট শক্ত করে ধরে জোড়া লাগিয়ে দিলাম। দরজাটি সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে চকিতে আমি দরজার ফাঁকের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম যে  নুসরাত তখনো আগের মতো সেখানে বসে আছে কিনা? সে তখনো সেখানেই ছিল। আমি দরজাটি বন্ধ করে দিলাম এবং জীবনে আর কখনোই সেটা খুলতে পারিনি। 

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ ভারতীয় উর্দুভাষী লেখক। জন্ম লখনোউ-এ, (১৯৩৬- ২৪ জুলাই ২০১৭) মূলত তিনি ছোট গল্প লেখেন, অনুবাদ করেছেনকাফকার রচনাবলী। ২০০১ সালে তিনি উর্দু সাহিত্যের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০০৭ এ পেয়েছেন সরস্বতী সম্মান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *