নাইয়ার মাসুদের গল্প : চিঠি

নাইয়ার মাসুদের গল্প : চিঠি

অনুবাদ: জয়দীপ দে

মৃতদের সঙ্গে আমার কাটানো সময়গুলো আজ অতীত

– রবার্ট সোথে

তাদের জন্য যারা বৃদ্ধ, তাদের জন্য যারা আজও নবীন

– ওমর খৈয়াম

শ্রদ্ধেয় সম্পাদক,

আপনার স্বনামধন্য পত্রিকার মাধ্যমে আমি শহরের পশ্চিমাঞ্চলের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করতে চাই। বেদনার সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, যেসময় এ শহরে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, শহরের অন্যান্য অঞ্চলের লোকজন যখন আধুনিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে, সেসময় পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো সাধারণ নাগরিক সুবিধা থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত। মনে হচ্ছে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি যখন পশ্চিমাঞ্চল বেড়াতে গেলাম, তখন বুঝতে পারলাম- শৈশবে এখানকার যা অবস্থা দেখেছি তার কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

ব্যক্তিগত কারণে আমি সেখানে যাইনি। গিয়েছিলাম মায়ের জন্য। কয়েক বছর আগে, যখন আমার বার্ধক্যে পা রেখেছেন, তিনি চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। দৃষ্টিশক্তিও মিলিয়ে আসছে। তাঁর মন হয়ে পড়েছে হতবিহ্বল। তাঁর অসুস্থতার সত্ত্বেও তিনি আমাকে দিনে তিন চারবার ডেকে পাঠান। কাঁপা কাঁপা হাতে আমার সারা শরীর বুলিয়ে দেন। আসলে জন্মের সময় আমি খুব একটা স্বাস্থ্যবান ছিলাম না। তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন আমার শরীর খুব ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কখনো বা খুব গরম। মাঝে মাঝে ভাবেন আমার কণ্ঠস্বর পাল্টে গেছে, বদলে গেছে চোখের রং। আমার মার জন্ম হাকিম পরিবারে। তাই তিনি অনেক রোগের নাম ও লক্ষণ জানেন। কিছুদিন পর পর তিনি বলে উঠেন আমি নতুন কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছি। রোগের চিকিৎসা করার জন্য জোরাজুরি করেন। তাঁর অসুস্থ হওয়ার প্রথম দিকে আমার বার কয়েক এমন হয়েছিল যে কাজের চাপে আমি তাকে দেখতে যেতে ভুলে যেতাম। তিনি, খোদা জানেন কীভাবে- নিজেকে টেনে নিয়ে হাজির করাতেন আমার ঘরের দরজায়। আরো কিছুদিন পর তিনি যখন অবশিষ্ট প্রাণশক্তিও হারিয়ে ফেললেন, ডাক্তার তখন আমাকে দিনে অন্তত একবার সরিয়ে রাখতেন তাঁর চলৎশক্তি পরীক্ষা করার জন্য। তিনি আমার প্রসঙ্গ ভুলে গিয়েছিলেন। অথবা সেরকমই মনে হত। কিন্তু শেষরাতে তাঁর মৃদু প্রলাপ শুনতাম, ছুটে যেতাম তাঁর কাছে। আমি গিয়ে দেখতাম দরজায় যাওয়ার অর্ধেক পথ তিনি অতিক্রম করে ফেলেছেন। আমার বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি মাটিতে শুতেন। দেখতাম তার সঙ্গে বিছনাপত্র। মনে হত বিছনাপত্রই তার সঙ্গে হেটে যাচ্ছে। যখন তিনি আমাকে দেখতেন কিছু বলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তিনি ক্লান্তিতে মূর্ছা যেতেন। কয়েকদিন তিনি অজ্ঞান থাকতেন। তাঁর চিকিৎসক বারবার তাঁর ভুলের কথা বলতেন।তিনি দুঃখ প্রকাশ করতেন মাকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেয়ার জন্য। কারণ এর পর থেকে মা দৃষ্টি ও মানসিকভাবে অচল হয়ে পড়েন। একসময় তাঁর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি এক হয়ে যায়।

এরপর অনেকদিন গেছে। মায়ের চিকিৎসকও মারা গেছেন। সম্প্রতি একরাতে ঘুম থেকে উঠে দেখি তিনি আমার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে আমার বিছানাপত্র গোটাচ্ছেন।

‘তুমি?’ তাঁর রগভাসা হাতের চেটো দেখে বলে উঠলাম আমি, ‘এখানে কী করে?’

‘তোমাকে দেখতে… এখন কেমন আছো?’ স্থবিরভাবে তিনি বলেন গেলেন, যতক্ষণ না একটা হাতবুদ্ধ পরিস্থিতি তাকে গ্রাস করল।

আমি বিছনা থেকে উঠে মেঝেতে তার পাশে বসলাম। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। আমি চেষ্টা করলাম শৈশবে দেখা মায়ের সেই মুখটা স্মরণ করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মুখটা ভেসে উঠল আমার চোখের পর্দায়। ইতোমধ্যে কিছুটা হতবুদ্ধতা কাটিয়ে উঠেন। তাঁকে ধীরে ধীরে উঠতে সাহায্য করতে করতে বললাম, ‘চল, আমার সঙ্গে তোমার রুমেচল’।

‘না’, যন্ত্রণাক্লিস্ট কণ্ঠে বললেন,’আমাকে আগে বল…’

‘কী বলব?’ আমি ক্লান্ত স্বরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘তুমি এখন কেমন আছো?’

সত্যি বলতে কি, কয়দিন ধরে আমার শরীর ভালো যাচ্ছিল না, তাই বললাম,’ ভালো না।’

আমি ভেবেছিলাম তিনি আমার অসুস্থতার বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইবেন। তা না করে তিনি বললেন, ‘তুমি কাউকে দেখিয়েছো?’

‘কাকে দেখালে ভালো হয় বলত?’

আমি জানতাম কোন উত্তরটা আসবে। একটি উত্তর তিনি সঙ্গে সঙ্গে ধারালো কণ্ঠে দিতেন। একটা দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি সেই একই কথা বললেন, কিন্তু আশ্চর্য রকম বিষণ্নতা আর হতাশা নিয়ে, ‘তুমি কেন সেখানে যাচ্ছো না?’

আমি ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে সেখানে যেতাম। সেটা ছিল একটা হাকিম বাড়ি। তারা ছিল মায়ের নিকট আত্মীয়। তাদের বাড়ি ছিল অনেক বড়ো, বিভিন্ন অংশে অনেকগুলো পরিবার বসবাস করত। সে পরিবারগুলোর প্রধান ছিলেন একজন হাকিম সাহেব। শহরে তাঁর খুব একটা নামডাক না থাকলেও আশেপাশের গ্রাম থেকে এতো পরিমাণ রোগী আসত যে, তা শহরের যেকোন নামডাকওয়ালা ডাক্তারের চেয়ে বেশি।

সেখানে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান লেগে থাকত। আমার মা বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হতেন। তিনি মাঝে মাঝে একা আমাকে নিয়ে যেতেন। আমি তাদের অদ্ভুত সব অনুষ্ঠান দেখতাম দারুণ মুগ্ধতায়।

এটা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যেত না সেখানে যাওয়া মাত্র মায়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসত। তিনি পৌঁছামাত্র একটা আনন্দের ঢেউ উঠত পুরো এলাকায়। তার জায়গা থেকে কখনোই সবার প্রতি যথাযথ সৌজন্য দেখাতে হেলা করতেন না। তিনি ছোট ও সমবয়সীদের ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু বয়স্কদের কাছে নিজে গিয়েই দেখা করতেন। সেখানে মাঝেমাঝে পারিবারিক দ্বন্দ্ব দেখা দিত। এসব ব্যাপারে মায়ের বিচার সবাই মেনে নিত।

সে বাড়িতে অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু সবার মুখই আমার কাছে ধোঁয়াশা। কেবল হাকিম সাহেব ছাড়া। সেটা হওয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে তাঁর সঙ্গে মায়ের পারিবারিক মিল ছিল। এখনও আমি স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি, সববয়সী নারী পুরুষ ও শিশু আমাদের ঘিরে ধরত। আমার কাছে মনে হত যেন অনেকগুলো পাতার মধ্যে একটি ফুল।

এখন তার শুষ্ক মুখখানি আমার দিকে ফেরানো, তিনি তাঁর দৃষ্টিহীন চোখ দিয়ে আমাকে দেখার চেষ্টা করছেন।

‘তোমার কণ্ঠ কর্কশ শোনাচ্ছে। তুমি তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে যাবে,’ তিনি বলেন। আবার বলেন, ‘কেন তুমি সেখানে যাও না?’

‘সেখানে… এখন তো আমি আর কাউকে চিনতে পারব না’।

‘তুমি পারবে। দেখলেই চিনতে পারবে। যদি না পার, তারই তোমাকে চিনে নেবে’।

‘অনেক দিন হয়ে গেছে,’ আমি বললাম, ‘আমি জানি না কীভাবে সেখানে যাব’।

‘তুমি যখন বের হবে তখন স্মরণ করা শুরু করবে’।

‘কীভাবে?’ আমি বললাম, ‘সবকিছু নিশ্চয়ই পাল্টে গেছে’।

‘কিছুই পাল্টায়নি’, তিনি বললেন। আবার তিনি অচেতনতার মধ্যে ঢলে পড়লেন, তারপরও তিনি কিছু বলার চেষ্টা করলেন, ‘কিছুই পাল্টায়নি…’। তারপর তিনি মূর্ছা যান।

আমি তাঁর পাশে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। মায়ের সাথে সে বাড়িতে যাওয়ার স্মৃতি রোমন্থন করে আমি অনেক চেষ্টা করলাম সেই বাড়ি যাওয়ার পথ মনে করতে। আমি সেই বাড়ির নকশা মনে করার চেষ্টা করলাম। আমার মনে একটা ঢিবির কথা এলো- যাকে হাকিমদের ঢিবি বলা হত। যা সদর দরজায় দাঁড়ালেই সোজা দেখা যেত। হ্যাঁ, হাকিমদের ঢিবি ছিল শহরের পশ্চিমাঞ্চলে। কিছু জঙ্গল আর না-বাধানো কবরগুলো ছিল সে শহরের শেষ সীমানা।

আমি মাকে দু’হাতে তুলে নিলাম, তিনি যেমনটা করতেন আমার শৈশবে। মনে হলো আমি যেন শৈশবের ঋণ শোধ করছি। যদিও তিনি সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন তারপরও আমি তাকে বললাম, ‘আসো, আমাকে সাহায্য কর তোমার রুমে যেতে। সকাল আসুক, আমি অবশ্যই সেখানে যাব’।

পরের দিন সকালে আমি সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পরই ঘুম থেকে উঠলাম। এর পরপরই আমি বেরিয়ে পড়লাম বাসা থেকে।

২.

বহুদিন হয় আমি আমার পাড়া ছেড়ে পশ্চিমাঞ্চলে যাইনি। আমার চোখে অনেক পরিবর্তন ধরা পড়ল। মাটির ঘরগুলো ইটের দালান হয়েছে। খালি জায়গায় ছোট বাজার বসেছে। একটি পুরানো সমাধির ধ্বংসাবশেষের উপর কাঠের গুদাম তৈরি হয়েছে। বহুদিন আগে দেখা কারো মুখগুলো আর আগের মতো ছিল না। যাই হোক, কিছু মানুষের সঙ্গে আমি দেখা করলাম, যারা আমাকে চিনতে অথবা আমি যাদের চিনতে পেরেছি। যদিও আমি জানতাম না তারা আমার নিজের পাড়ায় থাকে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বললাম সাধারণ আনন্দে। কিন্তু আমি কোথায় যাচ্ছি তা কাউকে বলিনি।

আমার পাড়া ছাড়িয়ে একটি শস্যের বাজারে এলাম। তারপর ঔষধ আর মশলার বাজার। বাজারের দুপাশেই পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা চলে গেছে অনেক দূর। রাস্তার পাশে অস্থায়ী পানীয় ও নাস্তার দোকান। যাইহোক, যে রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটছি তাতে অনেক গর্ত দেখতে পেলাম। আরো যত অগ্রসর হলাম পুরো রাস্তাই নোংরা। এমনকি আমি রাস্তাটি মনে করতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম আমি সঠিক পথেই যাচ্ছি।

সূর্যের তাপ প্রখর হচ্ছিল। একসময় নোংরা রাস্তার সীমারেখা পর্যন্ত উধাও হয়ে যায়। কিন্তু আমি ঠিকই কল্পনা করতে পারছিলাম ধুলোয় ঢাকা গাছের দুটো আঁকাবাকা সারি। হঠাৎ সারিগুলো এমনভাবে হারিয়ে গেল যে রাস্তার একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না। রাস্তাটি হাতের পাঁচ আঙুলের মতো ছড়িয়ে গেল। এখানে এসে আমি দোনমোনায় পড়ে গেলাম, আমি বাড়ি ছেড়েছি বেশি ক্ষণ হয়নি; তাই নিশ্চিত যে আমি আমার পাড়া থেকে খুব বেশি দূরে যাই না। দাঁড়িয়ে পড়লাম আর ভাবতে লাগলাম যাওয়ার রাস্তাটি। আমি চারদিকে ঘুরে দেখতে লাগলাম। অসমান জমিনের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ধূলি ধূসরিত গাছপালা। আমি ভাবতে লাগলাম ধূলো ধূসরিত গাছের সারির মধ্যে নোংরা রাস্তা। এসব অবশ্য আমার কল্পনায় ছিল। কারণ এরকম কোন গাছ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার হিসেবে আমি একটা সরল পথ ধরে হাঁটছিলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো রাস্তাটি কেমন বাঁক নিয়েছে অথবা অজান্তেই সে পথিককে ছুড়ে মেরেছে। আমি নিশ্চিত হলাম এ পথ দিয়ে আমি কয়েকবার আসা যাওয়া করেছি। আমি যদি এই রাস্তার কোন চিহ্ন খুঁজে না পেতাম তাহলে আমার পক্ষে বাড়ি ফেরা অসম্ভব ছিল। তবে সে সময় আমি হাকিম বাড়ির ঢিবিনিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলাম, যেটি কোথাও দেখা যাচ্ছিল না, এরপর আমি কীভাবে বাড়ি ফিরব! যদিও চারদিকে গাছ ছিল, কিন্তু গাছগুলো এতো রুগ্ন ছিল যে জমিনের কিছুই আমার দৃষ্টির আড়াল হয়নি।

আমার ডানদিকের জমিন উপরের দিকে ওঠা, অনেক দূর পর্যন্ত উপরের দিকে ঢালু। ঢাল ঝোপের সাথে এতটাই বিন্দু বিন্দু মিশে গিয়েছিল, ঢালের অন্য দিকে কী আছে তা দেখা ছিল অসম্ভব।

যদি সেখানে কিছু থাকে, আমাকে ওপারে যেতে হবে। আমি ভাবলাম, আমাকে ওপাশে যেতে হবে। আমার ধারণা সঠিক ছিলাম। ঘন ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই দেখলাম ছোট ছোট বাদামী ইটের তৈরি একটি একতলা বাড়ি আমার সামনে। অবশ্য এই বাড়িটি আমি খুঁজছিলাম না। তা সত্ত্বেও আমি বাড়িটির দিকে সোজা হেঁটে যাই। দরজায় একটি নামফলক ঝুলানো রয়েছে। অবশ্য এর লেখাগুলো নিশ্চিহ্নপ্রায়। বাড়ির ভেতর একবারে নিঃশব্দ ছিল। কিন্তু নির্জন বাড়িটির বাইরের অবস্থা মোটেও সেরকম ছিল না। তাই আমি তিনবার দরজায় কড়া নাড়ালাম। কিছুক্ষণ পর দরজার ওপার থেকে নড়াচড়ার সামান্য শব্দ পাওয়া গেল এবং কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’
কি বলা যায় আমি ভাবতে লাগলাম। শেষমেশ বললাম, ‘আমি বোধহয় রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। এটা কি হাকিম বাড়ি?’

‘হাকিম বাড়ি… আপনি কোত্থেকে এসেছেন?’

প্রশ্নটি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক ছিল। কিছুটা বিরক্ত বোধ করলাম প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করার  জন্য। কিন্তু একজন মহিলা খুব শান্তভাবে ওপাশ থেকে কথা বলছিলেন। তার কণ্ঠস্বর খুবই মার্জিত। সে সামান্য খোলা দরজা ধরে ছিল, খুব হালকাভাবে। তার আঙুলের কমলা রং করা নখ দেখা যাচ্ছিল। একটা দুর্বল স্মৃতি আমার মনে হানা দিল। ঠিক তখনই দরজাটা আরও খানিকটা খুলে গেল। এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমি এক ঝলক অস্পষ্ট আলোয় আলোকিত উঠোন দেখতে পেলাম। উঠোনের এক কোণে বেড়ে ওঠা ডালিম গাছের কয়েকটি ডালে সূর্যাস্তের আভাস পেলাম। পরের মুহূর্তে আমার অস্পষ্ট মনে হলো মা এই বাড়িতে সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি দিতেন। কিন্তু আমি মনে করতে পারছিলাম না কারা এ বাসায় থাকতেন।

‘আপনি কী বিদেশ থেকে এসেছেন?’ দরজার ওপার থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এলো।

‘না’। আমি বললাম। আমার পরিচয় দিলাম। তারপর আমি বললাম, ‘আমি বহুদিন পর এ পথে এসেছি’।

কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে তিনি উত্তর করলেন, ‘অনুগ্রহ করে বাড়ির পেছনে যান, সোজা সামনে হাকিম বাড়ি দেখতে পাবেন’।

একজন বয়স্কা মহিলার ভারী কণ্ঠ শোন গেল, ‘মেহর, কে এসেছে?’

আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পেছনে গেলাম। সামনে অনেক ছোট বড়ো পাহাড় চোখে পড়ল। এদের বিশৃঙ্খল সারিগুলি যেন রাস্তায় ছাপ ফেলেছে। পাহাড়গুলো ছিল স্রেফ মাটির ঢিবি। কিন্তু সামান্য এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল আরেকটি ঢিবি। আমি নিবিড়ভাবে অন্য ঢিবির দিকে তাকালাম: ঝোপের মধ্যে মাটির কবরের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। কিছু কবরের উপরে করা চুনকাম তীব্র সূর্যালোকে ঝিকমিক করছিল।

৩.

আমি যে বাড়িটি খুঁজছিলাম সেটা এ বাড়ির পেছনেই ছিল। আমাকে তাই বাড়িটিকে ঘিরে অর্ধেকটা পথ যেতে হলো। বিশাল, পুরানো কাঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম, কি বলে আমার আগমনের খবর তাদের জানাব। কাঠের দরজাটি ছিল খুব ভারী ও স্যাঁতসেঁতে। তাই এতে টোকা মেরে কোন কাজ হবে না বুঝে গেলাম। তারপরও আমি তিনবার টোকা দিলাম। কিন্তু আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। আমার মনে হলো বাড়িটি সম্ভবত নির্জন । দরজায় একটা হালকা ধাক্কা দিলাম। দরজার দুটো কপাট কব্জার উপর ভর করে মসৃণভাবে খুলে গেল। ছোট্ট দরজা দিয়ে আমার সামনে উন্মোচিত হলো প্রশস্ত উঠোন। দ্বিতীয় দরজাটি হা মেলা ছিল। কিন্তু প্রবেশদ্বারের উপর দুই স্তরের চটের একটি পর্দা ঝুলানো ছিল। দরজাটির দিকে গেলাম। তখন শুনতে পেলাম মানুষের কথার আওয়াজ। আমি টোকা মারলাম। কেউ একজন বলে উঠল, ‘দেখ ত, কেউ একজন দরজা নাড়াচ্ছে-‘তখন আমার মনে হাজারটা চিন্তা ভিড় করল। এখানে এখন কারা থাকে? তাদেরকে কী বলা যায়? আমার আসার কারণ কী বলব? আমি তাদের কীভাবে নিজেকে চেনাব? চলে যাবার একটা তাগিদ ভেতরে দেখা দিল, কিন্তু ঠিক তখনই পর্দার আড়াল থেকে একটি কর্কশ নারীকণ্ঠ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’আমার পুরো নাম বললাম।‘কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’আমার কাছে একটাই মাত্র উত্তর ছিল, ‘হাকিম সাহেব’।‘মাতাব(ডিসপেন্সারি) তো বাড়ির উল্টো দিকে, দয়া করে সেখানে যান। তিনি বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন’।শেষ কথাগুলোর সঙ্গে তার কণ্ঠস্বর যেন মিলিয়ে আসছিল। আমি দেরি না করে চড়া গলায় বললাম, ‘দয়া করে ভেতরে আমার কথাটা বলুন’।সেই কণ্ঠটি আবার কাছ থেকে শোনা গেল। এখন অবশ্য স্বর আগের চেয়ে কম কর্কশ।‘আপনি কোত্থেকে এসেছেন?’আমি আবার নিজের পরিচয় দিলাম। তারপর থামলাম, মায়ের নাম বললাম। আরেকটু থেমে মায়ের ডাক নাম বললাম, যে নামে এ পরিবারের লোকজন তাকে ডাকত। বললাম আমি তার ছেলে। ইতস্তত করে আমার সেই নামটা বললাম যে নাম বললে ছেলেবেলায় আমি খ্যাপে যেতাম। আমি এমন এলোমেলোভাবে কথাগুলো বলছিলাম, পর্দার আড়ালের মহিলাটি তা আরো রসিয়ে কেউ একজনকে বলছিলেন, তখন ভিতরে কথা বলা মহিলাদের কণ্ঠস্বর কিছুটা চড়া এবং দ্রুততর হয়ে ওঠে। আমি শুনছিলাম তারা আমার মায়ের ঘরোয়া নাম আর আমার ডাকনাম বলাবলি করছিল। দুটো নামই অনেকক্ষণ ধরে বলতে শুনলাম। আমি নিশ্চিত হলাম যে আমি যদি কিছুক্ষণ তাদের কথা শুনতে থাকি তবে নি:সন্দেহে এ বাড়ির সমস্ত বিন্যাস এবং এর সমস্ত বাসিন্দাদের স্মরণ করতে পারব। প্রকৃতপক্ষে, একটি প্রশস্ত উঠানের প্রতিচ্ছবি আমার মনে ভেসে উঠতে লাগল। ঠিক তখন একটা চটের পর্দা আমার দিকে উড়ে এলো কোলাহল নিয়ে। পর্দাটি কিছুটা উপরে ওঠায় একটা সাইকেলের সামনের চাকা দেখা গেল। আমি একপাশে সরে গেলাম। এক বালক সাইকেল হাতে উঠোন দিয়ে হেঁটে আসছে। সে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।  কিছুক্ষণ পর একটা চাপা শব্দ পর্দার ওপার থেকে ভেসে এলো। সে শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কিছু হাঁস উঠোনে বেরিয়ে এলো। এরা এতো বিশৃঙ্খলভাবে বেরিয়ে আসছিল তা দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তাদের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এরা হেলেদুলে প্যাকপ্যাক করতে করতে সদর দরজার দিয়ে এগিয়ে আসছিল। এর মধ্যে কিছুক্ষণ কিছুই শোনা গেল না বাড়ির ভেতর থেকে। আমি উঠোনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কল্পনা করতে লাগলাম যে নির্জন ঘরগুলো থেকে যে নিস্তব্ধতা ভেসে আসছে তা পর্দার আড়াল থেকে আমার উপর ঢেলে দেয়া হচ্ছে, আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলার জন্য।  ঠিক তখন কেউ একজন পর্দার ওপার থেকে বলল, ‘ভেতরে আসুন’।দুই পরতের পর্দা ঠেলে আমি অন্দরমহলে পা রাখলাম। ছোটবেলায় দেখতাম প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে একটা বড়ো উঠোন, তার পাশে দুটো বা তিনটে দালান,এদেরকে কাছারি ঘর বলা হলেও এতে কোন দরজা বা জানালা ছিল না। ছিল ঝুল বারেন্দা আর কাঠের খিলান।এ বাড়িটাও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন অবশ্য সেটা ঘন ঘন মনে করতে পারছি না। উঠোনের মধ্যে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম পুরো বাড়িই পরিপূর্ণ। মহিলারা তাদের ঘাড় টিপচ্ছিল আর কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি অনুমান করার চেষ্টা করলাম যে বাড়ির কর্তীকে কোথায় পাওয়া যাবে। সোজা হলের দিকে এগিয়ে গেলাম, যেখানে উঁচু খিলান থেকে বড় লণ্ঠন ঝুলছে। একটা কাঠের তৈরি বড়ো চওকার বোর্ড মাটিত পড়েছিল। এর একপাশে বিশালদর্শন একটি ছাউনিঅলা বিছানা। বিছানার উপর সদ্য ধোয়া ঝলমলে চাদর যাতে মাড়ের কড়কড়ে ভাব রয়ে গেছে। বয়স্ক মহিলা চওকার বোর্ডের ওপর বসেছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলাম উনি কে না জেনেই। তিনি হাসলেন, আমার উপর আশীর্বাদ বর্ষণ করে বললেন, ‘বাছা, কী কারণে তুমি আজ এখানে এসেছো?’মনে হলো উত্তর পাওয়ার আশায় এ প্রশ্ন করা হয়নি। তাই যতটা সম্ভব সৌজন্যের সঙ্গে আমি তাঁর কুশলাদি জানতে চাইলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হঠাৎ কেন আমাদের কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় তুমি এলে তো যেতে চাইতে না’।তারপর তিনি এমন অনেক ঘটনা বর্ণনা করলেন যখন আমার পীড়াপীড়ির কারণে মাকে কয়েকদিন এখানে থাকতে হয়েছিল। ‘তারপরও তুমি কাঁদতে কাঁদতে যেতে,’ ওড়নারা খুটো দিয়ে চোখের কোণ মুছতে মুছতে তিনি বললেন।বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে মহিলারা এসে কাছারি ঘরে জড়ো হতে লাগল। বেশির ভাগই নিজে থেকে নিজেদের পরিচয় দিতে লাগলেন। জটিল সম্পর্কগুলোর বোঝার মতো মানুষ আমি ছিলাম না। তবুও আমি এমনভাবে দেখার চেষ্টা করলাম যেন আমি প্রত্যেক মহিলাকে চিনতে পেরেছি। তারা নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এবং ইতিমধ্যেই জানিয়েছে তারা কীভাবে আমার আত্মীয় হয়। মহিলাদের মাথা তেল জবজবে এবং চুলগুলো সুন্দর করে পাট করা। সবাই মোটা সুতি কাপড়ের ওড়না পরা। কিছু মনে হলো ঘরে রং করা। সবার কাছেই আমার শৈশবের গল্পের সংগ্রহ রয়েছে। আমাকে উঠোনের কোণার একটি পেয়ারা গাছ দেখানো হলো। সেখান থেকে আমি পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে মাও অজ্ঞান হয়ে যান। যখন আমার ঠাট্টার বিষয় উঠে আসে, তখন আমি জানতে পারি যে উপস্থিত একজন মহিলাও তাদের একজনের লক্ষ্য হতে রক্ষা পাননি।আমি উপলব্ধি করলাম আমার কিছু বলা ঠিক হবে না। কিন্তু তারা আমার থেকে কিছু শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল। পুরো কাছারি ঘর নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে তাকাতে লাগলাম। দেখলাম কিছু ছোট মেয়ে চওকার পাশে বসে আছে। আমি তাদের পড়াশোনার কথা জানতে চাইলাম। তারা কী কী করে তাও। আমার কথা শুনে তারা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে একজন আরেকজনের উপর পড়তে শুরু করল। কেউ একজন তাদের হয়ে উত্তর দিয়েছিল। ঠিক সেসময় তিনজন বালক এসে মেয়েদের থেকে একটু দূরে বসল। আমি তাদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে আলাপ করলাম। আমি ভেবেছিলাম তারা আলোচনায় আগ্রহী হবে, কিন্তু তাদের আগ্রহ কী তা আমার জানা ছিল না। ছেলেগুলো আমার কাছে বোকা মনে হলো, মেয়েগুলো কুৎসিত। যদিও আমার কাছে মেয়েদের বিনয়ে পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টা ভালো লাগল। ছেলেদের জন্য আমি একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় খুঁজছিলাম। এমন সময় দরজায় একটা খড়খড় শব্দ শোনা গেল। দেখলাম সেই সাইকেলওয়ালা ছেলে সাইকেল নিয়ে ফিরেছে। তার হাতে পত্রিকায় মোড়ানো কিছু যা থেকে তেল ঝরছে। সে কাছারি ঘরের তাকিয়ে একটা ইশারা করল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা উঠে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর তাদের হাসির আওয়াজ আর তৈজস্বপত্রের ঝনঝন শব্দ শোনা গেল। আমার মনে হলো দুটো শব্দের মধ্যে একটা অস্পষ্ট সম্পর্ক আছে। আমি ধারণা করলাম তারা আমি যেভাবে কথা বলি তা অনুকরণ করে ব্যঙ্গ করছে।কতক্ষণ ধরে সেই কাছারিঘরে বসে আছি তা ধারণা করার চেষ্টা করলাম। ঠিক তখন আমার বাঁ পাশের দরজা খুলে উঠল। দেখলাম নলখাগড়ার পর্দার ওপারে হাকিম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চিনতে পারলাম। তিনি তাঁর মাথার টুপি ঠিক করতে লাগলেন। তারপর তিনি তাঁর মুখনলখাগড়ার পর্দার দিকে ফেরালেন। তিনি তারা পকেটে কিছু ভরতে লাগলেন। আমি দেখলাম তার পেছনে আরেকটি দরজায় কৃষাণ-কৃষাণীরা ভিড় জমিয়েছে।‌‘তোমরা সবাই শোন, আমি আসছি’, নলখাগড়ার পর্দা সরাতে সরাতে তিনি বললেন।‘আপনি কি একটু এদিকে আসতে পারবেন,’ গৃহকর্তী বললেন, ‘দেখুন কে এসেছে… ওকে কি চিনতে পারবেন?’হাকিম সাহেব কাছারি ঘরের দিকে এগিয়ে এলেন। আমি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি আমার পুরো নাম পুনরাবৃত্তি করে নরম গলায় বললেন, ‘মিয়া, তুমি অনেক পাল্টে গেছো। তোমাকে যদি অন্য কোথাও দেখতাম তাহলে তো আমি চিনতেই পারতাম না’।কিছুক্ষণের জন্য তিনি আমার শৈশবের কথাগুলো বলতে লাগলেন। আরো বললেন আমার আব্বার অটল শ্রদ্ধার কথা। এমন সময় পিতলের একটা ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এলো কাজের মেয়ে। সুস্বাদ খাবারে ভরা রেকাবিগুলোর দিকে তাকালাম। বেশির ভাগ খাবারই বাজার থেকে কেনা। অবশ্য কিছু ঘরেও করা হয়েছে। রেকাবিগুলোর দিকে ইশরা করে বললেন, ‘এখন আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না’। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে তাহলে. আমার মাতাবে যেতে দেরি হবে’।তারপর তিনি তার ঘরে ফিরে গেলেন।‘মাতাব নিয়ে তিনি খুব ব্যস্ত থাকেন’। মার্জনা চাইবার সুরে গৃহকর্তী বললেন। তিনি আরো কিছু বললেন। কিন্তু আমি তন্দ্রার মধ্যে থাকায় পুরোটা ধরতে পারলাম না। আমি যখন সম্বিত ফিরে পেলাম তখন দেখলাম কাছারি ঘরে কেবল গৃহকর্তী আছেন। দুটো খিলানে মোটা কাপড়ের পর্দা ঝুলছে। কেবল মধ্যের খিলানটি খোলা ছিল। তাতে একটা ঝুলন্ত লন্ঠন দুলছিল। লন্ঠনটি বাতাসে কখনো ডানে কখনো বাঁয়ে যাচ্ছিল। আমি নলখাগড়ার পর্দার দিকে তাকালাম। পিছনের দরজার কাছে হাকিম সাহেব একজন বৃদ্ধ কৃষকের নাড়িতে হাত রেখে গভীর চিন্তায় হারিয়েগেলেন। আমি গৃহকর্তীর দিকে তাকালাম। তিনিও ঝিমাচ্ছিলেন। কিন্তু মেয়েদের হাসির চাপা আওয়াজে তিনি সচকিত হয়ে সোজা হয়ে বসলেন। ‘মেহর কি এসেছে?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন। আমি প্রথমবারের মতো তাঁর প্রসন্ন মুখে একটা উদ্বেগের ছাপ দেখতে পেলাম। ঠিক তখন ডান খিলানে ঝোলানো পর্দাটি একপাশে সরে গিয়ে এক তরুণী কাছারি ঘরে প্রবেশ করল। তার দিকে একটা ক্ষণিকের দৃষ্টি দিলাম। তার পরনে ছিল কমলা রঙের শাড়ি। শাড়িটি ভাঁজ পরে না এমন কাপড়ে তৈরি। হাতের নখে ছিল একই রঙের নেইল পালিশ। গৃহকর্তী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি কি মেহরকে চিনতে পারছো?’আমি আবার তরুণীর দিকে তাকালাম। তার ঠোঁটেহালকা কমলা লিপস্টিকের রং। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে অভিবাদন জানালাম যেন আমি তাকে চিনতে পেরেছি, যেমনটি আমি অন্য মহিলাদের বেলায় করেছি। আমি তার দিকে আরো নিবিড়ভাবে তাকালাম। কিছু তরুণী তাকে পর্দার আড়াল থেকে ডাকায় সে কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হাকিম সাহেব তখনও বৃদ্ধ কৃষাণের নাড়ি ধরে বসে আছেন। গৃহকর্তী আবার ঝিমাতে লাগেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। গৃহকর্তী অর্ধনিমীলিত নয়নে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, ‘অনুমতি পেলে আমি যেত চাই’।‘ও তুমি কি যেতে যাচ্ছো?’ তিনি বেশ ভারী গলায় কথাটি বলেন। তখনই আমার একটা কথা মনে পড়ল।‘তা.. সেই ভয়ংকর ঘরটা.. কি এখনো আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘ভয়ংকর ঘর!’ তিনি ভাবতে ভাবতে বললেন। তারপর একটা বিষণ্ন হাসি দিয়ে বললেন, ‘একদিন সেই ঘরে তুমি মেহরকে আটকে রেখেছিলে’। হাসিটা আরো বিষাদে ছেয়ে বললেন, ‘তুমি অন্তত এখানাকার কিছু স্মৃতি মনে করতে পারছো’।‘সেটা কি এখনো আছে?’‘এটা ঠিক সেখানেই আছে, ঢিবির কাছের দরজার পাশে। খুব দূরে নয়। রান্নাঘর আগেই ছিল, ধোঁয়ায় কালো দেয়াল । একটি দরজা আছে যা বাইরের দিকে খোলে। খোলাই থাকে। হুড়কো আর বাঁধা হয় না’।‘তাহলে আমি আসি?’ হাত তুলে বিদায় জানানোর ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে উঠোনে পা রাখলাম।  ‘আজ যেভাবে এলে মাঝে মাঝে সেভাবে এসো। সময় হলে প্রতিদিন এসো’। একটি গাঢ় নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি কথাগুলো বললেন। তাতে তার কণ্ঠস্বর কিছুটা কেঁপে উঠল। ‘সময় কেমন ব্যবধান তৈরি করে বাছা’।তার ঠোঁট তখনও কাঁপছিল। কিন্তু আমি উঠোন পেরিয়ে দেউরির পাশের দরজার দিকে গেলাম।সেখানে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। দেয়াল ও ছাদ ভরে আছে মাকড়সার ঝুলে। কিন্তু তা ঘরটাকে অত্যধিক অন্ধকার করেনি। তুষ মেশানো ভেজা কাদামাটিতে তৈরি একটি জরাজীর্ণ বড় চুলা একপাশে দাঁড়িয়েছিল। আমার সামনে একটি উলম্ব আলোর ছিদ্র দেখতে পেলাম।দরজাটি অবশ্যই বাইরের দিকে খোলা, আমি নিজেকে বললাম, ছিদ্রের কাছে এসে এটির মধ্য দিয়ে তাকালাম। সরাসরি হাকিম বাড়ির ঘর দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি আমার কপালে ঝুলন্ত লোহার হুড়কোর ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করলাম। সেটিকে আমার দিকে টেনে নিলাম। একটা দরজার কপাট খুলে গেল। আমি হুড়কোটা ছেড়ে দিতে দরজার কপাট আপনা থেকে বন্ধ হয়ে গেল। শৈশবে এই দরজা খোলা এবং আপনা থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখা আমার প্রিয় একটি বিনোদন ছিল। সেটা মনে করে কয়েকবার দরজা খোলা বন্ধ করলাম। আমি দুটো কপাটই একসঙ্গে আমার দিকে টেনে নিলাম এবং বেরিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমি বাদামী রঙের একতলা বাড়িটির পেছনে আসি। হাকিম বাড়ি, জঙ্গল আর কবর এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম কিছু একটা করা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় এলো হাকিম বাড়ির পাশের উঁচু ভিটির মতো জায়গাটায় আমার ওঠা হয়নি। একই সময় আমি অন্য আরেকটা বিষয় চিন্তা করলাম। ফিরে গিয়ে সেখানে উঠলাম। আমার কল্পনার চেয়েও বেশি কবর আছে সেখানে। যে খড়ের গাদায় একটা বুড়ো সাপ থাকত সেটা দেখা যাচ্ছে না। যারা সাপটিকে দেখেছেন বলে দাবি করতেন তারা বলেতেন যে এর ফণাতে চুল গজিয়েছে। বাচ্চারা খড়ের গাদার আশেপাশে খেলত। এমনকি আমিও এই খড়ের গাদার মধ্যে লুকিয়েছিলাম। কিন্তু কখনোই সাপটি কারো ক্ষতি করেনি। সম্ভবত এজন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিশ্বাস করা হত সাপটি হাকিম বাড়িকে পাহারা দিয়ে রাখছে। আংশিক শুকনো, আংশিক সবুজ খড়ের গাদার ছবিটি তখন আমার স্মৃতিতে সম্পূর্ণরূপে উঠে এসেছিল। কিন্তু আমি যা মনে করতে পারছিলাম না তা হল খড়ের গাদাটি ঠিক কোথায় ছিল। যেখানে আমি সন্দেহ করেছিলাম সে জায়গাটি চুনকামে ঝলমলে কিছু কবরে ঢাকা ছিল। আমি উচু জায়গা থেকে বাড়ির প্রধান দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার ইচ্ছে হলো সেখানে গিয়ে দরজায় ঠকঠক শব্দ করতে। এমনকি তা করার জন্য এগিয়েও গিয়েছিলাম, কিন্তু তারপরে থেমে গেলাম।ভাবলাম, এটা করা একেবারেই অযৌক্তিক কাজ হবে। বাড়ির থেকে উল্টো দিকের উচু জায়গা থেকে নেমে আসতে শুরু করলাম।ফেরার পথটা মোটেও কঠিন ছিল না। আমি সহজে বাড়ি ফিরে এলাম। 

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ

লেখক পরিচিতি: নাইয়ার মাসুদ(Naiyer Masud) একজন প্রখ্যাত উর্দু ও পারসিক ভাষার পন্ডিত, গল্পকার। ১৯৩৬ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মাসুদ হাসান রিজভী এবং মা হুসনে জাহান। বাবা মাসুদ হাসান রিজভি লখনৌ বিশ্ববিদ্যায়লের শিক্ষক ও পারসিক ভাষার একজন পন্ডিত ছিলেন। বাবার যোগ্যউত্তরসূরী হিসেবে নাইয়ার মাসুদও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্সি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণের পর তিনি তাঁর বাবার তৈরি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। বাড়ির নাম “আদাবিস্তান”, যার অর্থ সাহিত্যের আবাস। সাহিত্যে সাথে তাঁদের বন্ধনটা যে নিবিড় ছিল, এ থেকে স্পষ্ট। নাইয়ার মাসুদ অসংখ্য ছোটো গল্প লিখেছেন। বিভিন্ন ভাষায় তা অনূদিতও হয়েছে। পাশাপাশি প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। কাফকার অনুবাদক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। তার লেখায় কাফকা, বোর্হেস প্রমুখদের প্রভাব লক্ষনীয়। ‘৭০ এর দশক থেকে তিনি ছোটো গল্প প্রকাশ শুরু করেন। “দ্য স্নেক ক্যাচার(The Snake Catcher),” “এসেন্স অফ ক্যামফর(Essence of Camphor)” তাঁর সর্বাধিক পঠিত গল্পগ্রন্থ। বাবার মতো পদ্মশ্রী না পেলেও সাহিত্যিক জীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উর্দু একাডেমি পুরস্কার(১৯৯৩), সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার(১৯৯৩), গালিব পুরস্কার(২০০১), প্রেসিডেন্ট অফ ইন্ডিয়া পুরস্কার(২০০৩)। ২০০৭ সালে সরস্বতী সাহিত্য সম্মানে তাঁকে ভূষিত করা হয়। তাঁর ছোটো গল্পের সংকলন, “ তাউস চমন কি ময়না”র জন্য তিনি এই পুরস্কার পান। ২০১৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মুহাম্মদ উমর মেমন

মুহাম্মদ উমর মেমন

মুহম্মদ উমর মেনন উয়িসকন্সিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু সাহিত্য ও ইসলামিক গবেষণার ইমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি একজন প্রথিতযশা সমালোচক, ছোট গল্প লেখক,এবং আধ ডজন উর্দু গল্প সংকলনের অনুবাদক ও সম্পাদক।

জয়দীপ দে

জয়দীপ দে

জন্ম : বাংলাদেশের চট্টগ্রামে, ১৯৮০ সালে।
চারুকলা বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোতর।
কথাসাহিত্যিক। প্রবন্ধকার।
প্রকাশিত উপন্যাস : কাসিদ। উদয়ের পথে।
নিষুপ্ত। গহন পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *